খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে। অপরাধ দমনে সরকারের নানা উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানের পরও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি দৃশ্যমান হচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে উঠে আসছে সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগজনক চিত্র।
এমন পরিস্থিতিতে অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের অপরাধচিত্রের সঙ্গে সরকারি এই দাবির কতটা মিল রয়েছে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
কয়েক দিনের হত্যাকাণ্ডে ভিন্ন ভিন্ন অপরাধচিত্র
গত ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে শিরিন বেগমের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীর চার টুকরা করে রাখা হয়েছিল। দাম্পত্য কলহের জেরে তাকে হত্যার অভিযোগে স্বামী দুলাল হাওলাদারকে আটক করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। ঘরের ভেতরে এমন হত্যাকাণ্ড শুধু অপরাধের নৃশংসতাই নয়, পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের সীমাবদ্ধতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
এর একদিন পর, ১৩ অক্টোবর ভোরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সুফিয়া আক্তার নিশিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্বামী আব্দুল মান্নান মনিরের বিরুদ্ধে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। এর দুদিন আগে, ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে অন্তঃসত্ত্বা সীমা রানী দাসকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তার স্বামীকে আটক করা হয়।
একই ধরনের সন্দেহ ও দাম্পত্য বিরোধ থেকে সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা এসব হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নারীর নিরাপত্তার সংকট কেবল ঘরের বাইরেই নয়, নিজের ঘরও নিরাপদ নয়।
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে আরও ভয়াবহ অভিযোগ উঠে আসে। পুলিশ জানায়, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সুমন। এই ঘটনা শিশু ও কিশোরীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা এবং অপরিচিত পরিবহন চালকের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি নতুন করে সামনে এনেছে।
অন্যদিকে, ১১ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অটোরিকশাচালক রাজন মিয়াকে ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যার পর তার গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে যাত্রীবেশে ওঠা দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। পুলিশ অটোরিকশাসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে। পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন সাহেব আলী। যার বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধের মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
তিন মাসের পরিসংখ্যান উদ্বেগের
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে সহিংসতার ব্যাপক চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে ১৮৩টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৬৯টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও অন্তত ৫৪০ জন আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৩১টি ঘটনায় একজন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৬টি ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিরোধ, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংঘাত ঘটেছে। ৫১টি ঘটনায় অন্তত ১৫৩টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা অগ্নিসংযোগের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের সংঘাত যুক্ত হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় অন্তত ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছেন। তিন মাসে ৭৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। তাদের মধ্যে অন্তত ২৫৩ জন ধর্ষণের শিকার; ১৫৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ১২ জনকে হত্যার তথ্যও রয়েছে প্রতিবেদনে। পারিবারিক সহিংসতায় ১৩৭ জন নারী নিহত এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৮৯ শিশুর প্রাণহানির তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে তিন মাসে ২৮৫টি ঘটনায় ৩০২টি মরদেহ উদ্ধারের হিসাব। এর মধ্যে ২৯টি বস্তাবন্দি, ১৯টি গলা কাটা এবং ১৯টি হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মরদেহ পাওয়া যায়।
এইচআরএসএসের হিসাবে তিন মাসে অন্তত ৩৭ বন্দি কারাগারে মারা গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে পাঁচ জন এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে একজনের মৃত্যুর তথ্যও দেওয়া হয়েছে। ৮৮টি ঘটনায় ১৩৫ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হওয়ার দাবি করেছে সংস্থাটি।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম মনে করেন, রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঠেকাতে সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের উদ্যোগ, পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
গত ৮ অক্টোবর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে রাজধানী, খুলনা ও চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে মন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সেখানে সরকারি জমির ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এলাকাটিতে সারদার আদলে পুলিশ অ্যাকাডেমি এবং পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিতের পরিকল্পনাও জানিয়েছেন তিনি। পুলিশের ওপর জনআস্থা অর্জন ও ধরে রাখাকে বড় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তবে খুলনায় দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলমের ওপর ছিনতাইকারীদের হামলা এবং এরপর পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার সতর্কতামূলক নির্দেশনা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ যে বাহিনীর কাছে নিরাপত্তা চায়, তার সদস্যদেরও ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় বিশেষ সতর্কতা নিতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা পুলিশের মাঠপর্যায়ের ঝুঁকির প্রশ্ন সামনে এনেছে। নির্দেশনাটি প্রকাশ্যে আসার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের খবরও পাওয়া গেছে।
১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল এখনও পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিগত শাসনামলে পুলিশের ব্যবহার এবং তা নিয়ে জনঅসন্তোষ বাহিনীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কার্যকর পুলিশিংয়ে ফেরাতে আরও সময় প্রয়োজন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। অনেক অপরাধী পালিয়ে বা আত্মগোপনে থাকলেও তাদের ধরার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমানের ভাষ্যও একই। বিচ্ছিন্ন অপরাধ ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে। এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব প্রতিপত্তি বিবেচনায় না নিয়ে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’ তার মতে, প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা বাধার মুখে পড়ে। কোনও ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অন্য ঘটনায় শিথিলতা দেখানো হলে আইনের শাসনের ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, অতীতের সরকারগুলোও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সদিচ্ছার কথা বলেছে; মূল ঘাটতি ছিল কার্যকর বাস্তবায়নে। মাঠপর্যায়ে বাধাগুলো শনাক্ত, বাহিনীর পেশাগত স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় প্রয়োজন। অপরাধী যেই হোক, তদন্ত, অভিযোগপত্র ও বিচার প্রক্রিয়ায় সমান মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। তার সতর্কবার্তা, বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগ চলতে থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।