তিন সহোদর শহিদ ও তাদের স্ত্রী

Send
বাশার খান
প্রকাশিত : ০০:০৫, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৫, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

শহিদের স্ত্রীগণ। [ডান দিক থেকে] শহিদ এছাক মিয়ার স্ত্রী আছকিরন্নেসা, শহিদ আবুল কাশেমের স্ত্রী খায়েরা বেগম এবং শহিদ মোকসেদুর রহমানের স্ত্রী ফিরোজা বেগম। ছবি:লেখক

সুরকার ও গীতিকার আব্দুল লতিফের একটি বিখ্যাত গান, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারোর দানে পাওয়া নয়/ আমি দাম দিছি প্রাণ লক্ষকোটি, জানা আছে জগৎময়।’

কত ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেল বাঙালিরা—সে কথা লেখা আছে ইতিহাসে। তবে সব কথা লেখা নেই, ভবিষ্যতে হয়তো লেখা হবে। ১৯৭১ সালে বাংলার শহর ও গ্রামে-গঞ্জে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিলো যা শুনলে, পড়লে এবং জানলে যে কারো বুক কেঁপে ওঠে; ঘটনার ভেতরটা এত নির্মম যে, পাঠকের মনে হবে—এটা বোধহয় কোনো গল্প-উপন্যাসের কাহিনি।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি একটি গ্রাম ‘ছোটো সাতবাড়িয়া’। গ্রামের নামের শুরুতে ছোটো শব্দটি যুক্ত থাকলেও ১৯৭১ সালে এই গ্রামে এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে, যা মানুষের দুঃস্বপ্নকেও হার মানায়।

২৪ আগস্ট ১৯৭১, বিকেল বেলা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্থানীয় দোসর-রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ছোট সাতবাড়িয়ায় প্রবেশ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী—উদ্দেশ্য হাঁস-মুরগি ও খাসি ধরে নিয়ে যাওয়া। এ সময় গ্রামের রহিম বখশের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা এছাক মিয়াদের বাড়িতেও যায় হানাদাররা। এই বাড়ি থেকে হাঁস-মুরগি এবং খাসি ধরে নিয়ে যায় তারা। তখনো পাকিস্তানি সৈন্যরা জানতো না যে, এছাক মিয়া, মোকসেদুর রহমান ও আবুল কাশেম—তারা তিন সহোদর ভাইই মুক্তিযোদ্ধা। হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে পাশ্ববর্তী জগন্নাথ দিঘি সংলগ্ন ক্যাম্পের দিকে রওনা হয় হানাদার বাহিনী। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধা।

হানাদার বাহিনীর দলটি যখন স্থানীয় চিওড়া বাজারের কাছাকাছি যায়, প্রতিবেশী কয়েকজন রাজাকার দৌড়ে গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের জানায়, ‘ছোটো সাতবাড়িয়ার যে বাড়ি থেকে কিছুক্ষণ আগে হাঁস-মুরগি ধরে আনা হয়েছে, সেই বাড়ির আপন তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধা। কয়েকদিন হলো তারা ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে বাড়িতে এসেছে। থাকছে ছদ্মবেশে। তাদেরকে হত্যা না করলে আজ রাতেই আশপাশের রাজাকাররা এই তিন ভাইয়ের আক্রমণের শিকার হবে।’

এ কথা শুনে হানাদারদের দলটি আবার এছাক মিয়াদের বাড়িতে যায়। হানাদার বাহিনীতে যেহেতু হাঁস-মুরগি নিয়ে চলেই গেছে, বাড়িতে আর আক্রমণ করবে না—এমন ধারণা থেকেই তিন ভাই তখনো বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। তাই হানাদার বাহিনীর হাতে সহজেই ধরা পড়েন তিন সহোদর এছাক মিয়া, মোকছেদুর রহমান ও আবুল কাশেম।

এরপর পাকিস্তানি হানাদারদের ভারত সীমান্তবর্তী জগন্নাথ দিঘি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। সন্ধ্যার আগে তিন ভাইকে দিয়ে ক্যাম্পের পাশে গর্ত করানো হয়। সেই গর্তে ফেলেই তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে হিংস্র হায়েনার দল। এরপর ঐ গর্তেই তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধাকে মাটি চাপা দেওয়া হয়। শহিদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, চিওড়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে একাত্তরের এই করুণ অধ্যায়।

শহীদ এছাক মিয়ার ছেলে মীর হোসেনের বয়স ছিল তখন ৭ বছর। বাবা ও দুই চাচাকে তার সামনে থেকেই ধরে নিয়ে গিয়েছিলো পাকিস্তানি আর্মি। মীর হোসেন জানান, ‘সেদিন সন্ধ্যায় অথবা পরদিন সকালে বিবিসি বাংলা থেকে খবর প্রচার হয় যে, চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথ দিঘিতে তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। আশপাশের লোকজন রেডিওতে এই খবর শুনে আমাদেরকে জানায়। তখন বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। আমরা সবাই দিশেহারা হয়ে পড়ি।’

শহিদ মোকসেদুর রহমানের ছেলে আব্দুল মান্নান স্মৃতিচারণে জানান, ‘আমি তখন ছোটো। স্পষ্ট মনে আছে, বাবার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে আমি চিওড়া বাজার পর্যন্ত যাই। এরপর রাজাকাররা বাবার হাত থেকে আমাকে জোর করে ছাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘যা বাড়িতে যা। তোর বাপ পরে আসবে।’ কিন্তু বাবা আর আসেননি। আসেননি আমার জেঠা ও চাচাও। কোনোদিন আর আসবেনও না।’

স্বামী হারিয়ে তিন শহিদের স্ত্রী এতই ভেঙ্গে পড়েন যে, একাত্তরেই তাদের তিন জনেরই মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। আজ পর্যন্ত তারা কেউই পুরোপুরি সুস্থ হননি। সাক্ষাৎকার নেওয়া চেষ্টা করা হলে দেখা যায়, শহিদ এছাক মিয়ার স্ত্রী আছকিরন্নেসা দু’এক লাইন কথা বলার পরই খেই হারিয়ে ফেলেন। শহিদ আবুল কাশেমের স্ত্রী খায়েরা বেগম এবং শহিদ মোকসেদুর রহমানের স্ত্রী ফিরোজা বেগমের মনে নেই তেমন কিছুই। কোনো প্রশ্ন করলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তাদের চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু উচ্চ স্বরেও কাঁদেন না। ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’ এই প্রবাদের বাস্তব প্রতিফলনই যেন ঘটেছে তাদের জীবনে।

এই ঘটনার পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিশোধ নিতে দেরি করেননি। তিন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দেওয়ার মূলহোতা রাজাকার টুকু মিয়াকে ২৫ বা ২৬ আগস্ট রাতে আটক করতে সক্ষম হন তারা। রাজাকার ধরার অপারেশনে অংশ নেওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, ‘রাজাকার টুকু মিয়াকে ধরেই আমরা প্রচণ্ড মারধর করি। জানতে চাই—তার সঙ্গে আর কে কে এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই সে নাম প্রকাশ করছিলো না। পাশেই পাকিস্তানি আর্মির জগন্নাথ-দিঘি ক্যাম্প। তাই আমরা খুব বেশি সময় অবস্থান করতে পারিনি সেখানে। অপরদিকে হাতে সময়ও কম ছিল। তাই দ্রুত রাজাকারটিকে হত্যা করে আমরা গোপন আস্তানায় চলে যাই।’

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে জগন্নাথ দিঘির ঐ গর্ত থেকে তিন শহিদের দেহাবশেষ আনা হয়। দেখা যায়—শহিদ মোকসেদুর রহমানের কোমরে থাকা ম্যাচলাইট ও হাতের আংটি তখনো অক্ষত আছে। এরপর তাদেরকে বাড়ির পাশের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

শহিদের স্ত্রীরা বর্তমানে ১০ হাজার টাকা করে সরকারি ভাতা পান। যদিও বর্তমান সরকার শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে ভাতা নির্ধারণ করেছে। এ প্রসঙ্গে শহিদের সন্তানরা জানান, কিছুদিন দৌড়াদৌড়ি করে কোনো ফল পাননি তারা। তাই এগুলো নিয়ে তারা হতাশ।

 ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাড়ির পাশে তিন শহিদের স্মৃতিস্মরণে কুমিল্লা জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি পাঠাগার নির্মিত হয়। তবে সেখানে কোনো বই-পুস্তক দেয়া হয়নি আজও। পাঠাগারটি পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়।

তিন শহিদের মধ্যে বড় জনের স্ত্রী আছকিরন্নেসা বাকি দুই শহিদ জায়ার তুলনায় শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা ভালো। তবে কথা বলার সময় কিছুক্ষণ পরপর খেই হারিয়ে ফেলেন। তিনি হাঁটা-চলাও করতে পারেন। বাকি ২ জন লাঠিতে ভর করে হাঁটেন। আছকিরন্নেসার ছেলের বউ মমতাজ বেগম জানান, প্রতিবছর ২৪ আগস্ট আসলে আমার শাশুড়িকে ঘরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। জগন্নাথ দিঘির দূরত্ব আমাদের গ্রাম থেকে বেশি নয়। যেখানে তিন শহিদকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল, ২৪ আগস্ট এলে শাশুড়ি সেখানে চলে যান। দীর্ঘক্ষণ মাটিতে বসে থাকেন। কাউকে কিছু বলেন না। এমনকি কাঁদেনও না। পরে আমরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাকে নিয়ে আসি।’

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

//জেডএস//

লাইভ

টপ