পেটার হ্যান্টকের নোবেল ভাষণ

Send
ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর
প্রকাশিত : ০৬:০০, জানুয়ারি ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৮, জানুয়ারি ০২, ২০২০

গত ৭ ডিসেম্বর শনিবার সুইডিশ একাডেমিতে পেটার হ্যান্টকে জার্মান ভাষায় তার নোবেল ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণটি মূল জার্মান থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন কৃষ্ণা উইনস্টন।

‘প্রচলিত নিয়ম মেনে চলো। কোনো বিষয়কেই শুধু নিজের মতো করে দেখো না। চ্যালেঞ্জ খুঁজে নাও, তবে সুনির্দিষ্ট ফলাফল লাভের লক্ষ্য নিয়ে নয়। অলক্ষিত প্রণোদনা থেকে বিরত থাকো। কোনো কিছু আটকে রেখো না। শান্ত হও, তবে শক্ত থেকো। কাজের সঙ্গে জড়িত থাকো, জয় আসুক বা না আসুক। অতিমাত্রায় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করো না, বেশি বেশি হিসাব-নিকাশ করো না। তবে সতর্ক থাকো, ইঙ্গিত পাওয়ার জন্য সতর্ক থাকো। নাজুক হও। তোমার দৃষ্টি বাইরে ছড়িয়ে দাও, গভীরে তাকানোর জন্য অন্যদেরও উৎসাহিত করো, যথেষ্ট সুযোগ আছে কিনা দেখে নাও আগে, অন্যদের প্রত্যেকের নিজস্ব আদলকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করো। কোনো কিছু সম্পর্কে নিজে উদ্দিপ্ত বোধ না করলে সিদ্ধান্ত নিও না। নিজেকে ব্যর্থ হতে দাও। মোটের ওপর নিজেকে সময় দাও এবং যতদূর সম্ভব চেষ্টা করে যাও। একটি গাছ কিংবা জলাধার তোমাকে যা বলতে চায় শোনো, অবহেলা করো না। যেখানেই হোক, জোরালোভাবে চাইলে মনকে বিশ্রাম দাও এবং শুয়ে থেকে রোদ পোহাতে চাইলে সে অনুমতিও দাও নিজের মনকে। শুধু আত্মীয়স্বজনদের কথা না ভেবে অপরিচিতজনদেরও সমর্থন দাও। তুচ্ছ কিছুর দিকে তাকানোর জন্যও একটু নিচু হও। পারলে পরিত্যক্ত জায়গায় ঢুকে পড়ো, গন্তব্যের অতিনাটকীয়তার জন্য নিজেকে উৎসর্গ কোরো না, দ্বন্দ্ব-সংঘাত হাসিতে গুঁড়ো করে উড়িয়ে দাও। যতক্ষণ নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে পারো, যতক্ষণ পাতার মর্মর মধুর হয়ে ওঠে, কোনো রকম ছদ্মবেশ ধারণ না করে নিজের ভেতরটাকেই বাইরে প্রকাশ করো। সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করো।’

কথাগুলো প্রায় চল্লিশ বছর আগে বলা। ‘ওয়াক অ্যাবাউট দ্য ভিলেজেস’ নামের একটা দীর্ঘ নাটকীয় কবিতার শুরুতে একজন নারী একজন পুরুষকে ওই কথাগুলো বলে।

সময় হলে, সময় পেলেই আমার ছেলেবেলায় আমার মা গ্রামের মানুষদের কথা বলতেন। মানে স্লোভেনীয় ভাষায় স্টারা ভাস, জার্মান ভাষায় আল্টেস ডর্ফ বা প্রাচীন গ্রাম। মায়ের মুখে শোনা কথাগুলো গল্প নয়, বরং ক্ষুদে আখ্যান ছিলো একেকটা; গ্যোয়েথের ভাষায় বলা যায় ‘অনন্য ঘটনা’। আমার কানের কাছেও তেমনই লাগত। খুব সম্ভবত, মা আমার সহোদরদের কাছেও ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। তবে আমার স্মৃতিতে যতটুকু আসে, আমিই ছিলাম মায়ের একমাত্র শ্রোতা।

একটি ঘটনা এ রকম ছিল : পর্বতের দিকে যাওয়ার পথে স্থানীয় এক খামারে মানসিকভাবে অপরিণত একটা মেয়ে গোয়ালিনীর কাজ করত। তখনকার দিনে লোকজন তাকে ‘দুর্বলচিত্ত’ বলত। খামারের মালিক কৃষক মেয়েটাকে ধর্ষণ করে। একটা ছেলের জন্ম হয়। কিন্তু মালিকের স্ত্রী ছেলেটাকে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করতে থাকে। ওই মেয়েটাকে, মানে আসল মাকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়, সে যেন ছেলেটার ধারে কাছে না আসে। ছেলেটা বড় হতে হতে শুধু জানতে পারে, কৃষকের স্ত্রীই তার মা। কথা বলা শিখেছে, তবে বয়স খুব অল্পই—এমন সময় একদিন একা একা খেলতে খেলতে খামারের প্রান্তের কাঁটা তারের বেড়ায় আটকে যায় সে। যতই ছোটার চেষ্টা করে ততই আরো বেশি আটকে যেতে থাকে। ভয়ে অবিরাম চিৎকার দিতে থাকে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী গোয়ালিনী মা বা ‘দুর্বলচিত্ত’ মেয়েটা দৌড়ে আসে। মায়ের কাছে শুনেছি, সাওয়াপল এবং কারাওয়াঙ্ক এলাকার উপভাষায় তাকে ট্রিপন বলে। যা-ই হোক, তাড়াতাড়িই সে ছেলেটিকে কাঁটা তারের বেড়া থেকে ছাড়িয়ে ফেলে। কৃষকের স্ত্রীও দৌড়ে চলে আসে। ততক্ষণে মেয়েটি তার কাজে ফিরে গেছে, গোলাবাড়িতে কিংবা মাঠের কোথাও। ছেলেটি মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা মা, ট্রিপনের হাত এত সুন্দর কোমল হয় কী করে?’

‘শর্ট লেটার, লং ফেয়ারওয়েল’-এ এই ঘটনাটিই একটি গান হয়ে এসেছে। পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় এক রাতে একটি পানশালায় ব্যালাডের মতো করে গাওয়া হয়। প্রতি স্তবকের শেষে গায়ক পুনরাবৃত্তি করে যান, ‘আর সেই ছেলেটিই আমি! সেই ছেলেটিই আমি!’

আমার মায়ের মুখে শোনা বেশিরভাগ ঘটনার মধ্যে থাকতেন তার বাবা মায়ের পরিবারের সদস্য কিংবা তাদের বৃহত্তর পরিবারের কোনো সদস্য। প্রায় সবসময়ই প্রধান ব্যক্তি হিসেবে থাকতেন তার দুভাইয়ের একজন। তারা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ময়দানে শহিদ হয়েছেন। চলুন আমি আপনাদের সে রকম দুটো ঘটনার কথা বলি। ঘটনাগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও আমার লেখক জীবনের ওপর নির্দেশনামূলক প্রভাব ফেলেছে।

প্রথম ঘটনাটি আমার ছোট মামা সম্পর্কে। তিনি ছিলেন বাড়ির সবার ছোট। ঘটনাটি ঘটেছে দুই মহাযুদ্ধের মাঝখানে। আরো স্পষ্ট করে বললে, ১৯৩৬ সালে। শরতের মাঝামাঝি এক রাত, তখনও ভোর হয়নি। হ্যান্স (গ্রামের স্লোভেনিয়ান ভাষায় যে নামটা জানেজ বা হানজেজ) তখন বাড়ি ছেড়ে মাসখানেক হলো মারিয়ানাম নামের ছেলেদের একটা আবাসিক স্কুলে, পাদ্রি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্কুলটা প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পশ্চিমে করিনথিয়ার রাজধানী ক্লাগেনফুর্ট/ সেলেভেসে। খামার তখনও গভীর নীরবতায় ডুবে আছে। প্রথম মোরগের ডাকও অনেক দূরে। আর বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ কোথা থেকে যেন উঠোন ঝাড় দেওয়ার শব্দ আসছে। অন্ধকারে পরিবারের ছেলে বেনজামিন ছাড়া আর কেইবা এ রকম একটানা ঝাড় দিয়ে যাবে। তখন তার বয়সও তো প্রায় বালকেরই মতো। নিশ্চয় গ্রহকাতরতা (স্লোভেনিয়ান ভাষায় ‘ডোমোটোজি’) শহর থেকে এত দূরে মাঝরাতে তাকে টেনে এনেছে। তিনি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পড়াশোনা খুব ভালো লাগত তার। তবে শেষ রাতের দিকে স্কুলের নিচতলার জানালা বেয়ে বের হয়ে বড় রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে সোজা বাড়ি চলে এসেছেন। রাস্তা তখনও পাকা হয়নি। বাড়ির দরজাগুলো কখনো বন্ধ থাকত না। তবু তিনি কোনো রুমে না ঢুকে ঝাড়ু হাতে নিয়ে উঠোন ঝাড় দেওয়া শুরু করেছেন। আমার মায়ের মুখের বর্ণনায়, সেদিন ছিল শনিবার, মানে রবিবারের আগের দিন। বাড়ির নিয়মানুযায়ী ‘শনিবারে উঠোন ঝাড় দিতে হবে।’ সেজন্যই পূব আকাশ ধীরে ধীরে ফর্সা হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ঝাড় দিয়েই যাচ্ছিলেন। তখন পরিবারের কেউ একজন তাকে ভেতরে নিয়ে আসেন। আমার কল্পনায় আসে, তার বাবা-মা নন, তার বোন তাকে ভেতরে নিয়ে আসেন। তিনি আর বিশপ চালিত ছেলেদের স্কুলে ফিরে যাননি। তিনি বরং পাশের গ্রামে গিয়ে কাঠমিস্ত্রীর নবিশি করেন, দেরাজ আলমারি জাতীয় আসবাব তৈরি করতে থাকেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাভাবিক পরিবর্তনের ধারা পার হয়ে এই ঘটনাটি শুরু থেকেই বারবার চলে এসেছে আমার বইগুলোতে, মানে আমার আখ্যানমুলক ভ্রমণে বা একজন মানুষের অভিযানে।

দ্বিতীয় ঘটনাটিতে এ রকম কোনো রূপান্তর ঘটেনি। কিন্তু ঈশ্বর কিংবা ভাগ্য কিংবা সে রকম কেউ ইচ্ছে করে থাকলে তেমন কিছু ঘটেও থাকতে পারে। ‘রেপিটিশন’ নামের বই অনুসরণে, এখন হলো ‘সেকেন্ড রেপিটিশন’।

১৯৪৩ সালের আগস্টের শেষের দিকে কিংবা সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে আমার বড় মামা রাশিয়ার ক্রিমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সপ্তাহদুয়ের ছুটিতে বাড়ি এলেন। এলাকায় যুদ্ধ সম্পর্কিত খারাপ খবর ছড়িয়ে বেড়ানোর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এক লোক। বাস থেকে নামার পরই মামার দেখা হয়ে যায় লোকটির সঙ্গে। লোকটি তখন গ্রামের দিকেই আসছিলেন। তিনি পরিবারের কাছে খবর নিয়ে আসছিলেন, ‘পরিবারের সবচেয়ে ছোট ভাইটি পিতৃভূমির স্বার্থে তুন্দ্রা অঞ্চলের যুদ্ধের ময়দানে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছে।’ পরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে যাওয়ার কারণে খবর সরবরাহকারী ভাবলেন, আর বাড়ির পর্যন্ত যেতে হবে না। তিনি ছুটিতে আসা সৈনিকের হাতে তার ভাইয়ের মৃত্যুর নোটিশটি ধরিয়ে দিলেন। তারপর যা ঘটল : গ্রেগর বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। আনন্দ উল্লাসে তাকে বরণ করলেন বাড়ির সবাই। বয়স অল্প হওয়ার কারণে আমার মা সবচেয়ে বেশি আনন্দ প্রকাশ করলেন। কিন্তু ছুটির পুরো সময়ই তার ভাই ‘তুন্দ্রা বালকে’র মৃত্যু সম্পর্কে বড় মামা পরিবারের কাউকে একটি কথাও বললেন না। চিঠিতে ছোট মামা সবসময় নিজেকে ‘তুন্দ্রা বালক’ বলে উল্লেখ করতেন। মা যেমন বলেছেন, যুদ্ধের সময় ছাড়া অন্য সময়ে গ্রেগর ছিলেন ‘সত্যিকারের বাড়িঘেঁষা’ মানুষ। কিন্তু ছুটির পুরো সময়ই তিনি বাড়ির বাইরে রইলেন, বাবা-মা বোন সবাইকে এড়িয়ে চললেন, এমনকি তাদের স্টারা ভাস গ্রামেরও বাইরে সময় কাটালেন। রাতদিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলেন। কখনো কখনো সারা রাতই বাইরে কাটালেন। এনসেলনা ভাস, লিপা, রুডা, গোলাবাসনিকা, ডিস্কসি, রিনকোলা, ক্রকানজি—এ রকম আশপাশের গ্রামে পরিচিত লোকজনের সঙ্গে কিংবা কখনো একদম অপরিচিত লোকের সঙ্গেও থাকলেন এবং কেঁদে কেঁদে দুচোখের অশ্র—উজাড় করলেন। এক চোখওয়ালা সৈনিক কেঁদে কেঁদে অশ্র—উজাড় করতে পারলেন? নাহ, ‘কান্না আর থামেনি। আর কখনো থামার নয়।’ যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার জন্য শেষের দিন যখন বাসের জন্য এগিয়ে গেলেন তখনো থামেনি। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর নোটিশটি তখন তিনি বোনের হাতে দিলেন। বাড়ি থেকে বাস পর্যন্ত তার সঙ্গে পরিবারের আর কাউকে নয়, শুধু তার বোনকেই যেতে দিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর নোটিশ অনুসারে, কয়েক সপ্তাহ পরে তিনিও ‘বিদেশের মাটিতে সমাহিত হলেন; কবরের মাটি তার ওপরে চাপ তৈরি না করুক।’ গ্রামের কবরস্থানের স্মৃতিফলকের ওপরে আগের কথাগুলো আবারও লেখা হলো।

‘ওয়াক অ্যাবাউট দ্য ভিলেজ’ নাটকীয় কবিতার শেষ দৃশ্য স্থাপন করা হয়েছে এক কবরস্থানে। শুরুতে যে নারী কথা বলছিল সে দ্বিতীয় চরিত্র পুরুষটির দিকে ফিরে তাকায়; তবে প্রধানত সে অন্যান্য প্রধান চরিত্রের দিকে ফেরে। বোন এবং ভাই চরিত্রদুটি একে অন্যের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে। আর নোভা নামের এই নারী সব সময় কথা বলার চেষ্টায় শব্দ হাতড়ায়; সে নিচের কথাগুলো উচ্চারণ করে:

এই আমি, আমি অন্য গ্রামের সন্তান। তবে তোমরা সবাই নিশ্চিত হতে পারো: আমার মাধ্যমে একটা নতুন যুগের আত্মা কথা বলে যায়। আর সে আত্মার বলার মতো কথাগুলোই নিচে উল্লেখ করা হলো। হ্যাঁ, বিপদ আছে; আর সে আশঙ্কাই আমাকে এভাবে কথা বলার শক্তি দেয়, মানে যেভাবে এখন আমি কথা বলতে যাচ্ছি: প্রতিরোধকল্পে। সুতরাং আমার নাটকীয় কবিতা শোনো এবার। বিমূঢ় অবস্থায় থাকতে না চাওয়াটা ঠিক আছে; তবে ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের দলের মতো একে অন্যকে জাগিয়ে দিতে থাকাটা ঠিক নয়। তোমাদের কেউই দায়ী নয়। যথার্থই হতাশার প্রকোপের সময় তোমরা উপলব্ধি করে থাকতে পারো, তোমরা আসলে হতাশার মধ্যে নেই। হতাশায় যদি ডুবে থাকতে তাহলে এতদিন মারা যেতে। সুতরাং একা থাকার মতো আচরণ করার দরকার নেই। সত্যিই হয়তো তোমাদের কাহিনি ভরসা করার মতো স্বস্তি দেয় না। তবে টু-বি-অর-নট-টু-বি নিয়ে এত ধ্যান করা বাদ দাও। অস্তিত্ব বোধগম্যতার মধ্যে ধরার মতো একটা বিষয়, চিরকাল তেমনই থাকবে। আর অস্তিত্বহীনতা বোধের অতীত। বুঝতে চেষ্টা করো, তোমরা কতটা একই রকম। বুঝে নাও, তোমাদের মাঝে সাদৃশ্য আছে। আমিই এ কথাটা বলছি। কিন্তু আমি শুধু ‘আমি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নই। এ দুই ছদ্মবেশের মাঝের ‘আমি’টা সবচেয়ে পলকা হতে পারে, জগতের সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী বস্তু হতে পারে, আবার একই সঙ্গে সবকিছুকে আবৃত করে রাখতে পারে, শক্তিহীন করে ফেলার সর্বশক্তির অধিকারীও হতে পারে। ‘আমি’ই একমাত্র নায়ক। আর তোমরা সবাই নিরস্ত্র হওয়ারই কথা। হ্যাঁ, এই ‘আমি’ই মনুষ্য স্বভাবের উপাদান। এটাই আমাদেরকে মানব করে রাখে। যুদ্ধ এখান থেকে অনেক দূরে। আমাদের সেনাদল ধূসর আলকাতরা আর নুড়ি মেশানো রাস্তার ধূসরতার ওপর ধূসর হয়ে প্রাণহীণ দাঁড়িয়ে থাকে না। তারা বরং ফুলের হলুদ রঙের গলার ওপরে হলুদ বর্ণ হয়ে থাকে। সম্মান দেখানোর জন্য ফুলের সামনে মাথা নোয়ানো সম্ভব। ডালে বসা একটি পাখির সঙ্গেও কথা বলা যায়। সুতরাং নকল রঙে আক্রান্ত জগৎ মাঝে প্রকৃতির রঙের জন্য জায়গা তৈরি করো; আসল রঙকে জাগিয়ে দেবে প্রকৃতি নিজেই। পর্বতের গায়ের নীল রঙটা আসল; বন্দুকের খাপের বাদামী রঙটা আসল নয়। আর যে ব্যক্তি বা যে জিনিসটাকে টেলিভিশনে দেখে তোমরা মনে করো চেনো, সে ব্যক্তি বা জিনিসটাকে তোমরা প্রকৃত অর্থে চেনো না। আমাদের কাঁধের অস্তিত্ব আকাশের জন্য। মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত পথটাকে আমাদের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। ধীরে চলো। ধীরে চলার মাধ্যমে একটা অবয়ব হয়ে যাওয়া যায়। আর সেটা ছাড়া দূরত্বের আকার তৈরি হতে পারে না। প্রকৃতিই একমাত্র প্রতিশ্রুতি যার ওপরে তোমরা ভরসা করতে পারো। তবু প্রকৃতি আশ্রয় কিংবা পলায়নের উপায় হতে পারে না। অবশ্য প্রকৃতি শুধু সীমানা দিতে পারে। সেটাও প্রতিদিন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হয়। মাথার ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ যখন দ্রুত বেগে ছুটে যায় তখনও ধীরে চলো। ভেঙেচুরে এগিয়ে যেতে হবে, পুড়ে যেতে হবে—কে বলেছে তোমাদের? তোমাদের যুদ্ধ পেছনে ফেলে আসোনি? তাহলে শান্তিপূর্ণ বর্তমানকে গতি দাও। যারা টিকে আছে তাদের প্রশান্তি প্রদর্শন করো। দূর থেকে যেটাকে ভয়াবহ মৃত্যুর মুণ্ডু বলে মনে হয় কাছে গেলে দেখা যায়, সেটা বাচ্চাদের খেলার বস্তু। হাজার বছরের পুরনো বিছানা বাইরের বাতাসে নিয়ে এসো। বাল্যবেলার দূরবর্তী সন্দেহকারীদের কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই। আরেকটা যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না: প্রকৃতির উপস্থিতির মধ্যেই সত্যিকারের শান্তিকামীদের পাওয়া যেতে পারে। তোমাদের উত্তরসূরীদেরকে শয়তানের মুখ দেখিও না। অন্যের মুখের দিকে তাকালেই সেখানে শক্তির আলোয় খুঁজে পাবে। বর্তমানটাই কৃতজ্ঞতার উৎসব। সুতরাং সতর্ক থাকো, কেউ যেন বলতে না পারে, তোমরা শান্তির সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছ: তোমাদের শ্রম যেন বিস্ময়কর কাজ করতে পারে। তোমাদের শ্রম সম্পর্কে অন্যদেরও জানাও। তবে যারা এ রকম শ্রম কাজে লাগাতে ভালোবাসে শুধু তাদেরকে জানাও। ভালোবাসো শুধু একজনকে, সেটাই সবার জন্য যথেষ্ট হবে। তোমাদেরকে ভালোবাসার মাধ্যমে আমি জেগে উঠে নিজেকেই দেখি। এমনকি যখন বেশিরভাগ মানুষকে ওপরে তোলা যায় না তখনও তোমরা নিজেদেরকে ওপরে ওঠার মতো যোগ্য অবস্থায় রাখো। দু’পাওয়ালা পাশবিক জন্তুদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখো। বাস্তব হওয়ার চেষ্টা করো। কারাভাঁ সংগীতকে অনুসরণ করো। গোলমেলে জটপাকানো অবস্থা থেকে অপসরণ রেখা দৃশ্যমান না পর্যন্ত হেঁটে যেতে থাকো। তবে আস্তে হাঁটো যাতে সামনের জগৎ নতুনরূপে তোমাদেরই হয়ে ওঠে। আস্তে হাঁটো যাতে পরিস্কার মনে হতে পারে জগৎ যেন তোমাদের অধীন নয়। হ্যাঁ, যে ক্ষমতা নিজেকে ক্ষমতা হিসেবে জাহির করে সে ক্ষমতা থেকে সব সময় দূরত্ব বজায় রেখে চলো। তোমরা একা—এ কথা বলে আফসোস করো না। বরং আরো একা হয়ে যাও। পাতার মর্মর পার হয়ে চলে যাও। সুন্দর জিনিস বিলীন হয়ে যাওয়ার আগেই দিগন্তের গুণের বর্ণনা দাও। একজন আরেকজনের কাছে জীবনের চিত্রকল্পের বর্ণনা তুলে ধরো। অতীতে যা কিছু ভালো ছিল এখনও তার টিকে থাকার অধিকার আছে। নিজের জন্য সময় নাও, সৃষ্টিশীল হও: তোমাদের ব্যাখ্যার অতীত দীর্ঘশ্বাসগুলোকে শক্তিশালী গানে রূপান্তর করো। আমাদে শিল্পের উচিত আকাশের দিকে চিৎকার ছুড়ে দেওয়া। তোমাদের সম্পর্কে কথা বলার সময় কেউ যেন বলতে না পারে তোমাদের মধ্যে সৌন্দর্য নেই। আমরা মানুষেরা যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করি সেটাই আমাদের অন্তরের ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়। নিজেদের তোমরা রহস্য মোচনের কাজে নিবেদন করো, যেটা একই সময়ে একক রহস্যও খুলে ফেলে। মনে রেখো: কোনো শিশু তোমার দিকে আসার সময় যদি ভয়ের দৃষ্টিতে তাকায় তার জন্য দায়ী তুমি। নানারকম বেশ ধারণ করাটা হবে তোমার নিজের নিয়তি। কৌতুকের ছলে সত্যের বদলে প্রতারণাকে বেছে নিলেও সেটা এক সময় প্রকাশ পাবেই। দৈনন্দিন জীবনের প্রহসনগুলোও পালন করে যাও। পরাজিত হওয়া খেলারই একটা অংশ। তবু যে ব্যক্তি মুখোশ পরে না, সে গর্বের সঙ্গে এগিয়ে যায়। জগতের অচেনা এলাকা পর্যন্ত এগিয়ে যেতে থাকো। যাদের মধ্যে মরীচিকা নেই তাদের বিদ্বেষপূর্ণ হাসি হাসতে দাও: বিদ্বেষ অর্ন্তদৃষ্টির শক্তি বাড়িয়ে দেয়। হ্যাঁ, বাহ্য অবয়বের জন্য হাহাকার যেন তোমাকে বিদ্ধ করতে পারে সে সুযোগ নিজেকে দাও। নিরাময় পাওয়া জগৎ অন্যদের কাছেও দিয়ে যাও। যে বিদ্রূপের হাসি তোমার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে তার মূলে আছে অজ্ঞতা; এটা মৃত আত্মার মুমূর্ষু অবস্থার ঘরঘর শব্দ। মৃতরা তোমাদের অতিরিক্ত আলো দেয়। তাদের সঙ্গে কথা বলতে না পারলেও চিন্তা করো না: এক সিলেবলও যথেষ্ট হতে পারে। তবে আমাদের যাদের জন্ম হয়নি তাদেরকে তোমাদের চিন্তার মধ্যে রেখো। শান্তির শিশুর জন্ম দাও। তোমাদের নায়কদের সুরক্ষা দাও। তারাই তো অনুকীর্তন করবেন: যুদ্ধ, তুমি আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও! এখানকার মানুষেরা, তোমরাই তো এখন দায়িত্ব পালন করবে। কেউ যেনো তোমাদের বোঝাতে না পারে, দিন শেষে তোমরাই নিস্ফল—সে সুযোগ কাউকে দিও না। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে আদি উৎসের সবচেয়ে কাছে চলে এসেছি আমরা। সম্ভবত আর কোনো তেপান্তর বাদ নেই। তবে যেটা সদাই বুনো, যেটা সদাই নতুন সেটা তেমনি থেকে যাবে : সেটা হলো সময়। ঘড়ির টিকটিক শব্দের আসলে কোনো মানে নেই। সময় হলো তরঙ্গ যেটা আমাদেরকে এই অভিশপ্ত শতাব্দি পার হয়ে যেতে সহায়তা করে। সময় : তুমি আমার অধীন। আশীর্বাদের দিনটা এখন। ফলপ্রসূভাবে কাজ করার মাধমে সেটা টের পাওয়া যেতে পারে। যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাসের মতো আর কিছু হতে পারে না। তবে স্বর্গীয় কাঁপনের মধ্যেও যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস আছে। অলৌকিক ঘটনার দিকে দৃষ্টি দাও, তারপর সেটার কথা ভুলে যাও। দ্রুত এগিয়ে যাও। আনন্দই হলো ক্ষমতার একমাত্র সঠিক রূপ। তুমি আনন্দ না পেলে জগতের আর কিছুই ঠিক আছে বলা যাবে না। এখনও এ কথা সত্য যে, গল্পে আমরা সবাই একমত, নির্ভর করার মতো কোনো স্বস্তিই আসলে নেই। নির্ণয় করে দেখার মতো কে আছে? ক্ষমতায় থাকা শিশু-খুনিরা শাস্তি না পেয়েই চলে যায়। শান্তি এবং নীরবতা টিকে থাকতে পারে না। ক্ষীণ ধারায় বয়ে যাওয়া ঝর্ণা সামনের অবরোধকে বাধা পেয়ে গলে বিলীন হয়ে যায়। আশা হলো মিথ্যে পাখা ঝাঁপটানি। অন্যের আনন্দ ধ্বংসকারী কিলজয়রা সবখানেই থাকে। আনন্দের সূর্যের নিচে হেঁটে যাওয়ার সময় আমরা গভীরভাবে তিক্ততা পান করতে থাকি। এখানে উপস্থিত প্রিয় জনতা, আতঙ্কের চিৎকার চিরকাল চলতেই থাকবে। তোমাদের করুণা ভিক্ষার আবেদন শুধু ব্যর্থতার ইঙ্গিতকেই উৎসাহ দিয়ে যাবে। সুতরাং সবাই একসঙ্গে জেগে ওঠো এবং কালো স্যুট সাদা শার্ট-পরা লোকটার দিকে তাকাও। নদীর ওপারে ব্যালকনির রোদে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর দিকে তাকাও। তোমাদের ইচ্ছে অনুযায়ী আমাদের মানবীয় স্পর্ধা প্রমাণ করো। খুব ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রতিটা চুমুতে আশীর্বাদ থাকে। এখন তোমাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ আসনে ফিরে যাও। পৌনঃপুনিকতার মাধ্যমে দানবীয় শক্তি নিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করো। বাহ্য আকার ধারণ করার মধ্যেই আছে আইন এবং এটাই তোমাদেরকে ওপরে তুলতে পারে। চিরন্তন শান্তি সম্ভব। কারাভাঁ সংগীত শোনো। হিসাব করার সময়, জ্ঞান অর্জনের সময় লোকান্তরমুখি হও। এই নাটকীয় কবিতার প্রতি নিবেদিত থেকো। অবিরত হেঁটে যেতে থাকো। সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করো।’

আমার মায়ের কাছ থেকে শোনা ছোট ছোট এইসব ঘটনা যদি আমার লেখক জীবনের প্রায় সবটুকুতেই প্রণোদনা দিয়ে থাকে তাহলে নানা রকম শিল্পকর্ম আমাকে দিয়েছে অপরিহার্য অবয়ব, ছন্দ, কিংবা আরেকটু বিনয়ের সঙ্গে বললে, আন্দোলিত হওয়ার অনুভূতি এবং শক্তি। আর এই অনুভূতি এবং শক্তিই ওই প্রণোদনাকে দিয়েছে প্রকাশ ক্ষমতা। আমি শুধু বইয়ের কথা ভাবছি না, ভাবছি চিত্রকলার কথা, চলচ্চিত্রের কথা (সর্বোপরি জন ফোর্ডের ওয়েস্টার্নস এবং ইয়াসুজিরো ওজুর ‘ইস্টার্নস’), গানের (যেমন জনি ক্যাশ এবং লিওনার্দ কোহেন) কথাও। প্রথম দিকের প্রণোদনা অবশ্য শিল্পকর্ম থেকে আসেনি। ছেলেবেলায় আমি আলোড়িত হয়েছি, রোমাঞ্চিত হয়েছি স্লোভেনীয়-স্লাভিক ধর্মীয় প্রার্থনা সংগীতের দ্বারা। এই সংগীত আমি শুনেছি জন্মস্থান স্টারা ভাসের নিকটবর্তী গির্জার ধনুকাকৃতির খিলানের নিচে। আর ওইসব প্রার্থনা সংগীত একঘেয়ে হলেও কী বলব, চমৎকার সুরেলা! স্বর্গের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া ওইসব প্রার্থনা সংগীতের আবাহন এখন এই বাহাত্তর বছর বয়সেও আমাকে নাড়া দিয়ে যায়, আমাকে প্রাণিত করে যায়। আমার জন্য সুরের তন্ত্রি চয়ন করে; সেগুলো লেখক হিসেবে আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে সঙ্গী হয়, আমার জন্য স্বর্গীয় সুর পরম্পরা এবং কাদেনজা গুনগুন করে গায়; এগুলো বাহ্যিকভাবে শব্দহীন, মেরি মাতার জন্য লরেন্সীয় প্রার্থনা সংগীতের মতো—শত শত বিশেষণ আর আবাহনে ভরা। এখানে কয়েকটা উল্লেখ করতে চাচ্ছি। ইচ্ছে করেই অনুবাদ করা হচ্ছে না। শুধু পুনরাবৃত্ত প্রতিক্রিয়া-গীতটুকুর অনুবাদ করছি আপনাদের সামনে : প্রজি জা নাস : আমাদের জন্য (যিশুর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন :

মাতি স্তভারনিকোভা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

মাতি ওদ্রেসেনিকোভা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

সাদেজ মোদ্রোস্তি—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

জাসিতেক নাসিগা ভাসেলজা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

পোসোদা দুহোভনা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

পোসোদা কাস্তি ভ্রেদনা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

পোসোদা ভেস স্ভেততোস্তি—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

রোজা স্ক্রিভনোস্ততনা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

স্তল্প দাভিদোভ—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

স্তল্প স্লোনোকোসতেনি—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

হিসা জলাতা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

ক্রিনজা জাভেজে—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

ভ্রাতা নেবেস্কা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

জগদনজা দানিকা—আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন

কয়েক বছর আগে নরওয়ে গিয়েছিলাম। হেনরিক ইবসেনকে ধন্যবাদ। অবশ্য এই শেষ মুহূর্তে নাট্যকার সম্পর্কে এবং তারও আমাদের ‘পিয়ার গিন্ট’ সম্পর্কে আর আলোচনায় যেতে চাচ্ছি না। বরং ছোট তবে অনন্য ঘটনার কথা বলতে চাচ্ছি। একটা গোটা বিকেল এবং সন্ধ্যা কাটানোর আনন্দ পেয়েছিলাম পাঁচ ছয়জন দেহরক্ষীর সঙ্গে। প্রথম ঘটনাটি তাদেরই একজন সম্পর্কে। অনেক গভীর রাতে অসলোর ওয়াটারফ্রন্টের ধারে একটা নীরব পানশালায় বসেছিলাম আমরা। তখনই তিনি বেশ কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। প্রথমে নরওয়েজিয়ান ভাষায় তারপর ইংরেজিতে। কবিতাগুলো তার মোবাইল ফোনে রেখেছিলেন। সবগুলোই প্রেমের কবিতা। চমৎকার কোমলতার ছোঁয়া সবগুলোতে। পরে আরো কয়েক সন্ধ্যা কাটালাম এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে। শেষের দিকে এক মধ্য রাতে অসলোর (কিংবা বলা যায়, অল্পবয়সী ন্যুট হ্যামসুনের ‘হাঙ্গার’ বইয়ে বর্ণিত তখনও উচ্চারিত ক্রিস্টিয়ানা) রাস্তায় একা একা ঘোরার সময় একটা বইয়ের দোকানের আলোকিত প্রদর্শনী জানালার পাশে একজন মানুষের ছায়া ছায়া অবয়ব দেখতে পেলাম। তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি আমার দিকে ফিরে ভেতরের একটা বইয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ওই যে, আমার প্রথম বই। আজ প্রকাশ করা হয়েছে। আজই প্রথম দিন।’ এই ব্যক্তির বয়স অল্প। একটা বাচ্চা ছেলের চেয়ে বড় নয় মনে হলো। কিংবা বলা যায়, টেক্সট বইয়ে কোনো অল্পবয়সীর ছবি থাকে, সে রকম। একটা বাচ্চা ছেলের মতোই সরল তার তৃপ্তি। এই লেখক, এই স্রষ্টা সেদিন যে আনন্দের উত্তাপ ছড়িয়ে দিলেন আজো সে উত্তাপ টের পাই আমি। প্রার্থনা করি, সে উত্তাপ যেন কখনও ঠান্ডা না হয়ে যায়।

তাহলে তাদের দুজনকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য এই মুহূর্তটি ব্যয় করি। অসলোর ওয়াটার ফ্রন্টের পাশে বসা মানুষটি এবং বইয়ের দোকানের জানালার পাশের অল্পবয়সী লেখক—হয়তো এই মুহূর্তে তাদের অবস্থান এখান থেকে পশ্চিম দিকে, কিংবা যেখানেই থাকুন না তাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা। আফসোসের বিষয় হলো, আমার দেহরক্ষীর প্রেমের কবিতার একটাও আমি আবৃত্তি করতে পারছি না। সেই সন্ধ্যায় কয়েকটা টুকে রেখেছিলাম। কিন্তু পরে সে কাগজের টুকরোটা হারিয়ে ফেলেছি। তবে এখানে একটা ভিন্ন কবিতা নিয়ে এসেছি, একজন আত্মারক্ষীর কবিতা (দুটো কাছাকাছি শব্দ নিয়ে হাস্যরস করার জন্য মাফ করবেন):

[টমাস ট্রান্সট্রোমারের ‘রোমান্সকা বাগার’-এর সুইডিশ আবৃত্তি]

//জেডএস//

লাইভ

টপ