নির্ঝঞ্ঝাট পিরিয়ডের জন্য ‘মেনসট্রুয়াল কাপ’

Send
নাহিদ আক্তার
প্রকাশিত : ১৭:৩০, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২২, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

বছর দেড়েক আগের কথা। পাহাড়ি মেয়েরা কীভাবে পিরিয়ডের সময়গুলো কাটায়, তা নিয়ে গবেষণা করতে আমার বর আর তার এক সহকর্মী যায় বান্দরবানের রুমা থেকেও আরও ১০ কিলোমিটার দূরের দুই পাড়ায়। ফিরে এসে জানায়, বেশিরভাগ মেয়েরা কাপড়ের পুটলি বানিয়ে তার মধ্যে বালু, খড় ইত্যাদি ঢুকিয়ে ব্যবহার করতো আগে, ইদানিং চট ও নিজেদের তৈরি মোটা কাপড় ব্যবহার করে! তবে কাপড় ব্যবহারও তাদের কাছে বিলাসিতা। কারণ কাপড় ধুতে যে পরিমাণ পানি লাগে, তা যোগাড় করা দুঃসাধ্য। আর স্যানিটারি প্যাডের কথা তারা শোনেইনি অনেকে। পুরো পাড়া খুঁজে দুজন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষককে পাওয়া গেল, যারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন। তাও কালেভদ্রে। কারণ, প্রথমত, দাম আর দ্বিতীয়ত কেনার ঝামেলা। প্যাড কিনতে যেতে হয় বান্দরবান শহরে।


তখন থেকেই খুঁজতে থাকলাম এর বিকল্প। গুগল জানালো, আফ্রিকায় বিভিন্ন এনজিও কাজ করছে মেনসট্রুয়াল কাপ নিয়ে। এরপর বিভিন্ন মেডিক্যাল জার্নাল এবং কনফারেন্স জার্নালে প্রকাশিত রিসার্চ আর্টিকেল আর ইউটিউব ঘেঁটে সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেই ব্যবহার করার। আর ব্যবহারের শুরুতেই বদলে গেল আমার বছরের পর বছর চলতে থাকা পিরিয়ড নিয়ে ভয়, দ্বিধা, সংকোচ।
হ্যাঁ, শুরুতে ভয় লেগেছে। ঠিকমতো ঢোকাতে পারছিলাম না, বের করতেও পারছিলাম না। ইউটিউব টিউটোরিয়ালই একমাত্র ভরসা। নিজেকে বুঝিয়েছি, এটা কোন রকেট সায়েন্স না। আমি পেরেছি। আরামের কথা বাদ দিয়ে যদি খরচের কথা ধরি, তাহলে মেনসট্রুয়াল কাপ কতটা সাশ্রয়ী, সেই হিসাব দিচ্ছি এইবার। পিরিয়ডের পাঁচ দিনে যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৬ ঘন্টা পর পর প্যাড চেঞ্জ করেন, তাহলে বছরে খরচ হবে ৩০০০-৭২০০ টাকা। একজন সুস্থ নারী তার প্রজনন বয়সে (১৩-৪৯ বছর) মোট খরচ করে ১ লাখ দুই হাজার থেকে ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আমাদের দেশের কতজন নারী এই টাকা খরচ করতে পারে? আর সেজন্যই বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ নারী এখনও কাপড়ের উপরেই ভরসা করে।
প্রজনন বয়সে একজন নারী সাড়ে এগারো হাজার প্যাড ব্যবহার করে যার ওজন হয় ৫১ কেজি। আর এর এক একটি মাটিতে মিশতে সময় লাগে ৫শ বছর! স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের পর মেডিকেল বর্জ্য হিসাবে শোধন করতে হয়। কিন্তু আমরা কি করি? কোথায় ব্যবহৃত প্যাড ফেলবো তাই ভেবে ব্যাগে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। ফেলি ডাস্টবিনে।
এসবের বিপরীতে মেনসট্রুয়াল কাপ যদি কোনও মেয়ে তার টিনএইজ থেকে ব্যবহার শুরু করে, তাহলে তার মেনোপজ পর্যন্ত লাগবে সর্বোচ্চ ৬টা কাপ। কারণ মেডিক্যাল গ্রেডেড সিলিকন দিয়ে তৈরি এক একটি কাপ ব্যবহার করা যায় ১০ বছর। এটি পিরিয়ডের রক্ত জমিয়ে রাখে। পিরিয়ড ফ্লো’র ওপর নির্ভর করে ৫ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত রাখা যায় এক টানা। পিরিয়ডের সময় কাপ পরিষ্কারের জন্য ২৫০ মিলি পানিই যথেষ্ট।
তবে স্বীকার করছি, কৌশল রপ্ত করতে সময় লাগে। তবে তা তিন মাসের বেশি না। একটা নতুন মোবাইল অ্যাপ কিংবা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার শিখতেও তো আমাদের সময় লাগে, তাই না? একটি ছোট্ট কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্ত আপনার পিরিয়ডের সময়টাকে কতটা আরামদায়ক করতে পারে, তা ব্যবহার না করলে আপনি বুঝবেন না।
মেনসট্রুয়াল কাপ ব্যবহারে নিশ্চিন্ত হোক নারীর বিশেষ সময়, এই কামনা থাকলো।

লেখক: সহ-প্রতিষ্ঠাতা, মাম্বল, একটি সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। 

/এনএ/

লাইভ

টপ