চলতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে বিদায় করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লিখিয়েছে নরওয়ে। দলটির এই রূপকথার জয়ের নায়ক আর কেউ নন, খোদ আর্লিং হালান্ড; যার জোড়া গোলেই চুরমার হয়েছে সেলেসাওদের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন। এই দুই গোলের সুবাদে চলমান আসরে নিজের গোলসংখ্যাকে সাতে নিয়ে গেছেন এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার; যার মাধ্যমে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সঙ্গে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসলেন তিনি।
মাঠে হালান্ডের এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তার ফ্যাশন সেন্স এবং মাঠের ব্যক্তিত্ব নিয়েও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কমতি নেই। বিশেষ করে তার লম্বা সোনালি চুল বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ম্যাচ বা অনুশীলন চলাকালে হেয়ার টাই দিয়ে সেই চুল বাঁধার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ভাইরাল হয়।
বিশ্বকাপের এই উন্মাদনার মাঝেই এবার নিজের সেই চুল বাঁধার ব্যান্ড বা হেয়ার টাই নিয়ে নতুন এক ব্যবসায়িক চমক দিলেন হালান্ড। জনপ্রিয় হেয়ার টাই ব্র্যান্ড ‘কেকেএনইকেকেআই’ বিশ্বকাপ চলাকালেই বাজারে এনেছে বিশেষ সীমিত সংস্করণ ‘হলান্ড এডিশন’। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, হালান্ড কেবল এই ব্র্যান্ডটির প্রচারণাদূত বা ফেস হিসেবেই কাজ করছেন না, বরং সরাসরি এই প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করে এখন এর মালিকানার অংশীদারও হয়েছেন।
বিজ্ঞাপনী চমক নয়, এক আত্মিক সম্পর্ক
সাধারণত তারকারা কোনও ব্র্যান্ডের প্রচারণায় আসেন মোটা অঙ্কের চুক্তির বিনিময়ে। কিন্তু হালান্ডের ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন। এই বাণিজ্যিক মেলবন্ধনের অনেক আগে থেকেই কেকেএনইকেকেআই ছিল হালান্ডের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। লম্বা চুলগুলোকে সামলে রাখতে কোনও ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসেবে নয়, বরং পণ্যটির কার্যকারিতার জন্য তিনি নিজেই এটি বেছে নিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে এটি তার রুটিনে পরিণত হয়। কঠোর অনুশীলন সেশন থেকে শুরু করে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের দিন, কিংবা মাঠের বাইরের অবসরে সবখানেই তার চুলে বা কবজিতে দেখা যেত এই ব্যান্ড। এই অকৃত্রিম ভালো লাগা থেকেই শেষ পর্যন্ত ব্র্যান্ডটির অংশীদার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
হালান্ড নিজেই অকপটে স্বীকার করলেন সেই কথা, আমি কেকেএনইকেকেআই-এর হেয়ার টাই পরি এবং কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছি, কারণ আমি এই পণ্যটির ওপর মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি।
হালান্ডের নিজস্ব রঙের ছোঁয়া
ব্যবসায় যুক্ত হয়েই হালান্ড ভক্তদের জন্য নিয়ে এসেছেন একটি দারুণ চমক। নতুন করে কোনও পণ্য জোর করে তৈরি না করে, তিনি যা নিয়মিত পরেন সেটিকে নিজের রঙে সাজিয়েছেন। বাজারে এসেছে হালান্ডের নিজস্ব পছন্দে তৈরি আটটি হেয়ার টাইয়ের একটি সীমিত সংস্করণ বা লিমিটেড এডিশন বক্স।
এই বিশেষ সংগ্রহের পেছনে লুকিয়ে আছে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের গল্প। হালান্ড জানান, এই আটটি হেয়ার টাইয়ের রং মূলত মাঠে আমি যে দলগুলোর হয়ে খেলি, সেই দলগুলোর জার্সির রঙের অনুপ্রেরণায় বেছে নেওয়া হয়েছে।
এর ভেতরের কিছু রঙের টোনে জড়িয়ে আছে ম্যাচের দিনগুলোর তীব্র উত্তেজনা, গতি আর মনঃসংযোগের গল্প। আবার কিছু রঙের টোন রাখা হয়েছে বেশ মৃদু ও শান্ত, যা মাঠের বাইরে হালান্ডের যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি ব্যান্ডের ফিনিশিংয়ে যুক্ত করা হয়েছে একটি কাস্টম ‘হালাণ্ড’ পুঁতি বা বিড, যা পণ্যটিতে যোগ করেছে এক সূক্ষ্ম কিন্তু দারুণ ব্যক্তিগত ছোঁয়া।
চুলের সুরক্ষায় ৬০ সুতার বুনন
হালান্ডের নাম জড়ালেও কেকেএনইকেকেআই তাদের মূল পণ্যের গুণগত মানে কোনও পরিবর্তন আনেনি। প্রতিটি হেয়ার টাই তৈরি হয়েছে তাদের নিজস্ব সিগনেচার বুননশৈলীতে। ৬০টিরও বেশি সুতার নিখুঁত বুননে তৈরি এই ব্যান্ডগুলো যেমন শক্ত, তেমনি চুলের জন্য নরম। ফলে চুলে কোনও টান লাগে না বা চুলের কোনও ক্ষতি হয় না। এটি চুলে যেমন আরামদায়ক হোল্ড দেয়, তেমনি ফ্যাশনেবল অনুষঙ্গ হিসেবে কবজিতেও সমানভাবে মানিয়ে যায়।
স্বপ্ন ছোঁয়ার মুহূর্তে এক নতুন যাত্রা
হালান্ডের এই ব্যবসায়িক উদ্যোগটি এমন এক মুহূর্তে সামনে এলো, যা তার ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে খেলেছিলেন হালান্ডের বাবা। এবার বাবার সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার সুযোগ এসেছে খোদ হালান্ডের সামনে।
আবেঘন কণ্ঠে হালান্ড বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবার মতো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন ছিল আমার। এখন আমার পালা, আর এই সুযোগটি আমার কাছে আমার জীবনের সবকিছু।
হালান্ড বিশ্বাস করেন, বিশ্বকাপের মতো এই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো কোনও এক রাতের বা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের ম্যাজিক নয়। এটি গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের ছোট ছোট অভ্যাস, রুটিন আর মনোযোগ ধরে রাখার মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায়। ফুটবল মাঠের এই ধ্রুব সত্যটি তিনি তার এই পণ্যের দর্শনেও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। আর এই গভীর দর্শনকে চুলে বেঁধে নিয়েই এবার নতুন এক গোলপোস্টের দিকে ছুটছেন আর্লিং হালান্ড।









