বলাৎকারের মামলায় ১০ বছর সাজাপ্রাপ্ত এক আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে ফের ধর্ষণের পর এক কিশোরীকে হত্যা করেছে। কিশোরগঞ্জের কুলিয়াচর এলাকায় চলতি বছরের মার্চ মাসে এই ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার আট মাস পর উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হাসান নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পিবিআই জানায়, চলতি বছর ৩ মার্চ কুলিয়াচরের চর কামালপুর এলাকার একটি পুকুর থেকে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। সেই মামলায় হাসানকে গ্রেফতারের পর জানা গেছে, নিহত কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেয় হাসান। সম্পর্কে হাসান ওই কিশোরীর চাচাতো দুলাভাই। সে আদালতে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
শনিবার (২০ নভেম্বর) সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা পিবিআইর পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ১৮ মার্চ কিশোরগঞ্জের কুলিয়াচর থানায় একটি পুকুর থেকে এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর কুলিয়াচর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়। কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।’
এই ঘটনার প্রায় তিনমাস পর গত ২৯ জুন ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ‘ওই কিশোরীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে’। এরপর গত ২৯ জুন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পুলিশ সদর দফতর গত ১ নভেম্বর হত্যা মামলাটি কিশোরগঞ্জ জেলা পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। পিবিআই-এর পরিদর্শক মোহাম্মদ সাখরুল হক খান মামলাটির তদন্ত শুরু করেন।
পিবিআই প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে হত্যা মামলাটি তদন্ত করে। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে কুলিয়ারচর থানার মাসকান্দা এলাকা থেকে মো. হাসানকে (৪৮) গ্রেফতার করে পিবিআই। গ্রেফতারের পর সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
যেভাবে হত্যা করা হয় ওই কিশোরীকে
গত ১৭ মার্চ ওই কিশোরী তাদের বাড়ির কাছাকাছি চাচাতো বোনের বাড়িতে ঘুড়তে যায়। ওই বোনের মেয়েও ভুক্তভোগী কিশোরীর সমবয়সী। তার সঙ্গে সখ্যতা ছিল। ওই কিশোরী চাচাতো বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে দুলাভাই মো. হাসানের সঙ্গে। সন্ধ্যা হয়ে আসায় ওই কিশোরী তার দুলাভাইকে এগিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে। এসময় হাসানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে বাড়ির দিকে যায়। হাসান ওই কিশোরীকে মেলায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওই কিশোরীও এতে রাজি হয়। পরে হাসান তাকে রাতে তৈরি থাকতে বলে। কথামতো, ওই রাতে ১২টার দিকে সবার অগোচরে ওই কিশোরীকে নিয়ে মেলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। সোজা পথের কথা বলে কুলিয়াচর এলাকার একটি কলা বাগানে নিয়ে যায় হাসান। পরে হাত বেঁধে ওই কিশোরীকে একাধিকবার ধর্ষণ করে হাসান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক মোহাম্মদ সাখরুল হক খান বলেন, ‘ওই কিশোরী চিৎকারের চেষ্টা করলে হাসান তার মুখ চেপে ধরে। প্রথম দফায় ধর্ষণের পর ওই কিশোরীকে হাত বাধা অবস্থায় ফেলে রেখে কলাবাগানে বসে থাকে। এর কিছুক্ষণ পর ওই কিশোরীর ওপর আবার বিকৃত যৌন নির্যাতন চালায় সে। একসময় ওই কিশোরী মারা যায়। পরে লাশটি পাশের একটি পুকুরে ফেলে সেখানে গোসল করে বাড়িতে চলে যায় হাসান। পরদিন ১৮ মার্চ সকালে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়।’
সবই ছিল হাসানের পরিকল্পিত
মেলার কথা বলে ওই কিশোরীকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার পেছনে হাসানের খারাপ উদ্দেশ্যই ছিল। সে আগেই স্থানীয় বাজারের ফার্মেসি ও একটি মুদি দোকান থেকে যৌন উত্তেজন ওষুধ ও কনডম কিনে নেয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ওই কিশোরীকে নিয়ে বের হওয়ার আগেই সে যৌন উত্তেজন ওষুধ সেবন করে।
বলৎকার মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হাসান
বলাৎকারের একটি মামলায় নিম্ন আদালতে হাসানের ১০ বছরের সাজা হয়েছে। ওই সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে হাসান। এরপর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়। মামলাটি আপিলে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। জামিনে বের হয়ে হাসান ফের একই অপরাধ করেছে উল্লেখ করে কিশোরগঞ্জ জেলা পিবিআই’র পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভ্যাসগতভাবেই হাসান অপরাধী। এই ঘটনার পরও তার মধ্যে কোনও অনুশোচনা নেই। সে এর আগে ১১ বছরের এক ছেলে শিশুকে ধর্ষণ (বলাৎকার) করে সাজা পেয়েছে, তারপরও তার মধ্যে কোনও পরিবর্তন আসেনি। জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়েছে। এই কিশোরী বয়স কম ছিল, বোনের স্বামীকে সে বিশ্বাস করেছিল, কিন্তু সেই বোনের স্বামী তাকে হত্যা করেছে।’
ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের বক্তব্য
ওই কিশোরীর ষাটোর্ধ্ব বাবা তার মেয়ের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মেয়ে বিয়ের পর জামাই হাসানকে নিয়ে আমাদের বাড়িতেই থাকতো। কয়েক বছর আগে তারা আমাদের বাড়ি থেকে চলে যায়, আলাদা বাড়িতে থাকে। হাসানের পাঁচ সন্তান। তার বড়মেয়ের সমবয়সী ছিল আমার মেয়ে। একারণে ওই বাড়িতে যাতায়াত ছিল। কিন্তু হাসান এতো বড় সর্বনাশ করবে আমার, আমি তা বুঝতে পারিনি। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’









