আদালতে ঝুলছে ৪৬ লাখ মামলা, সমাধান কোথায়

বাহাউদ্দিন ইমরান
২২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতেই ঝুলে আছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। বিপুল এই মামলাজটের বিপরীতে নিষ্পত্তির গতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে বছরের পর বছর বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে বিচার বিভাগের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন অনেকেই।

তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই হাইকোর্ট বিভাগের একটি বিশেষ উদ্যোগ মামলাজট কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চলতি বছরের ৭ মে থেকে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পুরোনো মামলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ নিষ্পত্তি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ১২ কার্যদিবসে পুরোনো ক্রিমিনাল মিস ও রিট মামলাসহ মোট ৬২ হাজার ৬৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে হাইকোর্ট।

তবে ৪৬ লাখের বেশি মামলার জট কাটাতে শুধু পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তিই যথেষ্ট হবে কিনা, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মামলাজট নিরসনে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, মামলার দীর্ঘসূত্রতা রোধে আইনজীবীদের ভূমিকা এবং আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি আরও জোরালো করা প্রয়োজন।

সারা দেশের আদালতে ৪৬ লাখ মামলা

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতসমূহে মোট ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ১৮ লাখ ১৩ হাজার ২৬৩টি দেওয়ানি এবং ২৮ লাখ ২৬ হাজার ২১৩টি ফৌজদারি মামলা।

অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলার মধ্যে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি দেওয়ানি এবং ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি ফৌজদারি মামলা। গত এক বছরে এসব আদালতে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন ৩৮ হাজার ৭১৩টি মামলা। এর মধ্যে দেওয়ানি ২১ হাজার ৬৫২টি এবং ফৌজদারি ১৭ হাজার ৬১টি।

হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলা। এর মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১ লাখ ১ হাজার ১৬৮টি এবং ফৌজদারি মামলা ৪ লাখ ২১ হাজার ১৬৩টি। গত বছর আপিল বিভাগে ৭ হাজার ৫৫৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দুই বিভাগ মিলিয়ে নিষ্পত্তির সংখ্যা ৬৩ হাজার ৩০৯টি।

পুরোনো মামলা নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টের বিশেষ উদ্যোগ

মামলাজট কমাতে প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় চলতি বছরের ৭ মে থেকে হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল মোশন ও রিট মোশন বেঞ্চে দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পুরোনো মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

কোর্ট প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগের ১৩টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে মোট ৫ হাজার ৪০৫টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস (বিবিধ) মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সর্বমোট ১২ কার্যদিবসে মোট ৫৫ হাজার ৭৩০টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি করা হলো। ফলে ১২ কার্যদিবসে মোট ৬২ হাজার ৬৩৭টি পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি করলো হাইকোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চ এবং রিট মোশন বেঞ্চসমূহে দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, মামলাজট হ্রাস এবং বিচারব্যবস্থার গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত এ বিশেষ উদ্যোগটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। তাই মাননীয় প্রধান বিচারপতির পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

শুধু পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি করলেই কি জট কাটবে?

হাইকোর্ট বিভাগে পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টিকে প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাঁর দপ্তরের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা থাকবে।

তবে শুধু হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষেত্রে নয়, মামলা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়গুলোতেও জোর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. খাদেমুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের অধস্তন আদালতসমূহে একটি মামলার মূল কার্যক্রম শুরু হয়। এই আদালতেই বিচার-সংশ্লিষ্ট সব সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা হয়। তাই এই পর্যায়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের মামলাজট নিরসনে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, মামলার দীর্ঘসূত্রতা রোধে আইনজীবীদের ভূমিকা, আদালতের বাইরে বিরোধ নিরসনে এডিআর পদ্ধতিকে আরও জোরালো করতে হবে। তাহলে জট নিরসনের পাশাপাশি আদালতের প্রতি বিচারপ্রার্থীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে।

মামলাজটের প্রভাব

মানবাধিকার সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের (আরআরএফ) ট্রেজারার মো. ইমাম হোসেন পাটোয়ারী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দ্রুত নিষ্পত্তি না করতে পারায় মামলা-সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাদের দেখে অন্য বিচার প্রত্যাশীরা হতাশায় ডুবে যান। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তারা এমন অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।

তার মতে, দেশের আদালতসমূহের জট নিরসন সম্ভব না হলে সমাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। নাগরিকরা আইন-আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করবেন।

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
স্কুলছাত্রীর মৃত্যু ঘিরে নতুন মোড়, কথিত প্রেমিক রাজুর বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা
হাসপাতালে যুবককে পিটিয়ে হত্যা মামলায় গ্রেফতার ২, এখনও ফেসবুকে সক্রিয় প্রধান আসামি
মাদক মামলার আসামিদের ছিনিয়ে নিতে পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, গ্রেফতার ৩
সর্বশেষ খবর
বিএনপি বিনা ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে না: শাহে আলম
বিএনপি বিনা ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে না: শাহে আলম
শনিবার ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলা
শনিবার ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলা
পশ্চিমতীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান চীনের
পশ্চিমতীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান চীনের
অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অনেক ক্ষতি করে গেছে: বিমানমন্ত্রী
অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অনেক ক্ষতি করে গেছে: বিমানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম বরখাস্ত
লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম বরখাস্ত
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর
ভারতীয় তরুণীকে ৯ লাখ ৫০ হাজার রুপি উপহার দিলেন মিস্টারবিস্ট
ভারতীয় তরুণীকে ৯ লাখ ৫০ হাজার রুপি উপহার দিলেন মিস্টারবিস্ট
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা