অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্মদিনতৃপ্তিই তেলের শিশির উৎস

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ০৭:০০, মার্চ ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, মার্চ ১৫, ২০২০

তেলের শিশি ভাঙল বলে

খুকুর পরে রাগ করো

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা

ভারত ভেঙে ভাগ করো

তার বেলা?

#

ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা

জমিজমা ঘরবাড়ি

পাটের আড়ৎ ধানের গোলা

কারখানা আর রেলগাড়ি
তার বেলা?

#

চায়ের বাগান কয়লাখনি

কলেজ খানা আপিস-ঘর

চেয়ার টেবিল দেয়ালঘড়ি

পিয়ন পুলিশ প্রোফেসর!

তার বেলা?

#

যুদ্ধ জাহাজ জঙ্গি মোটর

কামান বিমান অশ্ব উট

ভাগাভাগির ভাঙাভাঙির

চলছে যেন হরির লুট!

#

তেলের শিশি ভাঙল বলে

খুকুর পরে রাগ করো

তোমরা যে সব ধেড়ে খোকা

বাংলা ভেঙে ভাগ করো!

তার বেলা?

#

(খুকু ও খোকা : অন্নদাশঙ্কর রায়)

“লিখি ১৯৪৭ সালে, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে না ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, মনে পড়ছে না এতদিন পরে। যে খাতায় লিখেছিলুম সেটাও কবে হারিয়ে গেছে। বদলির সময় অনেক বইপত্র, বহু উপহারও হারিয়েছে। অনেক মূল্যবান চিঠিও।

এটা মনে আছে, অফিসে যেতে-যেতে, গাড়িতে বসে, ছোট এক টুকরো কাগজে, পেন্সিলে দুই লাইন লিখি। অফিসে গিয়েও কাজের ফাঁকে-ফাঁকে আরও কয়েক লাইন খসড়া করি। (অন্নদাশঙ্কর রায় তখন ময়মনসিংহ জেলা-আদালতের পয়লা বিচারক)। অফিস থেকে ফিরে চা খেয়ে বাকি অংশ। রাতে ফাইনাল। পরে টাইপ করে”

উল্লেখ্য, ১৯২৯ সাল থেকে অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলা টাইপ রাইটারে লিখতে শুরু করেন। হাতের লেখার বদলে বাংলা টাইপ রাইটারে লেখার কারণও আছে। জন্ম : ১৫ মার্চ ১৯০৪, ঢেঙ্কানল ওড়িশা, শৈশব-কৈশোর, যৌবনের প্রারম্ভ ওড়িশায়। বাংলা ছাড়াও ওড়িয়া ভাষায় কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখতেন। ওড়িয়া আধুনিক সাহিত্যের সূচনা তার এবং তারই পাঁচজন সতীর্থের হাতে, ওড়িয়া আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখিত।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের হাতের লেখার ওড়িয়া ‘ধাঁচ’ তো, পাঠোদ্ধারে ‘ঝামেলা’ কিছুটা। নিজেও জানতেন। বলতেনও রসিয়ে, “ওড়িয়া-বাংলাকে মিশিয়ে দিয়েছি”। “সকালের পোস্টে বুদ্ধদেবকে (বুদ্ধদেব বসু) ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য পাঠিয়ে দিলুম”, বললেন অন্নদাশঙ্কর।

ভারত-বাংলা ভাগ নিয়ে লেখা, গভীর বেদনা থেকে লেখা, ১৮ বছর চাকরির জীবনে ৯ বছরই কাটিয়েছেন পূর্ববঙ্গে, পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায়, একসময় পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়ায় স্থায়ী বসবাসের ভাবনা ছিলো, দেশ ভাগ না হলে হয়তো ইচ্ছে পূরণ করতেন, ‘আমার ভালোবাসার দেশ’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন, ভালোবাসার দেশ পূর্ববঙ্গ, দেশভঙ্গে আত্মীক ক্ষত থেকেই ‘খুকু ও খোকা’ রচনা এবং এই রচনা আপনার ছোটদের ছড়াগ্রন্থে—যা আপনার প্রথম ছড়ার বই সংকলিত। ছড়াটি প্রবল রাজনৈতিক, আদৌ ছোটদের জন্য নয়, সব বয়সের পাঠকের, বয়স্করাই ভালো বুঝবে, দেশভাগ নিয়ে প্রশ্ন, ছোটরা এই প্রশ্ন করবে না, খুকু ও খোকার ভাবনা কীভাবে চক্কর দিলো মাথায়?

প্রশ্নের উত্তরে অন্নদাশঙ্কর : “তোমার দিদুকে (লীলা রায়) জিজ্ঞেস করো, তিনিও জড়িত এবং খুকুও (তৃপ্তি রায়, ছোট কন্যা, লীলা-অন্নদাশঙ্করের)। দিদুর (লীলা রায়। জানিয়ে রাখা ভালো, লীলা রায়-অন্নদাশঙ্কর রায়ের আস্তানায়, প্রশ্রয়ে বারো বছর ছিলুম। ওঁদের কথায়, “আমাদের বড়ো নাতি” আজকের দিনে বোধহয় এরকম বলতে হিম্মতের দরকার। এরকম ভাবুন, অন্নদাশঙ্কর রায় হিন্দু (যদিও বৈষ্ণব), তার স্ত্রী মার্কিনি, খ্রিস্টান, এই আশ্রিত বাংলাদেশের, ধর্মীয় তকমায় মুসলিম, একই বাড়িতে থাকা, একই টেবিলে খাওয়া, ধর্মাধর্মের উর্দ্ধে) বয়ান নিম্নলিখিত :

“ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে (১৯৪৭) বেশ শীত। উনি (অন্নদাশঙ্কর) সকালে স্নানের আগে নারকেল তেল গায়ে মেখে স্নান করেন। সকালে রোদ ছিলো। নারকেলের তেলের শিশি বারান্দায় দিয়েছিলাম, একটু গরমে যেন গলে যায়। আমি তখন রান্নাঘরে, ব্রেকফার্স্ট তৈরি করছিলাম। তোমার দাদু হাঁক ছাড়লেন, ‘তেলের শিশি দাও’। কাজের মেয়েটি তখন বাইরে, অন্যকাজে। বারান্দায় খেলছিল তৃপ্তি (ডাকনাম খুকু), ওর বয়স দেড় কি দুই, ওকে বলি তেলের শিশি বাবাকে দিতে। খেলতে খেলতে তেলের শিশি হাতে নিয়ে খেলাচ্ছলে হয়তো তৃপ্তির হাত থেকে পড়ে যায়, ভেঙে যায়। আমি খুব রাগারাগি করলাম, বকাঝকাও। তোমার দাদু মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘সামান্য একটি তেলের শিশি ভাঙল রাগ করছো, এদিকে দেশ ভাঙছে’। বলেই স্নানের ঘরে না গিয়ে, টেবিলে গিয়ে কাগজে কী যেন লিখলেন। পড়িনি। লিখেছেন মিনিট দুয়েক।”

দিদু আরও বললেন, “ব্রেকফার্স্টের সময় তোমার দাদু বিড়বিড় করে কীসব বলছিলেন, শুনতে পাইনি, হয়তো আমার বা তৃপ্তির ওপর রাগ।”

তৃপ্তি রায়ের কথা, “অনেকপরে বাবার মুখে শুনেছি : তুমি তেলের শিশি ভেঙেছিলে বলেই তুমিই ‘খুকু ও খোকা’ ছড়ার উৎস।”

লীলা-অন্নদাশঙ্কর রায়ের পাঁচ সন্তানের তিনজনই গত। পাঁচ নাতি-নাতনির তিনজনও।

ছোটপুত্র নন্দু (আনন্দরূপ রায়। মেরিল্যান্ড এবং কলকাতায় বাস), ছোট কন্যা তৃপ্তি রায় (খুকু। পুরি ও পুনেতে বাস)।

তৃপ্তি রায় লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। কবিতা, ছড়া, গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ লেখেন না, লেখেন মূলত স্মৃতিকথা। এবং রাজনীতির কথক। বর্তমানে সরকারের তীব্র সমালোচক। যেকোনো রাজনীতিককে অনায়াসেই কাবু করতে পারেন, ‘তৃপ্তি রায়ের লেখা বড়ো বেশি উগ্র’, সংবাদপত্রের সম্পাদকের উক্তি।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘খুকু ও খোকা’ পাকিস্তান আমলে, পূর্ব পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ছিলো সম্পূর্ণ, রাঙা ধানের খৈ’ ছড়া গ্রন্থও।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, ‘খুকু ও খোকা’ ব্যাপক প্রচারিত, পঠিত। নানা আবৃত্তিকারের কণ্ঠে সিডিও হয়েছে।

অন্নদাশঙ্কর রায় বলতেন, “সব কৃতিত্ব তৃপ্তির, আমি নিমিত্ত।”

//জেডএস//

লাইভ

টপ