কুমিল্লায় নিখোঁজের পর লাশ পাওয়া গেছে ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এর আগেও এ বছর নিখোঁজ শিশুদের কাউকে পাওয়া গেছে মাটিচাপা অবস্থায়, কারও লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার ছাড়াও চলতি বছর শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং স্বজনের সঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হত্যার কোনও কোনও ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে পরিচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য নিয়ে পরিসংখ্যান তৈরি করে আসক। তাদের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় মোট নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে নিহত ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত ৪৯, ধর্ষণের পর হত্যা (দুই ছেলেশিশুসহ) ২৬, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪, গুলিতে নিহত ৩, গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু ২, উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা ২ এবং অপহরণের পর হত্যা করা হয় একজনকে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনা আছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শিশু নিখোঁজের বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির জানান, শিশু নিখোঁজের ঘটনা আগেও ছিল। তবে এখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তা ফলাও করে গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টিকে একটি গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করে বাংলাদেশ পুলিশ। নিখোঁজ হওয়া শিশুদের ৮৭ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে বা তাদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
নিখোঁজের পর মিলছে লাশ
সম্প্রতি শিশুহত্যার একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। পাবনা সদরে ১০ বছরের একটি শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর, একটি ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর পরদিন জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। ১২ সেপ্টেম্বর তার সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে সাত শিশু নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিন বোনের মধ্যে সিপার বয়স ১০ এবং ইকরার ১৭ বছর ও সাইমা আক্তারের বয়স ছিল ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে খুন করা হয় ১২ বছরের ছেলে আয়ুশকে। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর লাশ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তার এক বছরের সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
শিশুদের বাইরে আরও হত্যার ঘটনা আছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। সেই হিসাবে মাসে গড়ে ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
এখনও নিখোঁজ দুই হাজার শিশু
শিশুহত্যার পাশাপাশি নিখোঁজের ঘটনাও আছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজের সংবাদ প্রকাশ করে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দফতর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হলেও ৮৭ শতাংশের বেশি শিশু উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। সেই হিসাবে নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।
নিখোঁজের যেসব কারণ বলছে পুলিশ
পুলিশের যাচাইয়ে দেখা গেছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় এবং একাকী বাসায় ফেরার সময় অন্য স্থানে চলে গিয়ে নিখোঁজ হয়।
১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনও সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, বর্তমানে পুলিশি সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু হয়েছে। ফলে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি শিশু উদ্ধার হয়েছে। সংখ্যায় এটি ১৩ হাজার ৬৭৯ জন। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের অ্যাডিশনাল আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম রবিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, শিশুরা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে ও নিখোঁজ হচ্ছে, এসব ঘটনা নতুন নয়। শিশু বলতে শূন্য থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সকে বুঝি। এসব শিশুরা অপহরণ, ধর্ষণ, কিশোর-কিশোরীরা প্রেমের কারণে পালিয়ে যাওয়া, বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিমান বিভিন্ন কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, তবে সংখ্যাটা বড় হলে আমাদের তা ভাবিয়ে তোলে। এছাড়া আমাদের একটা ঘাটতি ছিল তা হচ্ছে, নিখোঁজের জিডি হলেনও উদ্ধার হওয়া শিশুদের আবডেট তালিকা আগে করিনি, যা এখন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিশুরা এসব ঘটনার শিকার হলে আমরা ব্যধিত হই। শিশুদের সুরক্ষায় পুলিশ কাজ করছে। অনলাইন জিডির সঙ্গে ছবি সংগ্রহ করা, হারিয়ে গেলে তদন্ত করে দ্রুত উদ্ধার, স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং উদ্ধার হওয়াদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। অনেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া যারা হত্যা ও ধর্ষণের শিকার তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তাও দেওয়া হচ্ছে।
সুরক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা
বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে ২২ মে বিবৃতি দেয় ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এ সব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসানের আহ্বান জানান। ঘর, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বানও উঠে আসে সংস্থাটির বক্তব্যে।
এ সব ঘটনায় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে ইউনিসেফ। পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্রেও জবাবদিহি বাড়ানোর কথা তুলে ধরা হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল রবিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা মানসিকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংস্কৃতি চর্চা গড়ে তুলতে পারিনি, চর্চাও করি না। তার ফলে সমাজে যারা দুর্বল, প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ও যারা প্রতিকার চাইতে পারে না, তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চলতে থাকে। নারী ও শিশুরা সেই শ্রেণিতে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, সমাজে অন্যান্য যে জনগোষ্ঠী আছে সেই তুলনায় নারী-শিশুরা অনেক বেশি দুর্বল ও অসহায়। বিশেষ করে শিশুরা, তারা তো প্রতিবাদও করতে পারে না, তারা তো বুঝতেও পারে না, তাদের ওপর নিযাতন হচ্ছে। ফলে তারা অভিযোগও করতে পারে না। মানুষের কাছে বোঝাতে পারে না, তাদের ওপর নির্যাতন কীভাবে হয়।
সুলতানা কামাল বলেন, তাদের ওপর দীর্ঘদিন নির্যাতন চলতে থাকেলে, তখন আমরা খবরটা পাই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এ ধরনের নির্যাতন অনেক বেশি সংখ্যায় চলে, আমরা জানতেও পারি না।
সুরক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে সঠিকভাবে ও নিরপেক্ষভাবে এসব ঘটনার বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও মানসিকতার ব্যাপার আছে। অনেক সময় দেখা যায়, নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন হলে অনেকে সেটা আমলে নেন না এবং সেটাকে নির্যাতনও মনে করেন না; কিংবা মনে করেন নারীর দোষে সেটা হয়েছে, শিশুর দোষে সেটা হয়েছে, এমনকি এমনও মনে করা হয়, মায়ের দোষে হয়েছে। অনেকেই এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে বাস করেন।
এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি চর্চার বিষয়ে আমরা খুবই উদাসীন। এরপর দীর্ঘদিন ধরে আমরা একটা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অভাব, মানুষের সম্মান-মর্যাদা-অধিকারের প্রতি অশ্রদ্ধাবোধ, সবকিছু মিলে ঘটনাগুলো বেড়ে চলছে। এ জন্য রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে এবং পরিবর্তনের চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে।









