আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন আইপি বা অনলাইন টেলিভিশন ‘জয়যাত্রা টেলিভিশন’ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে র্যাব। সংস্থাটি বলছে, হংকংয়ের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের মাধ্যমে তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৪টি দেশে ‘জয়যাত্রা টেলিভিশন’ স্যাটেলাইট টিভি হিসেবে সম্প্রচার করে আসছিল। এজন্য প্রতিমাসে হংকংয়ে অবৈধভাবে অর্থপাচার করেছেন হেলেনা।
মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।
এর আগে হেলেনা জাহাঙ্গীরের দুই সহযোগী এবং জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাজেরা খাতুন ও সানাউল্লাহ নূরীকে গ্রেফতার করে র্যাব ৪। যারা জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের সকল অনিয়মের কথা জানেন।
র্যাবের মুখপাত্র বলেন, ‘হাজেরা খাতুনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে হংকংয়ের একটি স্যাটেলাইট টিভির তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশে স্যাটেলাইট টিভি হিসেবে সম্প্রচার করে আসছিল।
দেশীয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার করলেও জয়যাত্রা সেটি করেনি। কারণ হিসেবে হাজেরা খাতুন র্যাবকে জানিয়েছে, জয়যাত্রা টেলিভিশন অবৈধ, অনুমতি পায়নি, তাই হংকং থেকে অবৈধভাবে সম্প্রচার করা হয়েছে। ছয়লাখ টাকার বিনিময়ে হংকং থেকে সম্প্রচারের জন্য তরঙ্গ বরাদ্ধ নিয়েছিল। এই স্যাটেলাইটের রিসিভার হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা টেলিভিশনের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ৩৪টি জেলায় সরবরাহ করেছিল।’
এমনকি যেসব জেলায় রিসিভার দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে, সেসব জেলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। সেসকল প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন বলেও হাজেরা খাতুন প্রমাণ দেখিয়েছে র্যাবকে।
এছাড়াও জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের সদস্য পদ বিক্রি করতো হেলেনা জাহাঙ্গীর। এখন পর্যন্ত দুইশতাধিক সদস্য নিয়েছে তারা। এসব সদস্যদের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নিতো হেলেনা জাহাঙ্গীর। এই ফাউন্ডেশনের বর্তমানে ৫০ লাখ টাকা জমা রয়েছে। এই ফাউন্ডেশনে কোন নীতিমাল, কোন বার্ষিক সাধারণ সভা হতো না। এই ফাউন্ডেশনের টাকা হেলেনা জাহাঙ্গীরের সন্তানদের নামে ডিপোজিট করে রাখা হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে এই ফাউন্ডেশন কাজ করছে। মূলত নিজের অপকর্ম লুকাতে এই ফাউন্ডেশন ঢাল হিসেবে কাজ করতেন বলে র্যাবের এই কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলনে বলেন।
এসব চাঁদাবাজির কারণে গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে।
হেলেনা জাহাঙ্গীর প্রতিমাসে হংকং যেভাবে টাকা পাঠাতেন সেটা অবৈধ কিনা জানতে চাইলে র্যাবের কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতি মাসেমাসে হংকং সে টাকা পাঠাতেন, এটি আমরা খতিয়ে দেখছি। অন্য সংস্থাগুলোও খতিয়ে দেখবেন। এটা পাচার। এসব তথ্য আমরা দুদক, সিআইডিসহ সকল সংস্থাকে জানাবো।’
হেলেনা জাহাঙ্গীর বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে নিজের ছবি প্রকাশ করতেন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার জন্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২৯ জুলাই রাতে যখন কথিত জয়যাত্রা টেলিভিশনের অফিসে অভিযান চালানো হয়, তখন আমাদের সঙ্গে বিটিআরসির সদস্যরা ছিলেন। তাদের সামনেই সকল সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। আরও যদি এরকম আইপি টিভি থাকে উপযুক্ত প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হবে।’
আইপিটিভিতে যারা রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অতীতেও আমাদের অভিযান ছিল, ভবিষ্যতেও অভিযান অব্যহত থাকবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘হেলেনা জাহাঙ্গীরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ও কথিত জয়যাত্রা টেলিভিশন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তিদের নাম জানতে পারি। পরবর্তীতে তাদের গ্রেফতারের জন্য কার্যক্রম শুরু করে। হেলেনা জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে প্রতারিত ব্যক্তিরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার বিরুদ্ধে মামলা করছে।’
হাজেরা খাতুন জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ও টেলিভিশনের অ্যাডমিন হাজেরা খাতুন ও জয়যাত্রা টেলিভিশনের প্রতিনিধি নিয়োগের সমন্বয়ক হাসানউল্লাহ নূরী। হাজেরা খাতুন কুমিল্লার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্মাতকোত্তর শেষ করে একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ২০১৬ সালে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনে যোগদান করেন। জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ও জয়যাত্রা টিভির হিসাব নিকাশ ও হেলেনা জাহাঙ্গীরের আর্থিক বিভিন্ন লেনদেন দেখভাল করতেন। হাজেরা খাতুন হেলেনা জাহাঙ্গীরের দূরসম্পর্কিত আত্মীয়ও হন।
হাজেরা খাতুনের জিজ্ঞাসাবাদে র্যাব আরও জানতে পারে, দেশের ৫০টি জেলায় প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছিল জয়যাত্রা টেলিভিশন। বিনিময়ে প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে একলাখ টাকা নিয়েছিল। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার করে টাকা নেওয়া হতো। জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মাসে-মাসে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিতেন। আর উপজেলা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নিতো।
র্যাব জানায়, দেশের বাইরে প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে এক থেকে ৫ লাখ টাকা নিতো। এই টেলিভিশনের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন অখ্যাত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার প্রচার করে টাকা নিতো, অনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার করেও টাকা নিতেন।
‘গণমাধ্যম কল্যাণ পরিষদ’ করার উদ্যোগ নিয়েছিল হেলেনা জাহাঙ্গীর। এর সদস্য সংখ্যাও প্রায় ৫ হাজার করেছিলেন। নিজের প্রচারের জন্য এসব সদস্য নিতেন তিনি। যারা দেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত নন।









