সময়ই শিল্প-সাহিত্যকে মূল্যায়ন করতে পারে : মাকিদ হায়দার

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অহ নওরোজ
প্রকাশিত : ১৯:২৪, জানুয়ারি ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩০, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

কবি মাকিদ হায়দার কবিতায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯ পেয়েছেন। তিনি পুরস্কারপ্রাপ্তীর অনুভূতি ব্যক্ত করে টেলিফোনে বলেন, ‘আমি আনন্দিত।’ অনেক দেরিতে পুরস্কার পেলেন কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘পুরস্কার আগে বা পরে পাওয়া কোনো বিষয় না, পেয়েছি এটাই আনন্দের।’

কবি মাকিদ হায়দার ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার দোহারপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও তিনি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কথা বলেছেন তার সাহিত্যজীবন এবং সাহিত্যভাবনা নিয়ে।

আমরা জানি প্রথমত আপনি কবি। কিন্তু যদি ভুল না করি, সাহিত্যে প্রথম কবিতার মাধ্যমে পদার্পণ করেননি। কীসের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়েছিল?

মাকিদ হায়দার : ছড়ার মাধ্যমে। ছড়া লেখা এবং প্রকাশ হওয়ার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত হই।

 

ছড়ার প্রতি আকৃষ্ট হলেন কীভাবে?

মাকিদ হায়দার : মূলত ছড়ার উপস্থাপনশৈলী এবং এর মধ্যে অন্ত্যমিলের ব্যাপারটি আমাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। সে কারণে স্কুলের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে অন্য যেখানেই ছড়া দেখেছি, ছড়া আমাকে মুগ্ধ করেছে।

 

কিন্তু সেখান থেকে একদিন কবিতায় পদার্পণ করলেন। এবং কবিতাতেই স্থায়ী হলেন। কীভাবে কবিতাতে এলেন?

মাকিদ হায়দার : চারদিকে আমার যখন বেশ ছড়া ছাপা হতে থাকে তখন একদিন আমার বড় ভাই জিয়া হায়দার আমাকে বলেন, আগে কবিতা লেখ, একবার ছড়াকার হয়ে গেলে কিন্তু আর কবি হতে পারবি না। ব্যাস, বিষয়টি মাথার মধ্যে ঢুকে গেলো। আমি কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলাম। বিভিন্ন বই পড়া শুরু করলাম। ম্যাগাজিনে সমসাময়িক যারা লিখতেন তাদের কবিতাও পড়তে লাগলাম। যতদূর মনে পড়ে, তখন আমি কলেজে পড়ি। এরপর কবিতা লিখতে শুরু করি।

 

আপনার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদ-এ। সেখানে যেতে গিয়ে একটি মজাদার অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন। সেই ঘটনা একটু শুনতে চাই।

মাকিদ হায়দার : বেশ মজার ঘটনা। আমার এখন ঘটনাটি মনে পড়লে বেশ আনন্দ পায়। যখন কিছু কবিতা লিখে ফেললাম, তখন একটি কবিতা নিয়ে দৈনিক সংবাদের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। গন্তব্য রণেশ দাশগুপ্ত। কিন্তু নাম জানলেও আমি তাকে চিনতাম না, কিন্তু সংবাদের অফিসটি চিনতাম। তাই আমি এবং আমার আরেকবন্ধু দৈনিক সংবাদ অফিসের দিকে রওনা করলাম। তখন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন সিলেটের এক কবি, তার নাম ছিল দেলওয়ার হোসেন। যদিও তাকেও আমি চিনেছি পরে। সংবাদের অফিসে পৌঁছে গেলাম, সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। সিঁড়িটি ছিল বেশ সরু, দুজন একসাথে ওঠা কিংবা নামার অবস্থা তেমন ছিল না। আমি তখন একদম তাজা তরুণ। দ্রুত উঠে যাচ্ছি, এমন সময় উল্টো দিক থেকে একজন নামছেন, আমার কনুইয়ের সাথে উনি বেশ ধাক্কা খান। উনি থেমে যান এবং আমাকে ডাকেন। একটু বকাঝকাও করেন। উনার গলার স্বর শুনে গেটে একজন এসে হাজির হন। পরে উনি চলে যাওয়ার পর গেটে দাঁড়ানো লোকটি আমাকে বললেন একটু আস্তে নামতে পারতেন। তার মতো ব্যক্তিকে একটু সমীহ করে চলা তো উচিত। আমি তখন উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে? উত্তর পেলাম: আপনি শহীদুল্লাহ কায়সারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন। তখন শহীদুল্লাহ কায়সারকে চিনিনি, বেশ পরে এসে তারপর তাকে চিনি। এতক্ষণ যে লোকটি গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি ছিলেন সেই সাহিত্য সম্পাদক। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার কাছে যাবেন’। আমি বললাম। তারপর আমাকে রণেশ দাশগুপ্তের রুমে নিয়ে যাওয়া হল। এতো সুন্দর লোক, ধবধবে সাদা পোশাক পরা, সুন্দর দাঁড়ি। উনি নরম গলায় আমার কাছে জিজ্ঞেস করলেন কেন এসেছি। আমি বললাম। এরপর তিনি সাহিত্য সম্পাদককে আমার কবিতা দেখতে বললেন। কবিতা ছাপানো নিয়ে এই হল প্রথম ঘটনা, যা আমার আজও মনে পড়ে।

 

আপনি লিখছেন অনেকদিন ধরেই, কিন্তু আপনার বই সংখ্যা অনেক কম, এর কারণ কী?

মাকিদ হায়দার : বই প্রকাশ করার জন্য কোন প্রকাশকের কাছে গিয়ে লেগে পড়ে থাকতে হবে, সেটা আমার দ্বারা কখনোই সম্ভব হয়নি, যখন প্রথম লিখতে আরম্ভ করি তখন ঝোঁকের মাথায় পত্রিকায় লেখা ছাপানোর ব্যাপারে একটু আগ্রহ দেখিয়েছি কিন্তু যখন বড় হয়েছি, সাহিত্যের মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, তখন ধীরে ধীরে মনে হয়েছে কবিতা গল্প কিংবা অন্য যে ধরণের লেখাই আমি লিখছি-না কেন, সেটি আমার তৃপ্তির জন্য লিখছি। প্রকাশ হয়ে বিখ্যাত হবো এমন চিন্তা মাথায় আসেনি। যে কারণে বেশী বেশী বই ছাপা হোক আর সেজন্য প্রকাশকের পেছনে লেগে থাকতে হবে এমন ইচ্ছে হয়নি। আমার মনে হয়েছে আমার কাজ লেখা, আমার লেখা প্রয়োজন মনে করলে প্রকাশকরা ছাপাবেন। এসব কারণেই হয়তো বই কম হয়েছে।

 

ঠিক একই কারণেই কি আপনার একটি মাত্র গল্পগ্রন্থ?

মাকিদ হায়দার : সেটা বলা যায়। আমি নিজে বই প্রকাশ করার জন্য আগ্রহী হইনি।

 

আপনার প্রায় ‍সব কবিতাতেই একধরণের গল্প খুঁজে পাওয়া যায়। এটা কি সহজাতভাবেই হয়েছে নাকি ইচ্ছে করে তৈরি করেছেন?

মাকিদ হায়দার : এই কবিতাগুলোকে বলা যায় গল্প-কবিতা। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরণের কবিতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে বেশ ঐশ্বর্য পেয়েছে। আমার কাছে এই ধরনের কবিতা ভালো লাগে। আর এই ধরনের কবিতা লিখতে গিয়ে আমি নিজস্বতার স্বর খুঁজে পাই। যে কারণে এই ধরনের কবিতা বেশ লেখা হয়েছে। 

 

আহসান হাবীব আপনার কবিতা বেশ অনেকদিন পরে প্রকাশ করেছিলেন। কেন দেরি করেছিলেন?

মাকিদ হায়দার : সেটি বেশ অনেক আগের কথা। আমার কবি লেখার প্রথম দিকের ঘটনা। প্রথমদিকে তো অতো বুঝে কবিতা লিখতাম না, ভালো লাগতো লিখতাম। তখন ছন্দ কিংবা কবিতার গভীরে তো অতো প্রবেশ করে পারিনি। তখন তিনি দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন। তো তাকে কবিতা দেওয়ার পর উনি ছাপছেন না, আমিতো অস্থির হয়ে আছি। কয়েক সপ্তাহ পর দেখা করতে গেলাম। কেন ছাপছেন না জিজ্ঞেস করতেই বললেন, মাকিদ আপনার কবিতা ছাপার অযোগ্য। আমি বেশ বিস্মিত হলাম। উনি বললেন, ‘কবিতার গ্রামার জানেন’। মাত্রা সম্পর্কে জানেন? গ্রামার মেনে আগে একটি কবিতা লিখে দেখান। আমি তো তখন কবিতা সম্পর্কে অতো জানিনা। কেবল কবিতা লিখছি আনন্দে আনন্দে। তারপর বাসায় ফিরে জিয়া ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম। তারপর উনি আমাকে ছন্দ সম্পর্কে বোঝালেন, এরপর বই দিলেন ছন্দ সম্পর্কে। এরপর বেশ অনেকদিন পর আবার আহসান হাবীবকে কবিতা দিলাম। উনি ছেপেছিলেন।

বর্তমানে আমাদের বই প্রকাশ বেশ সহজসাধ্য, টাকা দিলেই যে কেউই যে কোন ধরনের লেখা ছাপতে পারে। বই মেলাতেও প্রকাশ হয়। এটা আমাদের সাহিত্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে?

মাকিদ হায়দার : মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। কিন্তু লিখলাম আর প্রকাশ করলাম, কী হল সে বিবেচনা নেই, সেরকম করে প্রকাশ করলে সেটি অবশ্যই খারাপ। কিন্তু আবার দেখা যাচ্ছে একই সঙ্গে অনেকে এর মাধ্যমে সাহিত্যের সাথে যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়টি আবার খারাপ না। তাই আমাদের প্রত্যেককেই পড়াশোনা বাড়ালে এই ধরনের সমস্যা আমরা অতিক্রম করতে পারবো।

আচ্ছা পুরস্কার কি কোনো সাহিত্যিককে বিবেচনায় আনতে পারে?

মাকিদ হায়দার : সেটা কীভাবে সম্ভব? পুরস্কার তার সম্মান এবং পরিচিতি বাড়াতে বাড়ে। একমাত্র সময়ই শিল্প-সাহিত্যকে মূল্যায়ন করতে পারে।

কবিতা নাকি পাঠকপ্রিয়তা হারাচ্ছে, প্রকাশকরা নিজের পয়সায় কবিতার বই প্রকাশে তুলনামূলক কম আগ্রহ প্রকাশ করেন। আপনি বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?  

মাকিদ হায়দার : রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দিয়েই একটি কথা বলি, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। কবিতা হল আবিষ্কারের ব্যাপার। এটা সবাই ধরতে পারে না, এবং সময় করে এর সৌন্দর্য খুঁজে এর ভেতরে প্রবেশ করতে যাবে এমন মানুষের সংখ্যা কম। সহজ যা লভ্য এমন জিনিসের আগ্রহী বেশী। কবিতা সহজে লভ্য নয় এজন্য এর আগ্রহী সমগ্র জনসংখ্যার তুলনায় অতি কম। আবার যারা এর মজা বুঝে যায় তারা আবার ছাড়তে পারে না। কবিতার পাঠক আগেই কম ছিল এখনো আছে। এটা স্বাভাবিক বিষয়।

২০১৩ সালে আপনার কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় রোকনালী’ বেরিয়েছিল। এই নাম দেখে অনেকেই একটু হোঁচট খান। এই নাম ও কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে জানতে চাই।

মাকিদ হায়দার : আমার ডাক নাম রোকন। আবার পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষের লোক ছিল শান্তিবাহিনীর লোকেরা, তাদের প্রায় সবাই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জামায়াত সদস্যদের একটি সাংগঠনিক স্তর হলো রোকন। রোকনালী হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী—যারা ধর্ষণ, হত্যা, ধ্বংসে মেতে উঠেছিল তাদের বিরুদ্ধে লেখা একটি প্রতীকী নাম। এজন্যই নামটি এমন।

বর্তমানের কবিতা প্রসঙ্গে একটু আসি, এখন ফেসবুক কবিতা প্রকাশ করার সবথেকে বড় মাধ্যম। এই সময়ের একজন কবি তৈরি করার পেছনে ফেসবুকের কোন ভূমিকা থাকতে পারেন বলে আপনি কী মনে করেন?

মাকিদ হায়দার : তথ্য আর জ্ঞান কিন্তু এক জিনিস নয়, ফেসবুক তথ্য সরবারহ করে, জ্ঞান নয়, কিংবা গভীর উপলব্ধিও নয়। শুধু ফেসবুকে লিখেই কবি হওয়া সম্ভব নয়। কবিতার জন্য যে ধ্যান প্রয়োজন ফেসবুক সেটাই বাঁধার সৃষ্টি করে, সুতরাং এটি একজন কবি তৈরি হওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক।

তরুণদের উদ্দেশ্য আপনার কোন বক্তব্য আছে?

মাকিদ হায়দার : বিশেষ কিছু বলার নেই।

এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মাকিদ হায়দার : আপনাকেও ধন্যবাদ।

//জেডএস//

লাইভ

টপ