বিমানযাত্রায় অনেকেরই একটি অভিজ্ঞতা বেশ পরিচিত, মাটিতে যে খাবারটি খেতে বেশ সুস্বাদু লাগে, আকাশে কয়েক হাজার ফুট ওপরে গিয়ে সেই একই খাবার যেন কিছুটা বিস্বাদ মনে হয়। খাবারে লবণ কম, মিষ্টি কম কিংবা গন্ধও যেন আগের মতো তীব্র নয়। অনেক সময় মনে হতে পারে, বিমানের খাবার তৈরির সময়ই বুঝি স্বাদে কিছুটা কমতি রাখা হয়েছে।
আসলে এর পেছনে রয়েছে বিমানের ভেতরের পরিবেশ এবং মানুষের স্বাদ ও ঘ্রাণ অনুভব করার ক্ষমতার পরিবর্তন। উচ্চতায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কেবিনের চাপ, আর্দ্রতা ও বাতাসের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব পড়ে জিহ্বা ও নাকের অনুভূতিতেও।
আকাশে উঠলেই বদলে যায় স্বাদ বোঝার ক্ষমতা
বিমানের কেবিন সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক কম আর্দ্র থাকে। দীর্ঘ সময় এমন শুষ্ক পরিবেশে থাকার কারণে মুখ ও নাকের ভেতরের আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। এতে খাবারের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করার ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে।
শুধু আর্দ্রতা নয়, কেবিনের চাপও গুরুত্বপূর্ণ। বিমান যখন অনেক ওপরে উড়ে যায়, তখন কেবিনকে কৃত্রিমভাবে চাপযুক্ত রাখা হলেও মাটির কাছাকাছি পরিবেশের তুলনায় এর পার্থক্য থাকে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে বিশেষ করে মিষ্টি ও নোনতা স্বাদ তুলনামূলকভাবে কম তীব্র মনে হতে পারে।
ঘ্রাণ কমে গেলে খাবারের স্বাদও বদলে যায়
আমরা খাবারের স্বাদ শুধু জিহ্বা দিয়ে অনুভব করি না। খাবারের গন্ধও স্বাদ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নাকের ঘ্রাণ অনুভব করার ক্ষমতা কমে গেলে খাবারও অনেকটা নিরস মনে হতে পারে।
বিমানের শুষ্ক বাতাস ও কেবিনের চাপের কারণে ঘ্রাণ অনুভূতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে মাটিতে যে খাবারের মশলা বা সুগন্ধ খুব সহজে বোঝা যায়, বিমানে সেটি তুলনামূলকভাবে কম স্পষ্ট মনে হতে পারে।
বিমানের শব্দও প্রভাব ফেলতে পারে
বিমানের ভেতরে সবসময়ই ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ থাকে। এই অবিরাম শব্দও খাবারের স্বাদ অনুভবের ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের শব্দের মাত্রা খাবারের স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই বিমানযাত্রায় খাবার খাওয়ার সময় যাত্রী হয়তো একই খাবার মাটিতে খাওয়ার তুলনায় কিছুটা ভিন্নভাবে অনুভব করেন।
তাহলে কি বিমানের খাবার আসলে কম সুস্বাদু?
সবসময় তা নয়। বিমানে পরিবেশন করা খাবার সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে উড়োজাহাজের পরিবেশেও তার স্বাদ যতটা সম্ভব ভালো থাকে। রান্নার সময় খাবারের স্বাদ, উপকরণ, সংরক্ষণ ও পুনরায় গরম করার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা হয়।
তবে মাটিতে রান্না করা তাজা খাবার আর বিমানে পরিবেশিত খাবারের অভিজ্ঞতা এক নয়। বিমানের খাবার অনেক সময় আগে থেকেই প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে বিমানে গরম করে পরিবেশন করা হয়। ফলে রান্নার ধরন ও পরিবেশনের পদ্ধতিও স্বাদের পার্থক্যের একটি কারণ হতে পারে।
কেন ঝাল বা মশলাদার খাবার কখনও বেশি ভালো লাগে?
মজার বিষয় হলো, আকাশে সব স্বাদ একইভাবে কমে যায় না। কিছু ক্ষেত্রে ঝাল বা মশলাদার খাবারের অনুভূতি তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট হতে পারে। কারণ ঝালের অনুভূতি মূলত স্বাদের পাশাপাশি মুখের স্নায়ুর ওপরও নির্ভর করে।
এই কারণেই বিমান সংস্থাগুলো খাবারের মেনু তৈরির সময় শুধু লবণ বা চিনির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে না গিয়ে বিভিন্ন মশলা, সুগন্ধি উপাদান ও রান্নার কৌশল ব্যবহার করে খাবারকে আকর্ষণীয় রাখার চেষ্টা করে।
খাবারের স্বাদ বাড়াতে বিমান সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা
বিমানের খাবার তৈরি করা সাধারণ রেস্তোরাঁর খাবার তৈরির মতো সহজ নয়। খাবারকে দীর্ঘ সময় নিরাপদ রাখতে হয়, পরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গরম করতে হয় এবং সেই সঙ্গে আকাশে বদলে যাওয়া স্বাদ অনুভূতির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়।
তাই বিমানের খাবারের রেসিপি তৈরির সময় শেফ ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরা কেবিনের পরিবেশের কথা বিবেচনা করেন। কোন খাবার গরম করার পরও ভালো থাকবে, কোন উপাদানের স্বাদ তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট থাকবে এবং কোন খাবার দীর্ঘ যাত্রায় পরিবেশনের উপযোগী এসব বিষয়ও গুরুত্ব পায়।
আকাশে খাবার অন্য রকম লাগাটাই স্বাভাবিক
বিমানে খাবারের স্বাদ বদলে যাওয়ার পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। কেবিনের কম আর্দ্রতা, চাপের পরিবর্তন, ঘ্রাণ অনুভূতিতে প্রভাব, বিমানের পরিবেশের শব্দ এবং খাবার সংরক্ষণ ও গরম করার পদ্ধতিসহ নানা কারণে তৈরি হয় ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা।
তাই মাটিতে প্রিয় খাবারটি বিমানে গিয়ে কিছুটা ফিকে মনে হলে অবাক হওয়ার কারণ নেই। খাবারটি হয়তো আগের মতোই তৈরি হয়েছে, কিন্তু কয়েক হাজার ফুট ওপরে গিয়ে আমাদের স্বাদ ও ঘ্রাণ অনুভব করার অভিজ্ঞতাটাই কিছুটা বদলে যায়।