চেনা সুরের রাগ-রঙ

Send
বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়
প্রকাশিত : ০০:০৩, নভেম্বর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৩, নভেম্বর ১৪, ২০১৮

 

(পর্ব-১৮)

স্বরূপও যিনি অব্যক্ত, তিনিই জগৎরূপে ব্যক্ত হয়েছেন। জগৎ ব্যক্ত হয় ভাব রূপে, ভাব ব্যক্ত হয় বাক্ রূপে। পরম এভাবেই প্রকাশিত হন তার অব্যক্ত আদি অবস্থা অর্থাৎ ‘পরা’ অবস্থা থেকে ‘পশ্যন্তি’ অর্থাৎ জগৎরূপে, জগৎ থেকে ‘মধ্যমা’ অবস্থায় ভাব রূপে এবং সবশেষে ভাব থেকে ‘বৈখরী’ অবস্থায় বাক্ বা শিল্প রূপে প্রকাশিত হন।

যিনি পরম, তিনিই ব্রহ্ম। ব্রহ্মের বিকার নেই, তিনি নির্বিকার। তার রূপ নেই তাই তিনি অরূপ, তার বন্ধন নেই তাই তিনি মুক্ত, তিনি সকল নিয়মের ঊর্ধ্বে, কারণ তিনিই একমাত্র নিয়ামক আর তাই তিনি সর্বশক্তিমান। সুতরাং অরূপ হয়েও তিনি জগৎরূপে প্রকাশিত হন—কে তাকে বাধা দেবে? অব্যক্ত হয়েও তিনি ব্যক্তি হতে চান, কে তাকে প্রতিরোধ করবে?

কিন্তু কেন তিনি ব্যক্ত হতে চান?

তার ইচ্ছা!

কেন তার ইচ্ছা? ...

এ প্রশ্ন অর্থহীন। কারণ, তিনি তো কোনো কারণের অধীন নন। তিনিই সব কিছুর নিয়ন্ত্রক অতএব কোনো কারণের দ্বারাই তিনি নিয়ন্ত্রিত হতে পারেন না। তার ইচ্ছা, তাই তার বৈখরী দশায় বাকরূপে তার প্রকাশ। সেই প্রকাশই সঙ্গীত।

বৃহদারণ্যকোপনিষদে বাক্-এর এই তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে। ভর্তৃহরি তার ‘বাক্যপদীয়’ গ্রন্থে এ কথা বলেছেন।

খুব সহজভাবে বলতে পারি, আল্লা, ব্রহ্ম, গড... যে নামেই ডাকি, তিনিই যদি একমাত্র সত্য হলো, তবে এই ব্রহ্মাণ্ড যে তিনিই—তাতে সংশয়ের অবকাশ থাকতে পারে না, এ তো নিশ্চিতভাবেই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত!

ব্রহ্মের অভিব্যক্তি ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মাণ্ডের অভিব্যক্তি হলো ভাব। তাই সমস্ত ভাবই এই চতুর্মাত্রিক দেশ-কালের কাঠামোয় আধারিত। শিল্প, সঙ্গীতের যে ভাব-লোক—তারও পটভূমি সেই একই দেশকালের আবহ। সুতরাং সুরের সঙ্গেও বিশ্বপ্রকৃতির যে রূপ, তার একটা নিবিড় যোগসূত্র আছে, আর সেই কারণেই আমাদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিনীর কথা বলা হতো। অনুমান করা অকারণ হবে না যে, ছয় রাগ আসলে ছ’টি ঋতুরই প্রতিভূ। গ্রীষ্মে দীপক, বর্ষায় মেঘ বা মল্লার, শরতে ভৈরব, হেমন্তে মালকোনা, শীতে শ্রী এবং বসন্তে হিন্দোল।

দীপক রাগটি এখন প্রায় অপ্রচলিত। কিন্তু সে প্রসঙ্গে পরে। কথা হচ্ছিল মেঘ রাগ প্রসঙ্গে; আবার সে কথায় ফিরে আসি। মেঘ রাগের যে ভাবরূপ, তার বর্ণনা দেব, কিন্তু তার আগে রাগটি শুনে নিতে হবে। আমি প্রথমেই বলব, পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারের রেকর্ডটির কথা। পুরোনো দিনের গালার চাকতি অর্থাৎ সেভেন্টি-এইট আরপিএম রেকর্ডের পরবর্তী সময়ে এক ধরনের ছোট আকারের রেকর্ড বেরিয়েছিল, যাকে বলা হতো উচ্চ রেকর্ড, সময় ৭ মিনিট। খুব সংক্ষিপ্ত আলাপ অংশে দেখতে দেখতে মেঘ ঘনিয়ে উঠবে মাথার ওপর। তারপর চকিতে সিতারখানি তালে পণ্ডিত কানাই দত্তের তবলায় গুরুগুরু মেঘধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির মতো বড় বড় দানার শুরু হবে সেতারে দ্রুত গৎ!

এ এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। মেঘের এ রূপ একবার প্রত্যক্ষ করলে ভোলার নয়।

আরো একটি রেকর্ডের কথা অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু তার আগে আবার স্মরণ করা যেতে পারে, ফার্সি ভাষায় ‘সারং’ শব্দের অর্থ হলো মেঘ। এ কথাও আবার বলি, সারং রাগের নানা প্রকারের মধ্যে বিশেষত মধমৎ সারংয়ের মেঘ গ্রীষ্মের একটি গুমোট দুপুরের ছবি আঁকে রৌদ্রের প্রচণ্ড দাবদাহে দূর দিগন্তে পুঞ্জীভ‚ত হয়ে উঠেছে মেঘ, কিন্তু বৃষ্টি তখনও বর্ষার প্রতীক্ষায়। সারং গ্রীষ্ম শেষের রাগ, কিন্তু মেঘ রাগটি নব বর্ষার, কিন্তু আয়োজন তখন সম্পূর্ণ। মেঘের সমারোহ এখনো রয়েছে, কিন্তু সে তখন সমস্ত আকাশে পরিব্যাপ্ত।

খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে ‘সঙ্গীত দর্পণ’ নামে একটি গ্রন্থে পণ্ডিত দামোদর মেঘ রাগের রূপ বর্ণনা করেছেন—

‘নীলোৎপলাভব পুরবিন্দুসমানচৈলঃ

পীতম্বরস্তৃষিত চাতক যাচমানঃ।

পীযূষমন্দহাসিতো ঘনমধ্যবর্তী

বীরেষু রাজতি যুবা কিল মেঘরাগ’

অর্থাৎ, নীলপদ্মের মতো দেহের কান্তি, চাঁদের মতো আভাময় ও স্নিগ্ধ মুখ-শোভা, পীতবস্ত্র পরিহিত জলভারাক্রান্ত শরীরের কাছে তৃষ্ণার্ত চাতকের দল জল ভিক্ষা করছে। মেঘলোকবিহারী সেই বীর যুবার স্মিতহাস্যে যেন অমৃতধারা ক্ষরিত হচ্ছে। ...

পণ্ডিত দামোদর বর্ণিত এই বীরপুরুষই মেঘ রাগ।

‘সঙ্গীত দর্পণ’ গ্রন্থে পণ্ডিত দামোদর, ‘রাগবিবোধ’ গ্রন্থে পণ্ডিত সোমনাথ প্রমুখ অনেকেই বিভিন্ন রাগের ভাবরূপ রচনা করেছেন শ্লোকের মাধ্যমে। সে সব বর্ণনাকেই শিরোধার্য করতে হবে, এমন কোনো মাথার দিব্যি না দিলেও, প্রতিটি রাগেরই একটা ভাবরূপ ফুটে ওঠে শ্রোতার মনে এবং সবার ক্ষেত্রে সে অনুভব হুবহু একই রকম হবেই এমনটা দাবি করাও সঙ্গত নয়; কিন্তু মননের চর্চার এই পথটা আধুনিক সঙ্গীতজ্ঞদের নিদারুণ ঔদাসীন্য ও অবহেলার ফলেই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। এই অনুষঙ্গে আরো একটা শিল্প ধারার কথা মনে পড়ছে। সে ধারার নাম ‘রাগিনী চিত্রমালা’। ভারতীয় চিত্র শিল্পের এই ধারার সূচনা হয়, আজ থেকে প্রায় দু’শো বছর আগে ভারতের পাঞ্জাবের অন্তর্গত পাহাড় ঘেরা একটি শান্ত উপত্যকা অঞ্চলে, যার নাম ‘কাংড়া’। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে রাজা সংসার চাঁদের আমলে বহু শিল্পী এখানে এসে বসবাস করেন। রাজা সংসার চাঁদ ছিলেন বৈষ্ণব এবং তারই উৎসাহে এইসব শিল্পীরা যেসব ছবি এঁকেছিলেন, তাই ‘কাংড়া চিত্রমালা’ নামে পরিচিত হয়— যার বিষয় মূলত ছিল রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং নানান রাগরাগিনীর রসে তাকে চিত্রায়িত করা। কখনো বা প্রকৃতি ও নরনারীর প্রেমের মধ্যে দিয়েও প্রকাশিত হতো রাগ-রাগিনীর চিত্ররূপ।

ঠিক এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে, ‘মেঘ’ রাগের একটি ছবির কথা। ছবিটি রাগিনী চিত্রমালারই এবং সেটি দেখেছিলাম কোথাও, তবে ঠিক কোথায়— তা আজ আর মনে নেই; বরং স্মৃতি থেকে একটা বর্ণনা দেবার চেষ্টা করব—

নদীর ধারে ঘন সবুজ পল্লবিত একটি গাছ, তার ডালে ডালে, শাখায় শাখায় থরে থরে মেঘের মতো পেলব পত্রপুঞ্জ। তার নীচে মনোরম পোশাকে সুসজ্জিতা, বসে আছেন অপরূপা এক রমণী, তাঁর চোখ আকাশে আর সেখানে জমে উঠেছে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। আশেপাশে কিছু গুল্মলতা আর দূরে মেঘের মতো চলে গেছে পর্বতশ্রেণী। চারদিকে সেই বিস্তীর্ণ মেঘময়তা, কে জানে, হয়তো এমনটাই ছিল অষ্টাদশ শতকের কাংড়া উপত্যকার ছবি। এদিকে ভারতে তখন আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার চূড়ান্ত অবস্থা। মনে হয় সেই কারণেই বিভিন্ন স্থান থেকে শিল্পীরা এখানে এই পাহাড়ঘেরা শান্ত পরিবেশে আশ্রয় নিয়েছিল, একটু শান্তির আশায়। ...

কিন্তু প্রশ্ন জাগে—কে এই বিরহিনী? ইনিই কি শ্রীরাধা? আর পটভ‚মে ওই পাহাড়ই কি গিরি গোবর্ধন? একি তবে বৃন্দাবনেরই ছবি? ... আবার আরেকটি ছবি। এও মেঘরাগের। কোনো প্রাসাদের শ্বেত পাথরের আঙিনায় দাঁড়িয়ে রক্তিম করপুটে মেলে ধরেছেন এক অপরূপা নারী। একটি ময়ূর শস্যদানা খাচ্ছে, আরেকটি অদূরে দাঁড়িয়ে। পটভ‚মে কুঞ্জবনের নিবিড় ছায়াচ্ছন্ন একটি গাছ আর তার মাথার ওপর ঘন মেঘের আচ্ছাদন। মনে হয়, যেন, শুধু এক স্তব্ধ প্রতীক্ষা ... তারপরই গুরুগুরু গর্জনে বৃষ্টি নামবে ঝমঝমিয়ে!

এই রকম কোনো একটা ছবির গভীরে মগ্ন হয়ে শুনুন পণ্ডিত রবিশঙ্করের মেঘ রাগের ওই রেকর্ডটি। অথবা আরেকটি ছবির কথা বলি...

পটভূমি, কোনো এক সুদূর আরালি পর্বতের কোলে কোনো এক ‘শুস্তা’ নদীর ধারে ছোট্ট জনপদ—‘বরিচ’। এই জনপদের সীমানা ছাড়িয়ে কিছু দূরে গেলেই সেই নদীরই ধারে পাথর বাঁধানো দেড়শত সোপানময় .... ঘাটের উপরে একটি শ্বেত প্রস্তরের প্রাসাদ শৈলপদমূলে একাকী দাঁড়াইয়া আছে—নিকটে কোথাও লোকালয় নাই। বরিচের তুলার হাট এবং গ্রাম এখান হইতে দূরে।

‘প্রায় আড়াইশত বৎসর পূর্বে দ্বিতীয় শা-মামুদ ভোগবিলাসের জন্য প্রাসাদটি এই নির্জন স্থানে নির্মাণ করিয়াছিলেন। তখন হইতে স্থানশামার ফোয়ারারমুখ হইতে ........ জলাধার উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকিত এবং সেই ........ নিভৃত গৃহের মধ্যে মর্মরখচিত স্নিগ্ধ শিনাসনে বসিয়া কোমল নগ্নস্পদ পল্লব জলাশয়ের নির্মল জলরাশির মধ্যে প্রসারিত করিয়া তরুণী পারসিক রমণীগণ স্নানের পূর্বে কেশমুক্ত করিয়া দিয়া, সেতার কোলে ....... গজল গান করিত।

‘এখন আর সে ফোয়ারা খেলে না, সে গান নাই, সাদা পাথরের উপর শুভ্রচরণের সুন্দর ......... —এখন ইহা আমাদের মতো নির্জনবাসপীড়িত সঙ্গিনীহীন ....... অতিবৃহৎ অতিশূন্য ....... কিন্তু আপিসের বৃদ্ধ কেরানি করিম খাঁ আমাকে এই প্রাসাদে বাস করিতে বারম্বার নিষেধ করিয়াছিল। বলিয়াছিল, ইচ্ছা হয় দিনের বেলা থাকিবেন, কিন্তু কখনো রাত্রিযাপন করিবেন না। আমি হাসিয়া উড়াইয়া দিলাম।

প্রথম প্রথম এই পাষাণপ্রাসাদের নির্জনতা আমার বুকের উপর যেন একটা ভয়ঙ্কর ভাবের মতো চাপিয়া থাকিত... কিন্তু সপ্তাহখানেক না যাইতেই এক অপূর্ব নেশা যেন আমাকে আক্রমণ করিয়া ধরিতে লাগিল।

... সেদিন আরালী পর্বতের চূড়ায় ঘনঘোর মেঘ করিয়া আসিয়াছিল। অন্ধকার অরণ্য এবং শুস্তার মমীবর্ণ জল একটি ভীষণ প্রতীক্ষায় স্থির হইয়াছিল। জলস্থল আকাশ সহসা শিহরিয়া উঠিল এবং ..... বিকশিত ঝড় শৃঙ্গল ছিন্ন উন্মাদের মতো পথহীন সুদূর বনে ভিতর দিয়া আর্তচিৎকার করিতে করিতে ছুটিয়া আসিল’ ... এবং পরক্ষণেই মেঘ রাগের একটি ক্ষিপ্র গতির তালে যেন হঠাৎ শত শত বর্ষের পর্দ উন্মোচিত হয়ে আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ল বিস্মৃত এক ইতিহাসের তীব্র বিরহ বেদনা! ওস্তাদ আমীর খাঁর কণ্ঠে ভেসে এল সেই বিস্ময়কর তারাণা! ... ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছায়াছবিটি যারা দেখেছেন- এ ছবি তাদের চেনা। (চলবে)

//জেডএস//

লাইভ

টপ