জলে ভেসে বিথঙ্গল

Send
ফারুখ আহমেদ
প্রকাশিত : ১৭:০০, অক্টোবর ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১১, অক্টোবর ০১, ২০১৯

ডান পাশের পুরোটাই কালাডোবার হাওর, বাম পাশটা দেখে মনে হয় যেন তেপান্তরের মাঠ। যে মাঠে গরুর দল চড়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের বজরা সে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে গরুর দল পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেও তাদের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল না। কাউকেই পশ্চাৎপদ হাঁটতেও দেখা গেল না। ঘাস মুখে নিয়ে মাথা উঁচিয়ে আমাদের দেখে আবার ঘাসে মুখ ডুবালো কেউ কেউ। পাশেই একটা গাছ, একাকী বলা যাবে না কারণ গাছতলায় জিড়িয়ে নিচ্ছিলেন রাখাল বালক।


আমাদের বিশ্রাম নেওয়ার কিছু নেই। বহুদূর যেতে হবে। সেজন্য রাত দশটার বাসে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সে রাতেই হবিগঞ্জ চলে এসেছি। আমাদের এই আসার পেছনের মানুষটি হলেন ঝুমুরদি। বাহারি নাম বলতে তাকে সবাই ঝুমুর দেব বলে ডাকেন। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ মোড়ে নেমে রাত তিনটায় দিদিকে ফোন করে ব্যর্থ হলাম। তারপর মিরপুরের রাস্তার খোলা চায়ের দোকান পেয়ে চা-বিস্কিট খেয়ে যখন দিনের আলো ফোটার অপেক্ষায় ছিলাম। তখনই রাত চারটার কিছুপর দিদি পড়িমড়ি করে ঘুম থেকে উঠে আমাদের তার বাসায় নিয়ে আসেন। হাদিরাতুল জান্নাত, সুমন বসাক, বেনজির আহমেদ ও আমিসহ চারজন পায়ে পায়ে ঝুমুরদির বাসায় চলে আসি। ঝুমুরদির এটা নিজের বাসা নয়। দুই রুমের ভাড়া বাসা। একটি ঘর বেশ বড়, অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট। আমরা চারজন বড় ঘরটিতেই এসে উঠি। আসবাব বলতে একটি বিশাল খাট, সঙ্গে টেলিভিশন ও ফ্রিজ। দক্ষিণের দেয়াল জুড়ে কাচ বসানো জানালা। জানালার কাপড়ের পর্দা টেনে সরিয়ে দিলাম। ঝুমুরদি মন উজাড় করে রান্না করেছিলেন আমাদের জন্য। রুটি, মাংস পিঠা নিজের হাতে বানানো দধিসহ কত কী!


সকালের নাস্তা সেই সাত সকালে শেষ করে আলো ফোটার আগেই পথে নামি। সেই সকালে রোদ ঝলমল আবহাওয়া ছিল না। বৃষ্টির পূর্বাভাস না থাকলেও ভয় ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে না আবার আকাশের মুখ ভার করে! আজকাল আবহাওয়ার মতিগতি বোঝা মুশকিল। আমরা মিরপুর থেকে সিএনজিচালিত অটো রিকশা নিয়ে খোয়াই নদীতে যাত্রা বিরতি দিয়ে হবিগঞ্জ শহর পার হয়ে চলে আসি কালাডোবা। সেখানে রিংকু ভাই তার বজরা নিয়ে আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। ঝুমুরদি বাক্স পোটলা ভরে খাবার নিয়ে  এসেছেন।


সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ভাদ্রমাসের তারিখটা মনে নেই। সকাল সাতটার একটু বেশি সময়। মাঝখানে রাস্তা আর দুপাশে হাওরের স্বচ্ছ জল। এলাকার নাম কালাডোবা বলেই হাওরের নামও কালাডোবা। অটো রিকশা থেকেই নেমেই চোখ পড়ে শরতের আকাশ। নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ আর গা ছুঁয়ে দিচ্ছে সোনারঙা রোদ্দুর। বজরায় ওঠার আগে আকাশ ও হাওরের মিতালির কিছু ছবি তুলি । তারপর মায়ের দোয়া হোটেলে চা পান করে বজরায় চেপে বসি। কালডোবা হাওর শাপলায় কতক লাল আর কচুরিপানায় কতক সবুজ হয়ে আছে। সে সব দেখে দেখে ছন্দে আনন্দে আমাদের হাওরের জলপথে চলা। মাছ ধরার নৌকা, ভেসাল, দেশি নৌকায় মানুষ-জনের পারাপার দেখে দেখে যে দ্বীপ প্রান্তর চোখে পড়ে, তারই কথা লেখার শুরুতে বলেছি। তারপর তো শুধু এগিয়ে যাবার গল্প। কালাডোবা হাওরের জলপথে অনেকটা চলার পর বিথঙ্গল হাওরে এসে পড়ি। এখানে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে হিজল করচের স্বাগত সম্ভাষণ। এরমধ্যে পেরিয়ে এসেছি কন্দুপা, পাথারিয়া ও নথুল্লাপুর। আমাদের গন্তব্য বানিয়াচং উপজেলার বিথঙ্গল গ্রামের বহু বছরের পুরাতন বিথঙ্গল আখড়া। অনেকে বলেন বিথঙ্গল বৈষ্ণব আখড়া। ছবিতে বিথঙ্গল আখড়ার চমৎকার নির্মাণ শৈলী দেখে মুগ্ধ হয়ে এই পথে চলে আসা। প্রায় ঘন্টা দেড়েক চলার পর হাওরের মাঝে ছোট্ট একটা দ্বীপের মতো জায়গা দেখে সেখানে বজরা থামাই। তারপর সবাই সেখানে নেমে পড়ি।


সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে আকাশ ততই সুন্দর হচ্ছে। মাথার ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে চিল। কখনো সে গোত্তা খেয়ে হাওরের পানিতে ছোঁ মেরে মাছ নিয়ে আবার আকাশে উড়াল দিচ্ছে। আমরা যেখানটায় নেমেছি সেখানে হাওরের পানির পরিমাণ অল্প। হাদিরাতুল তো পানিতে নেমে হাঁটু পেরিয়ে একেবারে কোমর পর্যন্ত চলে গেল। বেনজির, সুমনদা বা ঝুমুরদিও কোনও অংশে কম না। সবার মোবাইল ও আমার ক্যামেরায় ক্লিক চলল সমানে। আধাঘন্টার মতো ছিলাম বিথংগল হাওরের সে অচেনা যায়গায়। তারপর আবার আকাশ, দূষণহীন হাওরের সবুজ জল, মাছ ধরার নৌকা আর প্রকৃতির শোভা উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চলি বিথংগল আখড়া অভিমুখে। অবশেষে এক সময় বিথঙ্গল আখড়ার লাল পতাকা ওড়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। খানিক এগোতেই বোঝা হয় আমরা আখড়ার একবারে নিকটে।
বিথঙ্গল আখড়া
স্যান্ডেল খুলে আমাদের আখড়ার ভেতর প্রবেশ করতে হয়। কড়া রোদ্দুরে বিষয়টা আমাদের খুব কষ্টদায়ক ছিল। তবু ঘুরে দেখি চমৎকার নির্মাণ শৈলীর বিথংগল আখড়া। যার ভেতরের অংশ মুঘল স্থাপত্য রীতি ও বাইরের অংশ জোড়বাংলা স্থাপত্য রীতির সম্ভারে পরিপূর্ণ। হবিগঞ্জ এর বানিয়াচং উপজেলার সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণ এই বিথঙ্গল আখড়া। রামকৃষ্ণ গোস্বামী হবিগঞ্জের রিচি পরগনার বাসিন্দা ছিলেন। তিনিই বিথঙ্গল আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। আখড়ার বয়স আনুমানিক সাড়ে চারশ বছর। আখড়াটি আর্কিওলজি বিভাগের অধীন হলেও এখনও সেখানে তাদের কর্মতৎপরতা শুরু হয়নি বোঝা গেলো। গত বছর আখড়াটি জরাজীর্ণ হয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিল। আখড়ায় পা দিয়ে বুঝলাম একবছরে পরিচর্যা হয়েছে অনেকখানি। পুরো আখড়ায় সে পরিচর্যার ছোঁয়া। পরিকল্পনাহীন পরিচর্যায় বিথঙ্গল তার সৌন্দর্য হারিয়েছে। বলা যায় যে আবেদনটুকু নিয়ে দাঁড়িয়ে বিথঙ্গল, সে তা হারিয়েছে সবটুকুই। মানুষ সময় দেখতে যায়। নতুন কিছু দেখতে চায় না। আমি বা সবাই চাই সময়ের ক্ষয় দেখতে। বিথঙ্গলে সেটার বড্ড অভাব।


কীভাবে যাবেন
সারাবছর বিথঙ্গল যাওয়া গেলেও বর্ষা ও শরতের শেষ তারিখ পর্যন্ত বা যতদিন হাওরে পানি থাকে ততদিন এখানে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। অক্টোবরের পর বিথঙ্গল আখড়ায় যেতে চাইলে জিপ গাড়ি ভরসা। সুতরাং অক্টোবর শেষ হবার আগেই একবার বিথঙ্গল ঘুরে আসতে পারেন। ঢাকার সায়দাবাদ বা মহাখালি থেকে সারাদিনই হবিগঞ্জের বাস পাবেন। চাইলে রাতের উপবনে চলে যেতে পারেন। দশটায় উপবন ছাড়ে শায়েস্তাগঞ্জ থামে রাত তিনটায়। সেখান থেকে অটোতে হবিগঞ্জ। তবে বাসে ঝামেলা কম। একেবারে হবিগঞ্জ শহরে নামতে পারবেন। রাতের বাকি সময় কোনও আবাসিক হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে কালাডোবা খেয়াঘাট চলে আসুন। তারপর দরদাম করে বজরায় চেপে বসুন। সন্ধ্যার মধ্যে হবিগঞ্জ ফিরে বাস ধরলে, রাত বারোটা পেরুবার আগেই বাড়ি থাকবেন আশা করি। চাইলে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম, নিকলি বা বাজিতপুর থেকেও যাত্রা করতে পারেন। সময় দুইঘন্টা লাগবে। যেভাবেই আসেন সৌন্দর্য গিলেই আরেক সুন্দরের কাছে আসবেন। তবে শুকনা মৌসুমে খুব কষ্টকর।


কী কী দেখবেন
আখড়ায় রামকৃষ্ণ গোস্বামীর সমাধির উপর চমৎকার মঠ। একটি নাট মন্দির। শষ্য ভান্ডার ঘর ও ভোগ মন্দির, কিছু প্রাচীন স্থাপনা। বিশাল তিনটি দীঘি। তাছাড়া এখানে রয়েছে একটি ২৫ মণ ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকি। পিতলের সিংহাসন। রূপার পাখি ও মুকুট। আর কালঅডোবা ও বিথঙ্গল হাওরের পুরা জলাপথ রয়েছে তার অতি-অসাধারণ সৌন্দর্য নিয়ে!


থাকা-খাওয়া
বিশ্রামের জন্য হবিগঞ্জ আবাসিক হোটেল পাবেন। খাওয়ার জন্য হবিগঞ্জ শহরই ভরসা। বিথঙ্গল যাত্রার সময় সঙ্গে শুকনা খাবার নিবেন। সকালের নাস্তাটা হবিগঞ্জ সেরে নিবেন। বিথঙ্গলে খাবার যা পাবেন তা হল আখড়ার পাশের মিষ্টির দোকানের ভাজাভুনা, মিষ্টি ও দৈ-চিড়া।

ছবি: লেখক 

/এনএ/

লাইভ

টপ