শাস্ত্রীয় সংগীতকে ভালোবেসে চর্চা শুরু করি || অমরেশ রায় চৌধুরী

.
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১০:১০আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১০:৪৮

পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী শাস্ত্রীয় সংগীতকেই একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান করে সারাজীবন সাধনায় অতিবাহিত করেছেন পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী। এই একনিষ্ঠতা তাঁকে এনে দিয়েছে উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতি ও সম্মান। ভূষিত হয়েছেন 'সংগীত তীর্থ' উপাধীতে। এ বছর পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য গুণী এই মানুষটির সঙ্গে কথা বলেছেন, মাঈশা মারিয়াম সৈয়দ

বাংলা ট্রিবিউন : সংগীতের এতগুলো ধারা থাকতে উচ্চাঙ্গ সংগীতকে কেনো বেছে নিলেন?

অমরেশ রায় চৌধুরী : শুরুতে আমি বেশকিছু ধারার সংগীত শিখেছি, তখন যেগুলো প্রচলিত ছিল। ধ্রুপদ ও খেয়ালের পাশাপাশি কীর্তন, শ্যামাসংগীত, নজরুলগীতি, আধুনিক গানও শিখেছি। এর মধ্যে উচ্চাঙ্গ সংগীতটা আমাকে টানত বেশি। ধ্রুপদের প্রতি অন্যরকম একটা ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল। সেই থেকেই আমি শাস্ত্রীয় সংগীতকে ভালোবেসে এর চর্চা শুরু করি। মূলত ভালোবাসা থেকেই আমি উচ্চাঙ্গ সংগীতে আসি।

বাংলা ট্রিবিউন : এর শুরুটা কোথায়? কার অনুপ্রেরণায় আপনি গান শেখা শুরু করেন?

অমরেশ রায় চৌধুরী : আমার মা রাজলক্ষ্মী রায় চৌধুরী গান খুব ভালোবাসতেন। তাঁর ইচ্ছাতেই আমার কাকা গৌরগোপাল রায় চৌধুরী আমাকে নিয়ে যান ফরিদপুরের প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীতসাধক সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে। তাঁর কাছেই আমার সংগীতে হাতেখড়ি হয়, আমার বয়স তখন ৮-৯ বছর। সেই থেকে আমার সাধনা শুরু, আর থামাথামি নেই। আজ আমি যেখানে আছি, যা কিছু অর্জন করেছি, সবকিছুর মূলে রয়েছেন আমার মা।

বাংলা ট্রিবিউন : কার কার কাছে শিখেছেন? আপনার গুরুদের ব্যাপারে কিছু বলুন।

অমরেশ রায় চৌধুরী : আমার সংগীতে হাতেখড়ি হয় সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে, কিন্তু খুব বেশি দিন তাঁর সান্নিধ্য পাইনি আমি। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর আমি কয়েক বছর সিরাজগঞ্জের উচ্চাঙ্গ সংগীতবিদ হরিহর শুক্লার কাছে তালিম নিই। ইনি ছিলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লার বাবা। তারপর আমি  দীর্ঘ সময় উপমহাদেশের স্বনামধন্য শিল্পী ও সাধক সংগীতাচার্য্য তারাপদ চক্রবর্তীর কাছে ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুমরী শিখি। আমার গুরু বলতে তিনিই। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র মানস চক্রবর্তীর কাছেও উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখি। এছাড়াও ময়মনসিংহের নেত্রকোণা জেলার বিশিষ্ট শিল্পী ও সুরকার নিখিলচন্দ্র সেনের কাছে কয়েক বছর আধুনিক গান, অতুলপ্রসাদ, রাগপ্রধান, নজরুলগীতি ও শ্যামা সংগীতের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি।

বাংলা ট্রিবিউন : লেখাপড়ার পাশাপাশি সংগীত শিক্ষা চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হয়নি?

অমরেশ রায় চৌধুরী : হ্যাঁ, অনেক বাধাই এসেছে। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। অনেক পথ অতিক্রম করে বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে গান শিখতে যেতে হত। দূর-দূরান্তের বিভিন্ন সংগীত সম্মেলনে গান শুনতে যেতাম, বড় বড় ওস্তাদদের সান্নিধ্য পাবার আশায়। পথে ঝড়-বাদলে আটকে গেছি কতদিন। এমনও হয়েছে, ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে গানের ক্লাসে গিয়েছি। ঠাণ্ডা লেগেছে, জ্বর বাঁধিয়েছি, কিন্তু গানের ক্লাস ফাঁকি দিইনি। কোনো বাধাই সংগীতের প্রতি আমার ভালোবাসা কমাতে পারেনি।

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার ছেলেবেলা, বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবন নিয়ে কিছু বলুন।

অমরেশ রায় চৌধুরী : আমার জন্ম ফরিদপুরের বাইশরশি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে, ১৯২৮ সালে। সেই ফরিদপুরেই কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর। ওখানে আমার পিতামহীর নামে আমাদেরই প্রতিষ্ঠিত স্কুল বাইশরশি শিবসুন্দরী একাডেমি থেকে ১৯৪৫ সালে আমি ম্যাট্রিক পাশ করি। তারপর আমি চলে যাই কলকাতার বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ স্কটিশ চার্চ কলেজে, ওখান থেকেই গ্র্যাজুয়েশন করি।

বাংলা ট্রিবিউন : ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন?

অমরেশ রায় চৌধুরী : খুব একটা সিরিয়াস ছিলাম না। (হেসে ফেলে) ঝোঁকটা গানের দিকেই থাকত বেশি। তবে মোটামুটি রেজাল্ট করতাম।

বাংলা ট্রিবিউন : সংগীত চর্চার পাশাপাশি আর কী করেছেন, জীবিকা নির্বাহের জন্য?

অমরেশ রায় চৌধুরী : পৈত্রিক জমদারী ছিল, ব্যাবসাপত্র ছিল। সেসবের দেখাশোনা করেছি। এ ছাড়া গান শিখিয়েছি, তবে সেটা মূলত শেখানোর জন্যই। আসলে গানবাজনাতেই ডুবে থেকেছি, বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে খুব একটা ভাবিনি।

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার ব্যক্তিজীবন নিয়ে কিছু বলুন। পরিবারে আর কে কে আছেন? তাদের সমর্থন পান?

অমরেশ রায় চৌধুরী : পরিবারে আমি বাদে আছেন আমার স্ত্রী সোনালী রায় চৌধুরী, দুই পুত্র অমিত ও অভিজিৎ, এবং তাদের স্ত্রী-সন্তান। ওরা প্রত্যেকে আমার সংগীতজীবনে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমি সারাদিন গান নিয়ে থেকেছি, আমার স্ত্রী একা হাতে সংসার সামলেছেন, ছেলেদের মানুষ করেছেন। ওরাও বড় হয়ে ব্যাবসাপত্রে আমাকে সহযোগিতা করেছে। ওদের কারণেই আমি নির্বিঘ্নে সংগীত চর্চা করতে পেরেছি। সত্যি বলতে কী, ওদের সমর্থন ছাড়া আজ আমি এতদূর  আসতে পারতাম না।

বাংলা ট্রিবিউন : আপনি তো অনেক জায়গায় সংগীত শিখেছেন, সংগীত পরিবেশনও করেছেন। এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলুন যা আপনার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।

অমরেশ রায় চৌধুরী : এমন অসংখ্য ঘটনা আছে। আমার জীবনটা বাস্তবিকই ঘটনাবহুল। তবে আমার কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে  আছে দু'টি ঘটনা। একটি হল, আমার গুরু সংগীতাচার্য্য তারাপদ চক্রবর্তীর গানের আসরে একবার আমি সংগীত পরিবেশন করার সুযোগ পাই। তখন আমি ছাত্র। এটা ছিল আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। আরেকবার ১৯৮৪ সালে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদ ও ধামার কলাকারদ্বয় 'ডাগর ব্রাদার্স' (উস্তাদ নাসির জহিরুদ্দিন ডাগর ও উস্তাদ নাসির ফয়েজুদ্দিন ডাগর)-এর সামনে সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পাই ও তাদের আশীর্বাদ লাভ করি। আজীবন মনে রাখার মতো একটা অভিজ্ঞতা ছিল সেটা।

বাংলা ট্রিবিউন : একুশে পদক পাওয়ার পর কেমন অনুভব করছিলেন?

অমরেশ রায় চৌধুরী : আমি কখনোই কোনো পদক বা সম্মাননা পাওয়ার জন্য কিছু করিনি, তবু আমার সংগীতজীবনে অনেক জায়গা থেকে অনেকবার সম্মানিত হয়েছি। তার মধ্যে আমি বলব সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল একুশে পদক। গতবছর ২০ শে ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্পকলায় অবদানের জন্য আমাকে একুশে পদকে ভূষিত করেন। একুশে পদক পাওয়ার পরে আমার মনে হয়েছে আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু বাকি নেই। আমাকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে, এখন এর মান রাখতে আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শুদ্ধ সংগীতের প্রচার ও প্রসারে কাজ করে যাব। সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, আমৃত্যু এভাবেই যেন মানুষের ভালোবাসা পেয়ে যাই।

সংগীত সাধনায় মগ্ন পণ্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউন : বাংলাদেশের বর্তমান সংগীত পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলুন।
অমরেশ রায় চৌধুরী : আমার অভিজ্ঞতা বলে, উচ্চাঙ্গ সংগীতটা আগে একটু অবহেলিত ছিল। কেউ আগ্রহ পেত না শিখতে। কিন্তু এখন দেখছি নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখছে, এর চর্চা করছে। হুজুগে নয়, ভালোবেসেই করছে। শুধু তাই নয়, তাদের হাতে উচ্চাঙ্গ সংগীত নতুন জীবন লাভ করেছে। সংগীতের মানও আগের থেকে উন্নত হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউন : আপনার বয়স এখন ৮৮ বছর। এত বয়সেও সংগীতচর্চা করতে, নিয়মিত রেওয়াজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না?
অমরেশ রায় চৌধুরী : আমার জীবনের একমাত্র সম্পদ এবং সম্বল সংগীত। আমার মূলমন্ত্র হল, সংগীতে শক্তি, সংগীতে ভক্তি, সংগীতে মুক্তি। সারাজীবন সংগীতই আমাকে শক্তি জুগিয়েছে, সংগীতই আমার ভক্তি, সংগীতেই আমার মুক্তি। এত বয়সেও ভালো থাকার একমাত্র ওষুধ হল সংগীত। তাই আমার কোনো অসুবিধা হয় না।

বাংলা ট্রিবিউন : নতুন প্রজন্মের জন্য কোনো উপদেশ আছে?

অমরেশ রায় চৌধুরী : একটাই উপদেশ দেবো। যারা গান ভালোবাসে বা শিখছে, তারা যেন উচ্চাঙ্গ সংগীতটা শেখে এবং চর্চা করে। তাদের যে ধারার গান ভালো লাগে করুক, কিন্তু গানের ভিত্তিটা আগে তৈরি করে নিতে হবে। আর ভিত্তি হল শাস্ত্রীয় সংগীত। উচ্চাঙ্গ সংগীতকে শাস্ত্রীয় সংগীত বলা হয় কারণ এটাই হল সংগীতের শাস্ত্র। শাস্ত্রীয় সংগীত শিখলে শুদ্ধ-কোমল সব স্বরের সাথে একটা আত্মীয়তা তৈরি হয়, যা যেকোনো ধারার গান শেখার জন্য জরুরী। শিখে যে একেবারে ওস্তাদ হতে হবে এমন নয়, কিন্তু চর্চাটা থাকুক। তাছাড়া গান বোঝার জন্য, সংগীতের প্রকৃত রস আস্বাদন করার জন্যেও তো উচ্চাঙ্গ সংগীতের জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
সীমান্তে কঠোর বিজিবি, ১০ পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
যুবদলের ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম