সমকালীন বাংলা কবিতায় কুমার চক্রবর্তী এক স্বতন্ত্র ও গভীর মননের কবি, যিনি একই সঙ্গে কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক হিসেবে নিজের আলাদা পরিসর তৈরি করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “লগপুস্তকের পাতা”, “আয়না ও প্রতিবিম্ব”, “সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর”, “পাখিদের নির্মিত সাঁকো”, “হারানো ফোনোগ্রাফের গান” এবং “তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ”। পাশাপাশি তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ “অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা” তাঁকে এক গভীর চিন্তাশীল সাহিত্যিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তাঁর কবিতার জগৎ মূলত অন্তর্মুখী—যেখানে মানুষ, নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন এক বিশেষ ভাষায় প্রকাশ পায়। প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তাঁর লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি প্রকৃতির মধ্যে একা সময় কাটাতে ভালোবাসেন, প্রতিদিনের পরিবর্তনশীল রূপকে নিবিড়ভাবে অনুভব করেন, এবং সেই অভিজ্ঞতাকে রূপ দেন কবিতার ভাষায়। এই অনুভবের ভুবনে যুক্তির পাশাপাশি বা অনেক সময় যুক্তির বাইরেও কাজ করে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় বোধ, এক অদৃশ্যের প্রতি সংবেদনশীলতা। তাঁর লেখায় সেইসব অভিজ্ঞতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, যেগুলো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু অনুভবের স্তরে গভীরভাবে সত্য। বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের অনুবাদের মাধ্যমেও তিনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্যচর্চা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি তা বৃহত্তর সাহিত্যিক সংলাপের অংশ। এই সাক্ষাৎকারে আমরা জানতে চেষ্টা করব তাঁর সৃষ্টির অন্তরালের ভাবনা, প্রকৃতি ও নিঃসঙ্গতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, এবং সেই অদৃশ্য অনুভবের জগৎ, যা তাঁর কবিতাকে করে তোলে অনন্য।
সাথী নন্দী: আপনার লেখালেখির সাথে আমার পরিচয় বন্ধু রণজিত দাশের মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রিয় কবিদের নিয়ে আলাপে নানা সময় রণজিৎ আপনার নাম উচ্চারণ করেছে। তখন বিচ্ছিন্নভাবে তাঁর পাঠানো কিছু লেখা পড়ি এবং ক্রমশ আপনাকে অভিনিবেশ নিয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। আজ আপনার সঙ্গে সরাসরি আলাপে আপনার জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে আরও নিবিড়ভাবে জানতে পারব ভেবে আনন্দ হচ্ছে!
কুমার চক্রবর্তী: তোমাকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। তুমিই বললাম, তুমি অনেক অনেক ছোটো আমার। কী বলো? রণজিৎ আমার প্রিয় একজন মানুষ, ভাতৃপ্রতিম। আমার লেখার সমঝদার সে। নিজেও কবি ও অনুবাদক। নানা সময়ে আমরা অনেক অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছি। এখনও কাটাই যদিও আগের মতো নয়। কারণ, আমরা সবাই সময়কে হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু প্রুস্তের মতো হারানো সময়ের সন্ধান করে ফিরি না। সময় আসলে কী তা কেউ জানে না। সেন্ট অগাস্টিন সময় সম্পর্কে বলেছিলেন, কেউ জানতে না চাইলে বলব আমি জানি আর জানতে চাইলে বলব আমি জানি না। অগাস্টিন আসলে সময়কে স্মৃতি, প্রত্যক্ষতা ও প্রত্যাশার জায়গা থেকে কথাটি বলেছেন।
জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে তুমি জানতে চাইছ। তো অগাস্টিনের মতো আমিও বলতে পারতাম। কিন্তু এই হেঁয়ালিতে না গিয়ে এটুকুই বলি যে, আমার জীবন ও সাহিত্য একটি অন্যটির পরা। এই পরাত্ব সম্পর্ক যেহেতু পরস্পরের, তাই বলা যায় একটিকে ছাড়া অন্যটি অস্তিত্বহীন; একটি ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব শূন্য। আবার দুয়ে মিলে আমার স্বাধীন অস্তিত্ব যেখানে জীবন ও শিল্প একসাথে ফুল ফোটাতে ব্যস্ত থাকে। আসলে সাহিত্য হচ্ছে জীবনের এক মানসিক অস্তিত্ব যা মানুষ বুঝে ফেলে জীবনের শুরুতেই। আমার ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে বলেই বোধ হয়। এক ধরনের নিয়তিগ্রস্ততা। তোমার সাথে আজকের আলোচনা আশা করি আমার জন্য অশেষ সুখকর হবে।
প্রশ্ন: আপনার যাত্রা শুরু হয়েছিল গল্প দিয়ে, কবিতায় এসেছেন পরে— কবিতা লিখতে হবে এই ইচ্ছেটা কবে, কীভাবে জন্মালো? কোনও বিশেষ প্রেরণা ছিল কি?
উত্তর: আসলে বিষয়টা তা নয়। গল্প লিখেছিলাম অজান্তেই। গল্পকার একদমই নই আমি। মানে যৌবনের শুরুতে শখবসত কয়েকটা লিখেছিলাম। এগুলো ঠিক লেখককৃত্য ছিল না। আসলে ফিকশন বেশি পড়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে গল্প লেখার শখ জাগে। আমাদের বাড়িতে উপন্যাস পড়ার রমরমা ছিল। মা পড়তেন। কখনও বলতেন পড়ে শোনাতে তখন তিনি হয়তো কাঁথা সেলাই করতেন। বউদিরা পড়তেন। আমার পাড়ার বন্ধু মোসতাক উপন্যাস পড়ত; আমরা বিনিময় করে করে পড়তাম। কবিতা শুরু করি ১৯৭৭ সালে, একটি নির্জন সময়ে। শহরের যে ঘরটিতে আমি তখন থাকতাম তা ছিল একা একটি ঘর, চারপাশটা গাছপালায় থমথমে। তো সেই নির্জনতাকে চেজ করার জন্য আমার কবিতা লেখার চেষ্টা। ১৯৮৮ সালে আমি চাকরিসূত্রে বাংলাদেশের মধুমতি নদীর পারে এক মফস্বল শহরে চলে যাই। অতি নির্জন ছিল ওই জায়গাটি যেখানে সূর্যের আলো দ্রুত সরে সরে যেত। জল ও আকাশের এক নিবিড়তা ছিল সেখানে। তো দিনের ব্যস্ততার পর রাত হয়ে উঠত অনেকটা পরাবাস্তবিক। একমাত্র বই হয়ে উঠত নিঃসঙ্গের সঙ্গী। কিন্তু বাইরের স্তব্ধতা পাঠকে করে তুলত আরও স্নায়ুরোধী। মফস্বল শহরটিতে ছিল একটি পাবলিক লাইব্রেরি, সেখান থেকে বই এনে পড়তাম। মনে আছে জেন অস্টেনের `সেন্স অ্যান্ড সেনসিবিলিটি’ এবং 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ ওখান থেকে নিয়েই আমি প্রথম পড়ি, বই দুটি এখনও আমার কাছে রয়েছে, লাইব্রেরিকে ফেরত দেওয়া হয়নি। এর কারণ ছিল তখন দেশ পত্রিকায় নীরদচন্দ্র চৌধুরীর একটি মারমার কাটকাট সাক্ষাৎকার বেরিয়েছিল। তো সেখানে তিনি এই বই দুটির কথা বলেছিলেন। এখনও মনে আছে 'প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’-এর শুরুর সেই পঙক্তিগুলি: it is a truth universally acknowledged, that a single man in possession of a good fortune, must be in want of a wife. সেখানে আমরা কখনও কখনও মধুমতির পারে বিকেলে গিয়ে বসতাম, সন্ধ্যা পার করতাম। দেখতাম জলের বয়ে চলার নিয়তিকে। একবার, ১৯৮৮ সালে, ভয়াবহ বন্যায় ভেসে গিয়েছিল জেলাটি, শহরটি। ত্রাণকাজে গ্রামের দিকে যেতে হতো । তখন জলের নিচে ভেসে উঠত জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের রহস্যময় জগৎ। আমি নিজেও একবার হাওরে ঝড়ের কবলে পড়েছিলাম। আর বলা যায় তখন থেকেই সক্রিয়ভাবে কবিতা লেখার শুরু আমার। একটি ডায়েরিতে লিখতাম সেগুলো। তবে একটি কথা বলা দরকার। আমার কবিতা পড়ার শুরুই কিন্তু জীবনানন্দ দাশের কবিতা দিয়ে। তখন এসএসসি পরীক্ষার পর তিন মাস লাগত ফল বেরুতে। ওই সময় আমার এক বন্ধু নাম তার বুলবুল, এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা, আমরা দুজনে ঘুরে বেড়াতাম শহরের অপ্রচলিত স্থানগুলিতে, আর কবিতা বানাতে চেষ্টা করতাম। একদিন কবিতা বানালাম— ‘গরুগুলি খাচ্ছে কংক্রিটের ঘাস’। এটাই বোধ হয় আমার প্রথম কবিতার উঁকিমারা। একদিন তার বাসায় গিয়ে দেখলাম জীবনানন্দ দাশের কাব্য সম্ভার বইটি। রণেশ দাশগুপ্তর সম্পাদনায় স্বাধীন বাংলাদেশে বের হয় বইটি। আমি তার কাছ থেকে বইটি এনে পড়তে লাগলাম। এখনও বইটি আমার কাছে আছে। জীবনানন্দের কবিতা পড়ে আমি অন্য এক জগতে যেন ঢুকে গেলাম। একটি ঘোর, একটি ইন্দ্রিয়বিপর্যয় যেন ঘটতে লাগল আমার ভিতরে। ঠিক অবোধ কিন্তু কী একটা যেন আচ্ছন্নতা, ঘোর, যাকে আমি টের পেতে লাগলাম। যে ঘরটিতে আমি থাকতাম তা ছিল গাছপালাশোভিত বাড়ি, জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে সে যেন এক রহস্য-অচ্ছেদ্যতা তৈরি করে দিল। তো এখন আমি বলি, আমার মূল কবিতাপাঠই শুরু হয়েছিল জীবনানন্দের মতো একজন শ্রেষ্ঠ কবির কবিতা দিয়ে। এটা একটা বিস্ময়। তখন প্রিয় কবিতা ছিল 'আমি যদি হতাম বনহংস'। আসলে মাইক্রোকোজম আর ম্যাক্রোকোজম-এর আন্তঃসম্পর্ক বুঝতে চেয়েছিলাম আমি। আর কবিতাকেই গ্রহণ করেছি এই রহস্য ও রসায়নকে প্রকাশের জন্য। কবিতা আমার জন্য একধরনের মুক্তি। এর জন্য বোধকরি আমার অন্তর্মুখী স্বভাবও দায়ী ছিল।
প্রশ্ন: আপনার কবিতায় প্রকৃতি একটা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাই জানতে ইচ্ছে করছে—শৈশব-কৈশোরের সেই পরিবেশ আর প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মিলিয়ে আপনার বড় হয়ে ওঠাটা ঠিক কেমন ছিল?
উত্তর: আমার কাছে প্রকৃতি হলো গতিশীল সত্তা যা আমার মধ্যে একইসঙ্গে প্রতিফলিত ও প্রতিসরিত। অর্থাৎ, প্রকৃতি আমার আয়না নয়, আমিই প্রকৃতির আয়না। আমাতেই সব প্রতিফলিত নানাভাবে, যা প্রতিফলিত হবে না তা আমার মতো অবতল লেন্সে বেঁকে ঢুকে ছড়িয়ে পড়বে। আবার উত্তল কাচের মতো, এর মাঝ দিয়ে কিছু জিনিস প্রতিসরিত হয়ে অন্য রূপ নিয়ে কনভাজড (converged) হয়ে রয়। মানে জীবন আমার শুধু অবতল কাচ নয়, উত্তল কাচও। প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তনকে বুঝতে চেষ্টা করি। প্রতিফলন বস্তুর বাস্তবকে নানা রূপে উদ্ভাসিত করে যা কবিতায় আমি আঁকি। এর একটি কারণ হলো, আমার জন্ম গ্রামে যা ছিল একটি প্রাকৃতিক প্রিজম। বস্তুবিশ্ব সেখানে ভাববিস্তার করে রাখত। পাখি, গাছ, ফুল, জল মিলেমিশে সেখানে একটি স্বপ্নজাল বিছিয়ে রেখেছিল যেখানে আমরা লুটুপাটি খেতাম। কিন্তু তা ছিল দশ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত। তারপর আমি কুমিল্লা শহরে চলে আসি। আর ফিরে যাইনি গ্রামে। রাসেলের একটি কথা আছে: নেভার রিনিউ দ্য ওল্ড মেমোরিজ। আমিও তা বিশ্বাস করি। দূরত্বই সৌন্দর্যের আত্মা। শৈশবে কৈশোরে দেখা জগৎ প্রতিনিয়ত আমার ভিতর বহুগুণিত হচ্ছে। এখনও দেখি, ঘুড়ি উড়ছে, পতঙ্গপ্রাণ মায়া বিস্তার করে রেখেছে। ঘাসফড়িংরা মৃদু লাফ দিয়ে চলেছে। এই যে প্রাণপ্রকৃতি, এর সঙ্গে আমার বসবাসটি আমাকে একধরনের স্বপ্ন উপহার দিয়েছে। কৈশোরে শহরে চলে আসি। সেখানে অন্য এক জীবন। আমাদের সময়ে পাড়ায় পাড়ায় উপন্যাস পড়ার চল ছিল। আর ছিল সিনেমা দেখা। সিনেমা দেখা এক নেশায় পরিণত হয়েছিল। মাসজুড়ে বাজারের টাকা থেকে একটুআধটু রেখে টাকা জমাতাম আর নতুন ছবি এলে অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে ছবি দেখতাম। সিনেমার কাগজগুলি পড়তাম। নায়ক-নায়িকাদের বাস্তব মানুষ বলে মনে হতো না। আসলে বলতে কী, শহরের আমার কৈশোর ছিল সিনেমার এক জগৎ। এ যেন এক অজানা জগৎ। আরেকটি বিষয়, সে সময়টায় আমাদের মনোজগৎ সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছিল রুশ সাহিত্য, পত্রিকাগুলি। আমি সংগীতের কথাও বলতে পারি। আকাশবাণীতে শনিবার বা রবিবার আধুনিক গান শোনা, সম্ভবত অনুরোধের আসর হতো শনিবার দুপুরে আর রবিবার রাতে। এসব শোনা ছিল রুটিনকাজ। রেডিয়ো চুরি করে নিয়ে নিজের রুমে গোপনে গানগুলি শুনতাম। একটি গানের কথা তোমাকে বলি: মিনা কাপুরের গাওয়া: ‘‘এইদিন সেইদিন এমনি করেই একদিন আমরা হয়ে যাব পুরোনো, যতদিন কাছাকাছি তুমি আমি পাশাপাশি, পৃথিবী হোক চোখ জুড়োনো।’’ গানটি এখন তো সত্য হয়ে গেল: আমরা তো পুরোনোই হয়ে গেলাম। বাংলাদেশে বেতারও শুনতাম, সেখানে বাংলাদেশের সিনেমার গান শুনতাম। 'দুর্বার' নামে একটি গানের অনুষ্ঠান হতো সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। পূজার সময় মাইকে গান বাজত। পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। আর ক্যাসেটে গান শোনা তো হতোই। কুমিল্লা শহরে টাউনহল নামে একটি স্থান আছে। ত্রিপুরার রাজা এটা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। সেখানে ব্যান্ড শো হতো মাঝেমধ্যে। ওখানে একটি পাঠাগার ছিল, আমরা সেখানে বইপত্র, পত্রিকা পড়তাম। আর শহরে বুকস্টল ছিল, একটি ছিল প্যানোরমা নামে। সেখানে পাওয়া যেত ভারতীয় জনপ্রিয় লেখকদের উপন্যাস। আমি সেখান থেকে বই কিনতাম। মনে আছে ওখান থেকে নীহাররঞ্জন গুপ্তের 'তালপাতার পুথি' বইটি কিনেছিলাম। তবে অন্য একটি বুকস্টলে পেয়েছিলাম মুজতবা আলীর 'শবনম'। সেটি পাঠ করা ছিল আমার জীবনের এক মহাস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যা-ই হোক, এ গল্প শেষ হবার নয়। ফেলে আসা পথই আসল পথ।
প্রশ্ন: আপনার কবিতায় যে প্রকৃতির এত ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি—তার পেছনে কি নির্জনতায় কাটানো সময়টাই বড় ভূমিকা নিয়েছে?
উত্তর: না, ব্যাপারটি তেমন নয়। এটার কারণ এক ধরনের অন্বেষকের ভূমিকার জন্য। আমি একজন নিরন্তর অন্বেষক। প্রকৃতির নীরব ভাষা আর তার মেটাফিজিক্স অব প্রেজেন্সকে বুঝতে চাই আমি। যেমন ধর, একটা পাহাড়ের ঢালে জন্ম নেওয়া রোডোডেনড্রন ফুলের গাছকে আমি আমার সত্তার উপলব্ধিতে নিই, তারপর তার অসংখ্য মডেলিং চলতে থাকে আমার ভিতরে। সে একা দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়ে, বনমৌমাছিরা আসে, মধু নেয়, ফিরে যায়, রোডোডেনড্রন একা চেয়ে থাকে। এমনটাই। আমি নির্জন বলেই প্রকৃতি আমার ওপর ভর করে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম, সে নির্জনতাকে অলংকারিত করে। যে প্রকৃতিকে দেখি বা আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় নিই, তার একটি বিবর্তন চলে আমার মধ্যে। প্রকৃতির নির্জনতায় সময় কাটানো তো সব সময় সম্ভব নয়। আমি প্রকৃতির কাছে যেটুকু যাই প্রকৃতি তার পরিবর্তিত সত্তা নিয়ে বহুগুণভাবে আমার কাছে ধরা দেয়। এটা একটা বদলে যাওয়া প্রকৃতি। আমার প্রকৃতি আসলে আমার ভিতরে মুকুরিত এক প্রকৃতি। আমি যার আয়না।
প্রশ্ন: আপনার জন্ম তো কুমিল্লা জেলায়। পরে গাজীপুরে ছিলেন, অনেক পরে শহর ঢাকায় শেকড় ছড়ানো। এই যে সবুজ শ্যামল গ্রামবাংলা থেকে রুক্ষ শহরজীবনে প্রবেশ তা কি কোনও টানাপোড়েন তৈরি করেছিল আপনার জীবনে কিংবা লেখায়? অর্থাৎ গ্রাম ও শহরজীবনকে আপনি কীভাবে দেখেন?
উত্তর: না, তা হয়নি। গ্রাম তখনও কোনো ক্ষত তৈরি করেনি। কিন্তু গ্রাম রয়ে গিয়েছিল আমার অবচেতনে। এখন যতই বয়স বাড়ছে ততই গ্রাম, শৈশবস্মৃতি হানা দিচ্ছে আমার ভিতরে। প্রুস্তের ভাষায় এ হলো অনৈচ্ছিক স্মৃতি। শহর হলো একটি নির্মাণ; আর গ্রাম হলো মোটাদাগে প্রাকৃতিক। গ্রামে নিজেকে তুমি মনে করবে প্রকৃতির অংশ, স্বাধীন সত্তা; আর শহরে তার বিপরীত। আর সময়কে অনুধাবনের দিক থেকেও বলা যায়, শহরে সময় হলো ঘড়ি, রাত আর দিন; কিন্তু গ্রামে সময় হলো বেহানবেলা, সকাল, দ্বিপ্রহর, অপরাহ্ণ, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত। এদের প্রত্যেকের এক একটা রূপ আছে, মায়া আছে যেটা মনের সাথে একটি সাঁকো নির্মাণ করে থাকে। শহরে ঋতু দুটি: গ্রীষ্ম, আর শীত। কিন্তু গ্রামে ছয়টি। শহরে নক্ষত্র নাই, আকাশ নাই, পাখি নাই, আরও অনেক কিছু নাই। গ্রামে সব আছে। বিশেষত রাতের আকাশ আছে যা দেখে তুমি আপনার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে কথা কইতে পারবে। গ্রামে আমরা বিকালের উড়ে চলা সাদা মেঘের দিকে চেয়ে বলতাম, ওই সামনেরটা দাদু, পেছনেরটা বাবা, তার পেছনেরটা মা, সাথে ছোটো মেঘগুলি আমরা ভাইবোনেরা। শহরে তো এসব নাই। শহরে তো আসলে মা-ই নেই। এখন আমার ভিতর মেন্টাল টাইম ট্র্যাভেল চলে যা দিয়ে আমি আমার হারানো গ্রামে ভ্রমণ করি।
প্রশ্ন: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'লগপুস্তকের পাতা'। এর কবিতাগুলো লেখার সময়কার যে কুমার চক্রবর্তী, তাঁর জীবনে তখন কী চলছিল?
উত্তর: সে সময়টা ছিল কবিতা লেখার এক ঘোর। কীভাবে ধরব কবিতাকে। কীভাবে বস্তুজগৎকে কবিতার মধ্যে বিনির্মাণ করব। তখন নান্দনিক ভাবনা বেশি কাজ করত। অপসৃয়মাণ সৌন্দর্য, যে সৌন্দর্য পলাতকা, তাকে কীভাবে গ্রেফতার করা যায়, সেটা একটা তাড়নার মতো কাজ করেছিল আমার মধ্যে। এই কাব্যের কবিতাগুলি অনেকটা সময় ধরে লেখা। প্রায় ৮ বছর। তখন আমি গাজীপুরের জয়দেবপুরে, যা ভাওয়াল গড় বলে খ্যাত। ঋতুচক্রের বিশেষ আশীর্বাদ ছিল গড় অঞ্চলটিতে। ফলে সেখানকার টপোগ্রাফি ছিল বৈচিত্র্যময়। নানা ধরনের ভূদৃশ্যের মুখোমুখি হতাম আমি। বর্ষায় বিলের সৌন্দর্য ছিল অসাধারণ। সূর্যের গতিপথ যেন স্পষ্ট বুঝতে পারতাম। আমি যেখানে থাকতাম সেখানটায় একটি গ্রাম ছিল মেঘডুবি। নামটি আমাকে খুব তাড়িয়ে ফিরত। এ নামে একটি কবিতাও আছে। ওই সময়টা আমার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সময়। দায়দায়িত্ব নিয়েও মুক্ত এক জীবন। পাশেই ঢাকা বলে সপ্তাহান্তে ঢাকা যাওয়া হতো, আনন্দ করা হতো। আমার জীবনের দুঃখের আগের এক আনন্দময় মহাল ছিল সেটা। ফলে ওখানে যে কবিতাগুলো লিখি সেগুলোয় এক ধরনের গতিশীল ও ধাবমান সৌন্দর্যকে ধরার প্রয়াস ছিল। ছিল উচ্ছ্বাসও।
প্রশ্ন: আপনার কবিতায় ও গদ্যে মৃত্যু এক প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা দেয়। যে মৃত্যুভাবনা আমাদের বিষাদিত আনন্দে আকর্ষিত করে! এবং মৃত্যুপাঠ করতে করতে জীবন যেন আরও তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। অর্থাৎ নশ্বরতার বোধে আক্রান্ত কবির অভূতপূর্ব চৈতন্য, আমাদের জীবনে জীবনায়ন ঘটায়। এ বিষয়ে আমার নির্দিষ্ট কোনও প্রশ্ন নেই। আপনি নিজের মতো এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করলে নিশ্চয়ই নতুন আলো পাব...
উত্তর: আসলে এর কারণ হলো জীবনানন্দের কবিতা। আমি বলেছি যে আমার কবিতা পড়ার শুরুই জীবনানন্দ দিয়ে। তো তাঁর কবিতার মৃত্যুময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম আমি। আমার প্রিয় কবিতা ছিল 'মৃত্যুর আগে'। পরে এক জাতীয় নান্দনিক হতাশায় আক্রান্ত হই আমি। ব্যক্তিজীবনের অনেক ঘটনা আমাকে দুঃখবোধের দিকে নিয়ে গেছে। আসলে মৃত্যু হলো এক অনিশ্চিত নিশ্চিততা। এটা আসবে কিন্তু কখন আসবে তা আমরা জানি না। আর সুখ সৃষ্টিশীল নয়, দুঃখ সৃষ্টিশীল। দুঃখ ব্যাপ্তও। জীবনের প্রতিটি কাজই মৃত্যুকে সামনে রেখে। মৃত্যু আছে বলেই মানুষ শিল্পী হয়, কারণ তখন সে নিজেকে রেখে দেওয়ার একটি বিকল্প উপায়কে খোঁজ করতে থাকে। আচ্ছা ধরো, যদি মানুষ অমর হতো তবে তার অবস্থা কী হতো! তার অবস্থা কুমে-র সিবিলের মতো হতো যে অমরত্ব পেয়েও মরতে চেয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা কিন্তু জীবনবিরোধী কিছু নয়, বরং জীবনকেই তা মহার্ঘ করে। তাই মৃত্যুর আবাহন মূলত জীবনেরই আবাহন। এটা হলো মর্ত্যজগতের এক আলোছায়ার খেলার ইন্টারল্যুড।
প্রশ্ন: আচ্ছা এত প্রবল মৃত্যুবোধ আপনাকে কেন তাড়িত করে?
উত্তর: কোনো তাড়না নয়। এটা হলো রবীন্দ্রনাথের 'আলোছায়ার পথে করি আনাগোনা'-এর মতো একটি প্রপঞ্চ।
প্রশ্ন: মৃত্যু তো নিয়তি! আপনি নিয়তিতে বিশ্বাস করেন?
উত্তর: না মৃত্যু নিয়তি নয়। মৃত্যু হলো জীবনের উৎসব, যেখানে উৎসব শেষে জীবন নিজেকে আহুতি দেয়। আমি নিয়তিতে বিশ্বাসী নই। আমি মনে করি, মৃত্যু হলো কোনো সময়হীন নদীর পারে গিয়ে স্থির হয়ে থাকা।
প্রশ্ন: আপনার জীবনে কী প্রবল বিচ্ছেদ আছে, হারানোর ব্যথা আছে?
উত্তর: হ্যাঁ। হারানোর ব্যথা তো বটেই, চলমান বা সঞ্চারিত ব্যথা রয়েছে আমার। অর্থাৎ যে বেদনা অশেষ, সে রকম বেদনা রয়েছে আমার। এটা এখন শেয়ার করতে চাই না। শোনো সাথী, কিয়ের্কেগার্দ নামে একজন দার্শনিক ছিলেন, তিনি বলতেন, আমার বুকে একটি তির বিঁধে আছে যার জন্য আমি ব্যথা পাচ্ছি, কিন্তু এও জানি তিরটা খুলে ফেলামাত্রই আমি মারা যাব। তো কিছু মানুষ ব্যথাকে বহন করেই বেঁচে থাকে, তা না করলে বোধয় তাঁরা মারা যাবে। আমার কিছু নৈসর্গিক ব্যথা আছে। দুঃশ্চিকিৎস্য। এখন এসব আর বলব না। ব্যথাবেদনাকে অনুভব করলে মন প্রকাশাত্মক হয়। পৃথিবীকে নতুনভাবে ভালোবাসা যায়।
প্রশ্ন: আপনি মনে করেন, যেকোনো সৃষ্টিশীল কাজের পেছনে সাফারিংটা ভীষণ প্রয়োজন। এরকম চিন্তার পেছনে কী কারণ রয়েছে? মানে দুঃখ থেকেই কী লেখার জন্ম হয়?
উত্তর: দেখো, আমাদের ভারতীয় পরিত্রাণবাদ দুঃখের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মহাভারত তার প্রমাণ। সর্বম্ দুঃখম্। ভারতীয় দর্শনের মূল ভিত্তিটা দুঃখবেদনীয়। আমাদের যে ভোগান্তি তাকে অস্বীকার করার কি কিছু আছে? যদিও উপনিষদ আনন্দের কথা বলেছে কিন্তু ভারতীয় দর্শনে সুখকেও এক ধরনের দুঃখ বলা হয়েছে। এর সাথে মিল আছে বুদ্ধদর্শনের বিপরিণামী দুঃখের। আর সংস্কার দুঃখের কথা কি অস্বীকার করা যায়! জীবন যে দুঃখময় তা আমি নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছি। দর্শন এক্ষেত্রে একে দৃঢ়তা দিয়েছে মাত্র। সুখ সৃষ্টিশীল নয়, দুঃখ সৃষ্টিশীল। এটা খুব সোজা ব্যাপার। আনন্দ ফুরিয়ে যাওয়া বিষয়, এর কোনো বিকাশ নেই, কিন্তু দুঃখ সৃষ্টিশীল কারণ তা আপনাকে চিন্তাশীলতা ও গভীরতা দিতে থাকে। এমনকি যে কমেডি আপনি দেখেন তার আড়ালেও দুঃখই সার। চ্যাপলিনের ছবিগুলিই তো তার প্রমাণ। একটি মজার কথা বলি, ভারতীয় দর্শনের একটি শাখায় সুখকেও দুঃখ বলা হয়েছে, কারণ সুখ খুব দ্রুতই দুঃখে পরিণত হয়। ভাবো, একটি কার্নিভাল, বা যাত্রার প্যান্ডেল, মধ্যরাত পর্যন্ত আনন্দফূর্তির পর একসময় কি নিঃশব্দতা নেমে আসে সেখানে! সুতরাং যা ক্ষণস্থায়ী তা সৃষ্টিশীল হতে পারে না। সুখ সেটাই। দুঃখের স্থায়িত্ব মৌলিক, রয়েছে প্রোটোজোয়া সুলভ রূপান্তরের ক্ষমতা, তাই সেটা সৃষ্টিশীল। এজন্যই বধির বিটোফেনের পক্ষে সম্ভব হয় কোরাল সিম্ফনি সৃষ্টি করার বা মিসা সোলেমনিস বা স্ট্রিং কোয়াট্রেটস সৃষ্টি করার।
প্রশ্ন: আপনার দৃষ্টিতে জীবন আসলে কী?
উত্তর: অলৌকিক আনন্দের ভার, আবার বেদনাও অপার। জীবন এক আশ্চর্য উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি। জীবনের প্রধান প্রাপ্তি হলো জীবন। এটা টটোলজিক্যাল শোনাবে, তবু এর উত্তর আর কীভাবে দেওয়া যায় বলো! দেখো সাথী, একটি চিনা উপন্যাস আছে, নাম 'ড্রিম অফ দ্য রেড চেম্বার', বা 'লালপ্রাসাদের স্বপ্ন'। খুব বিখ্যাত উপন্যাস, বলা যায় ফাউন্ডিং উপন্যাস। সেখানে বলা হয়েছে, জীবন হলো মায়ার, স্বপ্নের। তুমি যা দেখবে মনে হবে তা সত্য কিন্তু তা এক বিভ্রম, যেন লাল প্রাসাদের স্বপ্ন। রেড চেম্বার মানে মায়ার জগৎ। তো জীবনকে যদি তুমি এমনটা ভাবো তবে তা উদযাপনে সহায়ক হয়। আবার জীবন দুঃখময় এটা ভেবেও তাকে উদযাপন করা যায়। নান্দনিক হতাশা নিয়ে বাঁচা যায়। এই হতাশা সৃষ্টিশীল। তো আমার কাছে জীবন এক আশ্চর্য। এর কারণ বিজ্ঞানী, লেখক, কবি, শিল্পী, সংগীতকাররা জীবনকে এক মায়ার জাদুতে ভরিয়ে রেখেছে। আর মায়ের ভালোবাসা, সন্তানের ভালোবাসা, নানা প্রেমের খেলা তাকে সত্যিই এমন এক সত্তায় পরিণত করেছে যে, সেটুকুন মাথায় রেখে বলা যায় জীবন অবিকল্প। এ এক উদযাপন। উৎসব। এই উৎসবের আমরা এক একজন মহান রাজা।
প্রশ্ন: আপনি কি পরলোকে বিশ্বাসী? রামায়ণ, মহাভারত সহ বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে তো পরলোকের কথা আছে...
উত্তর: করি। কারণ প্রত্যেকের এক বিপরীত অস্তিত্ব রয়েছে। এটাকে প্রতিঅস্তিত্বও বলা যায়। এটা হলো অস্তিত্বের দ্বৈততা। বিজ্ঞানে একে বলা হয় অ্যান্টিমেটার। মহাবিশ্বে বস্তুর বিপরীতে তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এটি এক অস্তিত্বের আয়না। জীবনের বিপরীতে মৃত্যু হলো সেই অ্যান্টিমেটার। এটি এক ধরনের অদৃশ্য সম্ভাবনা। সুতরাং ইহলোকের প্রতিঅস্তিত্ব হিসেবে পরলোক হলো অ্যান্টিমেটার । ইহলোক দৃশ্যমান পরলোক অদৃশ্যমান। কারণ অ্যান্টিমেটার যেহেতু ম্যাটারের বিপরীত। তো, অ্যান্টিম্যাটার এক ছায়া যা আলোকে স্পষ্ট করে তোলে। এটি একটি অনন্ত প্রশ্নও।
পরলোক আমার কাছে এমনটাই। একটি ধারণামাত্র যা মহা ও আকুলিত ও শিহরিত অনিশ্চয়তায় ভরা। তবে সো কলড ধর্মভাবনার মতো আমি স্বর্গ-নরক, শাস্তি, পুরস্কার ইত্যাদিতে বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি মৃত্যুর মাধ্যমে একজন সময়হীনতায় প্রবেশ করে। স্বর্গ হলো সেই সময়হীনতা যেখানে বস্তুর অস্তিত্ব একটি প্রতি বা বিপরীত অস্তিত্বে পরিণত হয়। এটাকে আমার মতো করে আমি নির্বাণ বলতে পারি।
রামায়ণ-মহাভারতে তো এসবের কথা রয়েছে। এগুলো মানুষের অজানাকে নিয়ে চিন্তার নানা ক্যারিকেচার। তবে মহাভারতে একটি কথা আছে জন্ম-মৃত্যু বিষয়ে। বলা হয়েছে, মানুষ অজানা স্থান থেকে আসে আবার অজানা স্থানে চলে যায়। আমি মনে করি এ কথাটি মৃত্যু বিষয়ে একটি চমৎকার উক্তি। মৃত্যুর পর মানুষ স্থানকালহীন হয় তখন আসলে কোনো স্বরূপ থাকার কথা না। তবে এটা এমন এক অসহ্য বাস্তবতা যা সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা অসম্ভব। Human kind cannot bear very much reality—এলিয়টের এ কথাটির তো সত্যতা রয়েছে। তাই মৃত্যুর রূপকথা নানাভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে ধর্মগ্রন্থে।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আপনার কবিতা পড়ার মাঝখানে টাইটানিক সিনেমাটা দেখেছি। জাহাজের মানুষগুলো মৃত্যুকে কত কাছ থেকে দেখেছে, সত্যিই জীবন কত অনিশ্চিত! মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে! আর তারপরই আপনার সেই কবিতার লাইন পড়া— 'আমরা আছি কেননা আমরা কোথাও নেই' বা 'আমার দৃশ্যজীবন কেবলই মুছে যেতে থাকে, মৃত্যু থেকে মৃত্যুহীনতায়'। এই যে দার্শনিক উপলব্ধি আপনি এগুলোকে কীভাবে আয়ত্তে এনেছেন?
উত্তর: সাথী, প্রথমত একজন লেখককে একজাতীয় সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু এটা অত্যন্ত প্রাথমিক একটি অবস্থা, এটা প্রয়োজনীয় কিন্তু তা-ই সব হয় না। কবি একজন ভিজনারি (visionary) । সে নিজেই সৃষ্টি করে তার সত্তার কথনকে। আমরা আছি কেননা আমরা কোথাও নাই— এর মানে হলো আমাদের অস্তিত্ব একটি না-অস্তিত্বও। এটা এক দার্শনিক প্যারাডক্স। দ্বিতীয়টিতে দৃশ্যজীবন মুছে যায় মৃত্যুতে, আবার মৃত্যুহীনতায়, কারণ মৃত্যুর পর তো মৃত্যুহীনতা! আয়ত্ত আসলে কি, অনুভব। যারা ইমাজিনারি লিটারেচার করে তাদেরকে যুক্তির বাইরের এলাকায় যেতে হয়। এটা যুক্তিকে বাতিল করা নয়, তাকে পেরিয়ে যাওয়া। বুদ্ধকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি যে জ্ঞান অর্জন করেছেন তার ভিত্তি কী, তিনি বলেছিলেন আমার অনুভব।
প্রশ্ন: আমার মনে হয়েছে আপনার কবিতায় ব্যক্তি-কবি ও পাঠকসত্তার মাঝে স্বতোৎসারিত তৃতীয় এক স্বর থাকে। আমার জিজ্ঞাসা, লেখার সময় আপনি কি সচেতনভাবে নিজেকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে নেন?
উত্তর: কথাটা ঠিক যে কবিতা লেখার সময় আমি আসলে আমি নই, আমি এক অন্য। যে আমাকে বাদ দিয়েই পাঠককে না জেনেই কবিতাটি লিখতে চায়। এটা এক অপর সত্তার উপস্থিতি। কবিতা কবি লেখেন না, লেখেন তার ভিতরের দ্বৈত সত্তাটি, সক্রেটিস একে বলেছেন 'ডেইমন' যে তাকে দিয়ে বলায়। লেখার সময়টায় লেখকের ব্যক্তিসত্তার টেম্পোরারি সাসপেনশান ঘটে। কবিতা লেখাটি শেষ হলে তখন কবির ব্যক্তিসত্তা সেখানে প্রবেশ করে। এটা এক মেটেমসাইকোসিস (metempsychosis)।
প্রশ্ন: আপনার 'কামগায়ত্রী' গ্রন্থে এসেছে নারী ও যৌনতা। জীবনের পূর্ণতাকে তুলে ধরেন নগ্নতার পরিভাষায়। যৌনতা আপনার কাছে কীভাবে ধরা দেয়?
উত্তর: প্রথমত বলি, 'কামগায়ত্রী' পুস্তকাকারে বই হিসেবে বের হয়নি। কবিতাসমগ্রতে এসব কবিতার একটি শিরোনাম হিসেবে নামটি এসেছে। কবিতাগুলি আসলে একটা ঘোরের মধ্যে লেখা। একটা কথা বলি, আমি নারীর রূপ ও অরূপ সৌন্দর্যকে, একটি গতিশীলতাকে ধরতে চেয়েছিলাম কবিতাগুলিতে। যৌনতা আমার কাছে একটি নৈকট্যের আলাপ। এক সাইকিক এক্সটাসি। যৌনতা একজন পুরুষ ও নারীকে যত কাছাকাছি আনে, তা অন্য কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। যৌনতা হচ্ছে একে অপরের ভিতরে সেঁধিয়ে যাওয়ার এক সাইকোসোমাটিক পথ, অপরের অশ্রুবেদনকে গ্রহণ করার এক অপ্রতিম উপায়। এজন্য যৌনতার ভাষা বোঝা উচিত। যৌনতা শ্লীল আর অশ্লীলতার সীমা ভেঙে দেয়। সব ট্যাবুকে অতিক্রম করে। যৌনতা জীবনের এক ট্রান্সগ্রেশন। আমরা সবাই যৌনতার বাতাবরণে থাকি। কেউ বোঝে কেউ বোঝে না। নগ্নতা হলো আদি ও শাশ্বত সৌন্দর্য। বা জীবনসৌন্দর্য। আমি নগ্নতাকে উপভোগ করি এমনকি নিজের মধ্যেও। আমি মনে করি, প্রত্যেকেরই নিজের শরীরের প্রেমে পড়া উচিত।
প্রশ্ন: যদি বলি প্রেম, ভালোবাসা ও যৌনতা এই বিষয় তিনটিকে আলাদা আলাদা ভাবে ব্যাখ্যা করতে তাহলে কীভাবে করবেন?
উত্তর: তিনটি আলাদা হয়েও এক আবার এক হয়েও আলাদা। সাধারণত প্রেম-ভালোবাসা মন হলে যৌনতা হলো তার দেহ। আমার উৎসব বইতে এসব নিয়ে কথা আছে। আসলে বইটার নামই 'উৎসব: দেহ প্রেম কাম'। বইটির ভারতীয় সংস্করণও আছে— তবুও প্রয়াস প্রকাশনা থেকে এটা বের হয়েছে। যৌনতা ও প্রেমের সম্পর্কটা অঙ্গাঙ্গি । প্রেম ছাড়া আপেক্ষিক যৌনতাও সম্ভব নয় আমার কাছে। প্রেম যৌনতার সাথে সম্পর্কিত হলেও তাকে ছেড়ে বা তাকে নিয়ে অন্য উজ্জ্বলতায় জ্বলতে থাকে। এটি অক্তাবিয়ো কথিত 'ডাবল ফ্লেম', যার ভিতরের নীল আলোটা হলো প্রেম আর চারপাশের লাল আলোটা হলো কাম।
প্রশ্ন: আচ্ছা আপনার জীবনে প্রথম প্রেম কবে এসেছিল? সেই প্রেমের কী কোনো ভূমিকা ছিল আপনার জীবনে?
উত্তর: শোন, প্রতিটি প্রেমই প্রথম। আর সব প্রেমেরই পরিণতি চলে যাওয়া। প্রেম থাকে না কিন্তু সে একটা সুগন্ধ রেখে যায়। ভূমিকাসমৃদ্ধ প্রেম আসলে এক ধরনের প্রয়োজন থেকে আসে। সত্যিকার প্রেম হলো অপ্রয়োজনীয়। ঠিক শিল্পের মতো। তবে তা বলে প্রেম অর্থহীন নয়। প্রেম অর্থহীনের মতোই আসে কিন্তু সে জীবনসমান এক অর্থের জন্ম দিয়ে যায়। তা হলো স্মৃতি। এক অনৈচ্ছিক স্মৃতির জন্ম দিয়ে যায় প্রেম যা বারেবারে মনে পড়তে থাকবে আর ভিজাতে থাকবে মনকে। আমার জীবনে প্রেম এসেছিল, আসে। সবই এক অসাধারণ স্মৃতি রেখে যায়। তো তুমি আমাকে বলতে পারো স্মৃতিধর প্রেমের কবি। হা হা। এখন কথা হলো আমার জীবনে প্রথম প্রেম কবে এসেছিল। এটা আসলে আত্মজীবনীতে লিখলে ভালো হয়। তাছাড়া প্রতিটি প্রেমই যেহেতু প্রথম প্রেম, তাই তোমাকে কোনটার কথা বলব! হা হা। প্রেম আমার জীবনে কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেনি কিন্তু তা এক গতিশীল স্মৃতির মতো আমাকে ভারাতুর করে রেখেছে। আমাকে একই সঙ্গে রং ও গন্ধ দিয়েছে। আমার প্রেম ও কামবিষয়ক কবিতাগুলির উৎস তো প্রেম থেকেই জেগেছে। আর কী বলব! বলা কি ঠিক হবে!
প্রশ্ন: কথাসাহিত্যিক মণিকা চক্রবর্তীর সঙ্গে আপনার দীর্ঘ বৈবাহিক জীবন—আপনাদের সম্পর্কটা কেমন?
উত্তর: অন্য আরেক সাক্ষাৎকারে আমি এ নিয়ে বলেছিলাম। আমাদের সম্পর্কটা দান্তের ইনফেরনো আর পারাদিসোর মতো। মাঝে শুদ্ধিস্থল বা পুরগেতরিও আছে। একটি স্বর্গকে পাওয়ার জন্য আমরা নরক গড়তে থাকি, নরকের ভিতর দিয়ে স্বর্গে যাই। দুজনের সম্পর্কটা সুন্দরই তবে তা টেরিবল বিউটি। দুজনের মাঝে যে সাসপেনশান ব্রিজটি আছে, কে যেন মাঝে মাঝে এসে তা জোরে দুলিয়ে দিয়ে যায়। কে সে! কিন্তু সেই সেতুটি ভেঙে পড়ে না। জীবনের সব সূত্রকে মেনে ও না-মেনে আমরা আছি।
প্রশ্ন: দুজন সৃজনশীল মানুষের এক সঙ্গে থাকাটা সুবিধের নাকি সমস্যার?
উত্তর: আমরা দুজনেই যেহেতু লেখক তাই আমাদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া আছে। জীবনে সুবিধা অসুবিধার কিছু নাই আসলে। জীবন হলো হারিয়ে-হারিয়ে পাওয়া আর পেয়ে-পেয়ে হারানোর এক ভ্রমণ।
প্রশ্ন: আপনার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে 'অধিবিদ্যা ও কাম যেন কুমারের দুই ডানা, যাতে ভর দিয়ে তিনি মানব রহস্যের অন্য সব দিগন্তে পরিভ্রমণ করেন স্বচ্ছন্দে'—এ ব্যাপারে আপনার নিজের মতামত কী?
উত্তর: না, এটা ঠিক না। কোনোটাই আমার কবিতার সিগনেচার কিছু না। 'অধিবিদ্যা সিরিজ' কাব্যের জন্য এটা ভাবা ঠিক না। অধিবিদ্যা সিরিজ কাব্যে আমি সিরিজ কবিতাগুলিতে একটি চিন্তার আশ্চর্যকে আনার চেষ্টা করেছি। অধিবিদ্যার অর্থ আমার কাছে—যে বিদ্যা অন্য বিদ্যার জন্ম দেয়। অর্থাৎ জ্ঞান যা লজিকের বাইরে গিয়ে কিছু বলে। এটাকে বলতে পারো পরা বিদ্যা এই অর্থে যে, এটা বুকিশ জ্ঞান নয়, বরং ইনটুইটিভ জ্ঞান। আর কামগায়ত্রীতে কামের একটি অন্ধ প্রবাহ আঁকতে চেয়েছি কিন্তু আমার সমগ্র কবিতার সাপেক্ষে তো কাম কোনো আইডিয়া হিসেবে হাজির হয়নি। এটা অনেকটা ইপিফেনিক। সুতরাং অধিবিদ্যা ও কাম আমার কবিতার লাইটমোটিফ নয়। লাইটমোটিফ বললে বিষণ্নতাকে বলা যায়। এটা তৃতীয় কাব্য 'সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর' থেকে দেখা দিতে থাকে। এমনকি 'তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ'-এও রয়েছে। এবং এই বিষণ্নতা আমার কাব্যিক পরিক্রমণে নানাভাবে গতিবিকাশী হয়েছে। তুমি পড়ে দেখো, সেটা বুঝবে।
প্রশ্ন: অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সের দিকে ঝুঁকে যাওয়া কী কবির ক্ষেত্রে অবধারিত?
উত্তর: এই নামটা একটি 'ফিগার অব স্পিস'। অর্থাৎ ইংরেজি মেটাফিজিক্স এসেছে গ্রিক থেকে যার অর্থ প্রকৃতি পেরিয়ে। আসলে মেটাফিজিক্স বলতে বোঝায় অস্তিত্বের আদি প্রকৃতি। এর মধ্যে সত্তাতত্ত্ব অন্তর্গত। দার্শনিক অধিবিদ্যা নয় এটা। আমি আসলে কিছু বিস্ময়চিন্তাকে আনার চেষ্টা করেছি। আগে বলেছি অনেকটা।
প্রশ্ন: আপনার কবিতায় জীবনের সঙ্গে মৃত্যু কিংবা অনস্তিত্ব, উপস্থিতির সঙ্গে অনুপস্থিতি, কেন্দ্রাভিমুখের সঙ্গে কেন্দ্রবিমুখতা আছে। এরকম কেন? আপনার মূল উদ্দেশ্যটা আসলে কী?
উত্তর: হা হা। আমার উদ্দেশ্যই বিধেয়। আমাদের জীবনের একটি বাইনারি আছে। এই বাইনারিকে বিরোধী না করে কী করে বিধেয় করা যায় এটা আমার উদ্দেশ্য। বলতে পারো, রিভার্স মিররিং। এই আর কী!
প্রশ্ন: কবিতা ও দর্শনের যে মিথস্ক্রিয়া, সেটা কী আপনি সচেতনভাবে প্রয়োগ করেন?
উত্তর: না, বিষয়টা সেরকম কিছু না। কবিতার দর্শন হলো তার চিন্তা, এটা সাধারণ দর্শনের মতো কোনো ব্যাপার না। আমাদের অস্তিত্ব পাঁচটি উপাদানে গঠিত, এর মধ্যে চারটিই মানসিক। বুদ্ধ দর্শনে একে বলা হয়েছে পঞ্চস্কন্ধ: রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান। একমাত্র রূপই বাহ্যিক, অর্থাৎ বস্তু। বাকি সব মানসিক। সুতরাং এই মানসিক অবস্থার যেকোনো অবলোকন রহস্যময় ও চেতনিক হবে। কবিতায় আমি এই রহস্যময়তাকেই বলতে চাই। আর একটি হলো, পৃথিবীতে এক বিশাল অজানার অন্বেষণ আমাদের মধ্যে চলতে থাকে, সেটা রহস্যময় বলেই দার্শনিক। আরেকটি হলো মুহূর্তের বাস্তবতাকে বোঝা, বর্তমানের অধিবিদ্যাকে খোঁজা। এই অন্বেষণ দার্শনিক। সুতরাং কবির যে দার্শনিকতা তা সাধারণ দর্শনচর্চা নয়, এটা আসলে অন্য কিছু। এটা হলো মুহূর্তের ইউটোপিয়াকে ধরা আর তার পিছু পিছু ছোটা । সুতরাং কবিতা দর্শনের মতো কোনো ধারণা বা কনসেপ্টনির্ভর বিষয় নয়। দর্শনের সত্য কনসেপ্টনির্ভর, আর কবিতার সত্য সৌন্দর্যনির্ভর। কবিতা ব্যবহার করে ফিগারেটিভ ভাষা আর দর্শন ব্যবহার করে ডিসকারসিভ ভাষা। আমি আমার কবিতায় সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে চাই চিন্তাকে, রহস্যকে প্রাধ্যান্য দিয়ে; এজন্য একে দর্শনের মতো মনে হয় অনেকের কাছে।
প্রশ্ন: পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০) যেটি টানা গদ্যে লেখা, আছে দীর্ঘ দীর্ঘ স্তবক— এই যে লেখার স্টাইলটাকে বদলালেন, এটা আসলে কেন?
উত্তর: আসলে কবিতাগুলি ডিমান্ড করছিল এই স্টাইলটির। এটা আপতিক নয়। তার আগের বই 'সমুদ্র, বিষণ্ণতা ও অলীক বাতিঘর'-এ সমুদ্র শিরোনামে বারোটির একটি সিরিজ কবিতা আছে, সেখানেও এই প্রোজ-পোয়েম ধারাটি ব্যবহার করা হয়েছে। আসলে যে ভয়েসটা আমি কবিতায় আনতে চেয়েছিলাম সেটা এই দীর্ঘ আঙ্গিকটি ছাড়া সম্ভব ছিল না। আসলে কবিতার ভাবই ভাষা ঠিক করে দেয় আর ভাষাই ঠিক করে দেয় আঙ্গিক। আমি যে ধরনের স্বরকে নির্ণয় করতে চেয়েছিলাম তার জন্য এ ধরনের ভাষাবোধে ওই কবিতাগুলিই আশ্রয় খুঁজেছিল। তবে একটা কথা, ভাব যখন ভাষাকে পেরিয়ে যায় তখনই প্রকৃত কবিতাটি খোলতাই হয়।
প্রশ্ন: 'মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা' প্রবন্ধগ্রন্থে যে প্রবন্ধগুলো আছে সেগুলো লেখার পেছনে কী মনোভাব কাজ করেছে? জীবন-মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন?
উত্তর: এটা আসলে একটি টেক্সট যার বিষয় হলো আত্মহত্যা। পরে অবশ্য আমি নামটা বদলে দিই। 'অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা' নামে বইটি প্রকাশ পায়। তবে প্রথম নামটা জনপ্রিয় হয়েছিল। লেখার প্রেক্ষাপটটা একটু বলা দরকার। আমি ছোটোবেলায় একটি আত্মহত্যার ঘটনা দেখেছিলাম। একজন মহিলা সম্ভবত এন্ড্রিন খেয়েছিল। খবর পেয়ে দৌড়ে তা দেখতে গেলাম, দেখলাম, মহিলাটি নিচে শোয়া, আর কয়েকজন লোক লেট্রিন থেকে মানুষের গু এনে গুলে তাকে খাওয়াচ্ছে। বিষয়টি তখন বুঝতে পারিনি। সম্ভবত গু খাওয়ানো হলে মহিলাটি বমি করবে এ ধরনের উদ্দেশ্য ছিল। যাক মহিলাটিকে রক্ষা করা যায়নি। মারা যাওয়ার পর তাকে দ্রুত কবর দেওয়া হলো যাতে পুলিশটুলিশ না করতে হয়। ছোটোবেলার এ ঘটনাটি আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। মাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন আত্মহত্যা চির পাপ, নরকে গমন। তার মানে আত্মহতের আত্মার মুক্তি নেই। এরপর একদিন ঢাকায় একটি বইয়ের দোকানে পেলাম একটি বই, নাম 'দ্য ফাইনাল ড্রাফ্টস', এতে অনেক কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের আত্মহত্যার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছিল। তো তখন বইটি নিয়ে মনস্থ করলাম আত্মহত্যা নিয়ে বই লেখার জন্য। তখন আমি নোয়াখালিতে চাকরি করি, একটা চিলেকোঠায় আমি একা থাকি, সামনে খোলা ছাদ। আমার পরিবার তখন ঢাকায়। তো অফিস সেরে এসে হাঁটতে বেরিয়ে যেতাম গ্রামের দিকে, মনে অনেক চিন্তা দানা বাঁধত। ফিরে এসে স্নানটান সেরে আত্মহত্যা নিয়ে লিখতে বসতাম। মাঝে মাঝে খোলা ছাদে গিয়ে সিগারেট খেতাম, আকাশ আর নক্ষত্র দেখতাম। দম নিয়ে আবার লিখতে বসতাম। পিয়ন রাতের খাবার নিয়ে আসত, খেয়ে আবার লেখা। সপ্তাহান্তে ঢাকায় এসে প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ করে আবার নোয়াখালি গিয়ে লেখা শুরু করতাম। খুব কষ্টকর কাজ ছিল, বিশেষত আত্মহতদের সম্বন্ধে জেনে রাতে একা একা ঘুমাতে পারতাম না। বইটি লেখার সময় মনোভাব ছিল, আত্মহত্যামাত্রই পাপের কিছু নয়, এটা এক অস্তিত্বসংকটের ফল। তো বলা যায় আত্মহত্যাকে দার্শনিক-সাহিত্যিক-বৈজ্ঞানিক-মনস্তাত্ত্বিক-ধর্মীয়-সামাজিক ইত্যাদি জায়গা থেকে আলো ফেলে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে বইটিতে। বইটি আমার একটি সিগনেচার গ্রন্থ বলা যায়। বাংলাদেশে বইটির চারটি সংস্করণ হয়েছে, কলকাতার 'তবুও প্রয়াস' প্রকাশনা এটির একটি চমৎকার সংস্করণ করেছে। একটু বলে রাখি, আমি কিন্তু আত্মহত্যায় বিশ্বাসী নই, হা হা।
প্রশ্ন: আচ্ছা কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদের মধ্যে কোন কাজটা আপনাকে বেশি আনন্দ দেয়?
উত্তর: নিঃসন্দেহে কবিতা। তারপর গদ্য। এর কারণটা নিশ্চয়ই জানতে চাইবে? কবিতা হলো সত্তার উৎসার। একক ও স্বাধীন। কবিতা হলো এক জাতীয় মনস্তত্ত্ব যার প্রেরণা আমরা জিনগতভাবে পেয়ে থাকি। এজন্যই সবার ভিতরে কবিতার অন্তরা বিরাজ করে। কবি শুধু সেটা আভোগ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমাদের অস্তিত্বের যে পাঁচটি উপাদান বা অবস্থা রয়েছে, যেটাকে বুদ্ধবাদে পঞ্চস্কন্ধ বলা হয়েছে, যেমন: রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞা— এর মধ্যে একটি ছাড়া (রূপ: বস্তু) বাকি সবই মানসিক। কবিতা কিন্তু সবগুলোর সাথেই সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এজন্যই কবিতাকে একটি অপরা সত্তা বলতে পারি আমরা। যা জিনগতভাবে বহন করি।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন যে, সাহিত্য খুব অবহেলিত ব্যাপার। লেখক এক প্রান্তিকায়িত সত্তা। সত্যিই কী তাই? আর চিরকালই কী এমন ছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, তাই তো। লেখকসত্তা হলো প্রান্তিক ও গুপ্ত সত্তা, গুহাহিত সত্তা। অবহেলিত হলো পারিবারিক, সামাজিক এমনকি ব্যক্তিক জায়গা থেকে। সমাজ কি সংসার লেখকদের জন্য কোনো স্পেস রাখে না। এমনকি লেখক পরিচয়টাও এ সমাজে যেন হাস্যকর। কেউ যদি বলে আমি কবি তো সবাই হেসে উঠবে। তার মানে লেখাকে কাজ ধরা হয় না। ফলে লেখকরা এ সমাজে স্পেসহীন, তারা প্রতিস্পেস তৈরি করে বেঁচে থাকেন। আগে লেখকদের কিছুটা রাজকীয় রূপ ছিল। দরবারের কবি, মাহফিলের কবি ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন তা নেই। পরিবারে লেখকসত্তা অহেতুক এবং অকর্মক একটি কাজ। লেখকের প্রকৃত জায়গা আসলে তাঁর নিজের ভিতরে। যেহেতু মেইন জায়গায় লেখকদের অবস্থান অনিশ্চিত বা বাতিল, তাই লেখকদের অবস্থা প্রান্তিক। কিন্তু প্রান্তিক বলে তুচ্ছ নয়। লেখকদের নিয়ে সমাজের ও সরকারের উদ্বিগ্নতা রয়েছে। সমাজমনস্তত্ত্ব ভাবতে থাকে যে আরে ওরা কী করছে। সরকারের কাছে তারা উদবিগ্নতা সৃষ্টি করে, কারণ লেখকরা ভাষার বা সংস্কৃতির পিলারাইজেশন তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। তাঁরা সমাজের ভাষা ও মনন নির্মাণ করেন। মানুষের সাংস্কৃতিক ভাষার স্রষ্টা লেখকরা। মানুষের যৌথ মনস্তত্ত্ব নির্মাণে লেখকদের ভূমিকা একক। সুতরাং লেখক প্রান্তিক সত্তা হলেও লেখা প্রান্তিক নয়। এটার একটি চিরন্তনতা আছে। আর কেন্দ্রীয় সত্তায় লেখকদের অবস্থান তো সন্দেহজনক।
প্রশ্ন: আপনি তো একজন দক্ষ অনুবাদক। তাই আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি—বাংলা ভাষায় যে সমস্ত লেখালেখি হয়েছে বা হচ্ছে, অন্য ভাষায় সেগুলোর অনুবাদ তুলনামূলকভাবে কেন এত কম?
উত্তর: আসলে আমি তো একঅর্থে অনুবাদকই নই। যেগুলি করেছি তা প্রাণের টানে। কারণ তাঁরা আমার প্রিয় কবি। নিছক ভালোবাসা থেকে এসব অনুবাদ করা। আমি এসব অনুবাদের মাধ্যমে আমার প্রিয় কবিদের নিজ ভাষায় অনুভব করতে চেয়েছি, ভাষার প্রবাহকে বুঝতে চেয়েছি, তাঁদের মনঃশারীরিক অবস্থাকে বুঝতে চেয়েছি। অনুবাদ দু-দিকে যায়। একটি নিজ ভাষামুখী অন্যটি অপর ভাষামুখী। এখন কথা হলো আমাদের বাংলা ভাষার লেখা অন্য ভাষায় কম অনুবাদের কারণ কী। আসলে কি জানো, আন্তর্জাতিক হতে হলে ভাষার শক্তির যেমন প্রয়োজন তেমনি রাষ্ট্রের শক্তির প্রয়োজন। রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে এখন তার ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। আমরা জাপান ও চিনের দিকে বা হালের কোরিয়ার দিকে তাকালে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যাবে। তা ছাড়া সফ্ট পাওয়ার একটা বড়ো ভূমিকা রাখে। সফ্ট পাওয়ারের মাধ্যমে নিজ দেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ইত্যাদিকে বিশ্বে তুলে ধরতে পারলে বাংলা ভাষার প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি পড়বে। আরেকটি বিষয়, অন্য ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। আমাদের যেসব অনুবাদ হয় তা হয় ব্যক্তির উদ্যোগে। অনুবাদও দুর্বল। উদ্দেশ্য-ভাষার ওপর দখল কম। একটা বিষয়, বিদেশি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে নিজ ভাষা থেকে উৎস ভাষা কম জানলেও অনুবাদ করা যায় কিন্তু বাংলা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রে এমনটা হলে হবে না। অর্থাৎ, উদ্দিষ্ট ভাষার ওপর পুরো দখল থাকা খুব জরুরি। এছাড়া উদ্দিষ্ট ভাষার সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে জানাও খুব জরুরি। বর্তমানে সারা পৃথিবীতেই কমোপিফিকেশন অব লিটারেচার ঘটছে। এক্ষেত্রে সাহিত্যের এক ধরনের কাসকেডিং অত্যন্ত দরকার।
প্রশ্ন: আপনাকে অনেক ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করে ফেললাম, এবার আরেকটি বিষয় জানতে চাই—পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের মধ্যে কারা আপনার বিশেষ পছন্দের?
উত্তর: অনেকের লেখাই। একসময় ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় ডুবে ছিলাম, এক অনিষ্পন্ন বিষণ্ণতায় ঢুকে যেতাম আমি। উৎপলকুমার বসু আমার প্রিয় কবি। জয়ের প্রথম দিকের কবিতাগুলি একসময় স্নায়ুতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। অনন্য রায় পড়তাম খুব। আমার বন্ধু রাহুল পুরকায়স্থর কবিতা আমার প্রিয়। এমনকি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাও ভালো লেগেছিল। রণজিৎ দাশ ভালোলাগার কবি। কবিতা ছাড়া অরিন্দম চক্রবর্তী, বিমলকৃষ্ণ মতিলাল, শঙ্খ ঘোষ, রণজিৎ গুহ, চিন্ময় গুহর গদ্য আমার প্রিয়। আসলে এভাবে বলা যায় না। বলা ঠিকও নয়। যেমন তোমাদের কোচবিহারের লেখক অরুণেশ ঘোষের গদ্য আমার প্রিয়; তাঁর জীবনানন্দ বিষয়ক ছোটো বইটি তো আমার বিবেচনায় জীবনানন্দের ওপর লেখা অন্যতম সেরা একটি বই। আসলে আমি একটু চার্জড গদ্য পছন্দ করি। যা স্নায়ুউদ্দীপক।
প্রশ্ন: আপনার সমসাময়িকদের মধ্যে কাদের লেখা আপনার ভালো লাগে?
উত্তর: তুমি কি বাংলাদেশের কথা বলছ? ধরে নিলাম তাই। আসলে নাম নেওয়া একটু ঝুঁকিময়। কারও নাম বাদ গেলে সেটা ব্যক্তিগত আক্রোশে এসে পৌঁছে। তবে বেশ কয়েকজনের লেখাই আমি পছন্দ করি। নাম নিচ্ছি না। সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ থাকুক।
প্রশ্ন: আপনি সঙ্গীত পছন্দ করেন জানি, কিন্তু আর কী কী জিনিস আছে যা আমরা এখনও জানি না?
উত্তর: বুঝেছি, তুমি আমার অপর দিকটা জানতে চাও। একটা জিনিস আমি প্রায় প্রতিদিনই করি, তা হলো, দিনের কোনো এক সময়ে আমি ঘরের বাইরে বিশেষত জননির্জন জায়গায় যাই, ধীরে চলতে থাকি। প্রকৃতির প্রত্যেকটি উপস্থিতি ও অনুপস্থিতিকে পরখ করে দেখি। আলোর পরিবর্তন এবং এর সঙ্গে অণুবিশ্বের রূপ রূপান্তরকে আমি পর্যবেক্ষণ করি। একই সাথে প্রকৃতির ভাবটাকে বোঝার চেষ্টা করি। কখনও ছবি তুলি। ধরতে চাই বাস্তবতার নানা অবস্থান। ক্যাপচারিং দ্য মোমেন্ট আর কী! একটা ব্যাপার কি জানো, ক্যামেরা সবকিছুকে একটু সুন্দর করে ফেলে কিন্তু বিশুদ্ধ সুন্দরকে সে ধরতে পারে না। দারুণ সুন্দর কোনো কিছুকে ক্যামেরা ম্রিয়মাণ করে ফেলে। আমি লুকানো বা বদলে যাওয়া বাস্তবতার আলোছায়াকে ধরতে চেষ্টা করি। মৌহর্তিক অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স অব প্রেজেন্টসকে ধরতে চেষ্টা করি। সাধারণত মধ্যদিনটা আমার প্রিয় তবে তা হতে পারে বিকেলের দিকেও, বিশেষত বিকেল যখন ঢলে পড়তে থাকে গোধূলির দিকে। দেখবে তখন একটি অলীক মায়ার সৃষ্টি হয় চারপাশে। অলীক কিন্তু মিথ্যা নয়, অলীক হলো হতবুদ্ধিকর, যা আমাদের ঘোরগ্রস্ত করে। এটাকে আমি বলি আমার অণুভ্রমণ। আমার আত্মার চলাফেরা। অণুবিশ্ব আর মহাবিশ্বের প্রতি আমার এই শিশুতোষ অবলোকনটা কবিতা লেখায় কাজে আসে। তখন আমি, বস্তুবিশ্ব আর মহাবিশ্বের মধ্যে একটা সম্বন্ধ রচিত হয়। নানা ফুল দেখি। ফুলকে মনে হয় এক অলৌকিক বাস্তবতা। আমার বিশ্বাস, এই দিকটা একান্তই আমার, এখানে কেউ নেই। আমার ক্ষুদ্রত্ব আর বৃহত্ত্ব একাকার হয় তখন। এভাবে সময়ের এক অপসৃয়মাণতাকে বুঝতে পারি অন্যভাবে। আমার 'আত্মধ্বনি' ও 'পথিকমন' বইয়ে তার কিছুটা স্পর্শলেখ আছে। এ দুটি গদ্য গ্রন্থ। আসলে ছোটোবেলাতেও আমি একা একা ঘুরতাম বেশ। পাখিদের পিছন পিছন। একবার একটা চড়ুই মেরে ফেলেছিলাম তা আজও মনে কষ্ট দেয়। আরেকবার গঙ্গাফড়িঙের ল্যাজের পিছনটা একটু ছিড়ে ফেলে তাতে কাঠি ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম পরখ করতে যে ফড়িংটা কাঠিটা নিয়ে উড়তে পারে কি না। ফড়িংটা উড়তে গিয়েই পড়ে গিয়েছিল। এ কষ্ট আমাকে এখনও পীড়া দেয়, নিজেকে মনে হয় সেই কাঠি ঢোকানো ফড়িঙের মতো। এ নিয়ে আমার একটি কবিতা আছে: ‘ফড়িং ও সরলকাঠি’ নামে। আর তুমি প্রথমেই বলেছ যে সংগীত আমি পছন্দ করি। বিশেষত স্তব্ধ জায়গায় একটি 'সা'-কে অনুভব করি আমি, শুধু 'সা'। হ্যাঁ, সংগীতে আমি আমার আত্মার প্রতিধ্বনিকে খুঁজে পাই। শুধু পছন্দই করি না, সংগীত আমি চর্চাও করি। তবে সেসব কোনো ফরমাল কিছু নয়, আমার একান্ত মানসিক অনুশীলন। ভালোবাসার ধনকে আগলে রাখার মতো। তবে একটা কথা, সংগীতে আমি শুধু সামান্য শ্রোতা নই, আমি একজন ট্রাভেলার। আর হ্যাঁ, শুধু হাই থট বললে কেমনে হয়! আমি পছন্দের মদ খেতে আর সিগারেট খেতে খুব পছন্দ করি। নারীদের দেখতে খুব পছন্দ করি, তাদের লিভিং বিউটি এনজয় করি। এগুলি আমার ক্যাথারসিস ঘটায়।
প্রশ্ন: ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে আপনার মোট বইয়ের সংখ্যা কত সেই তালিকাটা যদি বলতেন...
উত্তর: কবিতা ৮টি ( লগপুস্তকের পাতা, আয়না ও প্রতিবিম্ব, সমুদ্র বিষণ্ণতা ও অলীক বাতিঘর, পাখিদের নির্মিত সাঁকো, হারানো ফোনোগ্রাফের গান, তবে এসো হে হাওয়া হে হর্ষনাদ, অধিবিদ্যা সিরিজ, আমার শীতের মদ; প্রবন্ধ ১০টি ( ভাবনাবিন্দু, ভাবনা ও নির্মিতি, অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা, কবিতার অন্ধ নন্দন, ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপ চিন্তা, উৎসব, আত্মধ্বনি, পথিকমন, মৃতদের সমান অভিজ্ঞ, খেয়ালপাতার গান); অনুবাদ ৬টি (টোমাস ট্রান্সট্রোমারের কবিতা, ইহুদা আমিহাইয়ের কবিতা, চেসোয়াভ মিউশের কবিতা, জর্জ সেফেরিসের কবিতা, ফিরনান্দো পেসোয়ার কবিতা, শুনতারো তানিকাওয়ার কবিতা। তো সব মিলিয়ে ২৪টি। এর মধ্যে সংকলনকে বাদ রাখা হয়েছে।
প্রশ্ন: সবশেষে জানতে চাই, আপনার সম্পর্কে বলা হয় যে আপনি ভিড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, আড়াল খোঁজেন, একা হতে চান—বর্তমানের কুমার চক্রবর্তী কী একই রকম আছেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথের একটি প্রবন্ধ আছে ‘গুহাহিত’ নামে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন জীবনের গুপ্ত ও গভীর দিকটির কথা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে মানুষ দ্বিজ, তার জন্মক্ষেত্র দুই জায়গায়: এক জায়গায় সে প্রকাশ্য আর অন্য জায়গায় সে গুহাহিত বা গভীর। তো এটা কমবেশি সবার জন্যই সত্য। কারও মধ্যে এক একটার প্রাবল্য থাকে। আমার মধ্যে গভীর দিকটা একটু প্রবল যা আমাকে বাইরের জগতের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। নিজের মধ্যে আমি গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করি। এমনও দিন গেছে আমি তিন দিন একা একা এক ঘরে কাটিয়ে দিয়েছি। ভিড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার আরেকটি কারণ হলো আমি একসাথে অনেকের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারি না এবং তাদের ভাষাও বুঝতে পারি না। অন্যের কথা বুঝতে আমার সমস্যা হয়। এজন্য আমি সিনেমার সংলাপ বুঝতে পারি না, গানের বাণী ভুল করি। এটা মনে হয় এক ধরনের কনজেনিটাল সমস্যা। আসলে নীরবতাকে আমি খুব এনজয় করি। ছাত্রজীবনে অনেকের সাথে দেখা হবে বলে আমি অনেকদিন ডাইনিংয়ে খেতেই যেতাম না। একসাথে থাকতে হবে বলে শিক্ষাসফরেও যেতাম না। আমার রুমমেট চলে গেলে পুরো রুমে আমি একাকিত্বকে অনুভব করতাম। আমি কারও সঙ্গে থাকতে পারি না, একা একটি ঘরে থাকি, ঘুমাই। এসবের অর্থ, আমি মানবদূরত্ব রক্ষা করে চলি। এই ধরনের গুহাহিত মানুষের কাজ বেশি হয় নিজের সত্তার সঙ্গেই। আমি বিষণ্ণ ও একা। এটাকে আমি ভাঙতেও চেয়েছি, মানুষের সঙ্গে জোর করে মিশতে চেয়েছি কিন্তু তাতে করে আমার আচরণের অস্বাভাবিকতাই বেশি বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন: আপনার সঙ্গে কথা বলে খুবই ভালো লাগল। কত কী জানতে পারলাম। আপনি আমাকে এতটা সময় দিলেন তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাই।
উত্তর: ভালো লাগার কী কারণ তা জানি না। তো বলি, আড়ালের জীবনই আসল জীবন, বুঝলে সাথী। আমি হতাশাবাদী মানুষ , আমি আসলে একা। তবে তা ধ্বংসাত্মক দুঃখবাদ ধরনের কিছু নয়। এটা হলো নান্দনিক হতাশাবাদ। এই নান্দনিক হতাশাবাদ মানুষকে সৃষ্টিশীল রাখে। আমিও সৃষ্টিশীল থাকতে চাই। প্রুস্তের একটি কথা আছে: happiness is salutary but sorrow develops the spirit of mind, মহাভারতে বলা হয়েছে সর্বম দুঃখম্। মানুষ পতিত সত্তা। এই পতনকে এনকাউন্টার দেওয়ার জন্যই সে শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-বিজ্ঞান এসবের চর্চা করে। কিন্তু শিল্পকে খুঁজতে গিয়ে তার সময় শেষ হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত শিল্প অধরাই থেকে যায়। তবু এই অজানার অন্বেষণে কিছু মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা বোধকরি মানুষের জেনেটিক অর্ডারের একটা দিক। তবে একটা কথা, আমি আড্ডাবাজও। খুব কাছের অনেক বন্ধুবান্ধব আছে আমার যাঁদের সঙ্গে মাঝেমাঝে আড্ডা দিই আমি। শিল্পসাহিত্য নিয়ে, গান নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে। একদম নারী থেকে ঈশ্বর পর্যন্ত। প্রয়াত কবি রাহুল পুরকায়স্থ ছিল এমনই এক বন্ধু আমার। এখনও তাঁর ডাক শুনি: কুমার, খবর কী? হায় রাহুল!
তোমার সাথে এই কবিতালাপ একটি চিরকালীন ভালোলাগা হয়ে থাকবে আমার কাছে। আমাদের সংস্কৃতিতে শতায়ু কামনা করার একটি রীতি রয়েছে। শতবর্ষী হওয়ার কামনা করা। সম্ভবত অশ্বত্থ গাছকে মনে রেখে এ ধরনের শুভ কামনা জানানোর রীতি চালু হয়েছে। তো আমি তোমার শতায়ু কামনা করছি। তুমি কিন্তু আমার জন্য তা করবে না, কারণ আমি শতায়ু হতে চাই না, চাই রবীন্দ্রনাথের সমান আয়ু।










