X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

করোনাকালে কেমন কাটছে তার জীবন

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১২:০৯

[২০২০-এর শেষে পুরো পৃথিবী যখন কোভিড-১৯ আতংকে ভুগছে, তখন প্যারিস থেকে প্রকাশিত ফ্রান্সের জাতীয় দৈনিক ‘লিবারেশন’ সাক্ষাৎকার নেয় জাপানি কথাশিল্পী হারুকি মুরাকামির। নিভৃতচারী লেখক বহুদিন পর মুখ খোলেন সেদিন। বৈশ্বিক মহামারি, সোশ্যাল মিডিয়া, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে খোলামেলাভাবে তার মতামত দেন। সেই সাক্ষাৎকার জাপানে আলোচনার ঝড় তোলে।]


প্রশ্ন : আপনাকে দেখা বা আপনার কথা শোনার সৌভাগ্য আমাদের খুব কম হয়। কিছুদিন আগে আপনার একটা ছোটগল্পের বই বেরিয়েছে। কিন্তু সে বই লেখা হয়েছে ২০২০-এর আগে। আপনি এখন কেমন আছেন? ২০২০ সালটা কেমন কেটেছে? 
মুরাকামি : আমি ঠিক আছি। আমার সবকিছুও ঠিক আছে। ২০২০ সাল নিয়ে যদি আমাকে এককথায় কিছু বলতে বলা হয়, তাহলে বলব যে এটা হলো করোনার বছর। আমি একজন ঔপন্যাসিক। বাড়িতে বসে একা কাজ করি। তাই আমার জীবনে এই বছরটা খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারিনি। কিন্তু আমার চারপাশটা বদলে গেছে। সেই হাওয়া আমি টের পাই। 
এতে করে আমার লেখালেখির কাজটা যে কঠিন হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। আগের মতোই আছে। পুরোটা সময় আমি বাড়িতেই ছিলাম। মন দিয়ে লিখেছি। আমি জানি, যারা নির্জনতা পছন্দ করে না তাদেরকে জোরজবরদস্তি করে একা থাকতে বাধ্য করা হলে বিষয়টা তাদের জন্য খুব ভয়ংকর। কিন্তু আমার জন্য এটা যন্ত্রণার কিছু ছিল না।

প্রশ্ন : এই প্যানডেমিক একেবারেই অপ্রত্যাশিত। পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আর অব্যাহত নেই। নষ্ট হয়ে গেছে। এই সময়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মুরাকামি : আমার মনে হয়, এই প্যানডেমিক হুট করে আকাশ থেকে নেমে আসেনি। বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের চারপাশের সবকিছু একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল। এখন পৃথিবীতে ইন্টারনেটের বিপ্লব ঘটেছে, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সবকিছু দখল করে ফেলেছে,  বিশ্বায়ন এবং পপুলিজম আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এই বদলে যাবার ধারাতে সর্বশেষ সংস্করণ হলো এই প্যানডেমিক। এখন আমরা যে জীবন কাটাচ্ছি, এটাকে আলাদা ঘটমান বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা না করাই ভালো। 

প্রশ্ন : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে এই প্যানডেমিক বিশ্বের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত?
মুরাকামি : হ্যাঁ। তাই আমি বলব, করোনাভাইরাসকে আলাদাভাবে মোকাবিলা না করে আমাদের ভাবা উচিত চারপাশের সব পরিবর্তনকে আমরা কীভাবে ডিল করছি। জাপানে সরকার এবং রাজনীতিবিদরা তাদের মতো করে সমস্যাটা মোকাবিলা করতে চেয়েছেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। অবশ্য এখন যে পরিস্থিতি তাতে ভুল করাটাই স্বাভাবিক। তারা যদি ভুলটুকু বুঝতে পারেন, দেশের মানুষ তাদের ক্ষমা করে দেবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাজ করার একটা নিজস্ব পদ্ধতি আছে। তার কাজকর্ম বোঝা খুব সহজ। কোনো প্যাঁচগোছ নেই। আমেরিকায় কিছু লোক আছে ট্রাম্প যা করেন তার সাথে একমত হন এবং তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেন। আর কিছু লোক আছেন, যারা মন থেকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বর্জন করেন। তারা এ কাজটা করতে পারেন কারণ ট্রাম্পের কর্মপদ্ধতি বোঝা যায়। 
জাপানে বিষয়টা সেরকম নয়। এখানে কোনো ব্যক্তি এককভাবে সিদ্ধান্ত দেয় না। এটা বরং একটা নেতৃত্বস্থানীয় দলের বিষয় যেখানে অনেকে মিলে সম্মিলতভাবে ভবিষ্যতের উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা ঠিক করে। ফলে জাপানের মানুষের জন্য সিস্টেমটা বোঝা মুশকিল। আমার মনে হয় বিজ্ঞানী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসা উচিত। রাজনীতিবিদদের দৃঢ় ধারণাগুলোকে ভেঙে দিয়ে তারা বুঝিয়ে বলুক, কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত আর কোনটা অনুচিত।

প্রশ্ন : এই প্যানডেমিক মোকাবিলায় বিজ্ঞানের কী ভূমিকা আছে আপনার মনে হয়?
মুরাকামি : বিজ্ঞান সম্বন্ধে যে আমি বিশেষ কিছু জানি, তা নয়। কিন্তু আমি আশা করি, বিজ্ঞান ও সাহিত্য হাত ধরে হাঁটবে। বর্তমানে আমরা একভাবে বেঁচে আছি। কিন্তু এই বেঁচে থাকার প্রক্রিয়াটা চিরন্তন নয়। এটা ক্ষণস্থায়ী, এবং আমরা জানিও না কখন এটা বদলে যাবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোভিড-১৯ এসে আগে যেভাবে বেঁচে ছিলাম, সেই সিস্টেমটা একদম ভেঙে গেছে। কোনো সিস্টেম যখন পুরোপুরি ভেঙে যায়, এবং নতুন সিস্টেম তৈরির প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তখন বিজ্ঞান বা সাহিত্য এককভাবে কিছু করতে পারে না।  

প্রশ্ন : সমাজের কোনো জিনিসটি বর্তমানে আপনাকে ভাবায়?
মুরাকামি : কেবল জাপানে নয়, পুরো পৃথিবীতেই এখন একটা ব্যাপার ঘটেছে। তা হলো, সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে এমন একটা ভাষা তৈরি হয়েছে, যে ভাষাটা আমার না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগের জন্য যে ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলো এই জালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই নতুন শব্দভাণ্ডার নিয়ে দুশ্চিন্তা হয় আমার। এই ভাষায় আমি আমার গল্প লিখি না। এই ব্যাপারটাকে পাশ কাটানোর ভানও আমি করি না। বরং ওভাবে ছাড়াও যে আরও শক্তিশালী উপায়ে ব্যতিক্রমি কিছু লেখা যায়, সেটা দেখিয়ে দেবার তাগিদ আমি অনুভব করি। 

প্রশ্ন : আপনার লেখার ভাষা নিয়ে বলুন। অনেকে বলে, আপনার লেখা দিন দিন খারাপ হচ্ছে... যদিও এ নিয়ে বিতর্কটা এখন কমে আসছে।
মুরাকামি : হ্যাঁ, বিতর্ক কমছে। এখন আর এ নিয়ে আমরা তর্ক করতে বসি না। কাউকে যখন সমালোচনা করা হয়, তখন সে সমালোচনার জবাব আরেকটা সমালোচনার মাধ্যমে দেয়। এই প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এমনকি আমাদের জাপানের প্রাইম মিনিস্টারও এমনটা করে থাকেন। আমি এর ঠিক বিপরীতটাই করতে চাই। সবকিছুতে প্রতিক্রিয়া দেখানো যায় না। করোনাকালীন বা করোনামুক্ত দুই ধরনের পৃথিবীর ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা প্রযোজ্য। 

প্রশ্ন : মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মুরাকামি : আপনি যেটা বলতে চান, সেটা কোনো বাধা ছাড়াই বলবেন এটা হলো প্রথম কথা। আপনি যদি ভুল কথা বলেন, সমাজ আপনার সে ভুলটা মেনে নেবে এবং ক্ষমা করে দেবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আমি এভাবেই দেখি। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে যেকোনো কথা ইন্টারনেটে আগুনের মতো ছড়িয়ে যায়। সেকারণে অনেক মানুষই এমন এক জীবন বেছে নিয়েছে যেখানে তারা অতিমাত্রায় সচেতন হয়ে নিজেদের সেন্সর করে। হিসাব নিকেশ করে কথা বলে। তবে আমার ক্ষেত্রে এরকম হয় না। আমি মন খুলে কথা বলি। কেয়ার করি না কিছু। কারণ আমি কোনোপ্রকার সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই। আগুন লাগলে সে আগুন আমাকে ছুঁতে পারবে না, বুঝতেই পারব না কিছু। শান্তি।

প্রশ্ন : করোনার দিনগুলোতে বই কি গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষত উপন্যাস?
মুরাকামি : কেবল বই নয়, যেকোনো শিল্পই এ সময়ে প্রয়োজনীয়। তবে আপনার হাতে যদি বই পড়ার সময় থাকে তো খুব ভালো। গল্পের ভেতরে ঢুকে যাবেন। ভালো ভালো গল্প পড়বেন—গভীর জীবনবোধ যেখানে থাকে। নিউজে আমরা সারাক্ষণ কেবল করোনা নিয়ে কথা বলি। আমার ধারণা, এই ব্যাপারটা নিয়ে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তারা অন্য একটা পৃথিবী চায় যে পৃথিবীটা গভীর। তাই শিল্প অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে।

প্রশ্ন : বইয়ের দোকানগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, আপনি কি এর প্রতিবাদ করবেন?
মুরাকামি : হ্যাঁ। আপনার মধ্যে বই পড়ার ক্ষুধা টের পেলেন, সেই ক্ষুধা তাৎক্ষণিকভাবে মিটিয়ে ফেলা জীবন রক্ষাকারী জিনিসগুলোর মতোই প্রয়োজনীয়। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যে পৃথিবীতে যখন যেটা চাই, তাৎক্ষণিকভাবে সেটা পাওয়ার উপায় আছে। সে উপায় খুঁজে না পেলে আমরা জিনিসটার প্রয়োজনীয়তা আবার নতুন করে অনুভব করি। বইয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেরকম।

প্রশ্ন : কোভিড-১৯ কি আপনার ভবিষ্যতের লেখায় কোনো প্রভাব ফেলবে? 
মুরাকামি : লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলতে পারব না। ধরুন, আমি একটা উপন্যাস লিখতে বসলাম এবং শেষ হবার সেটা পড়লাম। আমি তখন গিয়ে বুঝতে পারব করোনার দিনগুলো সেই লেখায় প্রভাব ফেলেছে কি না। এই প্রভাব দুভাবে পড়তে পারে।  সরাসরি গল্পের ঘটনা বা ম্যাটেরিয়ালে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার এটা সিম্বল বা মেটাফর আকারেও আসতে পারে। 
আমার ক্ষেত্রে সম্ভবত কোভিডের ব্যাপারটা সরাসরি আসবে না। অন্যভাবে মেটাফর আকারে আসতে পারে। আমার লেখার ক্ষেত্রে এটা খুব সহজাত প্রত্রিয়া। এমন না যে আমি মেটাফরগুলো জোর করে আনি। এগুলো নিজে থেকেই চলে আসে। এবং এতে সময় লাগে। যে অনুভূতিগুলো আমি ধারণ করি, সেগুলো চেতনার গভীরে বাসা বাঁধে এবং সেখানে ডুবে যায়। তারপর প্রয়োজনমতো সেখান থেকে বেরিয়ে আসে এবং মেটাফরের রূপ নেয়। আমার ধারণা, কেবল ঔপন্যাসিকরাই এই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন : দেশের বাইরে যাবেন না?
মুরাকামি : এ বছর তো সম্ভব না।

প্রশ্ন : আপনি এই দ্বীপরাষ্ট্রের বাইরে দীর্ঘদিন বাস করেছেন। কিন্তু তারপরও আপনার অধিকাংশ লেখার পটভূমি জাপান...
মুরাকামি : হ্যাঁ। এর কারণ আমি ঠিক বোঝাতে পারব না। আমি বাইরের দেশের মানুষদের নিয়েও লিখতে পারতাম। সত্যি বলতে কি, জাপানের বাইরে গিয়েই বুঝতে পেরেছি, আমি আসলে একজন জাপানিজ লেখক। কখনো এমন হয়েছে যে জাপানে থাকতে আমার খারাপ লেগেছে, বিরক্তও হয়েছি। তখন বিদেশ চলে গেছি। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পরে যখন লিখতে বসেছি তখন বুঝেছি যে আমি আসলে এক জাপানি ঔপন্যাসিক। জাপানে মানুষ কীভাবে বাস করছে সেটা আমার কাছে জরুরি হয়ে উঠেছে। ঘুরেফিরে তাই আমার উপন্যাসগুলোর পটভূমি জাপান।

প্রশ্ন : সংগীত?
মুরাকামি : খুবই জরুরি বিষয়। বিশ্বজনীন একটা ভাষা। সবাই এ ভাষা বোঝে। এবং এটা এরকমই থাকবে।

/জেড-এস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এবার হারমনি আর মন্দিরা নিয়ে হাজির... (ভিডিও)
এবার হারমনি আর মন্দিরা নিয়ে হাজির... (ভিডিও)
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজ
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজ
বাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী
জয়নুল আবেদিনবাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী
ভেড়ার মাংসে পাওয়া গেছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট: গবেষণা
ভেড়ার মাংসে পাওয়া গেছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট: গবেষণা
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
ইন্টারন্যাশনাল বুকার পেলেন গীতাঞ্জলি
ইন্টারন্যাশনাল বুকার পেলেন গীতাঞ্জলি
বাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী
জয়নুল আবেদিনবাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী