মাতৃভাষায় বিজ্ঞান

Send
ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
প্রকাশিত : ১১:৩৩, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৫, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০

মাতৃভাষা আমাদের জন্ম-জন্মান্তরের অধিকার। এই অধিকার ছিনিয়ে আনার রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের সবার জানা। আমরা যারা এদেশে জন্মেছি, তারা প্রায় সবাই জন্মাবধি বাংলা ভাষাতেই কথা বলি, চিন্তা করি; এই ভাষাতেই বিদ্যা শিখি, শেখাই। ইদানীং সংশয় দেখা দিয়েছে বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে কি না, উচিত হবে কি না, বিজ্ঞান-গবেষণা করা যাবে কি না ইত্যাদি নিয়ে। কয়েকটি শব্দ আগেই আলাদা করে নেওয়া উচিত— বিজ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানশিক্ষা, বিজ্ঞানচিন্তা, বিজ্ঞান-মনস্কতা, বিজ্ঞান-গবেষণা, বিজ্ঞান-সাহিত্য ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে একাডেমিক রিসার্চ হলো বিজ্ঞান গবেষণা। আর বাকি সবই মোটা দাগে বিজ্ঞানচর্চার মধ্যে পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞানশিক্ষার কিছুটা চর্চার আর কিছুটা গবেষণার অংশ বিজ্ঞানে পশ্চাৎপদতার কারণে আমাদের দেশীয় পরিস্থিতিতে এই মুহূর্তে বিজ্ঞানশিক্ষায় মনোযোগ দেয়া জরুরি।

বিজ্ঞানশিক্ষার তিনটি ভাগ আমরা চিহ্নিত করতে পারি—বুনিয়াদি বিজ্ঞানশিক্ষার স্তর (প্রাথমিক শিক্ষা), মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর, উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষাস্তর। প্রথম দুটো স্তরে, আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে, বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার মাতৃভাষাতেই হতে হবে। প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক কিংবা গণিত অলিম্পিয়াডের যেকোনো অনুষ্ঠানে বা যেকোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে আপনি যদি কিছুটা সময় কাটান, এ ব্যাপারে কারো তখন আর কোনো দ্বিমত থাকবে না। আমরা, যারা মাঠপর্যায়ে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের কাজ করি, প্রায়শই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি পড়ি যখন একটি লাজুক ছেলে বা মেয়ে ভীরু পদক্ষেপে এসে বাংলায় লেখা বিজ্ঞানের বইয়ের কথা জানতে চাইছে। আমাদের বর্তমান সমাজে সর্বস্তরে বিজ্ঞান শিক্ষার অধোগতির কথা বিবেচনা করলে মাতৃভাষায় বুনিয়াদি বিজ্ঞানশিক্ষার আবশ্যকতা প্রশ্নাতীত। তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষার মাধ্যম নিয়ে বিতর্ক আছে। স্নাতক, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বাংলা ভাষায় পঠন-পাঠন চলে। কিন্তু আমাদের সকল (পাবলিক ও প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয়েই মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন ইংরেজিতে, নয়ত ডিগ্রির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতায় সমস্যা তৈরি হয়; বিশেষ করে প্রকৌশল ও স্বাস্থ্যখাতের মতো পেশাদারি ক্ষেত্রে।আধুনিক গবেষণার সকল মাধ্যম এখন আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির দখলে।

কাজেই এসব ক্ষেত্রে ইংরেজিকে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাই বলে বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা কেন হবে না, তা বোধগম্য নয়। বাংলায় জনপ্রিয়, আধা-জনপ্রিয় ও টেকনিকাল বিষয়ে যত বেশি বই লেখা হবে, ততই পাঠক বাড়বে, বিজ্ঞানচর্চা বাড়বে, বিজ্ঞানীর সংখ্যা বাড়বে। আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করার মতো বিজ্ঞানী যদি একজনও বাড়েন, তবে বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ বাড়বে অতিরিক্ত একশ জন। এটা বৃহত্তর সমাজের জন্য মঙ্গলজনক। প্রসঙ্গক্রমে একটি  ঘটনা উল্লেখ করা যায়। বছর চারেক আগে একটি ছেলে আমাদের সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠন আয়োজিত একমাত্র শিশু-কিশোর আবাসিক বিজ্ঞান ক্যাম্পে অংশ নেয়। এর পর সে অন্য আরও কয়েকজনের সঙ্গে সম্মিলিত গবেষণা শুরু করে যার ফলশ্রুতিতে সে বিখ্যাত ‘নেচার’ পত্রিকায় একটি জার্নাল ছাপতে সক্ষম হয়। সে অকপটে স্বীকার করেছে ওই ক্যাম্প তাকে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন ও গবেষোণায় বুনিয়াদি শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে বিজ্ঞানশিক্ষিত মানুষ দরকার। সেটা তৈরির একমাত্র উপায় মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার। ভবিষ্যতে যদি আমরা যথেষ্ট অগ্রসর হতে পারি, বাংলাভাষায় উচ্চতর গবেষণা হতেও বাধা নেই।

ভাষা হিসেবে ইংরেজির আন্তর্জাতিকায়ন ঘটেছে বিংশ শতাব্দীতে, যার মূল অবশ্যই রয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর উপনিবেশের সংস্কৃতির বিকাশে, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল শিল্পবিপ্লব। এই পুরো ইতিহাসের বির্নিমাণ যা-ই হোক না কেন, এখন এ মুহূর্তের বাস্তবতা হলো ইংরেজির বিশ্বায়ন। এই মুহূর্তে একজন জাপানি, একজন ডাচ, একজন আরব, একজন চৈনিক বিজ্ঞানী তার নিজ নিজ মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিখতে পারেন, কিন্তু তার প্রকাশ-বিকাশ-পরিচিতি-ক্যারিয়ার ইংরেজিতে করতে হবে। এটা এখনকার গ্লোবাল ট্রেন্ড। এই স্তরে যেসব বাংলাদেশিরা যাবেন বা পৌঁছতে পারবেন তাঁরা নিতান্তই হাতেগোনা। ওঁদের জন্য ইংরেজির কাম্য দক্ষতা আর আমজনতার বিজ্ঞান-দক্ষতা সমমাত্রার নয়।

উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান-গবেষণা যে বাংলায় অসম্ভব নয়, তার প্রমাণ পাঁচ খণ্ডে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ’। বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে যে বাংলায় প্রকাশ সম্ভব সেটা প্রমাণিত। এর প্রচার-প্রসার কতটুকু, বা এর দুর্বোধ্যতা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু এর বাস্তব অস্তিত্বকে এড়ানো যায় না। এরই ধারাবাহিকতায় শিশু একাডেমী প্রকাশ করেছে অতীব মনোহর দুটি খণ্ডের ‘ছোটদের বিজ্ঞানকোষ’। ছোটদের জন্য যে স্বাদু গদ্যে বিজ্ঞানের বই লেখা যায়, সেটা ড. আবদুল্লাহ আল-মুতী অনেকদিন আগেই দেখিয়ে দিয়েছেন। তারই পরিণতি উক্ত ‘ছোটদের বিজ্ঞানকোষ’। বাংলাভাষা যে বিজ্ঞানকে ধারণ ও প্রকাশ করতে সক্ষম, সেটা এ ঘটনা দুটো থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ’ না থাকলে ‘বিজ্ঞানকোষ’ হতো না। এবং এইসব কোষগ্রন্থ মোটেই ‘আধো আধো ধারণা’ দেয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরঞ্চ বিজ্ঞানের অনেক সাম্প্রতিক বিষয় (ন্যানো ইলেকট্রনিক্স, কসমোলজি, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি) নিয়ে জ্ঞানগর্ভ যুক্তি দিয়েছে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য হয়ত কিছুটা সীমিত ছিল, কিন্তু বিজ্ঞানবোধ ঠিকই চারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীরা এখান থেকেই তাদের মননের রসদ যোগাড় করবেন, এটা আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

মাতৃভাষায় সেটা যে ভাষাই হোক, প্রোথিত না হলে বিজ্ঞানশিক্ষা দৃঢ়ীভূত হবে না, স্বচ্ছ চিন্তারও বিকাশ ঘটবে না। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান আত্মস্থ হলে তারপর বৈশ্বিক ভাষা শিখে নিতে হবে। বৈশ্বিক ভাষার দরকার আছে আন্তর্জাতিকতার খাতিরেই। এখনকার সময়ে এক ভাষাই যথেষ্ট হবে না। সামাজিক, ধার্মিক, বাণিজ্যিক ও বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে একাধিক ভাষা লাগবেই। কাজেই এক ভাষার বিলাস ত্যাগ করে একাধিক ভাষাশিক্ষা অত্যন্ত জরুরি, একথা বিশেষ করে প্রযোজ্য আমাদের দেশে। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজিতে খুব ভালো ও দক্ষভাবে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। রবীন্দ্রনাথ স্মর্তব্য, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন।’ পুনর্মুদ্রণ

//জেডএস//

লাইভ

টপ