নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের বিশেষ সাক্ষাৎকার ।। পর্ব-১

অনুবাদ : আলমগীর মোহাম্মদ
০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:০৭ আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:০৭

‘ব্রিক’ সাহিত্য সাময়িকীর ৮৯তম সংখ্যায় প্রকাশিত এলিনর ওয়াখটেলের নেওয়া অ্যান কারসনের সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন আলমগীর মোহাম্মদ।

কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যের পণ্ডিত এবং লিব্রেটিস্ট অ্যান কারসনকে আমি বহু বছর ধরে শ্রদ্ধা করে আসছি। ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির ক্লাসিকসের অধ্যাপক হিসেবে তার কথা প্রথম শুনেছিলাম। তার সেই সূচনাটি হয়েছিল এক বিচিত্র ও সুগভীর অ্যাকাডেমিক গ্রন্থ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ দিয়ে। যেখানে প্রাচীন দর্শনের সঙ্গে মিশেছে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সূক্ষ্ম রসবোধ ও সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি।

এরপর তিনি কবিতা ও প্রবন্ধের মেলবন্ধনে দুটি অসাধারণ বই উপহার দেন। হ্যারল্ড ব্লুম, সুসান সনট্যাগ এবং অ্যানি ডিলার্ডের মতো সাহিত্যিকরা তাকে এক অনন্য ও মৌলিক কণ্ঠস্বর হিসেবে অভিবাদন জানান। তিনি গুগেনহেইম ও ল্যানান ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ এবং ম্যাকআথার ‘জিনিয়াস’ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০১ সালে প্রকাশিত বই ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড: এ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাঙ্গোজ’-এর জন্য তিনি প্রথম নারী হিসেবে ইংল্যান্ডের সম্মানজনক ‘টি. এস. এলিয়ট পোয়েট্রি প্রাইজ’ অর্জন করেন। বইটি কানাডার 'গ্রিফিন প্রাইজ'-ও লাভ করে। এর মাঝেই ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ নামের আরেকটি ব্যতিক্রমী বই দিয়ে তিনি দারুণ জনপ্রিয়তা পান। অন্টারিওর ছোট শহর ও পেরুর পটভূমিতে রচিত এই বইটিতে গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির সাথে আধুনিক সমকামী প্রেমের গল্প বুনে দেওয়া হয়েছে। বুঝতে পারছেন আমি কী বোঝাতে চাইছি?

অ্যান কারসনের সাম্প্রতিক কাজ ‘নক্স’ আরেকটি বিস্ময়কর ও বিষাদময় বই। ২০০০ সালে প্রয়াত তার ভাইয়ের স্মরণে রচিত এই শোকগাথাটিকে (যাকে তিনি ‘স্মৃতিফলক’ বলেন) সাজানো হয়েছে স্মৃতির খাতা, ছবির টুকরো, চিঠি ও আঁকা ছবির কোলাজে। বইটির প্রথম পাতাতেই তিনি লিখেছেন: "আমি আমার এই শোকগাথাকে সব ধরনের আলোয় ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মৃত্যু আমাদের কৃপণ করে তোলে। আমরা ভাবি, এ বিষয়ে আর তো কিছুই ব্যয় করার নেই। সে মারা গেছে। ভালোবাসা একে বদলাতে পারবে না। শব্দ এতে কিছু যোগ করতে পারবে না। সে যে তারকাখচিত দুরন্ত ছেলেটি ছিল, তাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, শেষ পর্যন্ত তা এক সাধারণ, অদ্ভুত ইতিহাস হয়েই রয়ে যায়।”

২০১১ সালের জুনে ব্যানফ সেন্টারে ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি ট্রান্সলেটরস রেসিডেন্সিতে থাকার সময় তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল।

আপনার কাজের একটি বড়ো অংশ জুড়েই রয়েছে প্রাচীন ধ্রুপদী যুগ, গ্রিক মিথের উল্লেখ, লাতিন ও গ্রিক সাহিত্যের অনুবাদ এবং প্রাচীন চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রবন্ধ। কোন জিনিসটা আপনাকে প্রথম সেই জগতের দিকে টেনেছিল?

যতদূর মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালের দিকে অন্টারিওর হ্যামিল্টনের এক শপিং মলে একটা ঘটনাটা ঘটে। আমি একটা বইয়ের দোকানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। কী এক অজানা কারণে সেখানে অনুবাদক ও সম্পাদক উইলিস বার্নস্টোনের ‘স্যাফো’র একটি দ্বিভাষিক সংস্করণ ছিল, বামে গ্রিক আর ডানে ইংরেজি। দেখতে এত আকর্ষণীয় লেগেছিল যে মনে হলো, আমার ভাষাটা শেখা উচিত। পরের বছর আমরা পোর্ট হোপে চলে যাই। আমি সেখানকার এমন একটি হাই স্কুলে ভর্তি হই, যেখানে লাতিন শিক্ষকের গ্রিক ভাষাতেও দখল ছিল। আমি আগ্রহী জেনে তিনি দুপুরের টিফিনের সময় আমাকে গ্রিক শেখানোর প্রস্তাব দেন। তাই আমার ক্যারিয়ার ও জীবনের সমস্ত সুখের জন্য আমি পোর্ট হোপ হাই স্কুলের অ্যালিস কাউয়ানের কাছে ঋণী।

ঠিক কী দেখে এমনটা মনে হয়েছিল? ভাষাটা দেখতে কি খুব অচেনা বা অদ্ভুত সুন্দর লেগেছিল?

কিছুটা দৃশ্যমান নান্দনিকতার জন্য, তবে সেই সময় আমি নিজেকে অস্কার ওয়াইল্ডের এক পুনর্জন্ম বলে কল্পনা করতে ভালোবাসতাম। অস্কার ওয়াইল্ডের সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জগৎ, যেখানে লাতিন ও গ্রিক ভাষার বড়ো ভূমিকা ছিল, তা আমার কাছে রূপকথার মতো মনে হতো। আমি ভেবেছিলাম, আমি যদি গ্রিক শিখতে পারি, তবে আমি আরও বেশি অস্কার ওয়াইল্ডের মতো হতে পারব। এটিই স্বাভাবিক পরবর্তী পদক্ষেপ মনে হয়েছিল।

পুনর্জন্ম নেওয়া অস্কার ওয়াইল্ড!

আমার একটা অস্কার ওয়াইল্ড মার্কা পোশাকও ছিল, যা মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো উপলক্ষ্যে পরতাম। আমার মনে হতো উনি সবচেয়ে চমৎকার মানুষ।

আপনি কি চটজলদি তীক্ষ্ণ বা রসাত্মক মন্তব্য ছুড়ে দিতেন?

সাক্ষাৎকার চলাকালীন আপনি নিজেই টের পাবেন। না, আমার বুদ্ধি অত দ্রুত খেলে না, তবে বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা আমি বেশ উপভোগ করি।

লাতিন ও গ্রিক বিশেষ করে গ্রিক পড়া শুরু করার পর, আপনার কি মনে আছে প্রথম কোন মিথগুলো শুনেছিলেন?

সম্ভবত স্যাফো যেগুলোর উল্লেখ করেছেন সেগুলোই, যা সাধারণত প্রচলিত মিথগুলোর মতো নয়। যেমন নাইওবি-এর কথা ধরা যাক, যিনি এত কেঁদেছিলেন যে শেষে পাথরে পরিণত হন। সবচেয়ে স্পষ্টভাবে মনে আছে টিথোনাসের মিথটি। টিথোনাস ছিলেন তরুণ, যিনি ভোরের দেবীর প্রেমে পড়েছিলেন। তাদের দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। একদিন তিনি দেবীর কাছে অমরত্ব চাইলেন। তিনি দেবতা হয়ে সারাজীবন তার সাথে বাঁচতে চেয়েছিলেন। দেবী জিউসের কাছে গিয়ে বললেন, “আপনি কি টিথোনাসকে অমর করে দিতে পারেন?” জিউস বললেন, “অবশ্যই” এবং তাকে অমর করে দিলেন। কিন্তু জিউস তাকে চিরতরুণ থাকার বর দেননি। ফলে বেচারা টিথোনাস শুকাতে শুকাতে একটা ছোট্ট ঝিঁঝি পোকার মতো হয়ে গেলেন, যা ভোরের দেবীর জন্য আর তেমন উপভোগ্য রইল না।

সূক্ষ্ম শর্তাবলিতে খেয়াল রাখা দরকার!

হ্যাঁ, শব্দের প্রয়োগ। শব্দের প্রয়োগই আসল।

গ্রিক ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে আরেকটু বলুন। মানে, এটা পরিষ্কার যে আপনি একে আঁকড়ে ধরেছিলেন এবং এটিই আপনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তবে এই সংস্কৃতি, ভাষা বা এর জটিলতার কোন দিকটি আপনাকে টেনেছিল?

আমার মনে হয় কিছুটা সাহিত্যকর্মগুলোর বিষয়বস্তুর কারণে। এগুলো মানুষের সৃষ্টি করা অন্যতম চিন্তাশীল সাহিত্য। তবে অনুবাদের মধ্যে ডুবে থাকার মানসিক প্রক্রিয়াটাকেও আমি ভীষণ ভালোবাসি। এটা যেন এক অনন্ত শব্দজট মেলানোর মতো, যার শেষে একটা মূল্যবান ফসল পাওয়া যায়। মনের এই ধাঁধা মেলাবার অবস্থাটিই সবচেয়ে দারুণ।

আপনি একবার বলেছিলেন যে, আজকের দিনে আমাদের আধুনিক জগতের সাথে প্রাচীন অধিবাসীদের খুব একটা প্রাসঙ্গিকতা নেই। সত্যি বলতে, কথাটা আমাকে অবাক করেছিল। কারণ আমরা তো অতীত থেকে সবসময়ই প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।

আমি ঠিক সেভাবে বলিনি, আমি উলটোভাবে বলতে চেয়েছিলাম। মূল বিষয় হলো, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা আসলে কী করছিলেন তা ফিরে গিয়ে অনুধাবন করা এবং তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হওয়াটাই আমাদের আসল কাজ। জন কেজ বলেছিলেন, “কেউ যখন সত্যিই মন দিয়ে শুনতে শুরু করে, তখন তার নিজের কোনো চিন্তা থাকে না।” অতীত অধ্যয়নের ক্ষেত্রে এটাই আসল, প্রাচীনদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাদের জায়গায় নিজের মনের ভাবনা বসিয়ে ‘তারা আমাদের কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক’ তা খোঁজা নয়।

এর কারণ কি তারা জগৎটাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখতেন, নাকি তারা সময় ও ভাষার বিচারে আমাদের থেকে এতটাই দূরে যে তাদের নতুন করে বুঝতে হয়?

তারা এমন সব মূল বা শেকড়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, যা পরবর্তীকালে বেড়ে উঠে সেই বৃক্ষে পরিণত হয়েছে যেখানে আমরা আজ বাস করছি। তাদের ধারণাগুলো একেবারে তরতাজা, যেন শিশিরভেজা। হাজার বছর পর আমাদের ধারণায় হয়তো তার কিছুটা অবশিষ্টাংশ আছে, কিন্তু সেগুলোর ওপর শতাব্দীর পর শতাব্দীর পলি জমে গেছে। গ্রিকদের কাছে জগতের নতুনত্ব বারবার ভোরে আলোর মতো উন্মোচিত হতো।

আপনি কি মনে করতে পারেন ঠিক কোন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে এটিই আপনার জীবনের মূল বিষয় হতে যাচ্ছে?

মিসেস কাউয়ানের কাছে পড়ার সাথে সাথেই।

তাই?

হ্যাঁ, এতে কোনো দ্বিধা ছিল না।

একদম প্রথম দর্শনে প্রেম!

হ্যাঁ। তিনি খুব অদ্ভুত একজন মানুষ ছিলেন। তার শরীর থেকে সবসময় সেল্যারির গন্ধ বের হতো। সেই বছরের পর তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন বোধহয়। কেউ একজন আমাকে বলেছিল তিনি আফ্রিকায় চলে গেছেন। কয়েক দশক পর, যখন আমি মন্ট্রিঅলে একটি পাঠানুষ্ঠানে গ্রিক সাহিত্য নিয়ে বলতে গিয়ে তার কথা উল্লেখ করলাম, তখন এক মহিলা এসে বললেন, “অ্যালিস কাউয়ান আমার মা। তিনি এখন উত্তর অন্টারিওর একটি খামারবাড়িতে থাকেন, একপ্রকার সন্ন্যাসীর মতো। তিনি হয়তো আপনার চিঠি পেলে খুশি হবেন, তবে কোনো উত্তর দেবেন না।” আমি তাকে একটি চিঠি লিখেছিলাম এবং সত্যি সত্যিই তিনি কোনো জবাব দেননি। অ্যালিস কাউয়ান সম্পর্কে এটুকুই আমার জানা।

অ্যান কারসন
আপনার সাম্প্রতিক বই ‘নক্স’ একধরনের শোকের প্রকল্প, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের রোমান কবি ক্যাটুলাসের একটি কবিতার প্রতিশব্দ অনুবাদের মধ্য দিয়ে তৈরি করা ২০০০ সালে প্রয়াত আপনার ভাইয়ের একটি স্মৃতিফলক। ক্যাটুলাসের কবিতার প্রতিটি লাতিন শব্দের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা রাখা হয়েছে, বিপরীত পৃষ্ঠায় আপনি আপনার নিজস্ব কবিতা, ভাবনা, ছবি ও নানাবিধ স্মৃতির টুকরো সাজিয়েছেন। এই ভাবনাটা কোথা থেকে এলো?

সম্ভবত দ্বিভাষিক অনুবাদের কাঠামো থেকে। কারণ জীবনের অনেকটা সময় আমি এমন বই দেখে কাটিয়েছি। যেগুলোর বাম পৃষ্ঠায় গ্রিক বা লাতিন ও ডান পৃষ্ঠায় ইংরেজি থাকে। এই দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়। দুটি ভাষার মাঝের সেই সরু প্রণালীটিতে চিন্তা করতে শেখায়, যেখানে একটি নিখুঁত ভাষা বিরাজ করে।

আমি বুঝতে পারছি কেন এটা আকর্ষণীয়। কারণ বিস্তৃত আভিধানিক অর্থসহ প্রতিটি শব্দ যখন আলাদাভাবে আসে, তখন তা পাঠককে গতি কমিয়ে ধীরস্থির হতে বাধ্য করে।

শুনে ভালো লাগলো। এটা করার সময় আমি ভেবেছিলাম মানুষ কি সত্যিই বাম পাশের পৃষ্ঠাটা পড়ার কষ্ট স্বীকার করবে, নাকি ভেবে বসবে— 'এত কিছুর মধ্য দিয়ে যাওয়ার দরকার নেই' বলে পরের পৃষ্ঠায় চলে যাবে? তাই আমি চেয়েছিলাম তারা যেন একটু ধীরে এগোয়। আভিধানিক তথ্যগুলো অভিধান থেকেই নেওয়া, তবে খানিকটা পরিবর্তন করা হয়েছে। আমি চেয়েছিলাম পাঠক যেন ধীরে ধীরে তা খেয়াল করেন। সূত্রগুলো ধরে এগোন। প্রক্রিয়াটা অনেকটা ধাঁধার মতো।

কারণ আপনি অক্সফোর্ড লাতিন অভিধানের ভুক্তিগুলোকে কিছুটা নিজের মতো করে সাজিয়েছেন।

হ্যাঁ, আমি একটু-আধটু পরিবর্তন করেছি যাতে আরও বেশি ‘নক্স’ মিশিয়ে দেওয়া যায়।

ফরাসি মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জাক লাকাঁর একটি উক্তি আপনি উদ্ধৃত করেছিলেন— “আমরা জ্ঞানের জন্য কবিতার কাছে যাই না, যাই জ্ঞানকে ধ্বংস বা ভেঙে ফেলার জন্য।” কবিতা কীভাবে সেটা করে?

মতামত দেওয়ার সময় আমি তথ্যের যে ভিত্তির ওপর ভর করে থাকি, তা থেকে দূরে সরে যাওয়াটা আমার এক ধরনের তাগিদ বা তীব্র উন্মাদনা। আমার মনে হয় কাব্যিক চর্চা হলো তার একটি পথ। কাব্যিকভাবে চিন্তা করার সময় আপনাকে উঁচু দালান থেকে লাফ দিতে হয়। আপনি ডেটা বা তথ্য জমিয়ে পয়েন্ট ধরে ধরে এগোবেন না, আপনাকে শুধু সেই মুহূর্তে যা জানেন তা অনুধাবন করতে হবে। এর মধ্যে অদ্ভুত এক মুক্তি আছে।

‘ভেঙে ফেলা’ বা ‘খোসা ছাড়ানো’ বলতে আমি হয়তো একটু বেশিই আক্ষরিক অর্থ ধরে ফেলছি। কারণ যখন কবিতার শব্দে শব্দে ব্যবচ্ছেদ করার কথা ভাবি—

হ্যাঁ, আপনি কোনো শব্দের অর্থ একেবারেই বুঝে গেছেন এই আত্মবিশ্বাসটা নিজেই একটা আস্ত আবরণ। কিন্তু বাস্তবে আমরা তা জানি না। শব্দগুলো কেবল কিছু চিহ্ন, যা আমরা অভিধানে পেরেক দিয়ে পুঁতে রাখার ভান করি। ব্যবহারের কিছু প্রতীক মাত্র। কিন্তু সত্যি বলতে, সেগুলো সবই অনিয়ন্ত্রিত সত্তা। একে ভেঙে ফেলা বা ব্যবচ্ছেদ করা হলো ভাষার তলদেশে লুকিয়ে থাকা সেই রূপকথা বা ভুল ধারণাকে উন্মোচিত করার একটা উপায়।

আপনি কি এই ভুল ধারণার (মিথ) কথাই বলছেন?

সেই রূপকথা বা ধারণা যে আপনি একে চূড়ান্তভাবে জেনে গেছেন। এটা ব্যবহার করা যায়, হ্যাঁ। এর থেকে অর্থ তৈরি করা যায়, অবশ্যই। কিন্তু একে সম্পূর্ণরূপে জানা? আমি নিশ্চিত নই।

ক্যাটুলাসের ১০১ নম্বর কবিতাটি একাধিকবার অনুবাদ করার চেষ্টা করেছেন। প্রথম কখন চেষ্টা করেছিলেন?

সম্ভবত মিসেস কাউয়ানের কাছে পড়ার সেই বছরেই। এটা ক্যাটুলাসের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা, তাই সবাই এটা অনুবাদের চেষ্টা করে। ওপর থেকে দেখলে এটা ছলনাময়ভাবে সহজ, কিন্তু ভেতরের গভীরতাকে ধরা অসম্ভব। একটা নিখুঁত কবিতা।

এটা অনুবাদ করা এত কঠিন কেন?

সেটা বেশ জটিল। কিছুটা ক্যাটুলাসের শব্দচয়নের কারণে, তিনি প্রচলিত লাতিন কাব্যভাষাকে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার মিশ্রণে নতুন করে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি রাস্তার চলতি ভাষায় প্রচুর কবিতা লিখেছেন। এগুলো অনেকটাই ছিল নোংরা বা অশ্লীল। কিন্তু তার আনুষ্ঠানিক বা গম্ভীর কবিতাগুলোতেও তিনি রাস্তার ভাষার সেই শক্তি ধরে রেখেছিলেন। এছাড়া আমার মনে হয়, যেকোনো পরিস্থিতিকে একদম সংক্ষেপ করে শুধু তার মূল কাঠামোটুকু তুলে ধরার অদ্ভুত এক দক্ষতা তার ছিল, যা অন্য ভাষায় ফুটিয়ে তোলা কঠিন।

যদিও আমার মনে হয় দুটো দিকই আপনাকে আকর্ষণ করবে, চলতি ভাষার প্রয়োগ ও একই সাথে গাম্ভীর্যপূর্ণ বা শোকাতুর কবিতার সংমিশ্রণ।

এটা ঠিক যে আমি আলোচনার ধরণগুলো মিশিয়ে ফেলি, হয়তো অজান্তেই। তবে আমার বিশ্বাস ক্যাটুলাস তা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই করেছিলেন। কারণ প্রচলিত ধারার কবিতায় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ভাষার সংস্কার চেয়েছিলেন। আমি অতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কি না জানি না, তবে শক্তিটা একই রকম।

এই অনুবাদের কাঠিন্যটাই কি ক্যাটুলাসের প্রতি আপনার শ্রদ্ধার অন্যতম কারণ?

আমি এটাকে ‘সমাধানহীন সমস্যা দিন’ হিসেবে দেখি না। প্রতিদিনের এক সংগ্রামের উপাদান হিসেবে দেখি, যার সাথে অনবরত লড়ে যাওয়া যায়।

এবার কি আপনার মনে হয়েছিল যে অবশেষে আপনি এটি অনুবাদ করতে পেরেছেন? আমি জানি আপনি বলেছেন এই কবিতাটি অনুবাদ করতে শত শত বার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ‘নক্স’-এর ক্ষেত্রে কি আপনি অনুবাদে সফল হয়েছিলেন, নাকি নির্দিষ্ট এক ধরনের অনুবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন?

আত্মসমর্পণের মতোই ছিল। আমার মনে হয়, অনুবাদের সবসময় একটি প্রেক্ষাপট থাকে। এই বইয়ের জন্য অনুবাদটিকে বেশ সাধারণ ও অনালঙ্কৃত হতে হয়েছিল। আমি কোনো কৃত্রিম অলংকার যোগ করতে চাইনি।

অ্যান কারসন
কবিতাটি এবং এর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটু বলুন, ক্যাটুলাস কীভাবে এটি লিখতে এলেন?

তিনি তার ভাইয়ের স্মরণে লিখেছিলেন, যার সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু জানি না, শুধু এটুকু জানি যে তিনি এশিয়া মাইনরের ট্রোয়াডে মারা গিয়েছিলেন। ক্যাটুলাস ইতালি থেকে এশিয়া মাইনরে গিয়েছিলেন তাকে সমাধিস্থ করতে। সেই সময়েই তিনি এই শোকগাথাটি রচনা করেন।

ট্রোয়াড কি ট্রয়ের কাছাকাছি?

হ্যাঁ, প্রাচীন ট্রয় নগরী বলে তারা যা মনে করত, সেখানে রোমানদের একটা বসতি ছিল।

‘নক্স’ বইটির মধ্যে রহস্যের এক গাঢ় অনুভূতি লুকিয়ে আছে। মানে, যে ভাই মৃত্যুর বহু আগেই জীবন থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল, তাকে নিয়ে শোকগাথা লেখার মধ্যে একটা কাঠিন্য তো রয়েছেই। তিনি চলে যাওয়ার সময় তার জীবন সম্পর্কে আপনি কতটা জানতেন?

খুব বেশি কিছু জানতাম না। আমরা দুজনেই প্রায় একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তখন গ্রিক ও লাতিনের জগতে নিমজ্জিত, যে জগত নিয়ে তার কোনো আগ্রহ বা ধৈর্য ছিল না। পছন্দ, নৈতিকতার মানদণ্ড ও মানুষকে মানুষ করে তোলে এমন প্রতিটি বিষয়ে সে আমার থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি তাকে আর সত্যিই চিনতাম না। তারপর সে ড্রাগ ব্যবসা শুরু করল, যা আমার কাছে অত্যন্ত বোকামি মনে হয়েছিল। তা নিয়ে আমাদের মধ্যে তর্ক হয়। এরপর সে গ্রেপ্তার হয়। জামিনের নিয়ম ভেঙে দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

সেটা ছিল ১৯৭৮ সাল, যেবার আপনি তাকে শেষ দেখেছিলেন।

হ্যাঁ।

বইয়ে আপনার ভাইয়ের ১০ বছর বয়সের একটা ছবি আছে—সে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার ওপরে গাছের ঘরে কয়েকটা ছেলে বসে আছে। সেই ছবির দিকে তাকালে আপনি কী দেখতে পান?

সত্যি বলতে, ছবিটা দেখলে আমার বুক ভেঙে যায়। সে সবসময় তার চেয়ে বয়সে বড়ো ছেলেদের সাথে মিশতে চাইত। হয়তো এতে তার নিজের আত্মসম্মান বাড়ত, আমি জানি না। কিন্তু তারা সবসময় তাকে নিয়ে টানাটানি করত এবং ব্যবহার করত। ছবিতে সে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, তারা মইটা তুলে নিয়েছে যাতে সে ওপরে উঠতে না পারে। তা সত্ত্বেও তাকে কতটা দৃঢ়চেতা দেখাচ্ছে! দেখে মনে হয় সে ভাবছে এটা সাধারণ একটা বাধা মাত্র, সে এটা অতিক্রম করে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। সে সবসময় তেমনই ছিল। পরিস্থিতি ভালো হবে, এমন একটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন আশাবাদ তার মধ্যে ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ভালো হয়নি।

কারণ বইয়ে আপনি বলেছেন যে, বছরের পর বছর পর যখন সে ড্রাগ ব্যবসা শুরু করে, তখন আপনার মন খারাপ হয়ে যেত। কারণ সেই ছবিতে তার চোখে এক ধরনের বাঁকা, অদৃশ্য দৃষ্টি ছিল। সেই দৃষ্টি আপনাকে এত পীড়িত করে কেন?

আমি নিশ্চিত নই। ছবিগুলো ওই দিক থেকে অদ্ভুত। তারা আপনাকে এমন অনেক তথ্য দেয় যা শব্দে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যখন আমি ছবিটার দিকে তাকালাম, আমার মনে হলো তার পুরো জীবনটাই লুকিয়ে ছিল সেই দৃষ্টিতে। সে কখনো জিতবে না, তবুও সে বিশ্বাস করবে যে পরবর্তী দানটি নিশ্চিতভাবেই তার জয় আনবে।

আপনার আশাবাদের কথাটা শুনে বেশ অদ্ভুত লাগছে, কারণ অনেক ছবিতে তাকে আহত অবস্থায় দেখা যায়, হাতে স্লিং বা পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা।

অদ্ভুত, তাই না? বইটা তৈরির জন্য ছবিগুলো বের করার আগ পর্যন্ত আমিও বিষয়টা খেয়াল করিনি। তার হাত কিংবা পা ভাঙা থাকত, এই বিষয়টা আমাকে চমকে দিয়েছিল। এতসব আঘাতের কথা আমার মনে নেই, কিন্তু ছবিতে তা স্পষ্ট। তা সত্ত্বেও তাকে দমানো যায়নি। হাত ভেঙে ফেলত, আর সোজা গিয়ে হকি টিমে যোগ দিত!

আমার মনে হয় বড়ো ছেলেদের সাথে মেলামেশা করার খেসারত দিতে হতো। তার কি বন্ধু বানাতে সমস্যা হতো?

না, সে ভীষণ অমায়িক ও আকর্ষণীয় স্বভাবের ছিল। যেকোনো মানুষের সাথে সখ্য গড়ে তুলতে পারত। তাই বুঝতাম না তারা কেন তাকে এত মারধর করত। ভাইবোনের সম্পর্কের মাঝে এমন কিছু রহস্য থেকেই যায়।

আপনার ভাই আপনার চেয়ে চার বছরের বড় ছিলেন। আপনারা যখন কিশোর বয়সে হাইস্কুলে পড়তেন, সে চাইত আপনি যেন তার হোমওয়ার্ক করে দেন। কিন্তু একই সাথে আপনাকে “প্রফেসর” বা “পিনহেড” (কম বুদ্ধিসম্পন্ন) বলে ডাকত। আপনাদের সম্পর্কটাকে কীভাবে বর্ণনা করবেন?

অনুতাপময়। আমি তার হোমওয়ার্ক করে দিতে শুরু করার পর সে আমাকে সহ্য করত। সে ফ্রেঞ্চে বারবার ফেল করত। ক্লাসে পিছিয়ে পড়েছিল। তার প্রতি আমার মনোভাব ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্ব পূর্ণ। আমরা যখন আরও ছোট ছিলাম, সে ছিল আমার একমাত্র নায়ক। আমি তার পিছু পিছু সবজায়গায় যেতাম। সে আমাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলত। কিন্তু পরবর্তীতে আমি তার সিদ্ধান্তগুলো বুঝতে পারতাম না, তার সাথে যুক্তি দিয়ে কথা বলা যেত না। সবকিছু কেমন যেন ঝগড়াটে হয়ে উঠেছিল। ওই অদ্ভুত আশাবাদের কারণে বোধহয় আমি তাকে এক ধরনের পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দেখতাম। তার মধ্যে এক ধরনের আলাদা আভা ছিল। সে ঘরে ঢুকলে সবাই তার দিকে তাকাত। সে দেখতে খুব সুন্দর ছিল, লম্বা ও ফরসা চুল। যেমনটা বললাম, তার মধ্যে এক ধরনের মোহিনী শক্তি ছিল। আমি কখনোই সেরকম ছিলাম না, উজ্জ্বল বা মোহিনী তো নয়ই।

বইয়ে আপনি দুবার এই “পিনহেড” শব্দটির কথা উল্লেখ করেছেন। এই ছোট অংশটি কি একটু পড়ে শোনাবেন?

“তার কণ্ঠস্বর ছিল তারই গলার স্বরের মতো, কিন্তু তাতে বাড়তি কিছুর স্তর পড়েছিল—কালো, ঘন। যখন সে বলত “পিনহেড” (কী রে পিনহেড, প্রজ্ঞা লাভ হলো?) তখন মুহূর্তের জন্য তা উজ্জ্বল হয়ে উঠত, তারপর আবার অন্ধকারে তলিয়ে যেত। তার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া সব বছর ও সময় আমার মধ্যে স্রোতের মতো প্রবাহিত হচ্ছিল। সেই পুরো ইতিহাস। একটি কণ্ঠস্বর আসলে কী?”

এরপরের পাতায় আপনি লিখেছেন, “আমি পুরোনো সব প্রশ্ন ভালোবাসি।” এটা কি সেই প্রশ্নের দিকেই নির্দেশ করে?

“একটি কণ্ঠস্বর আসলে কী?”—হ্যাঁ। একটি কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে কত শত তথ্য প্রকাশ পায়, তা নিয়ে আমি বহুদিন ধরে মুগ্ধ।

আপনার কি মনে হয় “পিনহেড-প্রফেসর” ডাকটি স্নেহের প্রকাশ ছিল?

আমার মনে হয়, হ্যাঁ। আমার ষোল বছর বয়সে—না, ষোলো বছর বয়সের ক্রিসমাসে সে আমাকে ‘রজে’স থিসরাস’ বইটি উপহার দিয়েছিল, কারণ সে চেয়েছিল আমি যেন লেখক হই। আমিও লেখক হতে চেয়েছিলাম। বইটা আজও আমার কাছে আছে। তবে ওটা দুটো খণ্ডে ছিল, সে আমাকে শুধু প্রথম খণ্ডটা দিয়েছিল! দ্বিতীয় খণ্ডটা আর দেওয়া হয়নি। এটা আমার লেখার কিছু দিক বোঝার জন্য একটি বড়ো সূত্র।

আপনি কি বর্ণমালার প্রথম অর্ধাংশ বেশি পছন্দ করেন?

হ্যাঁ, কোনো এক অজানা কারণে ওই প্রথম অর্ধাংশ নিয়ে আমি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি!

‘নক্স’ বইটি নিজেই একটি শিল্পকর্মের মতো উপস্থাপিত। ভাঁজ করা অ্যাকর্ডিয়ন শৈলীর একটি বই, যেখানে কাগজের টুকরো স্ট্যাপল বা আঠা দিয়ে লাগানো—কখনো লেখা, কখনো ছবি, আঁকা ইমেজ কিংবা হাতে লেখা চিঠির অংশ। বইটি স্পর্শযোগ্য। সত্যি বলতে, আমি বারবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিলাম যে সত্যি কোনো স্ট্যাপল আছে কি না। তবে প্রতিটি পৃষ্ঠা আসলে সেইসব জিনিসের হুবহু পুনরুৎপাদন। কেন এই রূপায়ণ? কেন আপনি শারীরিকভাবে এমন একটি বই তৈরি করতে চেয়েছিলেন?

কারণ শুরুতে আমি নিজের হাতেই বইটা বানিয়েছিলাম। একটা খালি খাতা কিনে তাতে সবকিছু ভরেছিলাম, রং করেছি, আঠা দিয়েছি, স্ট্যাপল করেছি ইত্যাদি। যেদিন আবিষ্কার করলাম আঠা লাগানোর চেয়ে স্ট্যাপল করা সহজ, সেদিনটা সত্যিই পদ্ধতির এক দুর্দান্ত অগ্রগতি ছিল! যা হোক, আমার স্বামী রবার্ট কারি বলেছিল, যেহেতু বইটি হাতে তৈরি, তাই পড়ার সময় পাঠক এই মানুষগুলোর মাঝে, তাদের ভাবনায় ও এর অস্তিত্বের মধ্যে টেনে আসবে। তাই এটি ছাপাতে হলে সেই গুণটি ধরে রাখতে হবে। সে জেরক্সের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিল যাতে পৃষ্ঠাগুলোকে ত্রিমাত্রিক দেখায়। কোনো কিছু নিখুঁতভাবে জেরক্স বা স্ক্যান করলে তা রান্নার বইয়ের মতো চকচকে দেখায়। কিন্তু জেরক্স মেশিনে একটু আলো ঢুকতে দিলে তা একটু খারাপ জেরক্স হয়, যার ফলে প্রান্তগুলো স্পষ্ট হয় ও প্রাণ ফিরে পায়। কারি যাকে বলে “ক্ষয়” তা ফিরিয়ে আনা যায়। পাঠকের অভিজ্ঞতায় এই অনুভূতিটা রাখা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অ্যান কারসনের 'নক্স'
এমনকি টাইপ করা কিছু পাতাকে প্রাচীন করার জন্য চায়ে ভিজিয়েছিলেন!

হ্যাঁ, করেছিলাম।

কেন? ২০০০ সালে বইটি তৈরি করেছিলেন, কিন্তু একে প্রাচীন রূপ দিতে চেয়েছিলেন কেন?

লাতিন শেখার দিনগুলোর কথা ভেবে বাম পাশের ক্যাটুলাসের পৃষ্ঠাগুলোকে একটি পুরোনো অভিধানের মতো দেখতে করার শখ ছিল আমার। লাতিন শেখার সময় আমার কাছে সবসময় পুরোনো, হলুদ হয়ে যাওয়া অভিধান থাকত। আমার কাছে লাতিন পড়ার অভিজ্ঞতা মানেই ধুলাবালি জমা এক পুরোনো পাতা, যেগুলো সহজে পড়া যায় না। তাই ভাবলাম, চায়ে ভিজিয়ে নিলে জাদুকরী দেখাবে। চব্বিশ ঘণ্টার জন্য সত্যিই জাদুকরী দেখিয়েছিল, কিন্তু চা শুকিয়ে যাওয়ার পর তা আবার সাদা হয়ে যায়!

বইটি তৈরির মূল প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল? মানে, এটা কি শোক সামলে ওঠার একটা উপায় ছিল? বইটি আপনাকে কীভাবে যুক্ত রেখেছিল?

ঠিক শোক সামলানো ছিল না...মানে, কিছুটা তো ছিলই, তবে তার চেয়ে বেশি ছিল তাকে বোঝার ধাঁধা। কারণ মৃত্যুর ঠিক আগে, ১৯৭৮ সালের পর সে প্রথমবার আমাকে ফোন করেছিল। সেটা ছিল ২০০০ সাল, আমাদের মধ্যে খুব অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর এক কথোপকথন হয়। আমি কোপেনহেগেনে গিয়ে তার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করি, যেখানে সে থাকত। কিন্তু যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে এক মহিলা ফোন করে বললেন, “আপনি আমাকে চেনেন না, কিন্তু আপনার ভাই একটু আগে আমার বাথরুমে মারা গেছেন।” তিনি ছিলেন কোপেনহেগেনে তার স্ত্রী, যার সাথে সে ১৭ বছর ধরে সংসার করছিল!

ফোনে তো সে সেকথা বলেনি?

বিয়ের কথা বলেছিল, কিন্তু ফোনে স্ত্রী পরিচয় দেননি, শুধু বলেছিলেন “আপনি আমাকে চেনেন না।” এরপর আমি কোপেনহেগেনে গিয়ে তার ও তাদের কুকুরের সাথে দেখা করি। ভাইয়ের জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে পারি। কিন্তু যতই জানছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল যে, ২২ বছর সে উধাও ছিল, সে আসলে কেমন মানুষ ছিল তা আমি মোটেও জানি না। তাই তাকে বোঝার চেষ্টা থেকেই বইটি শুরু করি। তার সম্পর্কে যা বলা যায়, সেই সূত্রগুলোকে এক জায়গায় এনে সবটার একটা অর্থ দাঁড় করানোর চেষ্টা। এগোতে এগোতে বইটি আমার কাছে ‘স্মৃতিফলক’ হয়ে ওঠে।

সে যখন ফোন করেছিল, তখন কি বুঝেছিলেন হঠাৎ কেন ফোন করল? মৃত্যুর কোনো পূর্বাভাস পেয়েছিল?

কোনো ধারণা নেই, সে কখনো বলেনি। সে অল্প কথার মানুষ ছিল। শুধু যোগাযোগের তাগিদ অনুভব করেছিল।

এতগুলো বছর পর!

এত বছর পর। বুঝতে পারছেন, পুরো বিষয়টাই ধোঁয়াশা।

কীভাবে মারা যান তিনি?

অ্যানিউরিজমে। অতিরিক্ত ড্রাগস ও কঠিন জীবনযাপনের কারণে তার শরীর ভেঙে পড়েছিল। বয়স মাত্র পঞ্চাশের কোঠায় ছিল।

কিছু ছবি কেবল খণ্ডাংশ, অনেকগুলোতে কোনো মানুষ নেই—একটা ছায়া, একটা চেয়ার, একটা খালি দোলনা, কিছু সিঁড়ি, দেয়াল। শূন্যতার অনুভূতি ছেয়ে আছে। এগুলোর দিকে তাকালে আপনি কী দেখেন?

তাকে না বোঝার ধাঁধা। দুটো বিষয় বলা যায়, ছোটোবেলায় যখন তাকে আদর্শ মানতাম, তখনও সে উধাও হয়ে যেত। আমার সাথে সময় কাটাতে চাইত না, কেটে পড়ত। পরে যখন ভেবেছি সে কেমন মানুষ ছিল, তখনো কোনো কূলকিনারা পাইনি। এটা পাতালপুরীতে ঈনিয়াসের মতো, মৃত মায়ের সাথে দেখা হলে ঈনিয়াস তাকে জড়িয়ে ধরতে তিনবার হাত বাড়ায়, তিনবারই মা তার হাত থেকে উধাও হয়ে যান। তাই ছবিতে সেই ‘উধাও’ হয়ে যাওয়াটাকে রাখতে চেয়েছিলাম। মানুষকে কেটে বাদ দিলে একটা বড়ো শূন্যতা তৈরি হয়। পুরোনো পারিবারিক ছবিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক ছবিই আসলে ‘কিছুরই ছবি নয়’। খুব অদ্ভুত।

বইটির জন্য কিছু ছবি কি আপনি ছিঁড়েও ফেলেছিলেন?

হ্যাঁ, ছিঁড়েছি, কেটেছি।

ছবি ছেঁড়া কি কঠিন ছিল?

আশ্চর্যজনকভাবে, না! আমি কাজের মেজাজে ঢুকে গিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম।চলবে

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
চাঁদাবাজির অভিযোগ করায় বিএনপি নেতাকে মারধর, গ্রেফতার ২
চাঁদাবাজির অভিযোগ করায় বিএনপি নেতাকে মারধর, গ্রেফতার ২
‘জাতীয় মসজিদের খতিবের কিছু হলে ধর্মপ্রাণ মানুষ দাঁতভাঙা জবাব দেবে’
‘জাতীয় মসজিদের খতিবের কিছু হলে ধর্মপ্রাণ মানুষ দাঁতভাঙা জবাব দেবে’
বিরতির পর গোলবন্যা, ব্রাদার্সকে ৬ গোল দিলো ফর্টিস
বিরতির পর গোলবন্যা, ব্রাদার্সকে ৬ গোল দিলো ফর্টিস
সর্বাধিক পঠিত
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম তৈরি কেএনএফের, ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা
১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম তৈরি কেএনএফের, ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা