বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন

আরিফুল ইসলাম
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:২৯ আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:২৯

মাত্র ১১ বছর বয়সে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয় এক শিশু। অভিযোগ, গরম লোহার খুন্তি দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর, চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া, এমনকি দিনের পর দিন বাথরুমে আটকে রেখে খাবার না দেওয়ার মতো অমানবিক নির্যাতন করা হয় তাকে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে পায়ে পচন ধরার কথাও জানিয়েছে শিশুটি।

এ ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে শিশুটির ওপর চালানো নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, মামলার ঘটনা সত্য।

শিশুটির নির্যাতনের ছবি ও বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনা এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। তদন্ত শেষে গত ৩১ আগস্ট চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া।

মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯-এর বিচারক মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন ভূঁইয়ার আদালতে পাঠানো হয়। পরে মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এর বিচারক সোহেল রানার আদালতে পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা রোবেল মিয়া বলেন, ‘তদন্ত শেষে চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। মামলার ঘটনা সত্য। ভুক্তভোগী শিশুটিকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তা অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।’

বাথরুমে বন্দি, খাবারের বদলে পেস্ট ও পানি

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাসার ছোট শিশুকে দেখাশোনার জন্য গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল শিশুটিকে। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই বীথি আক্তার তার সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তার নির্দেশনা ও আচরণ অনুসরণ করে বাসার অন্য দুই গৃহকর্মীও শিশুটিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে দিয়ে কাজ করানো হলেও ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। দিনের পর দিন বাথরুমে আটকে রাখা হতো তাকে। সেখান থেকে বের হতে চাইলে বাধা দেওয়া হতো। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটাতে বাথরুমের পানি এবং দাঁত মাজার পেস্ট খেয়ে থাকার কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অসুস্থতার কারণে শিশুটি কাজ করতে না পারলে বীথি আক্তার ও অন্য দুই গৃহকর্মী মিলে রান্নার লোহার খুন্তি চুলার আগুনে গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দিতেন। বাঁশের কঞ্চি দিয়েও তাকে মারধর করা হতো।

শিশুটির বাবা দেখা করতে গেলে স্বাভাবিকভাবে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দেখা করার সুযোগ দেওয়া হলেও শিশুটিকে বড় জামাকাপড় পরিয়ে সামনে পাঠানো হতো। এ সময় অভিযুক্ত গৃহকর্মীরা পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে নির্যাতনের চিহ্ন বাবার নজরে না আসে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বীথি আক্তার তার বাবাকে ডেকে পাঠান। পরে বিভিন্ন কথা বুঝিয়ে শিশুটিকে বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সাবেক এমডি শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাসায় শিশুটির ওপর নির্যাতন চললেও তিনি বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করেছেন এবং শিশুটির খোঁজখবর রাখেননি। ফলে এ ঘটনার দায় তিনি এড়াতে পারেন না বলে মত দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

আদালতে শিশুর জবানবন্দিতে নির্যাতনের বর্ণনা

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে জবানবন্দি দেয় শিশুটি। সেখানে সে জানায়, তার দায়িত্ব ছিল বাসার ছোট শিশুকে দেখাশোনা করা এবং শিশুটি মাটিতে কিছু ফেলে দিলে তা তুলে রাখা। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তাকে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। চিৎকার করলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর করা হতো।

শিশুটির জবানবন্দি অনুযায়ী, তার পায়ের রান, দুই হাত ও পিঠে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। চোখে মরিচের গুঁড়া দিয়ে চেপে ধরা হতো। তার দাঁতও ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে শিশুটি।

জবানবন্দিতে সে আরও জানায়, বাসায় নেওয়ার পর থেকেই তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে পায়ে পচন ধরে যায়। শীতের সময় তাকে শীতের কাপড় দেওয়া হয়নি। খাবার না পেয়ে পেস্ট ও বাথরুমের পানি খেয়ে থাকতে হয়েছে। বাসার সাবেক এমডির সামনেও তাকে যেতে দেওয়া হতো না বলে জানায় শিশুটি।

নির্যাতনের কথা স্বীকার করেন বীথি ও সুফিয়া

গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইলের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বীথি আক্তার। সেখানে তিনি বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে তিন থেকে চার দিন মারধর করার কথা স্বীকার করেন। তবে তার জবানবন্দিতে শিশুটির জবানবন্দিতে উঠে আসা নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়নি।

বাসার আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি দাবি করেন, শিশুটি তার বিরুদ্ধে নারিকেল তেল ও সাবান চুরির মিথ্যা অভিযোগ করেছিল। এ কারণে তিনি দুই দিন শিশুটিকে মারধর করেন বলে স্বীকার করেন।

বাবার দাবি, এখনো রয়ে গেছে নির্যাতনের ক্ষত

মামলার বাদী শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা মেয়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা যেন আর কোনো শিশুর সঙ্গে না ঘটে। আমি আসামিদের উপযুক্ত বিচার চাই।’

মেয়ের শরীরে নির্যাতনের ক্ষত এখনো রয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শরীরের ক্ষতের দাগগুলো এখনো আছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না।’

বর্তমানে মেয়েকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে থাকেন গোলাম মোস্তফা। খাবারের হোটেলে কাজ করে সংসার চালান তিনি। মেয়ের ন্যায়বিচার না পেলে আদালতেই আত্মহত্যা করবেন বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি।

অভিযোগপত্র নিয়ে যা বলছেন সাবেক এমডির আইনজীবী

সাবেক এমডি শফিকুর রহমানের আইনজীবী আরিফুর রহমানের বক্তব্য, অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে আসামি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শিশুটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে বলেছে, এমডিকে কখনো দেখেনি। আর অভিযোগপত্র জমা হলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। আমরা বিচার মোকাবিলা করব।’

শফিকুর রহমানের পক্ষে সাফাই দিয়ে আইনজীবী আরও বলেন, ‘উনার দ্বারা এমন কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি একটি উচ্চপদে চাকরি করেছেন। তার দুটি সন্তান আছে। বাসায় দুইজন কাজের লোকও ছিল। তিনি সবদিকে খেয়াল রাখতে পারেননি।’

যেভাবে সামনে আসে নির্যাতনের ঘটনা

মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে শফিকুর রহমানের বাসায় শিশুদের দেখাশোনার জন্য ১১ বছর বয়সী শিশুটিকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়া হয়। বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর শিশুটিকে খুঁজে দেন। বিয়ে ও অন্যান্য খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে হোটেল কর্মচারী বাবা গত বছরের জুনে মেয়েকে ওই বাসায় কাজে পাঠান।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যান বাবা। এরপর আর মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি তাঁকে।

গত ৩১ জানুয়ারি বীথি আক্তার ফোন করে শিশুটির অসুস্থতার কথা জানিয়ে তার বাবাকে নিয়ে যেতে বলেন। পরে বাসায় গিয়ে মেয়ের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পান তিনি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শিশুটিকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি শিশুটির বাবা উত্তরা পশ্চিম থানায় শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে চারজনকেই গ্রেফতার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে শফিকুর রহমান ও রুপালী খাতুন জামিনে মুক্তি পান। তবে বীথি আক্তার ও সুফিয়া বেগম কারাগারে রয়েছেন।

অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে মামলাটি বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে এগিয়েছে। শিশুটির ওপর চালানো নির্যাতনের অভিযোগের বিচার এখন আদালতে প্রমাণের অপেক্ষায়।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
পদত্যাগেই দায়মুক্তি? রাড্ডা থেকে গেণ্ডারিয়া: আইনের মুখোমুখি হবেন কারা
মেনোপজ নিয়ে এই ভুল ধারণাগুলো জানেন তো?
জ্বালানি খাত এখন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে : অর্থমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
পদত্যাগেই দায়মুক্তি? রাড্ডা থেকে গেণ্ডারিয়া: আইনের মুখোমুখি হবেন কারা
পদত্যাগেই দায়মুক্তি? রাড্ডা থেকে গেণ্ডারিয়া: আইনের মুখোমুখি হবেন কারা
মেনোপজ নিয়ে এই ভুল ধারণাগুলো জানেন তো?
মেনোপজ নিয়ে এই ভুল ধারণাগুলো জানেন তো?
বেনামে খোলা যাবে না বিমা পলিসি, ১০ লাখ টাকার লেনদেনে রিপোর্ট বাধ্যতামূলক
বেনামে খোলা যাবে না বিমা পলিসি, ১০ লাখ টাকার লেনদেনে রিপোর্ট বাধ্যতামূলক
কিশোর গ্যাং দমনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ইউএনও-ওসির নেতৃত্বে কমিটি: আইজিপি
কিশোর গ্যাং দমনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ইউএনও-ওসির নেতৃত্বে কমিটি: আইজিপি
সর্বাধিক পঠিত
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
মধ্যরাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের স্ট্যাটাস, কথা বলেছেন পদত্যাগ নিয়ে
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা থাকবে না: চিফ হুইপ
আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ বিক্রির জায়গা থাকবে না: চিফ হুইপ
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক