আলবেয়ার কামুর ‘দ্য প্লেগ’ এবং আমাদের পুনর্জন্ম

Send
মূল : স্টিফেন ম্যাচকাফ, অনুবাদ : ইরা সামন্ত
প্রকাশিত : ১১:৩৭, মার্চ ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪১, মার্চ ২৮, ২০২০

কিছু বই আছে জীবনের প্রাসঙ্গিকতায় যেগুলো অন্যরকম রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। আজকের এই আইসোলেশনের জীবনে আমার কাছে নির্লিপ্তভাবে মনে হয়েছে ১৯৪৭ সালে লেখা আলবেয়ার কামুর উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’ তেমন একটি বই, যেটা পড়ে শেষ করার আগে অন্য কিছুতে হাত দেওয়া যেন উচিত হবে না। বইটির সঙ্গে আজকের প্রাসঙ্গিকতা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখ। ডা. বার্নার রিও তার অপারেশন থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়েছেন। এমন সময় পায়ের নিচে নরম মাংসের পিণ্ড। একটা মরা ইঁদুর! রিও কিছুক্ষণ থমকালেন। পাত্তা না দিয়ে এক লাথি মেরে সেটাকে সরিয়ে চলে গেলেন নিজের কাজে। এভাবেই শুরু হয়েছে ‘লা পেস্তে’ বা ‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসটি। রিও ওরান শহরে কর্মরত চিকিৎসক, যে শহরকে গ্রাস করেছিলো প্লেগ। এই মহামারির সূত্রপাত একটা লাথি। ইঁদুরটিকে পরীক্ষা না করে লাথি মেরে সরিয়ে দেওয়া।

আমি এখন নিউ ইয়র্কে নিজের বাসায় সেলফ আইসোলেশনে রয়েছি। করোনা মহামারির প্রতিদিন একই নিয়মে খাওয়া, টিভি দেখা, আর সন্ধ্যায় জোরে জোরে বই পড়ার মতো এক ধরনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ঝড়ের আগমুহূর্তে বাতাসের নিম্নচাপ-শূন্যতার মতো আমরা যেন এই মুহূর্তে অতিপ্রাকৃত এক জগতে বাস করছি।

আমার এক বন্ধু সমুদ্রের কাছে বাস করে, সে ইমেইলে লিখেছে, ‘আপাতত নিজের রুটি নিজেই বানিয়ে খাচ্ছি, বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ অন্য আরেক বন্ধু অস্ট্রেলিয়া থেকে লিখেছে, সে এখন ম্যারি শেলির ‘দ্য লাস্ট ম্যান’ পড়ছে, তার ধারণা এই মহামারি ‘সকলের জন্য একটি বিরাট আয়না।’ আমার একজন প্রতিবেশিকে দেখলাম তিনি তার বাড়ির বাঁশের বেড়া ঘেঁষে কুকুর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আমাকে দেখে বললেন, ‘সম্ভবত এই রোগটি আমাদেরকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দেবে।’

শেষবার পুরো পৃথিবী পুনর্জন্ম লাভ করেছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। একযোগে পুরো পৃথিবীকে প্রায় সর্বজনীনভাবেই নতুন করে শুরু করতে হয়েছিলো। হিরোশিমা এবং নাগাসাকিকে পঞ্চাশের শুরুর দিকে কেনেসিয়ান নীতিনির্ধারকরা যখন আদর্শ একটি রাষ্ট্র তৈরি করার জন্য নকশা করছিলেন, সে সময়ে জাপানের দুজন লেখক তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর দুটি উপন্যাস লেখেন যেগুলো প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে, যেমন ট্রাম্পের জয়ের পর জর্জ অরওয়েলের ‘নাইন্টিন এইটি-ফোর’ জনপ্রিয় হয়েছিলো।

‘দ্য প্লেগ’ উপন্যাসে দেখা যায়, ওরান শহরে রোগটি হটাৎ করে দেখা দেয়, কোথাও থেকে সংক্রমিত হয়ে নয় বরং অজানাভাবে হঠাৎ শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ইঁদুরের মাধ্যমে শুরু হয়, এরপর সরকারের উদাসীনতা, গুজব আর অলসতার কারণে জনগণের মধ্যে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে শহরের সকল দোকান বন্ধ হয়ে যায়, রাস্তাগুলো খালি হয়ে পড়ে থাকে। সংক্রমণটি জ্যামিতিকভাবে এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, ডেথ গ্রাফের দিকে তাকালে দেখা যায় : মৃত্যুর গ্রাফের রেখাটি খাড়াভাবে উঠেছে। দ্রুতই সমস্ত শহর কোয়ারান্টাইনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, কিন্তু হাসপাতালের দেয়ালের ভেতরে আবদ্ধ ডাক্তার এবং চিকিৎসার জন্য সরঞ্জামের ঘাটতি আর মুখোশগুলোর কার্যকরহীনতা নিয়ে শহরজুড়ে বিতর্ক ওঠে। একদিকে, মহামারিটি অন্যসব সমস্ত বিপর্যয়ের থেকে আলাদাভাবে গোপনে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যে কারণে নিজেকে বাঁচানোর জন্য বুঝে উঠতে মানুষের বেশ সময় লাগে। সেই সময়ের মধ্যে একজন পুরোহিত ঈশ্বরের পক্ষে একটি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন, আর শহরের খবরের কাগজগুলো নকল খবর প্রদান করা শুরু করে।

কিন্তু অল্প দিনেই হতাশা, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি আর আতঙ্ক, এইসব ঘিরে শহরের মানুষের মেজাজ আবর্তিত হয়। এবং শেষমেষ শহরটি এক ধরনের সামষ্টিক হতাশার মধ্যে পড়ে যায়। যারা সুবিধা বঞ্চিত ছিলো ঠিক তাদের মতো অঢেল টাকাওয়ালা মানুষেরাও মানসিকভাবে সুবিধা বঞ্চিত হয়ে পড়ে।

কামুর এই উপন্যাসটিকে প্রায়ই ফ্যাসিবাদের রূপক হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি, উভয় বিবেচনায় সেটা ভুল। উপন্যাসটি পড়ার পর আমার ধারণা : ‘দ্য প্লেগ’ রূপক কিছু নয়, বরং এতে সরাসরি সবকিছু দেখানো হয়েছে, একইসঙ্গে এটি স্পর্শকাতর এবং বয়ানে সুস্পষ্ট—একটি মহামারির মধ্যে পড়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মমভাবে মরে যাওয়া মানুষের গল্প। কামু যক্ষ্মায় ভোগা মানুষ, তিনি জানেন রোগকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করার কিছু নেই। দ্বিতীয়ত, উপন্যাসে কামুর ভিন্নরকম বয়ানের ধরন ক্যাটাগরির জায়গা থেকে একে ফ্যাসিবাদি টেক্সটের কাতার থেকে আলাদা করে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, একটি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে লেখার মধ্য দিয়ে কামু আপেক্ষিক গুরুত্বহীনতার ওপর জোর দিয়েছিলেন, একটি বিশাল খারাপ কিছু তাকে লিখতে প্রেরণা দিয়েছিলো। নাৎসিদের বিরুদ্ধে ফরাসি ‘লা রেজিসতন্স’ বাহিনীতে যোগ দিয়ে কামু যে সুনাম কুড়িয়েছিলেন, উপন্যাসের গল্পটিকে একটি আদর্শিক গুরুত্বের মধ্যে ফেলে দিয়ে সেটাকেও তিনি যেন তুচ্ছ করেছেন, যেন মানবতাই সবকিছু। তবে কামুর সব টেক্সটেই পুরাণে তার আগ্রহ দেখা যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদি মানসিকতাও টের পাওয়া যায়।

উপন্যাসে ওরান শহরটিকে কামু মনে করেছেন শুধুমাত্র বাণিজ্যিক, বৃক্ষহীন এবং প্রাণহীন। তরুণ অবস্থায় তিনি শহরটিকে অবকাশহীন শহর হিসেবে মনে করতেন। শহরের নাগরিকরা প্রকৃত অর্থে পাপি না হলেও তারা জীবনের প্রতিটি বিষয়কে ব্যবসার ভেতরে আটকে রেখেছিলো, যার কারণে মহামারি আসার পর মানুষের মানুষকে প্রয়োজন ও ভালোবাসার প্রতি উদাসীনতা তাদেরকে অপ্রস্তুত করে ফ্যালে।

উপন্যাসটিতে প্লেগই একমাত্র এবং আসল অভিনেতা।

উপন্যাসের বয়ানে কোনোরকম রাগ বা কারো প্রতি তিক্ততা নয়, শুধু ফুটে ওঠে মানুষের অপরিসীম সাহস, ধৈর্য, আর পরদুঃখকাতরতার চিত্র। কামু আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে নৈতিকতা মূল দাগ থেকে সবসময় দূরে থাকে। তিনি দেখিয়েছেন, যন্ত্রণা, মানসিক কষ্ট এবং মৃত্যুর কারণগুলো কীভাবে নীতিকে খেয়ে ফ্যালে। দেখানো হয়েছে স্বাধীনতা কীভাবে স্থানিক, কিংবা অল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কেমন ভঙ্গুর, ক্ষুদ্র।

দেখানো হয় তারু নামের একজন ব্যক্তি মানুষের নৈতিক পছন্দ নিয়ে কীভাবে নিরন্তর চিন্তা করে, এবং শেষমেষ সে একটি সিদ্ধান্তেই উপনীত হয় : ভুক্তভোগীদের সঙ্গেই থাকবে। নীতি নিয়ে কামু বলতে চেয়েছেন, ‘জীবাণু হলো প্রাকৃতিক, বাকি সকল কিছু—স্বাস্থ্য, সততা, বিশুদ্ধতা মানুষের ইচ্ছায় সৃষ্ট।’ আমি অবাক হয়েছি, বিদ্রূপের মধ্যেই কীভাবে আমাদের ধ্বংসের বীজ লুকিয়ে আছে, কামু যেন সেটা উপন্যাসে খুব সহজভাবেই দেখিয়েছেন। অবদমিত জিনিসের প্রকৃতি হচ্ছে, কমপক্ষে যদি সেটাকে নূন্যতম প্রত্যাশা করা হয় তাহলে সে ফিরে আসবেই। এইভাবে অনেক প্রশ্ন তুলে শেষ হওয়ার সময় উপন্যাসটি মুক্ত বাজারের বিমূর্ততা তুলে ধরে।

রোগেরা চালাক হয়, তারা মানুষের দুর্বলতা খুঁজে বেড়ায়। আর মানুষ কেবলই দুর্বল, কিন্তু ভান করতে তারা সবসময়ই সিদ্ধহস্ত।

সূত্র : লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস

//জেডএস//

লাইভ

টপ