প্রসঙ্গ ‘দ্য ওরেস্টিয়ান ট্রিলজি’

Send
অরণি হক
প্রকাশিত : ০৭:০০, মার্চ ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০০, মার্চ ২০, ২০২০

প্রাচীন যুগের সাহিত্য ভাগ্য বা দেবদেবি নিয়ন্ত্রিত হলেও সেখানে ব্যক্তিমানুষের প্রেম, সংগ্রাম ও সংকটের যে রূপ পাওয়া যায়, তা চিরকালের। দেবদেবীদের সমর্থন বা ষড়যন্ত্র যাই থাকুক না কেন, মানব চরিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের বাইরে মানুষ কখনো কি পা ফেলেছে? গ্রিক নাট্যকার ঈস্কিলাস-এর ‘দ্য ওরেস্টিয়ান ট্রিলজি’র প্রথম নাটক ‘আগামেমনন’-এ আগামেমননের যে ট্র্যাজিক পরিণতি তার প্রতিশোধ পুত্র ওরেস্টিস পরবর্তীকালে নিলেও হিংসা কখনো নিঃশেষিত হয়ে যাইনি। মানবজাতি তার বংশপরম্পরায় কর্মফলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। দেবদেবীর ভূমিকা সেখানে প্রতীকী অর্থে ধরে নেওয়া ছাড়া পথ নেই।

‘আগামেমনন’ নাটকটি ট্রয় পতনের সংবাদ দিয়ে শুরু। গ্রিক সেনাপতি, আর্গাসরাজ (গ্রিসের একটি শহর আর্গাস) আগামেমনন দশ বছরের যুদ্ধ শেষে তার রাজপ্রাসাদের সামনে রথ থেকে নামলেন, পেছনের রথে লুণ্ঠিত দ্রব্যের সঙ্গে ট্রয়ের রাজকন্যা কাসান্দ্রা। আগামেমননের স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা, কোরাস ও অন্যান্যদের স্তুতি লাভের পর অন্তপুরে প্রবেশ করলেন এবং স্ত্রীর হাতে নিহত হলেন। আপাত এই সরল কাহিনির ভেতর লুকায়িত আছে গ্রিক মিথ, এবং মানুষের রক্তক্লেদ। আগামেমনন যেমন পৈতৃকসূত্রে রাজা, তেমনি ঘাতকের লক্ষ্যবস্তুও। অর্থাৎ সে প্রবাহিত পাপের অংশীদারও। এখানে ব্যক্তি আগামেমনন কিছু নয়। যুদ্ধে আগামেমননের ব্যক্তিসত্তা বাৎসল্যের কাছে পরাজিত নয়, এইটুকুই তার বীরত্ব, গ্রিক জাতির কাছে চির সম্মানের।

গ্রিকমিথ অনুযায়ী—বিশ্বসৃষ্টির আগে ছিলেন দেবতাদের রাজা ঔরনস এবং তার স্ত্রী গাইয়া। ঔরনস মানে আকাশ, গাইয়া মানে পৃথিবী। ঔরনসের আমলেও ‘নিয়তি’ নামে এক দৈবশক্তি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। কালক্রমে ঔরনসের পুত্র ক্রোনস পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়। ক্রোনসের রাজত্বকালেই মানবজাতির সূচনা। এসময় দেবদেবীরা অসহায় মানবজাতির উপর তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় লিপ্ত হয়, দেখা দেয় চরম অরাজকতা। সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেন প্রমিথিউস।

খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে আর্বিভূত হলো নতুন এক দেবদেবীকুলের। যারা ছিল মানবিক গুণসম্পন্ন। তাদের প্রধান জিউস, অর্থ আকাশ, যিনি সরাসরি ঔরনসের বংশোদ্ভূত বলে দাবী করেন। প্রমিথিউসের সহায়তায় যারা ক্রোনসের অরাজকতাবাদী দেবতাদের বিরুদ্ধে জয়ী হন। দেবতারা কৃতজ্ঞাস্বরূপ প্রমিথিউসের সম্মানে এক ভোজসভার আয়োজন করেন। প্রমিথিউস এই সভায় যোগদান করেন এবং মানবজাতির জন্য স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে আনেন। এই আগুনের অধিকারি হয়ে মানবজাতির সামনে খুলে গেলো এক সম্ভাবনার দুয়ার। তারা ধাতু গলিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস ও যুদ্ধাস্ত্র আবিষ্কার করতে শিখলো। এতে রুষ্ট হলেন দেবতা জিউস। তার হুকুমে প্রথিথিউসকে ককেশাস পর্বতমালায় আটকে রাখা হলো। কিন্তু জিউসের পতন সম্পর্কে প্রমিথিউস পূর্ব-জ্ঞানের অধিকারী হওয়ায় প্রমিথিউসকে শৃঙ্খলমুক্ত করা হয় জিউসকে ভবিষ্যতবাণী জানানোর শর্তে।

প্রমিথিউস জানালেন, সমুদ্রদেবী থেটিসের গর্ভে জন্ম নেবে এক শক্তিশালী সন্তান, যে তার পিতার চেয়েও বীর, যার হাতে জিউসের পতন অনিবার্য। এই সন্তানের জন্ম রহিত করতে জিউস মরনশীল যুবক পিলিউসের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে বিশাল এক ভোজসভার আয়োজন করেন। সেখানে সবাই নিমন্ত্রণ পেলেও বাদ পড়লেন কলহের দেবী এরিস। এরিস প্রতিশোধের ফন্দি আঁটলেন। তিনি ভোজসভায় হাজির হয়ে অত্যন্ত কৌশলে ভোজসভার টেবিলে রাখা একটি সোনালি আপেলের গায়ে লিখে রাখলেন ‘সুন্দরীতমার জন্য’। কিন্তু সুন্দরীতমা কে? এ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন জিউসের স্ত্রী হেরা, মনীষার দেবী এথিনা এবং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি। ভোজসভায় কে সুন্দরীতমা তা নির্ধারণ করা গেলো না। জিউস বিচারের ভার দিলেন মরনশীল যুবক প্যারিসের হাতে। তিন দেবীই তাকে নানা রকমের উৎকোচ দিয়ে বশ করতে চাইলেন। হেরা দিতে চাইলেন শ্রেষ্ঠ রাজশক্তি, এথিনা দিতে চাইলেন শ্রেষ্ঠ সমরশক্তি এবং আফ্রোদিতি দিতে চাইলেন এক সুন্দরী রমণী। সুদর্শন যুবক প্যারিস আফ্রোদিতির হাতে আপেল প্রদান করলেন।

এখানে এসে ঘটনা আবার মোড় নিলো মানবজাতির মধ্যে। গ্রিসের শ্রেষ্ঠ শহর আর্গাস। রাজা টান্টালাস। তার মৃত্যুর পরে তার দুই পুত্র অ্যাট্রিউস ও থায়েস্টেসের মধ্যে দেখা দেয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। থায়েস্টেস অ্যাট্রিউসের স্ত্রীকে ধর্ষণ করলে, প্রতিশোধস্বরূপ অ্যাট্রিউস এক ভোজসভার আয়োজন করে থায়েস্টেসকে তার দুই শিশুপুত্রের মাংস রান্না করে খাওয়ান। থায়েস্টেস বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বমি করেন এবং অ্যাট্রিউসের বংশের বিনাশ কামনা করে অভিশাপ দেন। থায়েস্টেসকে তার আরেকপুত্র আজিসথুসহ নির্বাসনে পাঠানো হয়।

অ্যাট্রিউসের মৃত্যুর পরে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আগামেমনন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। অন্য ভাই মেনেলাস তার শ্বশুরের উত্তরাধিকারী হয়ে স্পার্টার শাসক নির্বাচিত হন। স্পার্টার রাজা টেন্ডারেউস ও স্ত্রী লেডা। লেডার সঙ্গে জিউস রাজহাঁসের ছদ্মবেশে মিলিত হতেন। লেডা-জিউসের কন্যা হেলেন। এবং টেন্ডারেউস-লেডার কন্যা ক্লাইটেমনেস্ট্রা। মেনেলাস বিয়ে করেন হেলেনকে, আগামেমনন বিয়ে করেন ক্লাইটেমনেস্ট্রাকে।

ট্রয়ের রাজা প্রায়াম তার পুত্র প্যারিসকে স্পার্টায় পাঠান। সেখানে তিনি হেলেনের আতিথ্য লাভ করেন। মেনেলাস রাজকার্যে হঠাৎ ক্রিটে চলে গেলে আফ্রোদিতি তার ওয়াদা পূরণ করলে প্যারিস হেলেনকে নিয়ে ট্রয়ে পালান। মেনেলাস ফিরে এসে ট্রয় আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। আগামেমনন এই বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন। গ্রিকরা জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন।

সমুদ্রযাত্রার শুরুতেই বাতাস উল্টোদিকে বইতে শুরু করে। নানারকম বলি-বিসর্জন ব্যর্থ হওয়ার পরে, ভবিষ্যতবক্তা ক্যালকাস বলেন, দেবী আর্টেমিসের উদ্দেশ্যে আগামেমননের কুমারী কন্যা ইফিজেনিয়াকে বলি না দিলে সুবাতাস বইবে না। আগামেমনন অন্যান্য গ্রিক রাজাদের বিদ্রুপে নিজের কন্যাকে বলি দিতে বাধ্য হন। যদিও স্ত্রীকে জানান যে, ইফিজেনিয়াকে সুপাত্রের কাছে বিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন।

দশ বছর যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে ট্রয় নগরী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু এরই মধ্যে আগামেমননের স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা এবং থায়েস্টেসের নির্বাসিত পুত্র আজিসথুস—যিনি আগামেমননের চাচাতো ভাই—প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং আগামেমননকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

নাটকে দেখা যায় আগামেমননকে অভ্যর্থনা জানাতে স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা লাল লালিচা বিছিয়ে তার উপর দিকে তাকে হেঁটে আসতে বলেন। কিন্তু লাল লালিচা একমাত্র দেবতাদের জন্যই সংরক্ষিত—মিথ অনুযায়ী এতে দেবতারা রুষ্ট হন— আগামেমনন অস্বীকৃতি জানালেও স্ত্রীর ভর্ৎসনায় বাধ্য হন।

আগামেমননকে তার স্ত্রী স্নানঘরে হত্যা করে ইফিজেনিয়াকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে। আর এতে প্ররোচিত করে পুরনো শত্রু ও প্রেমিক আজিসথুস। ভবিষ্যতদ্রষ্টা কাসান্দ্রা পুরো ব্যাপারটা জানতেন—এমনকি নিজেও যে একইসঙ্গে নিহত হবেন—কিন্তু অ্যাপেলো তার সঙ্গে মিলিত হতে চেয়ে সাড়া না পেয়ে তার অভিশাপে তার ভবিষ্যতবাণী কেউ বিশ্বাস করে না।

‘আগামেমনন’ নাটকে বীর আগামেমননের প্রতি কোরাসের পক্ষপাত, যার মধ্য দিয়ে ন্যায়বোধ প্রকাশিত।

এই ট্রিলজির দ্বিতীয় ভাগ ‘খিওফরি’ বা ‘তপর্ণ বাহকেরা’য় দেখতে পাই আগামেমননের নির্বাসিত পুত্র অরেস্টিস পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয় প্রসাদে মায়ের সঙ্গে থাকা কনিষ্ঠা বোন ইলেক্ট্রার সহযোগিতায়। অরেস্টিস নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন—এই সংবাদ নিয়েই অরেস্টিস রাজপ্রাসাদে পথিকের ছদ্মবেশে হাজির হন এবং আজিসথুকে হত্যা করেন। মাকে হত্যা করতে গেলে মা তাকে চিনে ফেলেন এবং অভিশাপ ও স্নেহের কথা বলার চেষ্টা করেও অরেস্টিসকে তিনি নিবৃত করতে পারেননি। এই পুরো ব্যাপারে নৈতিক সমর্থন জানান কোরাস।

সর্বশেষ নাটক ‘ইউমিনিডিস’ বা ‘দয়ালু-তে’ মায়ের অভিশাপ ভীষণা ফিউরিদের রূপ ধরে তাড়া করে। তারা দেখতে নাগিনীর মতো। এখানে নাট্যকার ঈস্কিলাস এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন এভাবে— ‘এইদীর্ঘ বৈরিতার শেষ কোথায়!/জানিনে; এরপরও আরও মৃত্যু আছে কিনা!/ কবে এই বংশ থেকে অপসারিত হবে অভিশাপ/সকল প্রকোপের প্রশমন ঘটিয়ে/ দেখা দেবে শান্তি—শান্তি—শান্তি।’

এই ট্রিলজিতে দেখতে পাই : দেবদেবী বা মানুষ প্রত্যেকেই পূর্বতন ঘটনা দ্বারা পরিচালিত, একটি সংকট বহু সংকটের জন্ম দেয় এবং যা প্রবাহিত করে বংশপরম্পরার মধ্যে। কারো শান্তি বা স্থিতি নেই। কেউ নৈতিকভাবে সঠিক কাজ করেও—যেমন অরেস্টিস—নিস্তার পায়নি মায়ের অভিশাপ থেকে, কারণ সেও যে মাতৃঘাতক।

তথ্যসূত্র

১. আগামেমনন : অনুবাদ, মুহাম্মদ নূরুল হুদা

২. তর্পণ বাহকেরা : রূপান্তর, মোবাশ্বের আলী

৩. চিরায়াত পুরাণ : খোন্দকার আশরাফ হোসেন

৪. উইকিপিডিয়া

//জেডএস//

লাইভ

টপ