আমি শুধু ভালো একটা গল্পই লিখতে চেয়েছি : সাজিদ উল হক আবির

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : হেমায়েত উল্লাহ ইমন  
১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫২আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৯

সাজিদ উল হক আবির একজন কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। জন্ম ১৯৯০ সালে, পুরোনো ঢাকার ফরিদাবাদে। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ: শেষ বসন্তের গল্প (২০১৪), আয়াজ আলীর ডানা (২০১৬), কোমা ও অন্যান্য গল্প (২০১৮), কাঁচের দেয়াল (২০১৯) ও নির্বাচিত দেবদূত (২০২৪)। উপন্যাস: শহরনামা (২০২২), সরীসৃপতন্ত্র (২০২৬)। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: হেমন্তের মর্সিয়া (২০১৮)। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ: মিসিং পারসন: প্যাট্রিক মোদিয়ানো (২০১৫, দ্বিতীয় প্রকাশ ২০২১) ও মুরাকামির শেহেরজাদ ও অন্যান্য গল্প (২০২৩)। শিক্ষকতা করছেন ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।

‘নির্বাচিত দেবদূত’ গল্পগ্রন্থের জন্য কথাসাহিত্যে ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০২৪’ পেয়েছেন। ‘মফিজের রিলেশনে স্পার্ক নাই’ গল্পের জন্য 'কমনওয়েলথ ছোটোগল্প পুরস্কার ২০২৬'-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হেমায়েত উল্লাহ ইমন।

হেমায়েত উল্লাহ ইমন: আপনার লেখালেখির শুরুটা কীভাবে?

সাজিদ উল হক আবির: জীবনকে মায়া নিয়ে দেখবার মতো একজোড়া চোখ এবং অনুভব করবার মতো একটি সংবেদনশীল অন্তরের অধিকারী আমি কবে, কীভাবে হলাম, আমার সঠিক জানা নেই। মনে আছে, আমার বাবা, বিনোদন সাংবাদিকতা করে যিনি নিজের পুরো জীবন কাটিয়েছেন, ঢাকা থিয়েটারের সক্রিয় কর্মী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন, তিনি সবসময় শিল্প ও শিল্পী নিয়ে কথা বলতেন। বাসায় সবসময় ক্যাসেটে গান বাজত, সতীনাথ—মানবেন্দ্র—মোহাম্মদ রফি—সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়—পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর। এবং পড়ার জন্য দেদারসে বই। ছোটোবেলা থেকেই দেখতাম বাবা তার সীমিত বেতন থেকে কিছু টাকা আলাদা করে আমার পড়ার জন্য বয়সানুগ দু’একটা বই আমার টেবিলে এনে রাখতেন। তার প্রভাব আমার জীবনে অনস্বীকার্য।

তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ২০০১ সালের সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাস থেকে দেশে তার কার্যক্রম শুরু করে। আমি প্রথম দিন থেকেই তার সদস্য ছিলাম। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সদস্য সংখ্যা এখন হয়তো লাখ ছাড়িয়ে গেছে। মনে পড়ে, আমার সদস্য নম্বর ছিল ৪১। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে ধার করে বই পড়া আমার জন্য কল্পনার নতুন একটা জগৎ খুলে দেয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পুরোনো ঢাকার আইজিগেট ফরিদাবাদ এলাকায়, বুড়িগঙ্গা নদীর একদম তীর ঘেঁষে নিজের শৈশব কৈশোর কাটানোর স্মৃতি (আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখাপত্রে এসমস্ত এলাকার নাম প্রায়ই আসে)। পুরোনো ঢাকা নিজেই একটা গল্পের খনি। একটা আলাদা জাদুর জগৎ। তার প্রতিটি সরু গলির মাঝে অসংখ্য গল্প আছে, ‘৪৭ এর, ‘৬৫ এর, ‘৭১ এর। এখনও বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে অনেক বাড়ি পাবেন, যেগুলো ব্রিটিশ আমলে, নিদেনপক্ষে পাকিস্তান আমলে বানানো। সময় এখনো ঐ জায়গায় স্থির হয়ে আছে।

আমার কৈশোরের অন্যতম আনন্দের স্মৃতি, বিকেলবেলা একটা বই বগলের নীচে চেপে ধরে মিলব্যারাক পুলিশ ফাঁড়ির পাশে যে জাহাজঘাট, তাতে গিয়ে হাজির হওয়া, এবং জেটিতে পা দুলিয়ে বসে বই পড়া। পড়তে পড়তে খুব গভীর দার্শনিক একটা প্যারার সম্মুখীন হলে কিছুক্ষণ বইটা বন্ধ করে রেখে বুড়িগঙ্গা নদীর ঢেউ, ওপরে আকাশ, আকাশে মেঘের আড়ালে ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম কিছুক্ষণ। ভাবতাম। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মেলাতাম। এভাবেই সম্ভবত আমার পৃথিবী দেখার চোখ এবং একটি সংবেদনশীল অন্তরের সৃষ্টি।

পঞ্চম ও সপ্তম শ্রেণিতে জাতীয় দৈনিকে লেখকের পদচারণা।

আর লেখক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষিক দক্ষতা সৃষ্টির পেছনে মূল ভূমিকা, বা কৃতিত্ব— সেও আমার আব্বুর। তিনি পাক্ষিক ‘আনন্দধারা’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন সমাপ্ত করেন। কলেজ লাইফে, যখন আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র, তখন থেকেই তিনি তার পত্রিকার জন্য কেনা হলিউড বলিউডের বিভিন্ন এন্টারটেইনমেন্ট ম্যাগাজিন এনে আমাকে দিতেন, এবং এক রাতের মাঝে তারকাদের বিশাল বিশাল সাক্ষাৎকার ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিতে বলতেন। যেটা পরে পত্রিকায় ছাপা হতো। এই অনুবাদের কাজ করেই আমি পকেটমানি উপার্জন করেছি আমার পুরো ছাত্রজীবন।

২০১২ সালে, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, তখন একটি দৈনিক পত্রিকা সহকারী সম্পাদক পদে সিভি চাইল। সিভির সঙ্গে একটি প্রবন্ধ জমা দিতে বলল। বিষয়—আমার প্রিয় শিক্ষক। এই প্রিয় শিক্ষক নিয়ে হাজার খানেক শব্দে একটি প্রবন্ধ লেখা শুরু করতে গিয়েই দেখা গেল, লেখাটি ফরমাল লেখার স্ট্রাকচার অতিক্রম করে একটা কাল্পনিক আঙ্গিক গ্রহণ করা শুরু করেছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে লেখাটি একটি গল্পে পরিণত হলো। ঐ আমার প্রথম গল্প, যার নাম ছিল ‘রমিজুদ্দিন মৌলভি ও কয়েকটি কুকুর’।

২০১৩ সাল থেকে আমি সামহয়ারইনব্লগে ব্লগিং করা শুরু করি। তখন ব্লগে অনেক গুণী লেখক-পাঠকের সমাহার ছিল। ব্লগেই কয়েকটা গল্প লেখা হয়ে গেলে গুছিয়ে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার প্রথম বই শেষ বসন্তের গল্প  প্রকাশ করি। বইটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার। তিনি সেই মুখবন্ধে এত ভালো ভালো কথা লিখেছিলেন আমার লেখার ব্যাপারে, আমার মনে হয়, আমার পরবর্তীতে লেখালেখিতে নিয়মিত হবার পেছনে স্যারের সেই মুখবন্ধেরও ভূমিকা আছে। আমার মনে হয়েছে, যদি লেখা বন্ধ করি, স্যার যে আশা প্রকাশ করেছিলেন আমার প্রতি, তা ভুল প্রমাণিত হবে। আমি সেটা চাইনি।   

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মুখবন্ধ।

২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল, এই বারো বছরে ১১টি বই প্রকাশ পেয়েছে আমার। এখনো লিখছি। আজও লিখেছি। স্রষ্টা আয়ু যতদিন দিয়েছেন, লিখে যাবার ইচ্ছে রাখি। 

প্রশ্ন: আপনি অনেকদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে লিখে যাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কোন জায়গাটায় 'স্পার্ক' করছে বলে মনে করেন?

উত্তর: অনেক সাড়া পাচ্ছি। পত্রপত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলে নিজের লেখা নিয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি। এটা অকল্পনীয় এক ব্যাপার আমার জন্য। লিখে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ, বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। সেই অসম্ভবটাই সম্ভব হয়েছে, ভালো লাগছে। আশা করি, আমার লেখা নিয়ে দেশে-বিদেশে এরকম আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম হব ভবিষ্যতেও।      

প্রশ্ন: ‘মফিজের রিলেশনে স্পার্ক নাই’ গল্পটির লেখার পেছনের গল্পটি কী?

উত্তর: বিশেষ কোনো  গল্প নাই। এটা কমনওয়েলথ কম্পিটিশানে আমার দ্বিতীয় সাবমিশন। ২০২৪ সালেও গল্প পাঠিয়েছিলাম। ফল পাইনি। কিন্তু ঐ বছর গল্প পাঠানোর পর থেকেই পরের বছরের গল্প (অর্থাৎ যেটা এবার শর্টলিস্টেড হলো) নিয়ে কাজ করা শুরু করেছিলাম। তখন ঐ গল্প লেখার প্যারালালি আমার বেশ কয়েকটি লেখার প্রজেক্ট চলমান ছিল। ব্যস্ততা ছিল আমার নতুন উপন্যাস সরীসৃপতন্ত্র-এর ভাষা সম্পাদনায় (ঐতিহ্য, ২০২৬), ঢাকা থিয়েটারে আমার ব্যাচের জন্য নাটক লেখায় (২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে শহিদ মিনারে মঞ্চস্থ হয়), এবং মিলান কুন্ডেরার উপন্যাস দা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং-এর বঙ্গানুবাদে (সদ্য সমাপ্ত)। একটা পেপারের কাজও করছিলাম তখন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির জার্নাল পানিনির জন্য, ওরহান পামুকের স্মৃতিকথা ইস্তাম্বুল-এ প্রো আতাতুর্ক তুর্কি এলিটদের সেলফ ওরিয়েন্টালিজমের ওপর। যেটা পরে গৃহীত হয়েছে সে জার্নালে প্রকাশের জন্য। প্রতিটি লেখাই সমাপ্ত হয়েছে। আলোচনায় এসেছে কেবল আমার গল্পটি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয়ী হবার জন্য।   

প্রশ্ন: গল্পটির বিষয়বস্তু ও কেন্দ্রীয় ভাবনা কী?

উত্তর: এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমি গল্পের প্লট কীভাবে পাই, সে ব্যাপারে আমার সংক্ষেপে কিছু কথা বলা লাগবে। আমি গল্পের প্লট পাই দু’ভাবে। কখনো চিত্র আকারে, কখনো আইডিয়া আকারে। হয়তো একটা ঘটনা ঘটলো আমার চোখের সামনে, যেটা আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে গেল—এটাকে আমি আমার গল্পে রূপান্তর করি। (যেমন: আমার কালি ও কলম পুরস্কার প্রাপ্ত বইয়ের ‘নির্বাচিত দেবদূত’ গল্পটির মূল চরিত্র, যে এক ৭-৮ বছরের এতিম মাদ্রাসা ছাত্র, আমি এই ছেলেটাকে দেখেছিলাম সামনাসামনি। এক জুমার নামাজে আগে হাজির হওয়ায় দেখেছিলাম, এই ছেলেটার ট্রাংক, যা মাদ্রাসায় তার একমাত্র সম্বল, তা ওর চে বয়সে বড় কিছু ছেলে মিলে লোফালুফি করছিল মসজিদের দ্বিতীয় তলায়, আর ছেলেটা কাঁদছিল অসহায়ের মতো একপাশে দাঁড়িয়ে।)।

আবার কিছু গল্প আসে আইডিয়া আকারে। যেমন, ‘মফিজের রিলেশনে স্পার্ক নাই’। এই যে মানুষ কথায় কথায় বলে, রিলেশনে স্পার্ক নাই—এই স্পার্ক না থাকা ব্যাপারটাকে আমি সায়েন্টিফিক স্যাটায়ারে রূপান্তর করার চেষ্টা করি। ইলেকট্রনের ওভারফ্লো হলে স্পার্ক হয়। গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর মফিজ (যে শব্দটি বাংলা ভাষায় একই সঙ্গে প্রোপার নাউন, এবং একটা এডজেক্টিভ) এর বৌয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। মহল্লার এনজিও প্রধানের সঙ্গে সে সমস্যা শেয়ার করলে সে মফিজকে বোঝায় যে, মফিজের ওর বৌয়ের সঙ্গে সম্পর্কে স্পার্ক নাই। তখন নিরক্ষর মফিজ গিয়ে হাজির হয় মহল্লার ইলেকট্রিশিয়ানের কাছে, যে ফিজিক্সের ছাত্র ছিল, এবং আগে ফিজিক্স টিউশন পড়াতো। সে বোর্ডের ওপর চক দিয়ে পরমাণুর স্ট্রাকচার এঁকে ইলেকট্রন প্রোটনের গতিপ্রকৃতি বোঝায়। মফিজ বুঝতে পারে যে সে পর্যাপ্ত আধান বিহীন এক ইলেকট্রন। তাকে ইলেকট্রনের বেগে দৌড়ে প্রয়োজনীয় আধান অর্জন করতে হবে, যাতে করে তার বৌয়ের সঙ্গে তার আধানের ঘাটতি পূরণ হয়।

বয়স মধ্য ত্রিশে হওয়ায় জীবনে নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক দেখেছি। তার কিছু ছাপ নিশ্চিতভাবেই আমার এ গল্পে পড়েছে। কিন্তু গল্পের যে সেটিং: সুন্দরবনের পাশে কাল্পনিক কেন্দুয়া গ্রাম, গ্রামের পাশে কাল্পনিক করাতিয়া নদী—যা আবার বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলে, এবং গ্রাম ঘেঁষে পারমাণবিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র—এগুলো আমার কল্পনা।   

 কমনওয়েলথ ছোটোগল্প পুরস্কার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা

প্রশ্ন: সমসাময়িক স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আপনার লেখাকে প্রভাবিত করে?

উত্তর: করে, আবার করে না। যাতে প্রভাবিত হই, তারও মাত্রায় তারতম্য আছে। পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া, এবং প্রোপাগান্ডা তৈরি করা কোনো লেখকের কাজ না। সাফাভিদ, অটোম্যান, এবং মুঘল মিনিয়েচার আর্টিস্টরা নিজেদের আর্টফর্মকে বলতেন ‘গডস পার্সপেক্টিভ’ (ওপর থেকে প্যানারমিক ভিউতে আঁকা হতো বলে)। আর ইউরোপে চর্চিত রিয়েলিস্টিক আর্টফর্মকে তারা বলতেন ‘ডগস পার্সপেক্টিভ’ (কুকুরের দৃষ্টিসীমার পার্সপেক্টিভে আঁকা হতো বলে)। লেখকের পার্সপেক্টিভ হওয়া উচিত, গডস পার্সপেক্টিভ, চাই সে নিউইয়র্কে বসে লিখুন, কী টোকিওতে, কী পুরোনো ঢাকায়।                        

প্রশ্ন: বাংলা ভাষায় লেখা একটি গল্পকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অর্থাৎ 'লোকাল' থেকে 'গ্লোবাল' করে তুলতে গিয়ে আপনার প্রধান ফোকাস ও চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?

উত্তর: সত্যি বলতে আমি স্রেফ ভালো একটা গল্পই লিখতে চেয়েছি। তবে এ বিষয়টা মাথায় ছিল যে, কমনওয়েলথ আসলে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের না শোনা গল্পগুলো তুলে আনতে চায়। এর বাইরে আমার আলাদা কোনো ফোকাস ছিল না।  

প্রশ্ন: আপনি নিজেও অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিযোগিতায় অনুবাদের অংশটুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়। আপনার নিজের গল্পের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কেমন?

উত্তর: অনুবাদের পুরো প্রক্রিয়ায় আমি কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। এ কথা আমি বারবার বলি, এবং মিন করে বলি। তারা অত্যন্ত সেনসিটিভিটির সঙ্গে আমার গল্পের অনুবাদ প্রক্রিয়াটা ডিল করেছেন। আমার সঙ্গে অনুবাদের পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। এর বেশি বলার সুযোগ এই মুহূর্তে নেই।  

লেখকের প্রকাশিত বইগুলোর প্রচ্ছদ।

প্রশ্ন: প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার পরিকল্পনা কীভাবে এলো?

উত্তর: নতুন কিছু ট্রাই করে দেখবার ইচ্ছা ছিল। নতুন কোনো সুযোগ, কোনো প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে দম নেয়ার ইচ্ছা ছিল।   

প্রশ্ন: বাংলাদেশে সাহিত্যচর্চায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তুলনামূলক কমই। একজন তরুণ লেখক হিসেবে আপনার পাঠ ও অভিজ্ঞতায় বিশ্বসাহিত্যের অন্যান্য লেখকদের ভূমিকা কেমন?

উত্তর: আমার চিন্তার জগতে, সত্যি বলতে বর্তমানে আর বাঙালি কোনো লেখকের প্রভাব নাই। কারণ, আমার মূল কাজের জায়গা হচ্ছে উপন্যাস, যার ফর্ম নিয়ে যত ভাঙচুর, নিরীক্ষা, এবং আবিষ্কার—তার সবই কমবেশি পাশ্চাত্যের আবিষ্কার। বই পড়ার ক্ষেত্রে দশজনের মুখে মুখে যে দরকারি বইগুলোর নাম আমার পর্যন্ত পৌঁছায়, তাই পড়ি। তা থেকে কিছু কিছু দ্বারা প্রভাবিত হই। যেমন ওরহান পামুক যেভাবে মাই নেম ইজ রেড লিখেছেন, অমন কিছু একটা লেখার স্বপ্ন আমার আছে। কুন্ডেরা যেভাবে দর্শন আর জীবনকে তার লেখায় মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে ফেলেন, অমন কিছু লিখতে না পারলে আসলে লিখে লাভ নাই। বুকার জয়ী শ্রীলঙ্কান লেখক শেহান করুনাতিলকায়ের সেভেন মুনস অফ মালি আলমাদিয়া-এর গল্প বলার ভঙ্গি আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

প্রশ্ন: আপনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়েছেন, এখন পড়াচ্ছেন। আমরা দেখি যে, এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট একটা রুচি গড়ে ওঠে বা এধরনের প্রতিযোগিতাতেও দেখা যায়, একটা 'অলিখিত নির্দিষ্ট রুচি' বা প্যার্টানকেই সবসময়ই মূল্যায়ন করা হয়। আপনার মন্তব্য কী এবিষয়ে?

উত্তর: ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং শিক্ষক হওয়ার ফলে আমার সবচেয়ে বড় উপকার যেটা হয়েছে, তা হলো ইংরেজি ভাষায় লেখাপত্র পড়বার সুযোগ এবং দক্ষতা। এতে দোষ কোথায়? ইংরেজি ভাষার সূত্রে আমি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সাহিত্যের সঙ্গে সরাসরি, বা ইংরেজি অনুবাদের সূত্রে পরিচিত হতে পারি। এ সুযোগ আর কোনো ভাষা আমাকে দেয় না।

প্রতিযোগিতায় কোন রুচি বা প্যাটার্নকে মূল্যায়ন করা হয়, আমার তা জানা নেই, কারণ আমি প্রতিযোগী, বিচারক নই। কিন্তু কমনসেন্স, এবং নিজের পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলিতে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নের নয়, বরং লেখকের মৌলিক ভাষা ও সুরকে মূল্যায়িত করার একটি প্রবণতা আছে। আপনি গত বছর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের যেকোনো উপন্যাস হাতে তুলে নিলে একদম সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সাহিত্য পুরস্কারের মানদণ্ডের ব্যাপারে ধারণা পাবেন। তার ঠিক আগের বছর নোবেল বিজয়ী হান কাং-এর লেখার সঙ্গে ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখার স্টাইলে কোন মিল আছে? বা তার আগের বছরের নোবেল বিজেতা নাট্যকার ইয়ন ফসের সঙ্গে? মিল নেই। এমনকি বুকার পুরস্কারেও ভাষার নিরীক্ষাধর্মীতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আপনি গত বছর ডেভিড সালাইয়ের বুকার বিজয়ী বই দা ফ্লেশ পড়তে বসলে এর ভাষার সাদামাটা সারল্যে নির্বাক হয়ে যাবেন। বইয়ের একটা লম্বা সময় জুড়ে রগরগে যৌনতা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছুই নেই। একদম শেষে গিয়ে বুঝবেন, পুরুষ মানুষের একাকিত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা এ উপন্যাসের প্রতিপাদ্য বিষয়। এর সঙ্গে আপনি শেহান করুনাতিলকায়ের সেভেন মুনস অফ মালি আলমাদিয়া, বা বানু মুশতাকের ছোটোগল্প, অথবা অরুন্ধতী রয়ের গড অফ স্মল থিংসের ভাষা মেলান। আপনি কোনো প্যাটার্ন খুঁজে পাবেন না। কাজেই একটা নির্দিষ্ট ভাষিক, বা দার্শনিক প্যাটার্নকেই আন্তর্জাতিক পুরস্কারগুলি মূল্যায়িত করে, আমার মনে হয় না এটা ঠিক দাবি।

‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০২৪’ গ্রহণ করছেন লেখক।

প্রশ্ন: আপনি ফেসবুকে আপনার সরাসরি শিক্ষক কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে এই আনন্দের খবর জানাতে না পারার আক্ষেপ থেকে একটা পোস্ট দিয়েছেন। আপনার সাহিত্যিক জীবনে তাদের প্রভাব কেমন?

উত্তর: গতবছর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের হাত থেকে ‘কালি ও কলম সেরা তরুণ কথাসাহিত্যিক পুরস্কার’ নেয়ার পর নেটিজেনেরা কেউ কেউ পুরস্কার দাতাদের মধ্যে ইংরেজি বিভাগ প্রীতি, স্বজনপ্রীতি আছে ইত্যাদি বলে ধুয়া তুলেছিলেন। মনজুর স্যারের হাত থেকে ঐ পুরস্কার নেয়ার ১ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে স্যার অনন্তের পথের যাত্রী হয়ে যান। আজ স্যার বেঁচে থাকলে খুশী হতেন, কারণ প্রার্থী নির্বাচনে কোনো বিতর্ক নাই, এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমার লেখা সংক্ষিপ্ত তালিকায় এসেছে।

আমার সাহিত্যিক জীবনে মনজুর স্যারের চেয়েও বেশি প্রভাব ইংরেজি বিভাগে আমার শিক্ষক প্রফেসর ফকরুল আলম স্যারের। আমার বেশকিছু লেখার প্রথম পাঠক, এবং সমালোচক ফকরুল স্যার। আমি যখন ঢাবির ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই, আমার অনেক ক্লাসমেটের সিগনিফিকেন্ট ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। আমার তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু প্রথম বর্ষে ফ্র্যাঙ্ক ও'কনরের গল্প মাই ইদিপাস কমপ্লেক্স-এর ওপর আমার দেয়া জীবনের প্রথম প্রেজেন্টেশন শেষে ফকরুল স্যার সবার আগে, এবং সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে হাততালি দেন। আমার পরবর্তী জীবনে যা কিছু অর্জন—তার ভিত্তিপ্রস্তর ফকরুল স্যারের সেই হাততালি।

প্রশ্ন: দেশের স্বনামধন্য সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া, তারপর আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি...লেখক হিসেবে নিজেকে শেষপর্যন্ত কোনো মঞ্চে দেখার স্বপ্ন দেখেন?

উত্তর: একজন লেখকের জীবনের সবচেয়ে রিওয়ার্ডিং এক্সপেরিয়েন্স হচ্ছে তার লেখালেখির কাজটা। চোখের সামনে যে দুনিয়া, সে এক নির্মম, রসকষহীন পৃথিবী। তার থেকে পালিয়ে নিজের কল্পনার জগতে আশ্রয় নেয়া, এবং অদেখা চরিত্রগুলিকে মূর্ত করে তোলার আনন্দ স্বর্গীয়। আমি লিখতে চাই আমৃত্যু। এটাই হবে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখি আমার লেখা অনূদিত হয়ে সাউথ এশিয়ান সাহিত্যে একটা আলাদা জায়গা করে নিচ্ছে।   

কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক সাজিদ উল হক আবির  

প্রশ্ন: যারা এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায়, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী? প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?

উত্তর: প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য কাউকে লেখালেখি করার পরামর্শ দিই না। লেখালেখিকে প্রধান পেশার পাশে প্যাশন হিসেবে চর্চা করা ছাড়া আর কিছু করা এদেশে প্রায় অসম্ভব। আর প্যাশন হিসেবে চর্চা করার অভিজ্ঞতাটাও হতাশায় মোড়ানো। লিখতে অনেক সময় লাগে। লেখা ছাপাতেও অনেক সময় লাগে। ছাপা লেখার পাঠ প্রতিক্রিয়া এদেশে বিরল এক অভিজ্ঞতা। তাই কেউ যদি স্রেফ বিভিন্ন কমপিটিশনে লেখা পাঠানোর জন্যে পরামর্শ চায়, তাকে দেয়ার মতো কোনো পরামর্শ আমার ভাণ্ডারে নেই। 

আর যদি জোর করে কিছু বলতেই হবে বলে দাবি করেন, তবে বলতে হয়, এই প্রতিযোগিতার জন্য বিশেষ কোনো প্রস্তুতিরও কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। আমি নিজে গল্প পাঠানোর সময় এই প্রতিযোগিতার পূর্বের কোনো গল্প পড়িনি। নিজের সেরা গল্পটা লিখতে চেয়েছি। লেখা শেষে পাঠিয়ে দিয়েছি। গল্পটা ক্লিক করেছে। যদি কেউ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান, তবে নিজের গল্প বলার শৈলীটা ঠিকঠাক মতো রপ্ত করতে হবে। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের