দূষণ ।। হেনরিয়েটা রোজ-ইনিস

Send
অনুবাদ : নাসরিন জে রানি
প্রকাশিত : ০৬:০০, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪২, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক হেনরিয়েটা রোজ-ইনিসের ‘পয়জন’ গল্পের অনুবাদ এটি। গল্পটি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় ২০ জুলাই ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। তার আগে গল্পটি ‘আফ্রিকান পেনস্ : নিউ রাইটিং ফ্রম সাউদার্ন আফ্রিকা ২০০৭’-এ প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে লেখা ‘দূষণ’ গল্পটি ২০০৮ সালে ‘কেইন প্রাইজ ফর আফ্রিকান রাইটিং’ পুরস্কার লাভ করে।

মহাসড়কে চলার কিছু পরে লিনের পুরনো টয়োটা গাড়ির তেল ফুরিয়ে না গেলে এতক্ষণে সে পেট্রোল স্টেশনে পৌঁছে যেত। গাড়িটিকে ঠেলে সে যখন রাস্তার ওপর থেকে কিনারে নিতে লাগলো, তখন তার নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হলো। সামনেই পেট্রোল স্টেশনের বিশাল বিল্ডিংয়ের লোগো। লাল ও হলুদ রঙের পতাকাগুলো দেখার পর থেকেই তাকে আবার হতাশায় পেয়ে বসে। পেট্রোল স্টেশনের খোলা প্রান্তর জুড়ে বিশাল গাড়ির বহর এবং লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অনেক গাড়ি। আপাদমস্তক নীল রংয়ের পোশাক পরা এক লোককে লিন দেখতে পেল। লোকটি তার হাত দিয়ে গলা চেপে ধরার অঙ্গভঙ্গি করে আছে। হায় ঈশ্বর! এখানেও কোনো পেট্রোল নেই।

পেট্রোল স্টেশনের ভেতরে অপেক্ষারত লাইনে কুড়ি ধরনের অসহায় লোকজন গাড়ির ভেতরে বা গাড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে। তারা লিনের দিকে শূন্যদৃষ্টি নিয়ে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয় দূরের শহরের দিকে। একপাশ থেকে বন্ধ করা একটা মিনিবাস। কিন্তু মিনিবাসের ভেতরেই কয়েকজন যাত্রী তাদের ব্যাগগুলোকে কোলে নিয়ে শক্ত হয়ে বসে আছে। সবাই খুব নিশ্চুপ, নীরব, বড় রাস্তার দিকে তাকিয়েছিল—সেখান থেকেই তারা এসেছে।

কেপটাউনের পাহাড়ের মাথায় শয়তানের চূড়াটিকে আড়াল করে তার ওপরে একটি তৈলাক্ত মেঘ ঝুলছে। এটি গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ অথবা অগ্নি হতে পারতো, যদি এটি এতোটা কালো না হতো এবং এত বিশাল আকার ধারণ না করতো। যখন তারা দূরের পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ দেখছিল, তখন তাদের মনে হয়েছে, ক্রমেই মেঘ জমে এত বড় হতে লাগলো আর একটু পরই পাহাড়ের চূড়াকে আড়াল করে দ্বিগুন উচ্চতার আকৃতি লাভ করে আকাশকে ঢেকে দেয়। তারা ভাবে, সেই ঘনীভূত মেঘ যেন একটি দুষ্টু জ্বীনের মতোই তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বিকেল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। প্রতিবার একটি করে গাড়ি লাইনে দাঁড়ালেও পুরো দৃশ্যটা একই রকম স্থির মনে হয়। ভিড়ের চোখগুলো আকাশের মেঘের দিকে সরে যায় একটু পরপর। নীল পোশাক পরা লোকটা তার গলায় হাত দু’টো চেপে ধরছে বারবার। অর্থহীন সময় এবং নির্বোধের মতো বসে থাকা, চোখ সরিয়ে নেওয়া এখানে ওখানে। কয়েকজন চালক একপাশে দাঁড়িয়ে পেট্রোল স্টেশনের দিকে অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, অন্যরা তাদের গাড়িতে ফিরে যায়। স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে বসে বসে তাদের ডাকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

লাইনে দাঁড়ানো একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি পেট্রোল স্টেশন ছেড়ে টানা কয়েকশত মিটার দূরে উপকূল বরাবর যাত্রা শুরু করে। গাড়ির চালক অস্থির চিত্তে যেন উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে যায়। আরেকটা গাড়ি এসে তিনজন ঘর্মাক্ত লোক ঠেলে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। লোকগুলোর শক্তিশালী বাহুর পেশী ফুটে আছে। হাতগুলো শরীরের পাশে ঝুলছিল, যখন তারা পেট্রোল পাম্পের অ্যাটেন্ডেন্টের সঙ্গে স্থানীয় খোসা উপভাষায় কথা বলতে শুরু করে। শহরে যাওয়ার রাস্তায় কোনো ভিড় নেই।

আগের দু’দিন ধরে টিভি চ্যানেলের সংবাদে পঞ্চাশ কিলোমিটার ধরে মহাসড়কগুলোর দু’পাশের তীব্র যানযটের চিত্রসহ বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিল। বিস্ফোরণের ভয়াবহতা এবং গুরুত্ব বুঝতে বেশিরভাগ মানুষের একদিন সময় লেগেছিল এবং যার যার পক্ষে সম্ভব হয়েছে তারা শহর ছেড়ে চলে গেছে। লিনের ধারনা, ভ্রমণের সময় পেট্রোলের অভাবেই লোকজন ফাঁদে আটকা পড়েছে এবং তারা শহর ছেড়ে বের হতে পারছে না। সে নিজেও অনেক দেরি করে ফেলেছে, সব ধরনের সতর্কতামূলক পরামর্শ শোনার পরেও। তার স্বভাবের কারণেই এমনটি ঘটেছে। সবকিছু জড়ো করতে করতে তার দেরি হয়ে যায়। প্রথম রাতে বন্ধুদের সঙ্গে মদ খেয়ে সে মাতাল হয়ে পড়েছিল। তারা দেরি করে বাড়ি ফিরে টিভিতে সংবাদগুলো দেখছিল। দ্বিতীয় রাতে সে একই কাজ করেছিল একা একাই। তৃতীয় দিন সকালবেলা গলার ভেতরে প্রচণ্ড জ্বলুনি নিয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠে বুঝতে পারে এটি কোনো হ্যাঙ্গোভার নয় এবং তাকে এই জায়গা ছেড়ে পালাতে হবে। ততক্ষণে তার পরিচিত সবাই শহর ছেড়ে চলে গেছে।

পেট্রোল স্টেশনে লোকজনের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে এবং তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এখানে-সেখানে বসে। পেট্রোল অ্যাটেন্ডেন্ট এবং কার-পুশাররা গাড়িগুলোর চারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তাদের শারীরিক ভাষাতে কেমন যেন অসতর্কতা ফুটে উঠেছে। তাদেরকে দেখে আর ডিউটিরত মনে হচ্ছে না, বরং তাদের হাবভাব এমন যেন ভিড়কে উপেক্ষা করে তারা নিজেদের জরুরী কাজগুলো করতেই ব্যস্ত। এক মহিলা ঝুঁকে তার গাড়ির চালককে নিচু স্বরে কী যেন বললো। সেই চালক এবং পেট্রোল স্টেশনের প্রহরীকে সবচেয়ে বেশি নির্ভার দেখাচ্ছিল। তারা দু’জনই নিজেদের সিটগুলোতে হেলে বসে আছে। চালক বেসবল ক্যাপটি তার চোখের ওপরে ঝুঁকে রাখে। অন্যদিকে একটি বড় দলে আফ্রিকান একটি বিশাল পরিবারকে দেখা যায়, সেখানে—মা, বাবা, বেশ কয়েকজন চাচা-চাচি এবং বিভিন্ন বয়সের আধডজন স্বর্ণকেশী বাচ্চা রয়েছে। পেট্রোল পাম্পের একপাশে তারা একটি শিবির স্থাপন করে। সেখানে তারা কুলার-ব্যাগ এবং ভাঁজ করা চেয়ারগুলো জড়ো করে। লিন তাদের চামড়ায় কালো কুঁচকুঁচে দাগ দেখতে পায়। শহর থেকে বেরিয়ে আসা প্রত্যেকেই অদ্ভুত আর বিচিত্র জিনিস বয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সাদা চামড়ার লোকদের অবস্থা আরো খারাপ ছিল। একটা দলকে দেখে মনে হলো সবাই যেন ছাত্র ছাত্রী—ট্যাটু, ড্রেডলক আঁকা ছিল ওদের গায়ে, পেট্রোল পাম্পের একপাশের কংক্রিটের ওপর বসে আছে চুপচাপ। একটি কালো মেয়ে, যার মাথাভর্তি কালো নোংরা চুল পেছন পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে, রাস্তার অপর দিক থেকে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে এলো হাতগুলোকে বগলে চেপে রেখে। ওকে দেখে লিনের নিজের কথা মনে পড়ে যায়। দশ বছর আগে সে ছিল এমনই চর্মসার, অধৈর্য একটি মেয়ে। একটি রূপালি রংয়ের হালকা ধরনের পিকআপ ট্রাক, যার দরজায় লেখা ‘আডিল’স আইটি বোনাঞ্জা’। সেই পিকআপ ট্রাকের ভেতর থেকে ট্রাকস্যুট পরা এক সুঠামদেহী লোক বেরিয়ে আসে এবং সতর্কতার সঙ্গে পেট্রোল স্টেশনের সামনে-পেছনে হাঁটাহাঁটি করে। আসলে কি লোকটি আডিল নিজেই? লোকটি তাঁবু করে বসা পরিবারটির কাছে যায় এবং সম্মানের সঙ্গে হাঁটু মুড়ে ঝুঁকে বসে।

লিন পেট্রোল স্টেশনের দোকানের কাঁচের দেওয়ালের গায়ে একা হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যটা মেঘে আড়াল করা, তাই রোদটা মলিন, যেন অস্বচ্ছ আবছায়ার মতো। লিন ফোনটাকে দেখতে লাগলো, কিন্তু গতকাল থেকেই নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। নিজেকে তার ভারাক্রান্ত মনে হয়। তার কেউ এমন ছিল না, যাকে সে ফোন করতে পারে। সেই নীল পুলওভার পরা লোকটা বারবার লিনের দিকে তাকাচ্ছে। তার গায়ের রং স্যাঁতস্যাঁতে মেটে, পাতলা শরীর এবং মুখে খলনায়কদের মতো গোঁফ। লিন চোখ সরিয়ে নিল অন্যদিকে।

কালো মেয়েটা পুনরায় লাফিয়ে লাফিয়ে বড় রাস্তায় উঠে যায়। একটি লাল ছোট্ট গাড়ি একজন মাত্র যাত্রীকে নিয়ে খোলা দূরত্ব পেরিয়ে দিকে এগিয়ে আসে। এই দেখে তার বন্ধুরা এক সঙ্গে ছুটে গাড়িটিকে ঘিরে ফেলে বড় রাস্তার উপরই। লিনের ইচ্ছে হলো তাদের সঙ্গে যোগ দেয়, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। গাড়িটি ভরে গিয়েছিল আর যাত্রাও শুরু করে দিয়েছে। প্রতিটি জানালার কাঁচে লোকজন মুখ চেপে আর কোলে হাতগুলো দলা পাকানোর ভঙ্গিতে বসে আছে। কালো চুলের মেয়েটি হাত তুলে তাদের বিদায় জানায়।

একদল যাত্রী গুচ্ছের মতো একটি গাড়ির ভেতরে বসে আছে। সেখানে এক মহিলার কাঁধের উপর দিয়ে উঁকি দিয়ে লিন দেখতে পেল, চাচা বয়সের এক লোক, পরনে হাঁটু তোলা প্যান্ট, ফুয়েল ট্যাংকের নিচে ঝুঁকে ট্যাংকের ফুটো মেরামত করছে। তার হাতমুখ জুড়ে পেট্রোলে মাখামাখি অবস্থা। সে তার পায়ের মোজাটি খুলে পেট্রোলের ক্যানে জড়িয়ে নেয়। তার গাল ফোলা এবং সে দাঁত দিয়ে পেট্রোলের হোস-পাইপটি ধরে রেখেছে। তারপর সে মুখ থেকে হোস-পাইপ বের করে পেট্রোলের কন্টেইনারের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তাকে খুব বিমর্ষ আর মলিন দেখাচ্ছিল।

‘আর কিছু?’ সে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে।

লিন মাথা নাড়ায়। দলের লোকজন অন্য গাড়ির দিকে যায়।

লিন ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে গিয়ে বসে। সেখানে ভাজা ডিমের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। চেয়ারগুলো লাল রংয়ের প্লাস্টিকে মোড়া আর টেবিলের ওপরটা হলুদ মার্বেলের তৈরি। এই দেখেই তার ছোটবেলার ভ্রমণের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। টমেটো আর সরিষার সসের বোতলগুলো, যেগুলোর মাথায় মুখ লাগানো আছে এবং মুখ খুলে চাপলেই সস বেরিয়ে আসে। এই আবছায়া জায়গাতে সে একা বসে আছে। উল্টোদিকে কাউন্টারের একপাশের তাকের উপর কিছু চিপসের প্যাকেট রাখা আছে। জানালার পাশে সরে বসার আগে লিন একটা কোকের ক্যান নিল। মনে মনে ভাবলো, একটি বিয়ার থাকলে বেশ হতো। জানালার রঙিন কাঁচ ছুয়ে সূর্যের আলো পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এটি নতুন কিছু নয়। এইসব জায়গায় সূর্যের আলো এমন রঙিন হয়েই ছড়িয়ে পড়ে সবসময়।

কাঁচের দেওয়ালের ভেতর দিয়ে আনমনে লিন আডিলের আইটি বোনাঞ্জা ট্রাকটিতে পেট্রোল ভরার দৃশ্য দেখতে লাগলো। ছোট্ট পিকআপ ট্রাকটিতে তেল ভরা হয়ে গেলে ক্যানোপিটা সরিয়ে নেওয়া হলো যেন অন্যান্য গাড়িগুলোতেও পেট্রোল ভরে দিতে পারে। চাচা-চাচির দল গাড়ির সম্মুখের দিকে বসে ছিলেন এবং তাদের প্রশস্ত পিঠ পেছনের সবাইকে আড়াল করে রাখে। সেখানে ছোট্ট বাচ্চা এবং ব্যাগগুলো মাঝখানে জড়ো করে রেখেছে। এছাড়া দু’টো কিশোর ছেলেমেয়ে গাড়িতে ওঠার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এইসব দেখতে দেখতে লিন আনমনে কী যেন ভাবতে থাকে। এক শ্বেতাঙ্গ পরিবার, যাদের মাত্র একটি বাচ্চা, পেট্রোল স্টেশনের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ঘেমে নেয়ে ওঠা কার-পুশাররা পেট্রোল ভরার জন্য গাড়িগুলোকে ঠেলে ঠেলে উপরে তুলে দিচ্ছে। নীল পুলওভার পরা লোকটা আডিলের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। লিন নিজে কতটা বোকা—এতগুলো লোকের এই বিচিত্র অবস্থানকে সে ঠিকমত পড়তে পারছে না। লিন যদি একটু চেষ্টা করতো, তাহলে তার গাড়িটিই এতক্ষনে লাইনে দাঁড়িয়ে যেত। এই ভাবতে ভাবতে লিন যখন তার কোকে একটু চুমুক দেয়, ততক্ষণে হালকা রূপালি ট্রাকটা অদৃশ্য হয়ে যায় তার সামনে থেকে।

উষ্ণ কোক : মনে হচ্ছে এখন বিদ্যুৎও চলে গেছে।

লিন খুব মনোযোগী হয়ে টেবিলের কোণা থেকে এলুমিনিয়ামের স্ট্রিপ টেনে তুলতে থাকে। এটা হয়তো জরুরি কোনো কাজে ব্যবহার করার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। সে একটা পনির এবং পেঁয়াজের চিপসের প্যাকেট খুলে খেতে শুরু করে। বিস্মিত বোধ করে নিজেকে এত ক্ষুধার্ত দেখে। তার নিজেকে হঠাৎ সুখি মনে হলো। এই অনুভূতিটা কেমন একটা চোরা অনুভূতি, প্রকাশ্য নয় যেন। এটা যেন স্কুল পালানোর মতোই একটা ব্যাপার। সে এমন একটা জায়গায় বসে আছে, যেখানে কেউ তাকে চেনে না, কেউ তাকে খুঁজেও পাবে না। এমন একটি দিন, কোনোভাবেই তা অন্যান্য সাধারণ দিনের মতো নয়। শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। তার যা করতে হবে, তা হলো আরো কিছু ঘণ্টা অতিবাহিত করা এবং এই অপেক্ষা চালিয়ে যাওয়া। সে ইচ্ছে করলে নোংরা ভিনাইল ছিটানো সিটের উপর হালকা রোদে শুয়ে থাকতে পারে। অনেকদিন সে কোনো চিপস খায়নি। এই চিপসটি খেতে বেশ সুস্বাদু, কুচকুচ করে খেতে মজা লাগছে। চিপসের লবণ আর চর্বিগুলো তার মাথা ব্যথাকে সারিয়ে তোলার অনুভূতি দিচ্ছে। লিন পা থেকে হিলজুতো খুলে ফেললো, যা এতক্ষণ তাকে ব্যথা দিচ্ছিল। সে গায়ের জামাটিকেও হালকা ঢিলা করে নিলো। লোকজনকে অপসারণ করে নিয়ে যাওয়ার দলে সামিল হওয়ার মতো করে সে নিজেকে সজ্জিত করেনি আজ।

এক মহিলা পেট্রোল অ্যাটেন্ডেন্ট ঝনঝন শব্দ করে কাঁচের দরজাটি খুলে ভেতরে ঢুকলো। শ্যামলা সুন্দরী তন্বী মেয়ে, চুলগুলো পরিপাটি করে কাটা। লিন লক্ষ্য করে যে, মেয়েটির ত্বক বাদামি হলেও খুব মসৃণ এবং পেট্রোল স্টেশনে কাজ করার ছাপ নেই তাতে। সে তার বুক থেকে একটা চাবির রিং বের করে নিয়ে কাউন্টারের দেরাজ খুলে লিনের দিকে একবার তাকালো, কয়েকটা পঞ্চাশ টাকার নোট, এরপর একশত টাকার নোট নিয়ে গুনতে লাগলো।

‘ট্যাক্সি চলছে’, মেয়েটি লিনকে উদ্দেশ্য করে বলে।

‘সত্যি? কোন পেট্রোল দিয়ে?’ লিন প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ, ঐ ট্যাক্সি পেট্রোল ভরতে পেরেছে। সিটগুলো ভরার জন্য ড্রাইভার অপেক্ষা করছে। তোমার জন্য ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে পারি, যদি তুমি রাজি থাকো,’ মেয়েটি বললো।

‘তুমি মশকরা করছো। লোকজনের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার জন্য সে শুধু অপেক্ষা করছে। সে কি যে কোনো সময় আমাদেরকে নিতে পারবে?’ লিন জিজ্ঞেস করে।

মেয়েটি এমনভাবে কাঁধ ঝাকালো যেন সে বলতে যাচ্ছিল, ‘হ্যাঁ, ট্যাক্সি ড্রাইভার তাই করছে।’ তারপর সে বুড়ো আঙুল চেপে পুনরায় টাকা গুনতে লাগলো।  

জবাবে লিনও কাঁধ ঝাঁকায়।

‘তুমি কি ট্যাক্সিতে আসতে চাও না?’

‘না, বিষয়টি তা নয়—আসলে আমরা কোথায় যাবো, ঠিক বুঝতে পারছি না। পুলিশ আসবে। উদ্ধারকারী দল আসবে।’

মেয়েটি আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে পাছা দিয়ে পেছনের দরজা খুলে টাকা হাতে বাইরে বেরিয়ে যায়। দরজাটি আস্তে আস্তে দুলে পরে স্থির হয়ে গেল।

লিন জানালা দিয়েই দেখলো টাকা হস্তান্তরের দৃশ্যটা। এই লেনদেনটি ট্যাক্সি চালককে চাঙ্গা করে তোলে এবং সে নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মূল সড়কের ব্যস্ততার মতো সে হাততালি দিতে দিতে চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকে। ভাবটা এমন যেন, এক্ষুণি তাকে গাড়ি ছাড়তে হবে। গাড়ির ভেতরে থাকা লোকগুলো সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালে সেই সুযোগে অন্যরা হুড়োহুড়ি করে উঠতে থাকে। ড্রাইভার লিনকে জানালার ভেতর দিয়ে দেখতে পায়। লিনের দিকে তাকিয়ে সে ভ্রুকুটি করে, প্রথমে লিনের দিকে তর্জনী তোলে এবং মিনিবাসের দিকে ইশারা করে দেখায়। তারপর সে পুনরায় লিনের দিকে তাকিয়ে তর্জনীর ইশারাতে জিজ্ঞেস করে, ‘যাচ্ছো তুমি?’ লিন শুধু একটু হাসি দেয়। ড্রাইভার তখন তার হাতটি নামিয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়। লোকজন তাদের ব্যাগ-প্যাটরা নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার জন্য ছুটাছুটি করছিল। লিন শক্ত করে টেবিলের কোণা ধরে রেখেছে, যেন তার পেটে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই কিছু জিনিস প্যাক করে পুরো রাস্তাটা গাড়ি চালিয়ে আবার সব নতুন করে শুরু করা তার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে। সিদ্ধান্ত, কর্ম এবং গতি—তার মনে হলো এবং ইচ্ছে হলো সিটের উপর কুঁকড়ে-মুকড়ে মাথা নিচু করে শুয়ে পড়তে। কিন্তু ট্যাক্সিটা ভরে গিয়েছে ততক্ষণে।

এই সিদ্ধান্ত নিতে তার শরীর তাকে বিরত করলো এবং হজম ক্ষমতার এই নাটকীয় পরিবর্তন তাকে অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত করতে থাকে। সে সাহস হারিয়ে ফেলেছে এবং সে দ্রুত টয়লেটের দিকে দৌঁড়ে যায়।

একটু আগেও টয়লেটে প্রবেশের পথে ভিড় ছিল। কিন্তু এখন সব ফাঁকা। বেসিনের আয়নায় নিজের মুখ দেখে চমকে ওঠে লিন। তার চুল গ্রিজে মাখামাখি, চোখগুলো গোলাপি, দেখে মনে হয় যেন সে কাঁদছে। দূষণের কারণেই এসব হচ্ছে। কালো রংয়ের প্লাস্টিকের কমোডে বসে লিন অনুভব করলো তার সারা শরীর থেকে বিষ বেরিয়ে এসেছে। সে টিস্যু দিয়ে মুখ মোছে এবং টিস্যুতে কালো কিছু উঠে আসে। তার ত্বকে এগুলো জমেছিল। সে টিস্যু দিয়ে তার নাকটি মুছতে শুরু করে। টিস্যুতে অজ্ঞাত তামাটে গন্ধ ছিল। এটা কীসের লক্ষণ? রাসায়নিক প্লান্টে যে বিস্ফোরণ হয়েছিল, তাতে কোনো ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছিল? খবরে তারা কী কী বলেছিল? লিন এখন আর তা কিছুতেই মনে করতে পারে না।

সে হঠাৎ করেই নিরবতা অনুভব করে। কিছুক্ষণ আগে ফাঁকা হওয়া জায়গাটির নিস্তব্ধতাটুকু সে অনুভব করতে পারছে।

পেট্রোল পাম্পের সামনের আঙিনায় মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। ভাঙাচোরা সাদা ট্যাক্সিটাকে ধাক্কা দিয়ে উপরে তোলা হয়েছে। তার ভেতরে ঠাসাঠাসি করে লোকেজন বসে আছে। ট্যাক্সির কব্জাগুলো খোলা, তিনজন লোক ছাদের হুড়কোতে আঙুল বেঁধে তাতে ঝুলে আছে। লিন দৌঁড়ে বড় রাস্তায় উঠে আসে, কিন্তু পেছনের জানালায় প্রায় লেপ্টে থাকা একমাত্র শ্বেতাঙ্গ দম্পতির ছোট বাচ্চাটি লিনকে দেখতে পেল। ট্যাক্সির গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাটির চোখও চঞ্চল হয়ে উঠে।

লিনের মাথার ওপরে মেঘেরা জমে জমে পুঞ্জীভুত হতে থাকে, আশেপাশে কোনো ছাউনি নেই। লিন নোংরা মেঘের মুখটা দেখতে পেল। এর আগে শহরে যখন ছিল তখন হেলিকপ্টার এবং সাইরেন বাজার শব্দ শুনেছিল। কিন্তু এখানে কাউকে দেখতে পেল না। খুব নিশ্চুপ চারপাশ। এভাবে মহাসড়কে একা দাঁড়িয়ে থাকাটা অবাস্তব লাগছে। এটি একটি গাড়ি চলাচলের রাস্তা। এই রাস্তা হাত দিয়ে বা পায়ের পাতা দিয়ে স্পর্শ করার জন্য নয়। এটি অন্যভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারলে ভালো হতো। রাস্তার চারটি লেনই খুব প্রশস্ত। এমনকি রাস্তার মধ্যবর্তী সাদা রেখাগুলো এবং গাড়ি থেকে দেখলেও মধ্যবর্তী জায়গা বেশি প্রশস্ত দেখায়। তার শরীরের প্রশস্ততার চেয়েও বড় এই ফাঁকা জায়গাটি, যেখানে সে চাইলেই শুয়ে পড়তে পারে। লিন নিজেকে থামালো পেছনে ফিরে দেখা থেকে, যেখান থেকে অদৃশ্য কোনো গাড়ি চলে আসতে পারে।

হঠাৎ তার এমন সব লোকের কথা মনে হলো যাদের বহুবার সে মহাসড়কের পাশে দেখেছে। লিন একাই হাঁটতে লাগলো। এই রাস্তা মানুষের হাঁটার জন্য তৈরি করা হয়নি। একটি অদৃশ্য দূরত্বকে সামনে রেখে লিন উদ্দেশ্যহীনভাবে একস্থান থেকে অন্যস্থানে হেঁটে যেতে থাকে। লিনের মনে পড়ে, সেসব লোকগুলোর ঝুঁকে থাকা মাথায় ছিল ধুলোর আচ্ছাদন এবং দিগন্ত ছিল যেন লোহার আংটাতে বাঁধা। বিগত বছরগুলোয় মহাসড়কের ওপর গাড়ি চালানোর সময়গুলোতে লিনের গাড়ি কোথাও থামেনি, বিশেষ করে কেপটাউন, জোহানেসবার্গ কিংবা ডারবানে। রাস্তায় হাঁটেনি লিন। কেনো সে তা করবে? মহাসড়কগুলো ছিল অন্ধকার আর ধূসর বর্ণের এক অনিবার্য স্থান, যেখানে রাস্তার পাশে ঢুলুঢুলু চোখে লোকেরা দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতো। গাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া মানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতোই। অন্য জগতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো। আর কতদূরে সে হেঁটে যাবে? দুর্বলতার কারণে সে যে কোনো সময়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারে। বাতাসে অজ্ঞাত তরল কিছু জমা হওয়ার আগে এখানে শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে কি?

সময়টা যদিও মধ্য-বিকেল, কিন্তু মনে হয় বেলা পড়ে গেছে। শহরের দিকে তাকালে দেখা যায় আকাশ ঘন লাল আলোয় সেজেছে। সূর্যের তেজ কমে যাওয়ার জন্য সরাসরি তাকানো সম্ভব—সূর্যটা যেন একটা চকচকে চাকতি, ভিন্ন গ্রহের চাঁদের মতো। মেঘগুলো অনেক ঘন হয়ে জমেছে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে এসব দেখছিল। সারা আকাশকে কালো কালিতে মেখে একটা ঘন গভীর মেঘমালা তার দিকে ছুটে আসছে। সে অদ্ভুত বৃষ্টির দিকে হাত পাতে এবং আকাশের পানে প্রসারিত করে। কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বিশাল হয়ে ঝরে পড়তে থাকে। লিন অনুভব করে এগুলো সব পাখি, হাজার হাজার পাখি, মরা পাখি, যারা আক্রান্ত হয়েছে। এখানে, পাহাড়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তারা তার কানের চারপাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। গিজগিজ শব্দ, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, যেন কোনো জ্বলন্ত পুস্তক থেকে তারা ছিটকে বেরিয়ে এসেছে।

তার মাথার ওপর দিয়ে পাখির দল অতিক্রম করার সময় লিন প্রথমবারের মতো ভয় পেল।

প্রায় পঞ্চাশ প্যাকেট আলুর চিপস, মিশ্রিত স্বাদের। আশি বা তার অধিক চকোলেট বার, বিভিন্ন ধরনের। পানীয়, ওয়াইন-গাম্পস, ফ্রিজে বিবিধ আকারের তিরিশটির মতো কোক এবং ফান্টার বোতল। তবে কোনো প্রকার অ্যালকোহল নেই সেখানে। প্রতিদিন আপনার কতটুকু জল পান করা উচিত? উইম্যান ম্যাগাজিন বলেছে, নূন্যতম দুই লিটার এবং এই পরিমাণ পানি আমাদের শরীরে জমে থাকা টক্সিনগুলোকে বের করে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত। কোক পানীয় হিসেবে কি যথেষ্ট? অবশ্যই। তাই ধরে নিই, দু’সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহ এখানে থাকতে হবে। বেঁচে থাকার পাটিগণিতটা এত সহজ। পর্যাপ্ত সময় হিসেবে দু’সপ্তাহকে যথেষ্ট বলা যায়। উদ্ধারকারী ততদিনে চলে আসবে। তার কাছে নিজেকে আত্মবিশ্বাসী এবং প্রস্তুত মনে হয়।

লিন দরজার কাঠের হাতল ঠেলে কাউন্টারের পেছনে চলে গেল। সেটা তখনো খোলাই ছিল। কক্ষের মধ্যে দু’টো সুইং ডোর ছাড়াও উঁচুতে কয়েকটা জানালা আছে। জানালা দিয়ে বেশ আলো এসে পড়ছে পুরো ঘরটিতে। কক্ষের এক কোণায় ইস্পাত দিয়ে তৈরি রান্না করার জায়গা দেখতে পায় লিন। দু’টো হ্যামবার্গার প্যাটি, আংশিক রান্না করা, গ্রিলের উপরে রাখা এবং একটা ঝুড়িতে ভাজা কিছু চিপস, যা তেল ঝরানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। কক্ষের ডানপাশে ধাতুর হাতল লাগানো একটা পেছন-দরজা দেখতে পেল লিন। সে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খোলে।

খোলা দরজার ভেতর দিয়ে তার সামনে একটি গৃহস্থালী দৃশ্য ভেসে ওঠে। তিন বা চারটা কালো রংয়ের ঝুড়ি, ধাতুর পাত্র, সূর্যের আলো, কয়েকটা খাঁজ কাটা ব্লুগাম গাছ এবং দু’টো কাঠের খুঁটিতে পুরনো তারের বেড়া দিয়ে তার উপরে বাছুরের চামড়া ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পেছনের দেওয়াল জুড়ে একটা লোহার ছাউনী, যা সামনের দিকে হেলানো । আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডল খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। লিনের কোনো ধারনাই ছিল না যে, এই রকম বড় ফ্রেঞ্চাইজ নেওয়া পেট্রোল স্টেশনের ভেতরে এত মাঝারি মানের বসতবাড়ি থাকতে পারে। তার ধারণা ছিল সবকিছু যেন নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিন্যস্ত, শৃংখল, সময় মেনে সবাই আসে এবং বাড়ি ফিরে যায়, যেমনটা আর সব কোম্পানিতেও দেখা যায়। এরকম একটি পরিবেশ—এখানকার কর্মচারীদের তাদের বিরতিগুলোতে হয়তো উজ্জিবিত করে, হয়তো উদ্যমী করে ফিরিয়ে আনে। তবে এটা পরিষ্কার যে, জায়গাটা কারোর বাড়ির উঠান। এখানে রান্না-বান্না আর মানুষের থাকার একটা আমেজ ছড়িয়ে আছে। ধোঁয়ার গন্ধ, ঘাম, থালাবাটি ধোয়া আর খাবারের গন্ধ, চুলা থেকে উঠে আসা তেল চিটচিটে গন্ধ সবকিছু ছড়িয়ে আছে বাতাসে। বাগানের মধ্যদিয়ে একপাশে প্লাস্টিকের বালতি রাখা, হয়তো বাচ্চাদের জন্য বা থালাবাটি ধুতে ব্যবহার করা হতো। দু’টো প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা, যার একটির এক-পা ভাঙা। ইটের উপর একটা মরচে পড়া গাড়ি রাখা আছে।

লিন হঠাৎ ভীষণ জোরে হেসে ওঠে। তার গাড়ি! তার নিজের গাড়ি। বিশ বছরের পুরনো গাড়ি। একই মডেলের নীল রংয়ের টয়োটা, যা একবার ছিনতাই হয়েছিল। গ্রীষ্মের কড়া রোদে জ্বলেপুড়ে নীল রংটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। গাড়ির ছাদেও মরচে পড়েছে। গাড়ির দরজার নিচের প্রান্তটি খোলা ছিল। গাড়ির সব সৌন্দর্য হারানোর পরে বিধ্বস্ত ভাব দেখে লিনের দাঁতগুলো কিড়মিড় করে ওঠে।

লিন গাড়িটি পেরিয়ে যায়। বেড়ার ওপাশে একটি গরু বাঁধা আছে। ওর সারা গা জুড়ে মাটি মাখা, চামড়াতে কাদা লেগে আছে। তারের কাছাকাছি একটা ছাগল দৌঁড়ে আসে। স্পষ্ট চোখে লিনকে দেখতে লাগলো। লিন আদর করে ছাগলটার শিংগুলোর মাঝখানে আচড়ে দেয়। এই দেখে গরুটাও লিনের গায়ে মুখ ঘসে দেয় এবং ঘাস খাওয়া দাঁত বের করে হাসতে লাগলো। লিন মনে মনে এডভেঞ্চারের আনন্দে কেঁপে ওঠে এবং ভাবে, ক’দিন যদি এখানে থাকা যেত। এই ভাবতেই তার সমস্ত ভয় কেটে যায়। এখানে কেউ ছিল না। কয়েক মাইল দূরেও কেউ নেই। যদিও এর মাঝেই সে লক্ষ্য করেছে যে, তার নিজের গলাটা বারবার হাত দিয়ে চেপে ধরতে ইচ্ছে করছে। গলাতে জ্বলুনি হচ্ছে।

এখানে এই প্রত্যন্ত এলাকায় আকাশটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার, যেন পেট্রোল স্টেশন দূষিত আকাশের সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছে। সে ছাগলের গায়ে আঙুল দিয়ে গুলি করার মতো ভঙ্গি করে, ট্যাক্সি চালকটার ভঙ্গিটা তার মনে পড়ে গেল। লিন ছাগলটাকে চক্কর কেটে ঘুরতে শুরু করে আর এতে সে বেশ মজাই পাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে নিশ্বাস ফেলে তারের বেড়ার পেছনের দিকে হেঁটে যায়। ‘জিসাস’, গাড়ির মধ্যে কেউ বসে আছে। কম্বলের স্তুপের মতো দেখতে মনে হলেও কাছে গিয়ে দেখতে পেলো সেটা একটা বুড়ো মহিলার আকৃতি ধারণ করে পেছনের সিটে বসে আছে। লিনকে দেখে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে।

লিন হাসতে চেষ্টা করলে গলায় কাশি চলে আসে এবং সে বুক চাপড়ে হাসির চেষ্টা করে। ‘হায় ঈশ্বর! আমি দুঃখিত, আপনাকে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।’ লিনের দিকে সোজা তাকিয়ে বৃদ্ধ মহিলা বিড়বিড় করেন। তার পরনে পা থেকে মাথা অবধি বোতামযুক্ত হাতে বোনা সবুজ রংজ্বলা জামা। পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু অবধি মোজা এবং পায়ে চটি জুতো। এছাড়া সে সাদা চুলের ফোলানো খোঁপা মাথার ওপরে সুন্দর করে বেঁধেছেন।

লিন ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসে। ‘হ্যালো, আপনি কি আফ্রিকান কেউ?’ লিনের আফ্রিকান বলাটা কেমন যেন দূর্বল শোনায়।  

মহিল খুব দ্বিধা নিয়ে বললেন, ‘হ্যালো?’ তারপর খুব বিব্রত গলায় আবারও বললেন, ‘হ্যালো।’ এই শব্দটি অন্যরকম এক অনুভূতি দিয়েছিল, যা শুনতে হাস্যকর লাগছিল।

আশেপাশে কোনো সাড়া নেই। খুবই বাজে ঘটনা। কেউ তাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। মহিলা কি বিস্ফোরণের ব্যাপারে কিছু জানে? ‘দুঃখিত, তানি,’ লিন আবারও দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। সে এর আগে কাউকে এত গুরুত্ব দিয়ে ‘তানি’ বলেনি। কিন্তু এতে কিছুটা কাজ হলো যেন। বৃদ্ধ মহিলা তার দিকে হালকা কৌতূহল দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। কালো, ছোট ছোট চোখ, সাদার প্রায় অনুপস্থিতি সেখানে। হাড় বের হয়ে যাওয়া মুখের ভাঁজে একটি কাঁচুমাচু দৃষ্টি নিয়ে বৃদ্ধ মহিলাটি লিনের দিকে তাকালো, একটি বৃদ্ধ ইদুর যেন, তাকে দেখে লিনের মনে হলো।

‘হাই, আমি লিন। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। ওহ! আমি বুঝতে পারছি না যে, কেউ আপনাকে আদৌ দূর্ঘটনার সংবাদটা জানিয়েছে কিনা? কেপটাউনে যা ঘটেছে।’

মহিলার মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে ওঠে। সে বিড়বিড় করে কিছু বলতে লাগলো। লিন তার কাছাকাছি গিয়ে কান পাতল শুনতে। ‘আমার নাতি।’ মহিলা খুব হতাশাগ্রস্তভাবে মৃদুস্বরে বলেই স্পষ্টভাবে হেসে উঠলেন। তারপর তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে খুব সংক্ষিপ্তভাবে কিছু একটা বললেন।

‘সে কি আপনাকে এই ব্যাপারে কিছু জানিয়েছে?’ লিন প্রশ্ন করে, কিন্তু মহিলা কোনো জবাব দিল না। সুতরাং এখন আরেকজন মানুষের উপস্থিতিকে বিবেচনায় রাখতে হবে। একজন বয়স্ক, দূর্বল মানুষ, তাকে সাহায্য করার জন্য কাউকে প্রয়োজন। লিনের ভেতরে ভারি ভাবটা ফিরে এলো। ‘তানি,’ সে বললো। আবার শুরু থেকেই ঘটনাটা তাকে বলতে চেষ্টা করে। ‘শুনুন, একটা বিস্ফোরণ ঘটেছে, দূর্ঘটনা। বাতাসে রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়েছে। বাতাস বিষ হয়ে যাচ্ছে। সেই দূষিত বাতাস এই দিকেই এগিয়ে আসছে। আমার মনে হয় আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। লোকেরা যারা এই এলাকা দিয়ে অতিক্রম করছে, তারা আমাদের সাহায্য করতে পারে। গাড়ি কিংবা এম্বুলেন্স।’

বৃদ্ধ মহিলাটির মাঝে এই ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। কিন্ত লিনকে তার হাত ধরে সিট থেকে উঠতে সাহায্য করতে দিলেন। যদিও ব্যাপারটা খুব সাধারণ। কিন্তু তিনি লিনের উপর পুরো হেলে পড়লেন। লিন অনুভব করে, সে যেন একটা স্যুটকেসের মতো মহিলার পুরো ওজন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পেট্রোল স্টেশনের সামনের দিকে ফিরে যাওয়ার পথে দরজার পর দরজা পার হওয়ার পরিবর্তে ওরা ঘড়ির কাঁটার মতো বৃত্তাকার পথটিকেই বেছে নিল, যা বিল্ডিংয়ের পেছনের ওঠানো আর তারের বেড়ার মধ্য দিয়ে একটি সরু পথের মতো স্টেশনের মূল দরজার দিকে গেছে। ওরা যখন ক্যাফে পেরিয়ে যাচ্ছিলো, তখন হঠাৎ ভারি বৃষ্টি শুরু হয় এবং তুমুল গতিতে নেমে এসে ওদের ভিজিয়ে দেয়। বৃষ্টির তোড়ে দিগন্ত বিলীন হয়ে গেছে। মূল উঠানের পাশে ছাউনিতে এত জোরে জোরে বৃষ্টি পড়ছে, তা দেখে লিন মনে মনে আশ্চর্যবোধ করলো, কী পরিমাণ দূষিত জল বৃষ্টি বয়ে এনেছে। সে দোকানের বাইরে বেঞ্চিতে বৃদ্ধ মহিলাটিকে বসিয়ে রেখে দোকানের ভেতর থেকে কিছু পানির বোতল আর চিপস নিয়ে ফিরে এলো। হঠাৎ তার খুব টয়লেটে যেতে ইচ্ছে হয়। টয়লেটের কমোডের ফ্লাশ আর কাজ করছে না। তার পেটের ভেতরে তরল অনুভূত হতে থাকে, কিন্তু চাপাচাপিতে কিছুই বের হয় না। মাথা ধরাটা ফিরে এলো আবার।

লিন টয়লেট থেকে বাইরে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টি থেমে গেছে। যত দ্রুত এটা শুরু হয়েছিল, বাতাসে কিছু বাজে গন্ধ ছড়িয়ে রেখে তত দ্রুতই থেমে গেছে। বৃদ্ধ মহিলাটিকে আর দেখা গেল না কোথাও। বাইরে বেরিয়ে লিন রাস্তায় হাঁটতে লাগলো। তার গাড়ির দরজাটি খোলা, কাছে এগিয়ে দেখে বৃদ্ধ মহিলাটি পেছনের সিটে বসে শান্তভাবে টমেটো চিপস খাচ্ছে। বাড়ির পেছনের ধ্বংসস্তুপ থেকে বেরিয়ে এসে একটি সচল গাড়িতে বসে সে যেন নতুন করে যাত্রার জন্য অপেক্ষা করছে। একজন ঝরঝরে বৃদ্ধ মহিলা এবং তার গায়ে কোনো ভাঁজ কিংবা মলিনতার দাগ নেই। তাকে দেখে মনে হয় চিপস খেয়ে কিছুটা বোধ ফিরে পেয়েছে। তার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, যখন সে তার পকেট থেকে কচ্ছপ খচিত প্লাস্টিকের একটা চিরুনি বের করে চুলগুলো আচড়াতে শুরু করে। তার খোঁপাটিকে পরিপাটি করে আবার সাজিয়ে নেয় একটি ইউ আকৃতির কাঁটা দিয়ে। এই রকম একটা কাঁটা লিনের দাদির ছিল। লিনের হঠাৎ দাদির কথা মনে পড়ে।

লিনের নিজেকে খুব অপরিচ্ছন্ন আর আলুথালু মনে হয়। যাত্রার কথা ভেবে সে কিছুটা বিব্রত বোধ করে। গাড়ির মেঝেতে হ্যানিকেন বিয়ারের খালি বোতল, কিউবিহোলে টিস্যু মোড়ানো। তার উচিত ছিল পরিচ্ছন্ন থাকার এবং নিজের জিনিসগুলোকে গুছিয়ে রাখার এবং ভালোভাবে যত্ন করার। ‘আমার নাতি,’ মহিলা লিনের দিকে তাকিয়ে আশ্বাস খুঁজতে লাগলেন।

‘জ্বী, অবশ্যই,’ লিন বললো।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। মেঘ কিছুটা সরে গেছে এবং পাহাড়ের ওপরের জ্বলন্ত ফুটোটা দেখা যাচ্ছে। সংক্ষিপ্ত বৃষ্টিটা বাতাসে একটা বিকট দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রেখে দিয়েছে, যেন পোড়া প্লাস্টিক তবে মেটালের মতো গন্ধ সাথে পচা মাংসের তীব্র বিকট গন্ধও জড়িয়ে আছে। লিন সামনের সিটে বসলো। চাবিটা ইগনিশনে ঢুকিয়ে স্টিয়ারিং চেপে ধরে। তার কোনো পরিকল্পনা নেই। সামনের আকাশটা এক আলোকিত নীল রংয়ের অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। পেছনে বসা শান্ত মহিলাটি রিয়ার-ভিউ মিররে তাকিয়ে আছে, যেন কারো প্রত্যাশিত উপস্থিতির আশায়।

হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করে লিন গাড়ি থেকে নেমে এলো। কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে একবার পূর্ব দিকে এবং একবার পশ্চিম দিকে তাকায়। তার ইচ্ছে হলো সাইরেনের শব্দ শুনতে এবং ফ্ল্যাশ লাইটগুলো দেখতে। সে আবার গাড়ির ভেতরে ঝুঁকে বৃদ্ধ মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরে আসছি। ঠিক আছে! আপনি ভালো আছেন তো?’ বৃদ্ধ মহিলা লিনের দিকে খুব ভদ্র আর বিনয়ী চাহনি ফিরিয়ে দেয়।

লিনের চারপাশটা ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করে। সে সূর্য বরাবর হাঁটতে থাকে। যার আলো লাল আর বেগুনি রংয়ের নোংরা মাখামাখিতে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। পাহাড়টিকে আর দেখা যায় না। রাস্তাটি বর্ণহীন হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে কালো কালো কিছু অদ্ভুত কণা ছড়িয়ে আছে রাস্তার ওপর। পাঁচটা মৃত পাখির দেহ পড়ে আছে চারপাশে এলোমেলোভাবে, যাদের পাখাগুলো স্যাতঁস্যাঁতে আর একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। রাস্তার পাশে ঘাসের মাথাগুলো কালোর রংয়ের কিছুতে ভেজা। খোলা প্রান্ত থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠছে। লিনের গোড়ালির চারপাশে কেমন বাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সে যত হেঁটে যেতে লাগলো, এটা বেড়ে আরো বেশি খারাপ আকার ধারণ করতে থাকে। লিন পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।

কেউ যেন তার গাড়ির কাছে থামলো। লিন এক পলকেই তাকে চিনতে পারলো তার গোঁফ দেখে, সেই নীল রংয়ের ওভারকোট পরা লোকটা। লিন প্রথমে লুকিয়ে পড়তে চায়, কিন্তু নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে নড়তে পারছে না এবং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে লোকটাকে দেখতে থাকে। লোকটা এখনো লিনকে দেখেনি। মেটে ত্বকের মানুষটার হাতে কিছু একটা ছিল। একটা বাক্স, নাকি ক্যান, হয়তো বোতল। তার হাতে ছিল সাদা একটা জেরি-ক্যান, বড় পেট্রোলের বোতল, যা থেকে সে লিনের গাড়িতে পেট্রোল ঢালছিল।

হঠাৎ করেই লিনের পেটে মোচড় দিয়ে ওঠে এবং রাস্তার পাশে বসে পড়ে। সে নোংরা ঘাসের উপর অল্প বমি করে। বমির সঙ্গে পনির আর পিঁয়াজের ছোট ছোট দানা বেরিয়ে আসে। যখন সে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে চিবুক তুলে তাকালো, লোকটা তখনো লিনের দিকে পেছন ফিরে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে ছিল।

লিন মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে নিজেকে দাঁড় করায় এবং হাত তুলে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে খুব দ্রুত মোটর চালু করে। সে গাড়িটিকে সামনে চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। যখন সে গাড়িটা লেন পরিবর্তন করে গলিতে নিয়ে আসে, তখন সে পেছন ফিরে বুড়ি মহিলার কিছুটা রূপালি রংয়ের মাথাটা দেখতে পেল। সূর্যের আলোর প্রতিফলন উইন্ডস্ক্রিনের উপর পড়ার আগেই টয়োটা গাড়ি পরিষ্কার সন্ধ্যায় জায়গাটি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। লিন গাড়িতে বসে বসে আকাশ দেখে। সেখানে ধীরে ধীরে তারা ফুটছে। তারাদের মাঝে শূন্য জায়গাগুলো দেখতে লীনের ভালো লাগে। তার মনে হয় তারাগুলো যেন পানির চেয়েও নরম এবং অনেক গভীর। সে যে স্থানে বসেছিল, যেখানে বৃদ্ধ মহিলা ছিল আগে, পা দু’টো কুঁচকে রেখে হ্যান্ডব্রেকটার জায়গাতে। লিন কোকের ক্যানে একটা চুমুক দেয় তার বমিভাবটা কাটাতে। এখানে তিনদিন ধরে ছিল, এখন ওর মাথা পরিষ্কার লাগছে। যদিও বৃষ্টির তোড় এখনো কমেনি, কিন্তু মহাসড়কের উপর রাসায়নিক ঝড় আর নেমে আসছে না তেমন। এটা দেখে মনে হচ্ছে পাহাড় ঘিরে দূষণ তার নিজস্ব আবহাওয়া তৈরি করে নিয়েছে, একটি কুৎসিত মেঘের গাঁট যেন। লিন অনুভব করে মেঘের অগ্রভাগ পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং মেঘের ডানাগুলোর তেলতেলে ভাবকেও ধুয়ে নাইয়ে শান্ত ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে।

লিন নিশ্চিত যে, এখন অথবা পরে হোক উদ্ধারকারীর দল আসবেই। ফ্লাশিং লাইটসহ এম্বুলেন্সগুলো, সরঞ্জাম আর সাপ্লাই সরবরাহ নিয়ে উজ্জ্বল রংয়ের জ্যাকেট পরা উদ্ধারকর্মীরা। অথবা ঘরে ফেরত লোকেরা গাড়ি চালিয়ে রাস্তায় নেমে আসবে। কিন্তু এরা যদি খুব বিলম্ব করে ফেলে, তাহলে লিন পেট্রোল পাম্পের একপাশে হেলান দিয়ে রাখা কালো বাইসাইকেলটা নিয়েই বেরিয়ে পড়বে। ওই বৃদ্ধ মহিলার নাতি নিশ্চয়ই এই বাইসাইকেলটাতে চড়ে। পেট্রোল ভর্তি বোতলটা হাতে নিয়ে এসেছিল কাছাকাছি কোথাও থেকে এই স্টেশনে। এটাকে দেখে কোনো প্রবীণ ডাকবাহকের বাইসাইকেল মনে হয় লিনের। সাইকেলটি ওজনে একটু ভারি, কিন্তু শক্তিশালী। সে মনে মনে নিশ্চিত হয় লোকটা এই গাড়িটাকে এত দূরত্বে চালিয়ে এনেছে যখন, লিনও তা পারবে। হয়তোবা আগামীকাল বা পরশু। যখন এইসব কিছু, দুঃস্বপ্ন খতম হয়ে যাবে, লিন একটি সঠিক ডিটক্স পদ্ধতি গ্রহণ করবে। সমস্ত প্রকার জাংকফুড, অ্যালকোহল পান করা ছেড়ে দেবে। সে খুব শীঘ্রই তা করবে।

লিন একটি লবণ ও ভিনেগার ফ্লেভারের চিপসের প্যাকেট খোলে। তার পেছনে সূর্যাস্তের শেষ রেখাটি প্রায় তামাটে এবং বিষাক্ত বেগুনি রঙ ধারণ করেছে। কিন্তু সে পুনরায় সেদিকে তাকিয়ে দেখলো না। সে শুধু পরিষ্কার আকাশ এবং আফ্রিকার তৃণাচ্ছাদিত সবুজ খোলা প্রান্তরই দেখতে চাইছে। লিন চোখ বন্ধ করে এবং ব্যাঙের ডাক শুনতে পায়। তার ভাবনার দিগন্ত পেরিয়ে ব্যাঙটি যেন সান্ধ্যগীত গাইছে।

 

অনুবাদকের টীকা:

Xhosa (খোসা): একটি স্থানীয় আফ্রিকান ভাষা, এটি বান্টু ভাষা হিসেবে পরিচিত। পূর্ব এবং পশ্চিম কেপটাউনের কিছু লোক এই ভাষায় কথা বলে।

Gaardjie (গার্ডজি) : টেক্সি অপারেটর (আফ্রিকান আঞ্চলিক শব্দ)।

Bakkie: এক ধরনের হালকা পিকআপ ট্রাক, বা কনটেইনার ধরনের গাড়ি।

Verd: দক্ষিণ আফ্রিকার খোলা প্রান্তর বা তৃণভূমি।

//জেডএস//

লাইভ

টপ