দুদক অভিযোগ থেকে ছাড় দিলেও সিআইডির অনুসন্ধানে সেই মোয়াজ্জেম

জামাল উদ্দিন
১১ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৮আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৮

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রায় ১১ মাসের অনুসন্ধানে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পরিসমাপ্তির চিঠি পান সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের পরিচালক মো. কামরুজ্জামানের সই করা চিঠিতে তাকে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিষয়টি মার্চ মাসে প্রকাশ করেন মোয়াজ্জেম। এর কয়েক দিনের মাথায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) আবেদনে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। সেই আদেশ এখনও বহাল রয়েছে।

সিআইডির আবেদনে বলা হয়, এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তদবির-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে মোয়াজ্জেম হোসেন শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান চলছে।

এর আগে দুদকও তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, তদবির-বাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্য এবং শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করে। তবে দুদকের পরিসমাপ্তির চিঠিতে বলা হয়, অনুসন্ধানকালে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিষয়টি পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানের শুরু

মোয়াজ্জেম হোসেন ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এপিএস হিসেবে নিয়োগ পান। পরে আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলে সেখানেও তার এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোয়াজ্জেম।

২০২৫ সালের এপ্রিলে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, তদবির ও টেন্ডার-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। ওই বছরের ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর দেখিয়ে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় ২২ এপ্রিল।

এরপর ২৫ এপ্রিল সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ জানিয়েছিলেন, মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য তিনি দুদককে অনুরোধ করেছেন। অভিযোগ যাচাইয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০২৫ সালের ২২ মে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে মোয়াজ্জেমকে প্রায় সোয়া একঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অনুসন্ধানের দায়িত্বে ছিলেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক মিনু আক্তার সুমি।

প্রথম নিষেধাজ্ঞা ও এনআইডি ব্লক

জিজ্ঞাসাবাদের দুই দিন পর ২০২৫ সালের ২৪ মে দুদকের আবেদনে মোয়াজ্জেমের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। একইসঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহার বন্ধ বা ব্লক করার আদেশও দেওয়া হয়।

দুদকের আবেদনে বলা হয়েছিল, এপিএস থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তদবির-বাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে মোয়াজ্জেম শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাঁর বিদেশযাত্রা বন্ধ এবং এনআইডি ব্লক করা প্রয়োজন।

ওই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যেতে আদালতের অনুমতি চেয়েছিলেন মোয়াজ্জেম। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করেন।

পরে ১৮ ফেব্রুয়ারির চিঠিতে দুদক জানায়, অনুসন্ধানে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিষয়টি পরিসমাপ্ত করা হয়েছে।

সিআইডির পৃথক আবেদন

দুদকের সিদ্ধান্ত প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর গত ৩০ মার্চ মোয়াজ্জেমের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করে সিআইডি। ঢাকার মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেন। আবেদন করেছিলেন সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুল হান্নান।

আবেদনে তদবির-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ অর্জনের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। ওই অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলে জানায় সিআইডি।

মোয়াজ্জেম বিদেশে চলে যেতে পারেন— এমন আশঙ্কায় অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার বিদেশযাত্রা বন্ধ রাখার আবেদন করা হয়। আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

অগ্রগতি জানেন না মোয়াজ্জেম

মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর সিআইডির অনুসন্ধান কত দূর এগিয়েছে ৬ আগস্ট পর্যন্ত সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

তিনি বলেন, “যেখানে দুদক অনুসন্ধান করে কোনও কিছু না পেয়ে দায়মুক্তির সনদ দিয়েছে— সেখানে সিআইডি কিসের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করছে, জানি না। যেখানে দুর্নীতি দমনে দুদক আছে সেখানে তারা দুদকের সঙ্গে কথা বললেও পারতো। যাই হোক, তারা অনুসন্ধান করতেছে করুক।’’ তবে এখনও পর্যন্ত সিআইডির অনুসন্ধান কিংবা তদন্তের অগ্রগতি কী সেটা তিনি জানেন না। তার ভাষ্য, ‘‘সিআইডির আবেদনের পর আদালত বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সেটা এখনও বহাল আছে।”

দুদক ও সিআইডির মধ্যে অনুসন্ধানসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। সিআইডি পৃথক কোনও অভিযোগ বা তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করছে কিনা, সে বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাসপোর্টের আবেদন

মোয়াজ্জেম জানান, দুদকের অনুসন্ধান পরিসমাপ্ত হওয়ার পর তিনি সাধারণ বা সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। তবে এখনও পাসপোর্ট পাননি।

তিনি বলেন, “চাইলে আমি ইনটেরিম গভর্নমেন্টের সময় সবুজ পাসপোর্ট নিতে পারতাম। কিন্তু তখন অভিযোগ আসতো— আমি দেশ ছাড়ার জন্য অফিসিয়াল পাসপোর্ট স্যারেন্ডার করছি। দুদক থেকে দায়মুক্তি পাওয়ার পর সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু পাসপোর্ট এখনও পাই নাই।”

পাসপোর্ট আবেদনটির বর্তমান অবস্থা, এটি আটকে থাকার কারণ কিংবা আদালতের বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক কোনও বিষয়ের সঙ্গে পাসপোর্ট ইস্যুর কোনও সম্পর্ক রয়েছে কিনা—সে বিষয়ে মোয়াজ্জেম কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পেছালো
বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে ইসলামী ব্যাংকের অভিযোগ 
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ
সর্বশেষ খবর
এনটিআরসিএ নিয়ে কী হচ্ছে?
এনটিআরসিএ নিয়ে কী হচ্ছে?
জুলাইয়ের চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার আহ্বান ইউজিসি সদস্যের
জুলাইয়ের চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার আহ্বান ইউজিসি সদস্যের
এবার কুমিল্লা ওয়াসার চেয়ারম্যান হলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক
এবার কুমিল্লা ওয়াসার চেয়ারম্যান হলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক
জনগণ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে: প্রধানমন্ত্রী
জনগণ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে: প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
এমপির গলায় রামদা ধরে বাড়িসহ সব সম্পত্তি লিখে নিলো কারা?
এমপির গলায় রামদা ধরে বাড়িসহ সব সম্পত্তি লিখে নিলো কারা?
শাবনূরের বার্তা, ডন গ্রেফতার: সালমান শাহ হত্যা মামলায় নতুন মোড়
শাবনূরের বার্তা, ডন গ্রেফতার: সালমান শাহ হত্যা মামলায় নতুন মোড়
আগামীকাল স্কুল-কলেজে ছুটি
আগামীকাল স্কুল-কলেজে ছুটি
একসঙ্গে পরীক্ষা দিলেন মা-ছেলে, দুই জনই পেলেন জিপিএ-৫
একসঙ্গে পরীক্ষা দিলেন মা-ছেলে, দুই জনই পেলেন জিপিএ-৫
এনটিআরসিএ বাতিল হলে সরকার পতনের ডাক দেওয়া হবে: রাবি শিবির সভাপতি 
এনটিআরসিএ বাতিল হলে সরকার পতনের ডাক দেওয়া হবে: রাবি শিবির সভাপতি