স্মৃতি বিস্মৃতির বইমেলা || সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

Send
শ্রুতিলিখন : লুফাইয়্যা শাম্মী
প্রকাশিত : ১১:৪১, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৩, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০

অমর একুশে বইমেলা দিনকে দিন আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আরম্ভকালীন সময়ে কেউ মনে হয় এমনটা ভাবেনি।

বাংলা একাডেমির সামনে যে মাঠটা আছে সেখানে অল্প কয়েকটা স্টল ছিল, সর্বোচ্চ ৫০-৬০টা হবে। মানুষজনও তেমন আসতেন না, আয়োজনটার তেমন ব্যাপকতা ছিল না। মেলার তেমন প্রচার ছিল না। আর পত্রিকাতে আসতো সাদাকালো বিজ্ঞাপন, তাও গুটিকয়েক পত্রিকায়। এই কারণে মেলা তেমন জমত না। তবে এতো সমস্যার ভেতরও যে জিনিসটা আমার কাছে সত্যিকার অর্থে ভালো লাগত, তা হলো মেলায় লেখকদের আড্ডা। এখন যেখানে চায়ের দোকানগুলো রয়েছে, সেখানে মোটামুটি এখনকার সব দামি দামি কবি লেখকরা আসতেন। চায়ের টেবিল ঘিরে ছিল জমজমাট আড্ডা। এখনকার মতো এতো বিদ্যুৎও ছিল না। অনেকটা গ্রামের মেলার মতো লাগতো। আনুমানিক ৮০’র দশকের দিকে মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরু হয়।

১৯৮৬ সালে আমার প্রথম বই আসে, কিন্তু সেটা বইমেলা উপলক্ষে নয়। বইটিতে ভাষা শহিদদের নিয়ে কিছু প্রবন্ধ ছিল, প্রকাশ করেছিল বাংলা একাডেমি। তখন সবচেয়ে বড় স্টলটা ছিল বাংলা একাডেমির। তখন থেকেই বাংলা একাডেমির স্টলে আমার বই পাওয়া যেত। আর সেই সময়ে একটা বই বের হলে সেটা প্রায় সবার হাতেই পৌঁছাত, দেখত এবং সেটা পড়ে অনুভূতিও জানাত।  বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ১০জনে মিলে একটা বই কিনতো এবং বইটা সবাই মিলে পড়তো।

মনে পড়ে, কামরুল হাসান মাঠে বসে ছবি আঁকতেন এবং তা বিক্রিও করতেন মেলাতেই। খুব সস্তায়, ৫০০ টাকায়। কারণ তিনি চাইতেন শুধু বই নয়, চিত্রকলাও কিনুক মানুষ। এসএম সুলতানও আসতেন! এটা আমার অন্যতম উপলব্ধি। চিত্রকলাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, আমার কাছে অমলিন একটা বিষয় বলে মনে হয়েছে। কিন্ত এখনকার সময়ে এটার বিলুপ্তি ঘটেছে। কামরুল হাসান বলতেন, ঘরে একটা সস্তা ক্যালেন্ডারের চেয়ে একটা আর্ট থাকাটা বেশি সুন্দর মানায়।

একটা স্মরনীয় দিন ছিল, যেদিন : লেখকরা যেখানে আড্ডা দিতেন, সে যায়গাটার নাম হয়ে ওঠে লেখককুঞ্জ, ঠিকঠাক সময়টার কথা আমার মনে নেই। ওখানে লেখকরা লেখা পাঠ করতেন, কিন্তু একদিন সেই স্থানে প্রচুর পুলিশের ডিউটি থাকায় আর কোনো জমানো আড্ডা হলো না, সবারই একটু মন খারাপ। পরে আমি লেখককুঞ্জের নাম দেই পুলিশ কুঞ্জ!

ধীরে ধীরে মেলার পরিধি-আড়ম্বর বাড়তে থাকে। পাঠকদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। হুমায়ুন আজাদ আর হুমায়ূন আহমেদ, এই দুই হুমায়ুন অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত থাকতেন, হুমায়ুন আজাদ বসতেন আগামী প্রকাশনীতে আর হুমায়ূন আহমেদ বসতেন অন্যপ্রকাশে। পাঠকের থাকত দীর্ঘ লাইন। অবশ্য পাঠক সৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর হুমায়ুন আজাদের কাছে যেত যারা সত্যিকার অর্থে শিল্প সাহিত্যেকে ভালোবাসে।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, অসম্ভব মেধাবী একজন কবি ছিলেন, কিন্তু তিনি তো হারিয়ে গেলেন। কবিতার দিক দিয়ে তার বইয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

আসলে মেলার বই বিকিকিনির চেয়ে আড্ডাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখনকার সময়ে বড় বড় লেখকেরা তাদের লেখা নিয়ে কথা বলতেন, যেগুলো আমাদের মতো উঠতি লেখকদের খুবই কাজে দিত।

অনেকের নামও ভুলে গেছি। সাজ্জাদ শরীফ, ফরিদ কবির, মোহাম্মদ সাদিক এরা আমাদের জুনিয়র ছিলেন। রফিকুন নবী, সন্তোষ গুপ্ত বসতেন, যারা আমাদের সিনিয়র ছিলেন। তারপর যেমন সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, শিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ। এই যে সবাই মিলে মেলায় থাকতেন সেটি আমাদের কাছে অনেক আনন্দের ছিল।

এখন একটু আড়ালে থাকতে পছন্দ করি। নিজের তেমন প্রচার করি না। পুরনো দিনের যারা ছিলেন তাদের কাছেই শিখেছি প্রচারের কোনো প্রয়োজন নেই, আমার বই বের করছি, যাদের ইচ্ছে করবে তারা খুঁজে নিবে।

বই পাঠক খুঁজে নিবে, আমি এটাই বিশ্বাস করি। এবং নিচ্ছেও। এলাকাটা যখন বড় হয়ে গেলো, মানুষের ভিড় যখন বাড়লো একসময় তো শাহবাগেও লাইন লেগে থাকতো, তখন আমি মেলায় যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। মেলায় এতো ভিড় হয়, আমি ঠিক স্বস্তি পাই না। মেলায় পাঠকের পাশাপাশি এতো মানুষ আসে! তবে তরুণরা খুব আনন্দ পায়। কিন্তু আমাদের অভ্যাস হচ্ছে পুরনো। আমাদের বইয়ের আড্ডাটা, যেখানে বই নিয়ে আলোচনা করতাম, সেটা যখন পাই না তখন আর খুব বেশি আগ্রহবোধ করি না।

এবারের মেলা বঙ্গবন্ধুর স্মরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা একটা ভালো উদ্যোগ। বাংলা একাডেমি সোহরাওয়ার্দীতে পুরো মেলাটা সাজানোর কারণে স্বস্তিদায়ক মনে হচ্ছে। এইবার মেলা বেশ বড় হয়েছে। আমি বোধহয় যাবো। লেখক হিসেবে মেলাতে কিছুটা অংশগ্রহণ আছে আমার। এমনিতে আমি দু-তিন বছর পরপর বই প্রকাশ করি, গল্প উপন্যাস লিখতেও একটু সময় লাগে। তবে আমার কয়েকটা উপন্যাস নিয়ে একটা সমগ্র আসছে এইবার। সেইসব উপন্যাসে ভুলত্রুটিগুলো ঠিকঠাক করেছি। প্রকাশ করছে পাঞ্জেরি। আর অন্যপ্রকাশ গল্পসমগ্র প্রকাশ করছে। এইটার নাম দিয়েছি গল্পসকল। এখানে ত্রিশটি গল্প আছে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ