পাঁচ বছর আগে কেন খুন হয়েছিলেন মিঠু? কেন মেলেনি লাশ?

আমানুর রহমান রনি
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫:০০আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:১৩

খুলনার দৌলতপুরের ২৪ বছরের যুবক আলী হোসেন মিঠু। ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর বিকালে একটি ফোনকল পেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর আর ফেরেননি। এতদিন বাবা-মা জানতো তিনি অপহৃত হয়েছেন। কোথাও না কোথাও আটকে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি তিন জনকে গ্রেফতারের পর সিআইডি জানালো, অপহরণের পর খুন করা হয় মিঠুকে।

মিঠুর লাশের সন্ধান মেলেনি। গ্রেফতার তিন জন হত্যার কথা স্বীকার করলেও লাশ গুম করায় সেটারও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। লাশ না পেলে কঠিন হবে বিচারকাজ। কেবল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দিলেও আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। সিআইডি বলছে, মিঠুর লাশ খুঁজে বের করে শনাক্ত করার তদন্ত জোরালোভাবেই চলছে।

যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন মিঠু

আলী হোসেন মিঠু থাকতেন তার বাবা নুরুল হক, মা খুরসিদা বেগম, স্ত্রী ও অপর দুই ভাইবোন নিয়ে। একই বাসায় থাকতো সবাই। বাবা দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফিরে মিঠুকে কয়লা ব্যবসার জন্য টাকা দেন। এরপর ব্যবসা শুরু করেন মিঠু।

২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর। পরিবারের সবাই দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম করছিলেন। বিকাল ৩টার দিকে একজনের ফোন পেয়ে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন মিঠু। এরপর আর ফেরেননি। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও ছেলেকে পাননি মা-বাবা।

মিঠুর মোবাইল নম্বরের কললিস্ট ওঠানো হয়। কললিস্টে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে সন্দেহজনক তিন জনের নাম উল্লেখ করে ওই বছরের ২৮ নভেম্বর দৌলতপুর থানায় মামলা করেন মিঠুর বাবা এনামুল হক। মামলার নম্বর ১৯। আসামিরা হলেন, রাশেদুল ইসলাম, রিয়াজুল ইসলাম ওরফে আহাদ শেখ এবং আহাদ শেখের স্ত্রী ও শ্যালিকা। মামলার পর আহাদকে গ্রেফতার করে দৌলতপুর থানায় সোপর্দ করে র‌্যাব। কিছু দিন পরই জামিনে বের হয়ে যান আহাদ। এরপর থেকে তিনি পলাতক। পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় খুলনার সিআইডি।

খুলতে শুরু করে জট

খুলনার সিআইডি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর রহস্য উদঘাটন শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ পান উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলাম। এ বছরের ৩ জানুয়ারি খুলনার রূপসা থানার বাগমারা এলাকা থেকে রাশেদুল ইসলামকে গ্রেফতার করেন তিনি। এরপর ৫ জানুয়ারি রূপসা থানার বাবাধাল গ্রাম থেকে সুমন মল্লিক এবং ২৫ জানুয়ারি ঝালকাঠির সরকারি কলেজের সামনে থেকে ইমরান শেখ ওরফে মেহেদী চৌধুরী নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তিন জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

লাশ গুম করা হয় যেভাবে

ঘটনার দিন মিঠুকে রাশেদুলের মোবাইল থেকে কল করে আহাদ। এর আগেই মিঠুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে রাশেদুল। তাই রাশেদের মোবাইল দিয়ে মিঠুকে ফোন করে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। এরপর মিঠু মোটরসাইকেল নিয়ে আহাদ ও রাশেদুলকে নিয়ে ঝালকাঠি চলে যান। পরে জেলার সদর থানার কেপায়েতনগর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় মিঠুকে। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল সুমন মল্লিক ও ইমরান শেখ ওরফে মেহেদী চৌধুরী। পরিত্যক্ত বাড়িটি ইমরান শেখের খালু মৃত বারেকের।

সিআইডি খুলনার বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে গ্রেফতার আসামিদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে বলেন, ‘পরিত্যক্ত বাড়িতে যাওয়ার পর কোমল পানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় মিঠুকে। মিঠু অচেতন হয়ে পড়লে তার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে তারা। হত্যার পর রাতেই মিঠুর লাশ বস্তায় ভরে মোটরসাইকেলে করে ঝালকাঠির গাবখান ব্রিজের ওপর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। লাশ ফেলে দ্রুত চলে যায় আসামিরা। পরে মিঠুর মোটরসাইকেলটি ওরা যশোরে নিয় বিক্রি করে দেয়।’

যে কারণে হত্যা

আলী হোসেন মিঠুকে হত্যার কারণ ও পরিকল্পনার কথা তিন আসামির স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে। রাশেদুল আদালতকে জানিয়েছেন, আহাদ শেখ বয়সে মিঠুর বড় হলেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। মিঠু আহাদকে বড় ভাই বলে ডাকতো। আহাদ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিলেন। নিজের শ্যালিকার সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়।

একটি মামলায় জেলে যান আহাদ। ওই সময় তার শ্যালিকার সঙ্গে মিঠুর সম্পর্ক হয়। আহাদ জেল থেকে বের হয়ে বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি তার শ্যালিকাকে মিঠুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু রাজি হন না ওই নারী। এরপরই মিঠুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন আহাদ।

সিআইডির ওসি মোছা. মাহমুদা খাতুন জানান, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহাদ তার বন্ধু রাশেদুলকে ভিকটিম মিঠুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বলেন। ঘটনার দিন ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর রাশেদুলের মোবাইল নম্বর দিয়ে মিঠুকে ফোন করে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে আহাদ। তারা মিঠুর বাড়িতে গিয়ে তার মোটরসাইকেলে করে ঝালকাঠির রাজাপুর যায়। আগে থেকে সেখানে অবস্থানরত সুমন মল্লিক ও মেহেদী চৌধুরীসহ চার জন মিলে মিঠুকে হত্যা করে।

লাশের খোঁজে সিআইডি

পাঁচ বছর আগে ঝালকাঠির গাবখান ব্রিজ থেকে বস্তায় ভরে লাশ নদীতে ফেলা হয়। তাই পুলিশের ধারণা, ব্রিজের আশপাশে এখন লাশ নেই। বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে যেহেতু ফেলা হয়েছে, তাই লাশ খুঁজে লাভ হবে না। ওই নদীর তীরবর্তী থানাগুলোতে তথ্য চেয়েছি। ২০১৬ সালে বা ঘটনার কাছাকাছি সময়ে অজ্ঞাত কোনও লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। করে থাকলে আমরা ডিএনএ টেস্ট করতে পারবো।’

লাশ পাওয়া না গেলে?

লাশ না মিললে অভিযোগপত্র দিতে আইনি জটিলতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে আনিচুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলাটি এখনও তদন্ত করছি। লাশ শনাক্ত করতেও কাজ করছি। এ বিষয়ে সরকারি আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আইনজীবী জীবন জয়ন্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেবল আসামিদের স্বীকারোক্তিতে হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দিতে আইনগত বাধা নেই। কিন্তু আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে লাশের প্রয়োজন। কারণ, আসামিরা আজ হয়তো স্বীকার করেছে, পরে স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারও করতে পারে।’

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুসারে পুলিশ মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। হত্যা মামলার আসামিরা যদি হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে তবে তার ভিত্তিতে চার্জশিট দাখিল করতে আইনত বাধা নেই। সাক্ষ্য আইন অনুসারে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রদত্ত জবানবন্দির যথেষ্ট সাক্ষ্যমূল্য রয়েছে। সুতরাং আসামি যদি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়, তদন্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই চার্জশিট দাখিল করতে হবে। লাশ না পাওয়া গেলে চার্জশিটে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দিতে হবে। লাশের সন্ধানে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে সেটাও বিস্তারিত লিখতে হবে।’

এখনও পলাতক মূলহোতা আহাদ

হত্যার সঙ্গে জড়িত তিন জন গ্রেফতার হলেও মূল পরিকল্পনাকারী আহাদ শেখ দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। পুলিশ তাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। জামিনে রয়েছে তার স্ত্রী ও শ্যালিকা।

মিঠুর মায়ের অপেক্ষা...

মিঠুর মা খুরসিদা বেগমকে ছেলের হত্যার কথা জানানো হয়নি এখনও। মিঠুর বাবা নুরুল হক সিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিঠুর মা সব সময় কান্নাকাটি করেন। তার বিশ্বাস ছেলে ফিরে আসবে। আমরা সবাই জানি মিঠু বেঁচে নাই। আমি ছেলের ছবি বিভিন্ন থানায় দিয়ে এসেছি। যাতে অন্তত লাশ পাওয়া যায়।’

 

 

/এআরআর/এফএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধন খসড়া অনুমোদন
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধন খসড়া অনুমোদন
বিচার বিভাগের বাজেট পৃথকীকরণসহ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্গঠনের দাবি
বিচার বিভাগের বাজেট পৃথকীকরণসহ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পুনর্গঠনের দাবি
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী