X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

অগ্নি-বীণা ও সাম্যবাদী

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ১৪:৫৪

বাংলা কবিতায় নজরুল প্রতিভার উন্মেষ নিঃসন্দেহে অভিনব, তবে অনভিপ্রেত নয়। কেননা, যুগনিরিখে সৃজনের যে আমূল রূপান্তর কিংবা সম্ভাবনার কৌণিকতা অনাবৃত থাকে এবং তাকে ঘিরে সহজাত যে জটিল তর্ক-বিতর্কের ফলিত জগৎ, তা যেকোনো কবির পক্ষেই ইতিবাচক। উপরন্তু কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) কবিতায় মসৃণ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক এষণা ও যুগসচেতন স্বরগ্রাম। বিশেষ করে, ঔপনিবেশজাত শোষণের আবহে তাঁর কাব্যচেতনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ যেন ‘ধূমকেতু’র সমতুল্য, যার জান্তব ও জ্বলন্ত শিখায় সচকিত হয় পরাধীন ভারতবর্ষের যুগ। সেসূত্রেই তিনি ‘সর্বকালের বিদ্রোহী’ কবিরূপে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে নেন। কিন্তু তাঁর এই উচ্চকিতরূপের অন্তরালে প্রবহমান এক পরাভূত জাতিসত্তার জাগরণপ্রয়াস। পাশাপাশি তাঁর মানসসংবেদে প্রতিষ্ঠা পায় জগতের সকল নিপীড়িত মানুষের প্রতি প্রেমবোধে তাড়িত এক আত্যন্তিক মানবতাবাদ (Humanism)। এক্ষেত্রে কবি নজরুল ইসলামকে কোনো তাত্ত্বিক বিশ্বের দ্বারস্থ হতে হয়নি, কিংবা আয়াসলভ্য পাণ্ডিত্যের; বরং জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তিনি অর্জন করে নেন মানবমুক্তির পথরেখা। আজন্ম রোমান্টিক এ কবির উচ্চকিত স্বরায়ণে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক প্রভুত্ববাদের প্রতি ধ্বংসাত্মক মনোভাব। কবিতায় বলেন : ‘রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা/ তাই লিখে যাই রক্তলেখা।’ (কাজী নজরুল ইসলাম, ) মূলত ‘রক্তলেখায়’ ঘুমন্ত ও পরাভূত জাতিকে জাগ্রত করার প্রয়াস তাঁর সৃজনভূমিতে প্রাধান্য পায়। যার অভিজ্ঞান বহন করে অগ্নিবীণা (১৯২২) ও সাম্যবাদী (১৯২৫) শীর্ষক কাব্য। এছাড়াও তাঁর অসংখ্য গান, কবিতা, প্রবন্ধে ধ্বনিত হয় বি-উপনিবেশবাদীর সংক্ষোভ। সমালোচক বেগম আকতার কামাল এ বিষয়টি চিহ্নিত করে বলেন : তিনি (নজরুল ইসলাম) তাঁর রোমান্টিসিজমকে ধারণ ও বহন করেন ঔপনিবেশিকতার প্রেক্ষাপটে আর নিজে নেন বি-উপনিবেশবাদীর ভূমিকা। (বেগম আকতার কামাল, ২০১৭ : ০৫)

নজরুল প্রতিভার এরূপ ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা পায় উত্তর-ঔপনিবেশিক বৌদ্ধিক পটভূমি। বিশ শতকের যুদ্ধোত্তর সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আলোড়নে বিশ্বব্যাপী উপনিবেশবিরোধিতার যে ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়, তা ক্রমে সাহিত্যতত্ত্বের মর্যাদা লাভ করে। এ তত্ত্বচিন্তার প্রসার ঘটে ফ্রাঞ্জ ফ্যানন (১৯২৫-১৯৬১) রচিত Blake Skin White Masks (১৯৫২) ও The Wretched of the Earth (১৯৬১) গ্রন্থের মধ্যদিয়ে। তাঁর বক্তব্যে প্রাধান্য পায় উপনিবেশের সাম্রাজ্যবাদী চেতনার উদ্দেশ্য কিভাবে উপনিবেশিতের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে এবং তাদের স্থানিক ও কালিক অস্তিত্বে বিপর্যয় ডেকে আনে। ফ্যাননের পর্যবেক্ষণসূত্রে জানা যায়, ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশিত জনসমাজে কেবল বস্তুগত (Objective) শোষণই চালায় না, তার মন ও মননেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। শুধু তাই নয়, ঔপনিবেশিক শাসন যেমন সত্য, এর আগ্রাসনের মাত্রা যেমন সুতীব্র; তেমনি এর প্রতি বিরোধিতা ও মোকাবেলাও উপনিবেশিতের মননে সক্রিয় থাকে। ফ্যাননের দৃষ্টিতে, উত্তর-ঔপনিবেশিকতা শুধু ঔপনিবেশিকের পরবর্তী পর্যায় নয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তিমাত্রই স্বাধীনসত্তার অভিমুখী হবার প্রয়াসে বি-উপনিবেশন’ (Decolonization) এক সম্ভাবনারক্তিম পদক্ষেপ। The Wretched of the Earth (১৯৬১) গ্রন্থের সূচনায় বলা হয়েছে : National Liberation, national rewakening, resloration of the nation to the people or Commonwealth, whatever the name used, whatever the latest expresstion, decolonazation is awlyas a violent event. (Frantz Fanon, 2004 : 01)

ফ্যাননের এ পর্যবেক্ষণের নির্যাস (Phenomenon) নজরুলের কাব্যচেতনায় লক্ষ করা যায়। তাঁর কবিতায় ঔপনিবেশ অবকাঠামোজাত অতৃপ্তি ও তদসঞ্জাত ক্ষোভ এক বিশিষ্ট বিষয় হিসাবে পরিগণিত। পাশাপাশি বিশ শতকের চার ও পাঁচের দশকের যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, তা নজরুল প্রতিভার গতি নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। ইতিহাসে দেখা যায়, এ সময়ে আফ্রিকা, লেবানন, আয়ারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র এষণা জাগ্রত হয়। তাদের এই যুথবদ্ধ প্রয়াসে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পূর্ণ সমর্থন গড়ে তোলেন বহু বুদ্ধিজীবী। তাঁদের এই বৌদ্ধিক জগতকে ঘিরেই উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের প্রাথমিক ধারণা গড়ে ওঠে। এপ্রসঙ্গে আলোচিত এডওয়ার্ড সাইদের (১৯৩৫-২০০৩) অরিয়েন্টালিজম (১৯৭৮), দি কোয়েশ্চেন অফ প্যালেস্টাইন (১৯৭৯), কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম (১৯৯৩) প্রভৃতি গ্রন্থ, যা এ চিন্তাকে সমালোচনাতত্ত্বে রূপ দেয়। সাইদের পর্যবেক্ষণে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী চেতনার নগ্নসত্য কেতাবি রূপ অর্জন করে। সেখানে দেখা যায়, পৃথিবীর বহু দুর্বল জাতির ওপর প্রতীচ্য উপনিবেশ কায়েম করে এবং সুকৌশলে মানবজাতিকে ‘পাশ্চাত্য’ ও ‘অন্যরা’ এমন দ্বৈতবিভাজনে ভাগ করে দেয়। সাইদের বক্তব্যে আরো সুস্পষ্ট হয়, উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতার অর্থ শুধু নিজেদের ভূমি উদ্ধার নয়, নিজস্ব সংস্কৃতির নির্মাণও। কিন্তু এ পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াটি সুকঠিন হয়ে পড়ে। কেননা, উপনিবেশ তার স্বীয় বাহুবলে এবং সন্তর্পণে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করে, যা উপনিবেশিতের বস্তুবিশ্ব ও মানসগঠনে মৌল রূপান্তর ঘটায়। একইসঙ্গে উপনিবেশিতের স্থানিক কিংবা জাতিগত সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়নের মধ্যদিয়ে তা লুপ্ত করায় সচেষ্ট থাকে। সুতরাং ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে উত্তর-ঔপনিবেশিকতার অবস্থান সৃষ্টির প্রয়াস বাংলা কবিতায় বিশিষ্ট হবার দাবি রাখে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কাব্যচেতনায় এই নৈতিকতাকেই ধারণ করেন এবং তাঁর সে দার্শনিক প্রত্যয়ই কবিতায় প্রকটিত হয়। এ কারণেই তাঁর কবিতায় সহজাত মানবতার জয়ধ্বনি, শ্রেণি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নতুন যুগের স্বপ্ন। তাঁর নন্দনবিশ্বে প্রতিষ্ঠা পায় স্বপ্নদীপ্ত এক কবিকণ্ঠ। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি তাঁর মননে ধারণ করেন সাম্যচেতনা ও রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি। এরই সূত্রে তাঁর কাব্যচেতনার অভিমুখ বহুলাংশে বিশ্বযুদ্ধোত্তর উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বচিন্তার সমজাতীয়।

 

২.

কবি নজরুল পরাধীন ভারতবর্ষের জাতক। শৈশব থেকেই ছন্নছাড়া জীবন আর দারিদ্র্যের অভিশাপের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। বর্ধমান থেকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল, রাঢ়ভূমি থেকে পূর্ববঙ্গে তাঁর জীবন হয়ে ওঠে বিচিত্রগামী। নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবন মূলত ১৯১৯ (অসহযোগ আন্দোলনের প্রাক্কালে) থেকে ১৯৪২ (আগস্ট আন্দোলন) সময়ের আবর্তে। ১৯২১ থেকে ১৯২৩ এই সময়েই নজরুল ইসলামের উপনিবেশবিরোধী মনোভাব ও উত্তর-ঔপনিবেশিক চেতনাঋদ্ধ কবিতা ও গান রচনার সূত্রপাত। তিনি তাঁর কবিতায় মানুষের আণবিক প্রতিমূর্তি অঙ্কনে প্রবিষ্ট হন। কেননা, মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃত্তে সাহিত্য, সমাজ এবং ইতিহাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মানুষকে ঘিরেই বৃত্তায়িত সামাজিক অবকাঠামো এবং তদ্সঞ্জাত লিখিত ইতিহাস। তবে এ বিষয়টিও লক্ষ করা যায়, এই দ্বৈত উপাদানের পারম্পর্য বরাবরই সাধারণ জনমানসের স্বার্থপরিপন্থি। উপরন্তু তা মুষ্টিমেয় মানুষের সুবিধাবাদ ও ক্ষমতালিপ্সু মননের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কেননা, ইতিহাস তো বিজয়ীরাই লেখে, আর সামাজিক অবকাঠামোর অস্থি-সন্ধিতে সক্রিয় থাকে শ্রেণিদ্বন্দ্ব। তাই শ্রেণি-বর্ণ-নির্বিশেষ মানুষের জীবনধারা ও স্বপ্নের প্রকৃত প্রতিবিম্ব সৃজনের দায়ভার সাহিত্যের ওপর বর্তায়। এক্ষেত্রে সাহিত্যের অন্যসকল মাধ্যম অপেক্ষা ‘কবিতা’ অনেক বেশি জীবনঘনিষ্ঠ ও সমাজঅন্বিষ্ট হবার প্রত্যাশা রাখে, এর কারণ—এই মাধ্যমের উদ্ভব ও বিকাশ মানবেতিহাসের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। কবিতার ইতিহাসের ধারায় কখনো কখনো এমন কিছু কবিপ্রতিভার দেখা মেলে যাঁরা মানুষের চিরকালীন বোধ ও অভিজ্ঞতার চালচিত্র, বৈপ্লবিক জীবনসংগঠন, তাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভাঙনের ইতিকথাকে নান্দনিক করে তোলেন। নজরুল ইসলামের কাব্যচেতনায় এ বিষয়টি পরিলক্ষিত। ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ হতে জানা যায়, ভারতবর্ষ চিরকাল বিজাতি বিজিত দেশ এবং এখানকার জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ণসংকর প্রবল। তাই বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবনার সমাহার ও সহাবস্থান এখানে যেমন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, তেমনি এ দেশে ‘ব্যুপনিবেশনের’ চর্চাও বরাবরই অব্যাহত ছিলো। তাই কবি কাজী নজরুল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বাভাবিক উৎসারণ। সামাজিক বাঁধা নিষেধ, শাসকের রক্তচক্ষু অতিক্রম করেও নিজেদের জীবনের নানা অনুভব, সমাজমনষ্ক ভাবনার নিদর্শন প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাব্যে খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলা কবিতার আদি নিদর্শন চর্যাপদ এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য হতে পারে। ‘সান্ধ্যভাষা’য় নিজেদের ধর্মীয় আচরণসংবলিত চেতনাকে সংরক্ষণ করতে গিয়ে যেসব রূপক ও সংকেতের আশ্রয় নেন চর্যাকারগণ, তা অনেক বেশি জীবনঘনিষ্ঠ ও সমাজঅন্বিষ্ট চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। বসত্কার ও ভূমিপুত্রের মধ্যে বিস্তর ব্যবধানের মধ্যখানে জেগে থাকা সংগ্রামী জীবনচেতনার বহু নিদর্শনই প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাব্যে নিহিত। প্রাকৃতপৈঙ্গলের একটি পদে যখন পদকর্তা ছন্দোবদ্ধ শ্লোকের ভাষায় বলেন : ‘রা আ লুব্ধ সমাজ খল’ অর্থাৎ ‘রাজা লোভী, সমাজ খল’; তখন কেন্দ্রের শাসনের প্রতি তখনকার জনমানসের সূক্ষ্মবোধের (critical awareness) ব্যাপারটিই প্রকাশ পায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণবপদাবলি, ‘শাক্তপদাবলি’সহ বিচিত্র ধারার কাব্যে ধর্মীয়চেতনার অন্তরালে জীবনমুখী ভাবনারই প্রকাশ ঘটেছে। মঙ্গলকাব্যের অন্তরালেও জীবনমুখী ভাবনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। মঙ্গলকাব্যের সমৃদ্ধ লোকজ ধারায় ভূমির স্পর্শজাত নর-নারীর সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্বপ্ন-সাধ, দ্রোহ-সংগ্রামের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ রূপলাভ করেছে। মনসামঙ্গলের আখ্যানে যে অদম্য দ্রোহী চরিত্র ‘চাঁদ’ সওদাগরের পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়, তা এক অর্থে আপোষহীন ও সংগ্রামী ‘ভূমিপুত্রে’রই প্রতীক। ‘চাংমুড়িকানী’ দেবী মনসাকে পূজা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানোর পৌরাণিক আখ্যানে ধর্মজাত বোধ প্রচ্ছন্ন থাকলেও, এরূপ অনুমান করা অসংগত হয় না যে—ভয়, হিংসা, ধ্বংসের প্রতীক মনসাদেবীর তোয়াজ ও তুষ্টিসাধনে ভূমিপুত্র ‘চাঁদ’ দ্রোহ না করে পারেনি। কেননা, সর্পদেবী ‘মনসা’ নিজ কীর্তিকলাপে ভূমিপুত্র চাঁদ সওদাগরের নিকট বস্তকারেরই প্রতীকরূপে বিবেচিত হয়। সুতরাং, জীবনসংগ্রাম এখানে অনিবার্য; দ্বন্দ্বও তাই সহজাত। অন্যদিকে প্রাচীন ও মধ্যযুগ পেরিয়ে উনিশ শতকে উদ্ভূত নতুন রাজনৈতিক প্রতিবেশে পাশ্চাত্যের রেনেসাঁসের আলোক যে নতুন বোধের উন্মেষ ঘটে তা নতুন কবিতার ধারাকে সম্ভাবিত করে তোলে। উনিশ শতকের উপনিবেশ শাসনে ভারতবর্ষে যে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন ও প্রসার ঘটে, তা বহুবছরের প্রবহমান জীবনব্যবস্থায় সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি আনয়ন করে। ইউরোপের ‘রেনেসাঁসে’র অনুকরণে ‘বাংলার রেনেসাঁস’ ঘটানোর যে প্রক্রিয়া সূচিত হয়, তাকে ‘প্যারাডাইম শিফট্’ বলা চলে। তবে, এদেশের রেনেসাঁস হল অতীতমুখী, অ্যাট্যাভিস্টিক ও বিশ্বাসকাতর। মনোভঙ্গি হল আপোসের। (হাসান আজিজুল হক, ২০১২ : ৪৩) উত্তর-ঔপনিবেশিকতাত্ত্বিক হোমি ভাবা Location of Culture গ্রন্থে কলোনিয়াল সংস্কৃতির এই মুগ্ধকর পরিস্থিতিকে বলেন ‘হাইব্রিডিটি’র (hybridization) পর্যায়। এক্ষেত্রে উপনিবেশিক শাসক উপনিবেশিতদের ‘তার মতো’ বানাতে চায়, অর্থাৎ সে পুরোপুরি ‘অপর’ হয়ে থাকবে না, অথচ ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকারীর স্তরেও উঠতে সমর্থ হবে না। মেকলের কুখ্যাত নীতি যার সমার্থক। এ অনুসারে ‘দেহের রঙে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নীতিবোধ ও বুদ্ধির দিক দিয়ে হবে খাঁটি ইংরেজ’— এ কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা। পরবর্তীসময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংস ও মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে যে নৈরাশ্য, শূন্যতা ও নির্লিপ্ত বিষাদের জন্ম হয়, তা রুশবিপ্লবের সাফল্যে নতুন মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে নতুনভাবে জাগ্রত হয়। এই নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার আশাবাদ, মাকর্সীয় দার্শনিক মতাদর্শে উদ্ভূত শ্রেণিচেতনা, শোষিত-নিপীড়িত জনতার প্রতি তৎকালীন ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় স্বাধীনতাকামী তরুণ বাঙালি মানসে প্রভাব বিস্তার করে। এ আদর্শকে বাংলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মেলবন্ধন করে নিয়ে এক নতুন ধারার কবিতা রচনায় ব্রতী হন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৪)। কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিজীবন পর্যালোচনায় জানা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ে এ কবি রুশ বিপ্লব সম্পর্কে অবহিত হলেও সাম্যবাদী চেতনায় তখনও ততটা উদ্বুদ্ধ হননি। মুজাফ্ফর আহমেদের সঙ্গে পরিচয়সূত্রেই ১৯২০ সালে দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় সম্পাদনাকার্যে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সময় ক্রমশ তিনি শ্রমিকদের জীবন ও সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। স্বীয় জীবনের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা আর বিশ্ববীক্ষণজাত নবচেতনা নজরুলের কবিমানসে এতটাই প্রভাব ফেলে, যার ফলে সমকাল সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত এ কবি কবিতায় নিজের প্রবল আমিত্বের প্রকাশ ঘটান, যে ‘আমি’ ঔপনিবেশিক শাসনামলে এক ভূমিপুত্রের সাহসী ও বলিষ্ট কণ্ঠস্বর। তাই প্রতিষ্ঠিত নন্দনবীক্ষায় আস্থা না রেখে শব্দে ও ছন্দে নতুন ভাবনার দ্যোতনা সৃষ্টিতে উৎসাহী হন। বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে এ কবি জাতি বর্ণ নির্বিশেষে জনমানসে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকাকে মূর্ত করে তোলেন কবিতায়, নজরুলের ‘Choice of position’ প্রকাশ পায় কবিতায় এভাবে :

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?—প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন-জীবন হারা অসুন্দরে করতে ছেদন!
তাই সে এমন কেশে বেশে
প্রলয় ব’য়েও আসছে হেসে
মধুর হেসে!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর!!
                                      [কাজী নজরুল ইসলাম ‘প্রলয়োল্লাস’, ২০১২ : ০৬]

এরূপ বিনির্মাণের শিল্পসংবেদে বাংলা কবিতার ইতিহাসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সূত্র সংযোজিত হয় তাঁর কবিতায়। নজরুল ইসলাম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতেও নিজের সামাজিক দায়কে বহুলাংশে স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনমনীয় দ্রোহকে প্রকাশ করেন, যার মাধ্যম কবিতা। ‘বল বীর-/ বল উন্নত মম শির’— এরূপ প্রত্যয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যদিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম ভূমিপুত্রের স্বপ্নসৌধ নির্মাণের পথে অগ্রসর হন, যা আতংকের সৃষ্টি করে সে সময়ের শাসনগোষ্ঠীর ভেতরে। শুধু কবিতা নয়, জনমানসের কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করার ক্ষেত্রে নজরুল ইসলাম প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডেও তৎপর হয়ে ওঠেন; যা অগ্রজ কবিদের অনুপ্রেরণার উৎসস্থল। ‘কবিতা’ যে শুধু আবেগের ললিতনৈপুণ্য নয়, বরং সমকালঅন্বিষ্ট ভাবনাকে প্রচার ও প্রসারে বিপ্লবের হাতিয়ার হতে সক্ষম—এ নবচেতনা ও দৃষ্টান্ত এ কবি তাঁর কবিতায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রবলভাবে। কবিতা রচনার জন্য ১৯২৩ সালে এ কবিকে কারাবরণও করতে হয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থার অসংগতির প্রতি তাঁর কবিতা যেভাবে প্রতিবাদের মন্ত্র হয়ে ওঠে তা অনির্ণেয়। বাঙালি জাতীয়চেতনায় উদ্বুদ্ধ এ কবি তত্ত্ব দিয়ে নয়, নিজের অভিজ্ঞতা ও ভৌগোলিক প্রতিবেশ বিবেচনায় সাম্যবাদের মন্ত্রকে গ্রহণ করেন। এ চেতনার প্রাণপ্রতিষ্ঠায় অসাম্প্রদায়িক ভাবনাকে জনসম্মুখে নিয়ে আসেন। ‘ভিন্নমতে’র (Dissent) অধিকারী এ কবিপুরুষ প্রতিষ্ঠিত নন্দনবীক্ষায় নানাভাবে সমালোচিত হলেও, তাঁর মতো জনপ্রিয় কবি বাংলা কবিতার ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর কবিতার পৌরুষব্যঞ্জক অভিব্যক্তি, যার সঙ্গে যুক্ত জাতীয়চেতনা ও সামাজিক দায়বোধজাত এষণা। কবি হিসেবে নজরুলের আবেদন জনমানসে যতখানি এবং বাংলা কবিতার ইতিহাসে জনমানস হতে বিচ্যুতি ঘটানো সাহিত্যকে গণমানুষের করে তোলার প্রয়াস যতখানি—তা তিরিশের বহু প্রতিষ্ঠ আধুনিক কবিদের ক্ষেত্রেও খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং, গণমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত, বেপরোয়া বা ‘Don’t care’ মনোভঙ্গি, রাষ্ট্রব্যবস্থার সকল অসংগতির প্রতি দ্রোহ, আবেগের উচ্ছ্বলতা, ভাষা-ছন্দে সৃষ্ট নব ব্যঞ্জনা—এমনই বহুভুজ কবিকৃতির নিদর্শনে তাঁর আবেদন অত্যন্ত সম্ভাবনারক্তিম ও দীর্ঘস্থায়ী।

 

৩.

২ ফ্রেডরিক মি. গিফিন ও রনা- ডি. স্মিথ সম্পাদিত সংকলন গ্রন্থ ‘এগেইনন্সট দ্যা গ্রেইন[Against the Gain/ প্রবণতার বিপরীতে] (১৯৭১)- এর ভূমিকায় বলেন : “সহজভাবে সংজ্ঞা দিতে হলে বলতে হয় ডিস্সেন্ট মানে ‘স্টেটাস কো বা বর্তমান ব্যবস্থার বিরোধীতা। এই ‘স্টেটাস কো-র সাথে মতভেদ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ভিন্নমতাবলম্বী অন্যের সমর্থনের অপেক্ষা না করে নিজেই প্রতিবাদ উচ্চারণ করতে পারে। আলবার্তু কামুর বর্ণনায় এ সিদ্ধান্ত লক্ষযোগ্য যে, প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তির বিদ্রোহ সমগ্র মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য এক প্রয়োজনীয় শর্ত। ‘I rebel-there-fore we exist-এমন মতবাদের ভিত্তিতে কাম্যু আরো বলেন—‘বিদ্রোহ যে কেবল নির্যাতিত মানুষদের ভেতর থেকেই উদ্ভূত হয় তাই নয়, নির্যাতনের দৃশ্যমাত্রও বিদ্রোহের উদ্রেক করতে পারে। এর মূলে রয়েছে কতিপয় নির্দিষ্ট বিশ্বজনীন মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক স্বতঃস্ফূর্ত সর্বমানবিক সংহতি।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় বি-উপনিবেশকারীর চেতনা প্রকাশ পায় ব্যক্তিক জীবনদর্শনের সত্যে। শৈশব থেকে সমাজের তথাকথিত মূলধারা হতে সমবিচ্ছিন্ন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত, দারিদ্রপীড়িত এ কবি অবলীলায় স্বোপার্জিত স্বাধীনতাকে ধারণ ও লালন করতে সমর্থ হন। উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বচিন্তায় দেখা যায়, ‘দেশ’ উপনিবেশমুক্ত হলেও উপনিবেশের অধস্তনে ভূমিপুত্রের ঐতিহ্য,ভাষা,সংস্কৃতিতে যে সংকরায়ণ ঘটে, তা উত্তর ঔপনিবেশ রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও প্রকৃত মুক্তি আনে না। বরং দূষিত বায়ুর মতোই তখনো সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোয় জেগে থাকে নব্য উপনিবেশিকতা। এরই বিরুদ্ধেই বিশ শতকের তাত্ত্বিকগণ তাঁদের লেখনী ধারণ করেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যজীবনের দীর্ঘ সময় ব্যক্তিগত আত্মআবিষ্কার তাঁর লেখনীতে তুলে ধরেন। পাশাপাশি সামষ্টিক জীবনে তার সম্প্রসারণে তাঁর কবিতাকে করে তোলেন অগ্নিজাত আয়ূধ। সাহিত্যিক ও সামাজিক দায়কে সমন্বিত রেখে তিনি রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হন। ‘নিজ’ ও ‘অপর’ এর মধ্যকার প্রশ্ন এবং উত্তর-ঔপনিবেশ তত্ত্ব ও চিন্তকদের অভিমতের সারগর্ভ নজরুলের অগ্নি-বীণা (১৯২২)কাব্যে বিশিষ্ট রূপ পায়। বিশেষত ফ্রাঞ্জ ফ্যানন উপনিবেশবাদের আওতায় উপনিবেশিতদের তিনটি রূপকেই সামনে আনেন। এ প্রসঙ্গে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ দিক :

১.উপনিবেশিক প্রশয়ে উত্থাপিত সাংস্কৃতিক মডেলের আত্তীকরণ;
২.এরই প্রতিক্রিয়ায় মনোজাগতিক ভাবে আত্ম-প্রশ্ন উপস্থাপন এবং নিজস্ব জাতীয়সত্তার অনুসন্ধান প্রয়াস
৩. সংহিংসতা ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর পক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্গীকার।

ফ্যাননের মতো এভাবেই বি-উপনিবেশায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এই ত্রিবিধ বৈশিষ্ট্যকে পুঁজি করেই নজরুল তাঁর প্রাতিস্বিক কাব্যচেতনা নিয়ে সাহিত্যে আবির্ভূত হন। এক অস্থির কালক্ষেপণের অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে আত্মআবিষ্কারের যে নেশা উন্মুক্ত করে, তারই সাক্ষ্য বহন করে অগ্নি-বীণা’ কাব্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের প্রতি মুগ্ধতাকে স্বীকার করেই নজরুল গ্রহণ করেন সেই ‘স্বর’, যা ইংরেজবিরুদ্ধ স্বাদেশিকতার আহ্বান। তাই ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন করে’—এ গানের অনুপ্রেরণাকে নিজ কাব্যচেতনায় অন্তলীন করে নেন। উল্লেখ্য, এ কাব্য প্রকাশের আগেই রচিত হয় বহু কবিতা, যা উত্তর-ঔপনিবেশিক অভীপ্সায় দীক্ষিত। উৎসর্গপত্রে লেখেন : ‘অগ্নিঋষি! অগ্নিবীণা তোমায় শুধু সাজে’ এবং উৎসর্গ করেন শ্রী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। স্বদেশী আন্দোলনের তাৎপর্যবহ পটভূমিতে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের অকুণ্ঠ সমর্থক এ কবির বলিষ্ঠ উচ্চারণ ফ্যানন কথিত বি-উপনিবেশ পরিস্থিতিরই জানান দেয়। আত্মবিস্মৃত জাতিকে প্রাক উপনিবেশ পর্বের স্মৃতির প্রান্তে আনয়ণ ও লৌকিক মিথের স্মরণে গণমানুষের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সমন্বিত হয় তাঁর কবিতায়। ‘ধূমকেতু’র ‘পূজা’ সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় বলেন :

          আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
          স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
          দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
          ভূ-ভারত আজ কসাইখানা আসবি কখন সর্বনাশী?

মূলত উত্তর-ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে স্বাদেশিকতার এক সম্পর্ক বিদ্যমান। তাত্ত্বিকগণ লক্ষ করেন, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের যুগে উপনিবেশিত দেশের ভূমিপুত্রে নিকট স্বদেশের ‘নারীরূপ’ শক্তির বার্তা নিয়ে আসে। পাশ্চাত্যের ‘লিবারেল জ্ঞান’, যুক্তি ও প্রযুক্তির প্রতারণা যখন সচকিত হলো তখন দেশব্যাপী জাগ্রত হয় স্বাদেশিকতার আহ্বান। ইতিহাসে দেখা যায়, ভয়াবহ মন্বন্তর, নীলবিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ প্রভৃতি নিরন্তর আর্থসামাজিক ডামাডোলে কবি অনার্য ও লৌকিক দেবীর প্রতীকী রূপকে কবিতায় নান্দনিক করে তোলেন। তাঁর উত্তর-ঔপনিবেশিক মননের প্রান্ত ছুঁয়ে আসা স্বপ্ন ও নবযুগ স্বদেশ ও মানবতারই সপক্ষে। উদাহরণস্বরূপ অগ্নিবীণা কাব্যের কিছু কবিতাংশ স্মরণ করা যেতে পারে :

          ক.                 মাভৈ মাভৈ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে!
                              জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে!
                              এবার মহা নিশার শেষে
                              আসবে ঊষা অরুণ হেসে
                                      করুণ বেশে!
                                       [কাজী নজরুল ইসলাম ‘প্রলয়োল্লাস’, ২০১২ : ০৬]

          খ.                 আমি     মানি নাকো কোনো আইন,
                             আমি     ভরা তরী করি ভরা ডুবি, আমি টর্ণেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
                             আমি     ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল বৈশাখীর!
                             আমি     বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী দূত বিশ্ব বিধাত্রীর!
                             [কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’, ২০১২ : ০৮]

         

          গ.                মেখলা ছিঁড়িয়া চাবুক করো মা
                             সে চাবুক করো নভ-তড়িৎ,
                             জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে
                             লালে লাল হোক শ্বেত হরিৎ!
                                       [কাজী নজরুল ইসলাম ‘রক্তম্বরধারিণী মা’, ২০১২ : ১২]

উদ্ধৃতি ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ তে কবি দেশ, কাল ও স্থানিক কাঠামোকে দূরীভূত করে মানুষের স্বাধীন প্রতিমূর্তি সামনে আনেন। এখানে ভাব-ভাষা-ছন্দ-অলংকারে উপনিবেশিত জনতার অন্তর্গত শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে। নিজ সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আশ্রয় নেন লৌকিক দেহবাদ ও ভারতীয় শক্তিতত্ত্বে। এভাবেই তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর তথাকথিত সুসভ্য পাশ্চাত্যের দৃষ্টান্তের সম্মুখে আনেন পুরাণসমৃদ্ধ ভারতবর্ষের মাতৃরূপ। শুধু আপস নয়, বিদ্রোহ আর সংগ্রামীচেতনার বিচ্ছুরণ তাতে বিশিষ্ট রূপলাভ করে। তিনি কবিতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগকে শক্তির চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে গণ্য করেন এবং সভ্যতার সব অপশক্তি দূর করার পৌরুষদীপ্ত উচ্চারণকে স্বীকৃতি দেন। রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাবরণের প্রাক্কালেও তাঁর কিংবদন্তিতুল্য সাহসিকতা তাঁকে জনমানসের সর্বকালের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। সাম্যবাদী কাব্যেও সমাজস্থ অসঙ্গতি ও ঔপনিবেশিক অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে উত্তর-ঔপনিবেশিক মনন পরিলক্ষিত। সাম্যবাদী কাব্যের কিছু কবিতা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে :

          ক.       গাহি সাম্যের গান—
                   যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,
                   যেখানে মিশেছে হিন্দু— বৌদ্ধ— মুসলিম— ক্রিশ্চান।
                                                          [কাজী নজরুল ইসলাম ‘সাম্যবাদী’, ২০১৫ : ৭৯]
          গ.       বিচারক! তব ধর্মদণ্ড ধরো,
                    ছোটদের সব চুরি করে আজ বড়রা হয়েছে বড়!
                   রাজার প্রাসাদ উঠিছে প্রজার জমাট রক্ত ইটে,
                   ডাকু ধনিকের কারখানা চলে নাশ করি কোটি ভিটে।
                                                 [ কাজী নজরুল ইসলাম ‘চোর-ডাকাত’, ২০১৫ : ৮৬]

          ঘ.       প্রজা হয় শুধু রাজ বিদ্রোহী’ কিন্তু কাহারে কহি,
                   অন্যায় করে কেন হয় নাকো রাজাও প্রজাদ্রোহী!
                   প্রজারা সৃজন করেছে রাজায়, রাজাতো সৃজেনি প্রজা,
                   কৃতজ্ঞ রাজা তাই প্রজায় ধরে করে দিল খোজা,
                   বন্ধু হাসিই ঢুটে;
                   আপনার ঘরে হয়ে আছি সব গোলাম নফর মুটে!
                                                          [ কাজী নজরুল ইসলাম ‘রাজা-প্রজা’, ২০১৫ : ৯২]

কবি তাঁর কবিতায় সাম্যের কথা বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেন। সর্বোপরি, দলিত মানুষের অস্তিত্বকে মহিমান্বিত করে তোলেন নন্দনবিশ্বে। তাঁর কবিতায় নিরন্তর উচ্চারিত উৎপীড়িত জাতির স্বাপ্নিক আবেগ এবং উপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ, যা মূলত উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ববিশ্বে গুরুত্বের সাথে বিবেচ্য।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মানুষ ও মানবতা। মূলত একজন ‘স্বাধীন মানুষ’ যেকোনো জাতিরাষ্ট্রে কেমন হবে,এ স্বপ্ন ও প্রত্যয়সঞ্জাত তেজস্বিতা তাঁর শিল্পে স্থান পেয়েছে। ঔপনিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হতে ক্রমদূরত্ব অবস্থান এবং স্বীয় জীবনাভিজ্ঞতার বৈরী পরিস্থিতি তাঁর কাব্যচেতনায় যুক্ত করে উত্তর ঔপনিবেশিক অভীপ্সা। তিনি উত্তর-ঔপনিবেশ চেতনার প্রশ্রয়ে নিজেকে চিনে নেন। এই আত্মআবিষ্কার এবং আত্মপ্রসারের সক্ষমতা বহুলাংশে উত্তর ঔপনিবেশিক তত্ত্বচিন্তার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। স্থানিক ও জাতীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারিত পরিচয়ও ভেঙে মানুষের বিশ্বব্যাপী যে স্বাধীন ও সার্বভৌম ‘অস্তিত্ব’—সেই স্বপ্নের প্রসঙ্গ তাঁর কবিতায় মূর্ত লাভ করে। তিনি প্রাক-ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির পুনর্নিমাণে পুরাণকে অবলম্বন করে কবিভাষা নির্মাণ করেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সকল ধর্মীয় ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ‘সহবস্থানের স্বপ্নকে’ সামনে আনেন। প্রতীচ্যের প্রাচ্য সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নের মুখে তাঁর এই আবেদন উত্তর-ঔপনিবেশিক, এমনকি একুশ শতকেও প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে।

গ্রন্থপঞ্জী :

কাজী নজরুল ইসলাম (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ ২০১২), নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ঢাকা
কাজী নজরুল ইসলাম (জন্মশতবর্ষ সংস্করণ ২০১৫), নজরুল রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ঢাকা      
প্রীতিকুমার মিত্র, বাংলাদেশের বুদ্ধিভিত্তিক ইতিহাস : ভাববিদ্রোহ ও বুদ্ধিসংস্কার, ঢাকা, সাহিত্য বিলাস, ২০১০
বেগম আকতার কামাল, ‘নজরুল : সিন্ধুর তিন তরঙ্গ’, কালি ও কলম, আবুল হাসনাত (সম্পা.), চতুর্দশ বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, আগস্ট, ২০১৭,
হাসান আজিজুল হক (সম্পা.), বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ, ঢাকা, সময় প্রকাশন, ২০১২
Fanon Frantz, The Wretched of the Earth, Translated by Richard Philcox, New York : Grove Press, 2004

 

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে বিবাদে নিহত ১
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে বিবাদে নিহত ১
নববধূ সেজে ইয়াবা কিনতে ঢাকা থেকে টেকনাফে
নববধূ সেজে ইয়াবা কিনতে ঢাকা থেকে টেকনাফে
ফেল নয়, বাছাই করে শিক্ষার্থী নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো: শিক্ষামন্ত্রী
ফেল নয়, বাছাই করে শিক্ষার্থী নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো: শিক্ষামন্ত্রী
পদ্মা সেতুর টোল প্লাজার পাশে দুর্ঘটনায় এমপির এপিএসসহ আহত ৩
পদ্মা সেতুর টোল প্লাজার পাশে দুর্ঘটনায় এমপির এপিএসসহ আহত ৩
এ বিভাগের সর্বশেষ
পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
মারুফা মিতার কবিতা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১মারুফা মিতার কবিতা
দিপন দেবনাথের কবিতা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১দিপন দেবনাথের কবিতা
খোঁপায় গমখেতের মায়া
খোঁপায় গমখেতের মায়া
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার
বুভুক্ষাই জন্ম দিয়েছে ইরোটিকার