`উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে’: পথিক রবীন্দ্রনাথ

Send
কুমার চক্রবর্তী
প্রকাশিত : ১৪:০৯, নভেম্বর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১১, নভেম্বর ২৬, ২০১৯


এর আগে রবীন্দ্রনাথ, দেশে ও বিদেশে, পাহাড়পর্বত, সমুদ্র দেখেছেন। তাঁর জীবনের প্রথম ভ্রমণ শুরুই হয়েছিল পর্বতদর্শন। এবং ভ্রমণের অবস্থানের উদ্দেশ্যে, পথে শান্তিনিকেতনস্থল এবং অমৃতসর দেখেছিলেন যা ভূপ্রাকৃতিকভাবে অনেকটা ঊষর। ভারতের এবং বাইরের যে-সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তিনি দেখেছেন, তা ছিল স্থির সৌন্দর্যময়, সমুদ্রও বেলাভূমি ছাড়া অনেকটা স্থিরতার সৌন্দর্য উপহার দেয়। আবার দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় সমুদ্র বিবমিষাময় হয়ে ওঠে, মানুষ সমুদ্রপীড়ায় আক্রান্ত হয়, অসুস্থ হয়ে পড়ে, সময়হীনতার বিবরে ঢুকে যায়। পাহাড় নিশ্চল, স্থবির এবং স্তব্ধ দৃশরূপ উপহার দেয় যা একসময় একমেয়েমি ও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে, প্রাপ্ত সৌন্দর্যকে মনে হতে পারে দূরত্বময় এবং অনাত্মীয়। পাহাড়ের সৌন্দর্য আপন নয়, ভয়জাগানিয়া, এতে বেশিক্ষণ থাকাও যায় না। এখানে মানুষ যেন অতিথিমাত্র। মনুষ্যবিহীন এই সৌন্দর্য ভীতিকরও কখনো কখনো। পাহাড়পর্বত এতটাই স্তব্ধ যে তা মানুষকে অপরলোকে নিয়ে যায়। তাই প্রথমবারের মতো শিলাইদহে যখন রবীন্দ্রনাথ দেখলেন নজরকাড়া গতিভঙ্গিময় নদীদের সুরতানলয়, চাঞ্চল্য এবং অগ্রসরমাণতা—এসব কিছু নদী ছিল তাঁর ভাষায় ‘অন্তঃপুরচারিণী’, দেখলেন উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে রাতের চাঁদের বিকাশ, নক্ষত্রদের ওঠানামা, পাখিদের নিস্বন, কাশবনের মৃদু হাহাকার, উত্থিত ঝড়, বৃষ্টির স্বর্গীয় পদধ্বনি, জনজীবনের মন্থরগামিতা, স্তব্ধতার বাঙ্মময়তা, তখন এসব তাঁর কাছে পরম আত্মীয়ের মতো মনে হলো, তাঁর সত্তা যেন এর জন্যই ছিল অপেক্ষমাণ। বস্তুত সত্তার প্রকৃত আবাহন এবং প্রকাশ যেন নতুনভাবে এখানে আবির্ভূত হলো। সৃষ্টিশীলতার জন্য যে-সব অবস্থার আনুকূল্য তাঁর দরকার ছিল, তার সবই যেন তিনি পেয়ে গেলেন শিলাইদহকেন্দ্রিক অবস্থানকালে। পূর্ব বাংলার নদীর রয়েছে ধ্বনি ও গতিবৈচিত্র্য, রয়েছে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের ব্যাপকতা, অনন্তের হাতছানি। চারপাশের আদিগন্ত বিস্তৃতি ও প্রকাশমাণতাকে নিয়ে সে অগ্রসর হয় অজানার পানে। পক্ষান্তরে পাহাড়ি নদী হয় খরস্রোতা কিন্তু অপ্রশস্ত, চারপাশ থাকে পাহাড়ের ঢালে আবদ্ধ ফলে একই সাথে সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতিকে সে মিলাতে পারে না। কখনো জলও শুকিয়ে যায় তখন মনে হয় নিপাট একটি খাঁড়ি। কিন্তু বাংলার নদী তার প্রশস্ততা ও বিস্তৃতির কারণে বর্ষায় যেমন গহন-গহীন, তেমনই শীতে শুকিয়ে গেলেও হয়ে থাকে স্মৃতিবহুল, বেদনামথিত। বর্ষার বিগন প্রেমের চিহ্নগুলো সে শীতেও বহন করে চলে। তার বুকে জলজ পাখি ও প্রাণীদের অবস্থান ও বেঁচে থাকা প্রাণবৈচিত্র্যের জাদুঘরকে যেন তুলে ধরে। বাংলার নদী শুধু সৌন্দর্যময়ই নয়, তা জোগায় মানুষের আহার এবং জীবিকা। তো রবীন্দ্রনাথের কাছে এসবই মনে হলো প্রাণের, নিজস্ব চাওয়ার। তিনি এই সৌন্দর্যকে দূর থেকে উপভোগ করেননি, এর সাথে মাখামাখিও করেছেন। শরীরীসত্তাকে রীতিমতো অবগাহন করিয়েছেন। তাছাড়া তিনি একা নন, তাঁর পরিবারপরিজন নিয়ে এই সৌন্দর্যের ভেতরে বাস করেছেন, কখনো চরে, কখনও নৌকায়, কখনো নদীর ধারে কুটিবাড়িতে। এই সজীব ও জীবন্ত সৌন্দর্যের মাঝ দিয়ে তাঁর পথিকসত্তা আকছার ঘুরে বেড়িয়েছে, দেখেছে সীমা ও অসীমের কালচিহ্নগুলোর উদ্ভাস। তাঁর রোমান্টিক মন মেতে ওঠেছে এই সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ স্পর্শে। বস্তুত সৌন্দর্যের অধরা এবং ধরা বিভাবে তাঁর মন আপ্লুত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাতে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েননি বরং হয়ে উঠলেন সৃষ্টিশীল, অজস্র লেখায় এই পথপ্রাপ্তিকে অনুপূরিত করতে লাগলেন। এর পাশাপাশি প্রথমবার তিনি মুখোমুখি হলেন আমজনতার সাথে যারা সহজ এবং ব্রাত্য। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হতে থাকল তাঁর মধ্যে। মানুষ ও প্রকৃতির আশ্লিষ্টতায় তিনি হলেন আবেশিত, মুগ্ধ ও চিত্রার্পিত। বুঝলেন, নিজের ভূমিতেই রয়েছে আত্মীয়তর সৌন্দর্যরা। উপরন্তু বাংলার মানবসুরকেও তিনি খুঁজে পেলেন এখানে যা তাঁর মনকে অধিকার করল, পেলেন লোকায়ত চিন্তার এক বিশাল খনি। মুগ্ধ হলেন নানা ধরনের ও বর্গের মানুষ ও প্রকৃতির চমৎকার সহাবস্থানে। এককথায় প্রকৃতি ও জীবনের ধীর, বিলম্বিত ও দ্রুত লয়ের সবকাটকেই তিনি এখানে আবিষ্কার করলেন যা তাঁকে নিসর্গী করে তোলে, করে তোলে হৃদয়ের কবি। জীবনস্মৃতিতে তিনি বলেছেন যে জীবনলোকের কথা যা তাঁকে যৌবনের প্রারম্ভে টেনেছে, তাকেই তিনি পেলেন এখানে। যে-খেয়ানৌকা পাল তুলে চলে যেত, যাতে তিনি সওয়ার হতে চাইতেন, সেই খেয়ানৌকা তিনি পেলেন শিলাইদহে, আর উঠেও পড়লেন তাতে, ভ্রমণের জন্য।

১৮৮৯ সাল থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে তাঁর এই শিলাইদহকেন্দ্রিক ভ্রমণ। শিলাইদহকেন্দ্রিক ভ্রমণের আত্মমনোচ্ছবি বা অটোসাইকোগ্রাফি ধরা আছে ছিন্নপত্রাবলীতে। সমগ্র বাংলা সাহিত্যে এই কীর্তি যেন অনন্য এবং একক সৌন্দর্যে ভাস্বর। শুধু নিজেকে সংস্কারহীন এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের দ্বারা যে মহৎ সাহিত্যের জন্ম হতে পারে, তার প্রমাণ ছিন্নপত্রাবলী। তরুণ রবীন্দ্রনাথ যেন নিজেকে ভেতর থেকে খুলে দিলেন, অঁরি ফ্রেদরিক আমিয়েল যেমন তাঁর জার্নালে আত্মচলাচলের এক নিভৃত আলেখ্য তুলে ধরেছেন তেমনই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছিন্নপত্রাবলীতে। ছিন্নপত্রবলীকে বলা যায় প্রথমত আত্মপাঠ তারপর আত্মধ্বনি। পত্রগুলো লেখার সময়টিকে বলেছিলেন ‘রসে ভরা’ ‘যা জীবনে আর আসবে না।’ এখানে এসে  জায়গাটিকে মনে হলো তাঁর অবাস্তবিক মরীচিকাজগতের মতো। আবিষ্কার করলেন এক ‘মায়া-উপকূল’ যেখানে ‘নির্জন মাঠের মধ্যে পূরবী’ বাজে। আবিষ্কার করলেন, ‘দূরে গফুরের চলনশীল একটি লণ্ঠনের আলো’, ‘বৃহৎসৌন্দর্যপূর্ণ নির্বিকার উদার শান্তি’। পতিসরে থেকে তিনি লিখলেন : ‘দিনের বেলায় রাতকে ভুলি, রাতের বেলায় দিনকে ভুলি।’ এসবই তাঁর আত্মমুখোমুখিতা, আত্মদর্শন, আত্মআবিষ্কার।

বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ—এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকা, কত কত দেশ, কত কত ভূগোল। সেসব ভ্রমণে সবসময় পথিকসত্তার উদাসীনতা বা নির্মোহতা হয়তো ছিল না, ছিল হয়তো কাজের অভিপ্রায়ও। কিন্তু তবু দেখা যায়, সমগ্র ভ্রমণেই স্ফুলিঙ্গের মতো, তাঁর পথিকসুলভ কাতরতা কখনো কখনো বাঁধ ভেঙে বেড়িয়ে পড়ছে। ১৯৩২ সালে পারস্যভ্রমণের সময় হাফিজের সমাধিস্থলে এসে কবি হয়ে পড়লেন বিহ্বলিত : ‘আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রুকুটি। তাদের রচনাজালে আমাকে বাঁধতে পারেনি, আমি পলাতক, ছুটি নিয়েছি অবাধপ্রবাহিত আনন্দের হাওয়ায়। নিশ্চিত মনে হলো, আজ কত শত বৎসর পরে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।’ ষাটোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি খুলে দিলেন নিজেকে, বললেন পলাতক, বললেন মুসাফির। আমরা জানি, তিনি তাঁর পিতার কাছে ছোটোবেলায় হাফিজ শুনতেন। সেই হাফিজ যিনি রহস্যময় সরাইখানার হাঁক শুনতেন আর পাপতে তোয়াক্কা না-করে সরাব পানের আহ্বানে সারা দিতে বলতেন। বলতেন, আয়ু দীর্ঘ হলেও তাকে হ্রস্ব বলেই ভাবতে হবে, বিশ্বাসী হতে হবে বর্তমানে, ভবিষ্যতে যা-কিছুই থাক না কেন। কালিদাসের নির্বাসিত যক্ষ যেমন মেঘকে বলছে অলকানন্দায় থাকা স্ত্রীকে যেন মেঘ তার বার্তা পৌঁছে দেয় তেমনই হাফিজ বলছেন : ‘বায়ু প্রবাহিত হও, যাও তো তার কুটিরের দিকে বয়ে, আর তার খবর নিয়ে ফিরে আসো একবার।’ জাপানযাত্রীতে তিনি মানুষের মধ্যে দুটো পাখি আছে বলেছিলেন, একটি ভোগী অন্যটি দ্রষ্টা। আরও বলেছিলেন, যে দেখে সেই মানুষটিই এক বড়ো রহস্য। সম্ভবত হাফিজের মধ্যে এই দুই পাখির স্বরূপই নিবিষ্ট ছিল।

১৯৩২ সালে বিদেশ ভ্রমণের পর আর বিদেশ-ভ্রমণে যাননি, কিন্তু দেশের ভেতর ভ্রমণ বজায় রেখেছিলেন সুবিধামতো। আরও আশ্চর্যের যে, ভ্রমণে তিনি আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলেন। জাভা-যাত্রীর পত্র-র শেষ পত্রে অমিয় চক্রবর্তীকে তিনি লিখলেন : ‘পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে অন্তত এই বুদ্ধি আমার এসেছে যে, ঘুরে বেড়িয়ে বেশি লাভ নেই; এ যেন চালুনিতে জল আনবার চেষ্টা, পথে-পথেই প্রায় সমস্তটা নিকেশ হয়ে যায়।’ ঝোড়ো হাওয়ার তাড়া খাওয়া মৌমাছির মতোই নিজেকে ভ্রমণে ব্যর্থ ভাবলেন তিনি। হয়তো শারীরিক ক্লান্তি পেয়ে বসেছিল তাঁকে, মনের বিচরণকে গুরুত্ব দিতে চাইলেন তিনি, স্থিরতার মাঝে গতিকে খুঁজতে চাইলেন। তাই শারীরিক ভ্রমণের চেয়েও মানসিক ভ্রমণ ছিল তাঁর আমৃত্যু ক্রিয়াশীল। ছিন্নপত্রাবলীর ৭৮ নম্বর পত্রটির শুরুতেও দেখা যায় তাঁর চরিত্রের বহির্মুখিতা এবং অন্তমুর্খিতার উভবল অবস্থাটি। তিনি লিখলেন : ‘আমার কিন্তু আর ভ্রমণ করতে ইচ্ছে করছে না— ভারী ইচ্ছে করছে একটি কোণের মধ্যে আড্ডা করে একটু নিরিবিলি হয়ে বসি। ভারতবর্ষের দুটি অংশ আছে—এক অংশ গৃহস্থ, আর-এক অংশ সনানাসী; কেউ বা ঘরের কোণ থেকে নড়ে না, কেউ বা একেবারে গৃহহীন। আমার মধ্যে ভারতবর্ষের সেই দুই ভাগই আছে। ঘরের কোণও আমাকে টানে, ঘরের বাহিরও আমাকে আহ্বান করে। খুব ভ্রমণ করে দেখে বেড়াব ইচ্ছে করে, আবার উদভ্রান্ত শ্রান্ত মন একটি নীড়ের জন্যে লালায়িত হয়ে ওঠে। পাখির মতো ভাব আর-কি।’

পৃথিবীর সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার কথা তিনি বলেছেন, তাই পথিক হওয়া যেন ছিল তাঁর ভবিতব্য। পথিক শব্দটিকে তিনি যে কত ভাব ও বিভাবে প্রয়োগ করেছেন! প্রেমপথিক, ঈশ্বরপথিক, ভাবপথিক, দর্শনপথিক, নিসর্গপথিক, জীবনপথিক কত ভাবেই তাঁর পথিকসত্তা আহুত। পথিকের মনের আকুলতায় তাঁর সবকিছু প্রকাশিত, এমনকি ঈশ্বরসন্ধানও : পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে,/পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া। সমগ্র জীবনের পরতে পরতে, সব লেখার, বিপুল-বিশাল লেখার ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করে গেছেন তিনি। একটি দিনের আগমন থেকে প্রস্থান, রাতের অভিসঞ্চার থেকে নিষ্ক্রমণ, ফুলের বর্ণ থেকে গন্ধ, পাখির উড্ডয়ন থেকে অপসৃতি, সবখানেই ছিল তাঁর অদৃশ্য ভ্রমণরেখার মায়াসম্পাত। ক্ষণ তাঁর কাছে কাল হয়ে ওঠে আর কাল যেন ক্ষণ। তিনি যখন বলেন, দিনশেষের রাঙা মুকুল জাগল চিতে, তখন দর্শনেন্দ্রিয় ভ্রমণ করে মনকে, অনুবর্তী করে আপনালোকে। ইন্দ্রিয়গত অন্বেষণ ঠাঁই খোঁজে আত্মগত অবস্থিতিতে; বস্তু, রূপ আর তার মানসগতি একটি অভিন্ন যাত্রা শেষে স্মিত হয়ে ওঠে। যে-ভ্রমণানুভূতি তাঁর ভেতরে কাজ করত তাতে ফুটে ওঠে পথিকের ভূয়োদর্শিতা : ‘মানুষ যদি কেবলমাত্র মানুষের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করিত তবে লোকালয়ই মানুষের একমাত্র মিলনের ক্ষেত্র হইত। কিন্তু মানুষের জন্ম তো কেবল লোকালয়ে নহে, এই বিশাল বিশ্বে তাহার জন্ম। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে তাহার প্রাণের গভীর সম্বন্ধ আছে।’ পথিকের প্রেমস্বপ্ন তিনিই প্রথম বাঙালিকে উপহার দেন। বলেছেন : পথ কি নিজের শেষকে জানে, যেখানে লুপ্ত ফুল আর স্তব্ধ গান পৌঁছল, যেখানে তারার আলোয় অনির্বাণ বেদনার দেয়ালি-উৎসব। ভ্রমণে তো তিনি পেয়েছেন প্রেম—মানব-মানবী, প্রকৃতি, প্রাণসত্তা, সবার প্রেম। প্রথমবার বিলাত যাওয়ার সময় বোম্বেতে সেই আনা তড়খড়ের দুর্বার-উচ্ছল অথচ বিস্ময়জাগানিয়া প্রেম, আর আর্হেন্তিনায় বিকতোরিয়া ওকাম্পোর প্রশান্ত মুগ্ধতাবোধের অবশ-করা প্রেম। তাঁকে প্রথমদর্শনে ওকাম্পোর শরীর অবশ হয়ে যায়, মনে হয় তাঁকে হৃদয়ের নিকটে আবির্ভূত আপনজন; রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘কত সহজে করিলে আপনারি/দূরদেশী পথিকেরে।’ আনা তড়খড় তাঁকে অনুরোধ করছে : যেন তিনি কখনও দাড়ি না রাখেন, মুখের সীমানা যেন দাড়িতে ঢাকা না-পড়ে; দস্তানা চুরির কাহিনির রূপকে জানান চুমু খাওয়ার অধিকারবোধের কথা। এ দুই প্রেমই ছিল তাঁর কাছে মনোস্পর্শের এক প্রাকৃতিকতা। প্রেমেও তিনি পথিক, পথিকের মতোই স্মৃতিসঞ্চয় আর তার রোমন্থণ করে পেরিয়ে গেছেন তা, আর তাকে করে তুলেছেন কবিতা ও শিল্প, বা অক্ষয় স্মৃতলেখ। জীবন যেন স্মৃতি যা ঘটনাকে করে তোলে সময়ের দান। প্রেমকে স্মৃতি করেছেন তিনি, স্মৃতিকে প্রেম। সম্ভবত প্রেম হলো সেই স্মৃতি—বিচ্ছেদকে যে অঙ্গীভূত করে জন্ম দেয় ইন্দ্রিয়সংবেদনের, ব্যক্তি যাকে বয়ে বেড়ায় স্যমন্তক মণি বা ল্যাপিজ লেজুলির মতো, জীবনভর। পথিক রবীন্দ্রনাথের প্রেম তাহলে ‘অধরা মাধুরী’, যাকে তিনি ছন্দোবন্ধনে ধরেছিলেন!

//জেডএস//

লাইভ

টপ