আহমাদ মোস্তফা কামালের কথাসাহিত্য: বড় বেদনার মতো বাজে

Send
মোস্তফা তারিকুল আহসান
প্রকাশিত : ১০:৩৭, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৪, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

[আহমাদ মোস্তফা কামাল বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখালেখির শুরু ১৯৯০ দশকের শুরুতে। প্রথম গল্পগ্রন্থ দ্বিতীয় মানুষ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর আরো ৯ টি গল্পগ্রন্থ, আটটি উপন্যাস, একটি নভেলা, চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ এবং দুটি মুক্তগদ্যের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সম্পাদনা করেছেন আরো ১১টি গ্রন্থ। পেয়েছেন প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার, কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার এবং সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার। আহমাদ মোস্তফা কামালের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলায়। আগামীকাল তার ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আজ প্রকাশ করা হলো তার কথাসাহিত্য নিয়ে পর্যালোচনার প্রথম কিস্তি।]

কথাসাহিত্য আজকের দিনে যেভাবে লিখিত হয় বা পাঠক তাকে যেভাবে পায় সেটি যে বিচিত্র এক পথপরিক্রমা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সারা বিশ্বের পটভূমিতে এই বিবেচনা আমাদের নিতে হয় যে, একটি গল্প বা কাহিনি দিয়ে পাঠককে টানা বা তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তার অর্থ এই নয় যে, ক্লাসিক সাহিত্যের যে মূল্য বা তাৎপর্য ছিলো বা গ্রহণযোগ্যতা ছিলো তা হারাতে বসেছে। পাঠক তার ক্ষুধা অনুসারে এখনো ক্লাসিক ধারার সাহিত্যের কাছে ফিরে যায় বা যেতে পারে। তবে বর্তমানে কথাসাহিত্য যে বিচিত্র প্রপঞ্চের নাম, তার গুরুত্ব অন্যরকম। বিষয়বস্তুর বর্ণনা বা নবরূপের উপস্থাপনা দিয়েও নতুন সাহিত্য কিনারা খুঁজে পেতে হিমসিম খাচ্ছে। জটিল জীবন প্রক্রিয়ার কারণে বা নানাবিধ যোগসুত্রের কারণে আমাদের প্রবহমান জীবনাচরণকে আয়ত্ব করাও বেশ কষ্টসাধ্য। তবু লেখককুল থেমে নেই। এই অস্থির সময়যাপনকে খুঁটে খুঁটে দেখে মণ্ড করে নতুন প্রক্রিয়া বা বয়নকুশলে উপস্থাপনের কাজ করে চলেছেন। কাজটি সতত কঠিন। অজস্র বিষয়ের মধ্যেও প্রয়োগ-কৌশলের অভিনবত্বে নতুন লেখা তৈরি হচ্ছে নতুন ব্যস্ত পাঠকের জন্য। এই সময়ে লেখক খুব চ্যালেঞ্জের মুখে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিশ্বায়ন আর ব্যস্ততার ঘেরাটোপে বন্দি মানবের কাছে মানবীয় বিষয়ও কখনো কখনো ক্লিশে মনে হয়। সে কারণে লেখক ভিন্নতর জীবন জিজ্ঞাসার খোঁজে নামতে চান; সামূহিক চালচিত্রের যুৎসই বা মানানসই চরিত্র বা গল্প তাকে খুঁজে নিতে হচ্ছে। তার চারপাশের চেনা জগত তার কাছে অচেনা হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে, সেটি ভাববার সময় এসেছে, বিশেষত পাঠক যখন সারা পৃথিবীর লেখালেখি হাতোর মুঠোয় পাচ্ছেন খুব দ্রততার সঙ্গে। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে আমরা কি আমাদের পূর্বসূরীদের দেখানো পথে হাটবো? নাকি ক্রমসম্প্রসারিত আর বহুধা বিস্তৃত জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবো। এর চটজলদি কোনো উত্তর দেওয়া শক্ত। তবে বলতে দ্বিধা থাকার কথা নয়, আমাদের সময় এসেছে আমাদের শক্তি ও সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি দেবার। ‘৪৭ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সাহিত্যধারার শক্তিশালী প্রবাহকে মনে রেখে নতুন সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি ফেরানোর সময় বোধহয় এসেছে। শুধু লিখে তৃপ্তি পাবার বিষয়টি এখন মাথা থেকে বাদ দেবার সময় এসে গেছে বলে ধারনা করা যায়। তবু এর বাইরে নিবেদিত এবং কথাসাহিত্যকে তার উচ্চতায় ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়ে লেখেন সেইসব লেখকদের স্বতন্ত্রভাবে মনে রাখতে হবে।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্য স্বাধীনতার পরে বিচিত্রপথে হেটেছে; ক্রমঅপসৃয়মান জীবনবোধের কারণে এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিকাশের পটপরিবর্তনের কারণে আমাদের কথাসাহিত্যে যে সুর ও রেখা যোগ হবার কথা, তা পুরোপুরি না হলেও বেশ সফলভাবে তা অনেকে আঁকতে পেরেছেন তাদের রচনায়। নতুন ধারার রচনার সাথে জনপ্রিয় বা লোকপ্রিয় ধারা এবং পূর্বানুগামি ধারাও সব সময় লক্ষ করা গেছে। ইউরোপ বা ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যপাঠজাত মুগ্ধতা নিয়ে যারা কথাসাহিত্য লিখেছেন সেই লেখা সবসময়  মানসম্পন্ন না হলেও তাকে গুরত্ব দেবার প্রবণতার জন্য অন্যসারির শক্তিমান লেখকেরা কখনো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে আমাদের দেশে। যারা সরাসরি প্রভাবিত না হয়ে তার শক্তিকে কাজে লাগাতে পেরেছেন সে ধারার লেখকও আমরা লক্ষ করি। তবে স্বীকার করা ভাল যে, পোক্ত পাঠকশ্রেণির অভাবে আমাদের প্রকৃত শক্তিশালী লেখকগণ মূল্যায়িত হননি।

ধরে নেওয়া হয় যে (যদিও এই কথার যুক্তি কতটুকু তা প্রমাণ করা কঠিন) আমাদের নব্বই দশকের লেখালেখি বেশ বিচিত্র এবং এই বলয়ে লেখকের সংখ্যাও বেশি। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের শক্তিশালী অধ্যায়কে ভুলে যাচ্ছি। আশি বা নব্বই পাশাপাশি অবস্থানে থাকার কারণে দুই প্রজন্মের মধ্যে বেশ সাযুজ্য দেখা যায়, যদিও পার্থক্যের রকমও কম নয়। অনুমান করা চলে যে, স্বাধীনতার পর কয়েকটি দশকে পুরনো লেখকদের সঙ্গে নতুনেরা মিলে একটি বড় পাটাতন তৈরি করতে পেরেছেন। সবাইকে আলাদা করে সবসময় চেনা যায় না সত্য, তবে সবাই একটি গভীর স্রোতধারা তৈরির চেষ্টা করেছেন। এ সময়ে কথাসাহিত্য নানা নিরীক্ষা বা প্রবণতাকে অন্বিত করেছে; বিশেষত রচনাশৈলি বা বয়নকুশলতার নতুনত্ব সহজে চোখে পড়ে। যারা চারপাশের জীবন বা চোখেদেখা ব্যক্তি,পরিবার বা নানা সম্পর্ক নিয়ে স্বাভাবিক সতত কৌশলে কথাসাহিত্য রচনা করেছেন তাদের সংখ্যাই হয়তো বেশি। তাদের নিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতাও আমাদের কথাসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

নব্বইয়ের অন্যতম জীবনঘনিষ্ট ও পরিচিত কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল। নব্বইয়ের প্রথম থেকে তিনি নিয়মিতভাবে লিখে চলেছেন। প্রচুর না লিখলেও তিনি একেবারে কম লেখেননি। তার লেখার বিষয়বস্তু ও রচনাধারা বিবেচনায় নিলে তিনি একটি স্বতন্ত্র স্বর তৈরি করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গল্প ও উপন্যাসে একই সঙ্গে সমান দক্ষতায় তিনি এ পর্যন্ত লিখেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী এক হতাশাজর্জরিত যুবক শ্রেণিকেই তিনি মূলত তার লেখার বিষয়বস্তু করেছেন। এর পাশাপাশি রয়েছে পারিবারিক জীবনের গভীর সংবেদ। পারিবারিক সর্ম্পকজাত নানা প্রসঙ্গকে উপস্থাপনের সময় তার শক্তি সহজে পাঠক বুঝতে সমর্থ হন। ভাই-বোন, মা-বাবা বা বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের সহজাত রূপ কত নিবিড় হতে পারে, কত মায়াবী হতে পারে সেটি কামালের অজস্র গল্প বা উপন্যাসে আমরা লক্ষ করি।

কামালের গল্প বা উপন্যাস পড়লে খুব সহজে আমরা বলতে পারবো তিনি জাত রোমান্টিক লেখক। দুঃখকে তিনি ক্লাসিক মর্যাদায় নিয়ে গেছেন বলা যায়। এটির অর্থ এই নয় যে, তিনি সিচকাঁদুনে বা তরল লেখা আমাদের উপহার দিয়েছেন। বরং বাংলাদেশের নিন্মবিত্ত বা মধ্যবিত্তের চরম সংকটময় জীবনের ভয়াবহতাকে তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। তার সময়ের কোনো কোনো লেখক আহমাদ মোস্তফা কামালকে গভীরভাবে মোহাবিষ্ট করেছে ঠিকই তবে তিনি নিজের পথ তৈরি করতে পেরেছেন সাবলীলভাবে। তার লেখার প্রতিটি পরতে মিশে আছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের জীবনযাত্রার আলেখ্য। তার চরিত্রগুলো বাস্তবতার নিরিখে উপস্থাপিত এবং শিল্পের নৈয়ায়িক শৃঙ্খলায় চিত্রিত। কামাল স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছেন মূলত তার নিজস্ব জীবনদর্শন ও চিন্তার বিভূতির জন্য। তার দেখার ভুবন আলাদা: সেটি রোমান্টিক হলেও সেই রোমান্টিকতার রঙ স্বতন্ত্র মর্যাদা পেয়েছে কাহিনি ও চরিত্রের নতুনতর সংযোজনায়।

আমরা জানি, সত্যিকার অর্থে সব সেরা রচনাই আত্মজৈবনিক। নিজস্ব অভিজ্ঞতার নির্যাস এবং তার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় মহান সাহিত্য। লেখকের অভিজ্ঞানসূত্র লেখাকে ক্লাসিক করে তোলে আর এভাবে সাহিত্যে জীবনের সম্ভাবনার নিরীক্ষা করার সুযোগ পান লেখক। আহমাদ মোস্তফা কামাল যা লিখেছেন তা তার জীবননিষিক্ত রসধারা। তার গল্পের একটি চরিত্রের মুখে তিনি লিখেছেন:    

একজন গল্পকারের গল্পের সংখ্যা যাই হোক না কেনো, আমার ধারণা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনি একটি গল্পই লেখেন জীবনভর। সাধারণের মাঝে খোঁজেন অসাধারণত্বের সম্ভাবনা। সেই একটি গল্প আমাকে ধরা দেয়নি এখনো। যা লিখছি তা খসড়া মাত্র: জানি না, আরাধ্য গল্পটি আদৌ কোনোদিন ধরা দেবে কিনা আমাকে।

এখানে এই সত্য তিনি পাঠককে বলতে চেয়েছেন যে, লেখা নিয়ে তিনি কতটা সৎ, কতটা বিশ্বস্ত। বস্তুত, প্রতিটি লেখক তার শ্রেষ্ঠ লেখার জন্য অপেক্ষা করেন আর সে কারণেই তিনি সবসময় দৃঢ়প্রত্যয়ী থাকেন, তার সেরা রচনাটি লেখার জন্য।

যারা কামালকে শুধু রোমান্টিক বা প্রেমের ক্ষেত্রে সফল মনে করেন তাদের জন্য একথা বলা প্রয়োজন যে, সমসাময়িক বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতার তিনি একজন নিবিড় পর্যবেক্ষক। ‘ঘরভরতি মানুষ অথবা নৈঃশব্দ’ গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পে তিনি বাস্তবতাকে শিল্পে পরিণত করেছেন। এমনকী ‘আমাদের শহরে একজন অচেনা লোক’ শিরোনোমের দু’টি গল্পে সাময়িক জীবনবাস্ততাকে একটি দার্শনিক অভীক্ষায় আঁকতে সক্ষম হয়েছেন। ‘ঘুমোবার সব আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবার পর’ এই পর্বেও অসাধারণ গল্প। আপাতভাবে রোমান্টিক মনে হলেও এর গভীরতা পাঠকের আত্মাকে স্পর্শ করে। এখানেই কামালের শক্তি পাঠক উপলব্ধি করতে পারেন।

অন্ধ জাদুকর, কান্নাপর্ব, আগুন্তক উপন্যাসে তিনি স্বচ্ছন্দ বরাবরই এবং এখানে পাঠক ব্যক্তিসম্পর্কের গভীরতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি  করতে পারেন। প্রেম, রীরংসা, মানবমানবী সম্পর্ক এবং দুঃখ-যাতনার গভীর পর্যবেক্ষক কামাল। তার রচিত গল্প পাঠককে বেদনামাথিত করে তোলে এবং তিনি উপযুক্ত প্রেক্ষাপট ও রচনাকৌশল নির্মাণ করেন।

‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ উপন্যাসে বিশাল পটভূমি লক্ষ করলে কামালের কথাসাহিত্যের শক্তি সহজে অনুমান করা যায়। তিনি পারিবারিক জীবনের পটভূমিকে ভিত্তি ধরেই এগিয়েছেন তবে ভারতভাগের ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে সামরিক শাসক এরশাদের সময়কে উপস্থাপন করেছেন গভীরভাবে। এই প্রথম তিনি উপন্যাসে ঐতিহাসিক উপাত্ত ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করলেন। এই উপন্যাস স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুরবস্থার চিত্রকে চিত্রিত করেছেন এবং রাজনীতি ব্যক্তিজীবনকে কীভাবে পর্যুদস্ত করে তা উপস্থাপন করেছেন সাবলীলভাবে, উপন্যাসোচিত কুশলতায়।

নব্বই দশকের এই শক্তিমান কথাকার তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নির্যাস, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, নবদৃষ্টিভঙ্গি, রচনাশৈলীর স্বাতন্ত্র্য এবং মানবসম্পর্কের নিবিড় অবলোকনের জন্য পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন গভীরভাবে। তিনি পাঠকের মর্ম স্পর্শ করতে পেরেছেন; এটি লেখক হিসেবে তার শ্লাঘার বিষয়ে হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ