কোটালীপাড়ায় আ.লীগ সরকারকে নিশ্চিহ্নের অপচেষ্টা হয়েছিলো: হাইকোর্ট

বাহাউদ্দিন ইমরান
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪:৪৪আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬:৩০

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) এবং আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন, কোটালীপাড়ায় বোমা হামলার প্রচেষ্টার মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সমগ্র জাতিকে পিছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিলো। সে অবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার উন্নত দেশ গঠনের চেষ্টা শুরু করলে তার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) জনপ্রিয়তাকে ধ্বংস করতে ভয়ঙ্করভাবে চেষ্টা চালানো হয়। এটি দেশের জন্য একটি কালো অধ্যায়, জঘণ্য ও বর্বরোচিত অধ্যায়। সেদিন কোটালীপাড়ায় বোমাগুলো ফুটলে বোমা পুঁতে রাখার স্থান থেকে চারপাশে এক কিলোমিটার ধ্বংসাবশেষে পরিণত হতো। মাটির নীচেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি হতো। সবমিলিয়ে ওই হামলা সফল হলে চারপাশ ধ্বংস লীলায় পরিণত হতে পারতো।

এসময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নাসির উদ্দিন ও মোহাম্মদ আহসান।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের সদস্যসহ অন্যদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সার্বভৌম দেশটি যতটুকু পিছিয়ে গিয়েছিল, ঠিক আবারও একটি ঘটনার অবতারণা শুরু হয়েছিল এ ঘটনার মধ্য দিয়ে।

‘এই দেশটি দুর্ভাগা এই কারণে যে, যেখানে জাতির জনককে স্বপরিবারে বিনা দোষে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল ঘাতকের দল। দুনিয়ার কোনও সভ্য দেশে এমনভাবে জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার ঘটনা বিরল। কাজেই এ মামলায় সংঘটিত ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের ভয়াবহ অপরাধ আসামিগণ করতে চেয়েছিল কেন? সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আসামিরা ঢাকাস্থ মোহাম্মদপুর ও মুগদাপাড়া অফিসে মিটিং করেছিল। মিটিংয়ে তারা মতামত প্রকাশ করে বলেন যে, ‘‘আওয়ামী লীগ সরকার ইসলাম বিদ্বেষী এবং ভারতের দালাল হিসেবে ইসলাম ধ্বংসের কাজে লিপ্ত।’’ সুতরাং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারকে উৎখাত করতে হবে হত্যার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কি ধরনের ইসলামবিরোধী কার্যক্রম তৎকালীন সরকার করেছিল বা ভারতের সঙ্গে কি ধরনের আঁতাত করেছিল, এর কোন বক্তব্য দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কেউ (আসামিরা) উল্লেখ করেননি।’

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, ‘আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- তাদের একটি অবাস্তব এবং ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছিল। আবার ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কেউ কেউ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে গিয়েও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের যোগদান করে বিভিন্ন জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এই ধরনের জঙ্গি তৎপরতার আড়ালে যাদের বিচরণ ছিল তাদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্ত আরও গভীরে যাওয়া উচিত ছিল। তাদের তদন্তকাজের আরও অধিকতর মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল।’

আদালত বলেন, অবস্থা যাই হোক না কেন, আসামিরা ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে তৎকালীন সরকারকে দোষারোপ করেছিল। অথচ ইসলামের মূল্যবোধ, হযরত মোহাম্মদ (স.) এর আদর্শিক দিকগুলো এদেশের মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য এবং আগত জেনারেশনকে উদ্বুব্ধ করার জন্য বিভিন্ন ইসলামি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুধু তাই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর বিষয়েও তিনি সজাগ ছিলেন।

আসামিরা যাদেরকে ইসলাম বিদ্ধেষী বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তারা বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে লিপ্ত। ইসলামের মূল্যবোধ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ও কর্মে পুরো দেশ ও সমাজ অশান্তিতে বিরাজমান ছিল। আসামিদের এ ধরনের ধ্যান ধারণা ইসলাম কোনভাবেই সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম।

আদালত আরও বলেন, এ মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এমন একটি ভয়ংকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল যা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়িত হলে তাদের ষড়যন্ত্র ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এদেশে আরেকটি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতো। সুতরাং বিচারিক আদালত তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে যে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেছে তা যথার্থ এবং আইনসম্মত।

এর আগে, হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ আসামির সাজা বহাল রাখা হয়। বিচারিক আদালতে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামি মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া আসামি আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান এবং সরোয়ার হোসেন মিয়াকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অনাদায়ে আরো এক বছরের দণ্ড দেন বিচারিক আদালত।

তবে এসব আসামিদের ক্ষেত্রে মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বহাল, আসামি আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস ও মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানের ১৪ বছর সাজা খাটা হলে মুক্তি প্রদান এবং আসামি সরোয়ার হোসেন মিয়াকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।

২০১৭ সালের ২০ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মমতাজ বেগম ১০ জঙ্গির সর্বোচ্চ শাস্তি দেন। আদালত গুলি করে প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। এছাড়াও চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ওয়াশিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর।

পরে এ মামলার রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে নথি উপস্থাপন করা হলে তিনি জরুরি ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এরই মধ্যে পেপারবুক তৈরি হলে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। কিন্তু হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কয়েকবার পুনর্গঠন হওয়ায় মামলাটির শুনানি পিছিয়ে যায়। এরপর মামলার শুনানি শেষে রায় দিলেন হাইকোর্ট।

প্রসঙ্গত, ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন কোটালীপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন। পরে ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালের ২৯ জুন আরো নয়জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা-২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়।


আরও পড়ুন:
প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল

/বিআই/টিটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম