এ কী জীবন কাটাচ্ছি আমরা

Send
হাসান আজিজুল হক
প্রকাশিত : ০০:০০, এপ্রিল ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০০, এপ্রিল ১৪, ২০২০

শৈশবে গ্রীষ্ম, শীত, বর্ষা, হেমন্ত, শরৎ, বসন্ত সবই উপভোগ করতাম। ঋতুর যে এই বৈচিত্র্য, এটার ভেতর অন্যরকম আনন্দ ছিলো। মাঘ মাসে প্রচণ্ড ঠান্ডা। গভীর রাত্রে বহুদূর থেকে শেয়ালের হাঁক শোনা যেতো। চারিদিকে শুধু ধু-ধু ফাঁকা মাঠ। আর কিছুই নেই। খানিকটা ছিলো ধানের নাড়া। সেই মাঠ ঝাপিয়ে আসতো অন্ধকার। সেই ঠান্ডা যে কম উপভোগ্য ছিলো তা নয়। আর আমি একটু অন্যরকম ছিলাম। মজাটা একা একা নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করতাম। লোকে শুনলে অবাক হবে যে, ওই শীতের রাতে মাঘ মাসে আমি বিনা কারণে, বিনা উদ্দেশ্যে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম পেরিয়ে, সিকি মাইল এগিয়ে প্রান্তরে গিয়ে দাঁড়াতাম।

এরপর এরই মধ্যে চলে আসতো বসন্ত। সেটা তো অবর্ণনীয় ব্যাপার। পাতা ঝরছে ঝুরঝুর করে। এলোমেলো বাতাস বইছে, তারপরে কখনো কখনো প্রচণ্ড গরম হাওয়া আসছে। এই করতে করতে এসে পড়লো গ্রীষ্মকাল। গরমকাল আরকি! রাঢ়ে খুব ফাঁকা জায়গা ছিল। যেসব অঞ্চলে বৃষ্টি হয়, সেসব থেকে অন্যরকম। সেটা অন্য জায়গা থেকে আসা মানুষের সহ্য হবে না।

মাঠের দিকে তাকালে দেখা যেতো নানাভাবে রোদ ঝিলমিল করছে। মনে হতো বাতাস কাঁপছে। তাপটাও কাঁপছে থরথর করে। হঠাৎ মনে হতো একেবারেই বাতাস নেই কোনো দিকে। আবার কোথা থেকে যেন হুট করে চলে আসছে গরম বাতাস। মনে হতো কোথা থেকে বাতাস এলো? একটা ঘুরন্ত বাতাস। নলের মতো। সেই নলের মতো বাতাসটা গোল স্তম্ভের মতো হয়ে এগিয়ে আসতো। তার আশেপাশে যত ঘাস পাতা আর জঙ্গল আছে, সেগুলোকে সে টেনে নিচ্ছে তার কাছে। টেনে নিয়ে উপরের দিকে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতো। এসবকে বলা হয় ঘূর্ণিবায়ু। সাধারণ মানুষ বলতো এসবের মধ্যে ভূত আছে। কেননা আমরা কখনো এটাও শুনেছি যে, ঘূর্ণিবায়ুর ভেতর পড়ে মানুষ উঠে গেছে, তারপর আছড়ে পড়ে মারা গেছে। এরকম ঘূর্ণিবায়ু, রোদের মাঠ, স্থির বায়ু। এটা হলো রাঢ়ের একদিকের বর্ণনা। আর গ্রাম জীবনের দুপুরবেলাটা থাকতো স্তব্ধ। কোনো মানুষই বাড়ি থেকে বের হতো না। আমরাও বের হতাম না। আর বেরও হতে দেওয়া হতো না।

আমার বাবা চারপাশের জানালা দরজা লাগিয়ে অন্ধকার করে দিয়ে আমাদের কাছে ঘুমাতেন। কাউকে উঠতে দিতেন না। অন্যদিকে আমার ছিলো ফুটবলের নেশা। খেলতে যাবো। একদিন ফুটবল না খেললে মনে হতো আজকের আর খাইনি। সাংঘাতিক ব্যাপার ছিলো! আমি খুব ভালো ফুটবল খেলতাম। এখনকার মতো নাদুস-নুদুস বালক ছিলাম না। শক্ত ছিলাম খুব। শক্ত কাজ করতাম। গৃহের কাজ পর্যন্ত করতাম। আমি এক কাঁধে প্রায় একমণ ওজনের পানিভর্তি  মাটির কলস, আরেক হাতে জলভরা বড় বালতি নিতে পারতাম। আমাদের সময় সবার বাড়িতে তো আর নলকূপ ছিলো না। দেখা যেতো ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্ট এরা দু’একটা নলকূপ বসাতো। সেখান থেকেই মূলত জল আনতে হতো।

আমাদের সময় বাবা মা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। বাবা তো অত্যন্ত কড়া মানুষ ছিলেন। কিন্তু ছেলে সকালবেলা উঠে কোথায় গেলো? কিংবা কী খেলো? সে খবর তিনি কখনো নেননি। বিশাল পরিবার ছিল আমাদের? আমরা মায়েও খবর নিতো না। কেননা বাড়িতে একজন ফুফু আছেন। তিনি ছিলেন বিধবা। সে-ই যথেষ্ট। ফুফুকে বললেই হতো ফুফু ভোগ লেগেছে। ব্যাস। উনিই সব ব্যবস্থা করতেন।  তো এই জীবনের কী তুলনা হয় জানি না। তখন তো জামা-কাপড়ের তেমন চাকচিক্য ছিলো না। আমার বাবা কোনো বড়লোকি পছন্দ করতেন না। অন্যান্য ছেলেমেয়েরা যেমন থাকতো আমাদেরকেও ওমনভাবে রাখতেন। সেইজন্যে একটি নতুন জামা পরে যদি কসটস লাগিয়ে ফেলতাম। তাহলে উনি ভীষণভাবে প্রহার করতেন। জিনিসপত্রের কীভাবে যত্ন করতে হয়। উনি সেটা শেখাতেন। আমাদের বাড়িতে বন্দুক, পালকি, ঘোড়া এসবই ছিল। গ্রামের অভিজাত পরিবারে যা যা থাকে আরকি। আর বাড়িঘর ছিল সব মাটির। আমাদের বিশাল বাড়ি ছিল সেটাও কিন্তু মাটির। সেই বাড়ি নিয়ে আমি একটা গল্প লিখছি।

এভাবে দিন যেতে যেতে চলে আসতো বৈশাখী মেলা। পুরো একমাস ধরে চলতো সেটা। মেলাতে সব ধরনের মনোরঞ্জনকারী জিনিসপত্রে ঠাসা থাকতো। গ্রামের নির্জন জায়গায় বসতো এই মেলা। হরেক রকম গাছপালার ছায়ার মধ্যে সারিসারি দোকান বসানো হতো। চারিপাশে গ্রামের মানুষের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়েই হতো এই মেলা। যেমন ধরো; কাস্তে, কোদাল, লাঙল, ফাল, মই হাড়িপাতিল। চিড়ে দই, ধান চাল এসবও উঠতো। এই সময় গ্রামে আমরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম মেলার জন্য। মেলায় যেতেই হবে এমন ইচ্ছে সবার মনে। এবং আমরা অনেক আগে থেকে টাকা জোগাড় করতাম। টাকা কোথায় পাবো? বলা ভালো, পয়সা জোগাড় করতাম মেলায় খরচ করবো বলে। আমাদের তো বড় ফ্যামিলি, বনেদি ফ্যামিলি। প্রথম দিন আমার বড় চাচা (তিনি নিঃসন্তান ছিলেন) একটা গরুগাড়ি করে আমাদেরকে নিয়ে মেলায় যেতেন। ছোট বাচ্চা মেয়েরাও যেতো। ওইদিন ঘুরে ঘুরে দেখা হতো, এটা ওটা খাওয়া হতো।

আমাদের গাঁয়ের বৈশাখী মেলা বলতে ওই পাশের গাঁয়ের মেলাটা। দূরত্ব দেড় মাইল। আর আমাদের নিজেদের গ্রামে মেলা হতো চৈত্র সংক্রান্তিতে। সেখানে শিবের গাজন হতো। এখানে সন্ন্যাসী হয় যারা, তারা শিবের ভক্ত। সবাই মিলে এক জায়গায় থাকবে বলে বাড়িঘর ছেড়ে চলে আসতো। গোসল করতো না। তেল দিতো না মাথায়। কারো বাড়িতে ঢুকতো না। বাড়ির রান্নাবান্না খেতো না। এরকম করে একমাস তারা কাটাতো। তারপর একদিন বিশেষ দিনটাতে তারা শিবতলায় গিয়ে দাঁড়াতো। সমস্ত গ্রামের মানুষ এক জায়গায় জড়ো হতো সেখানে। আর মাঝখানে শিবের ভক্ত-গাজনের ভক্ত। তারা একজন করে ডুব দিচ্ছে। আবার সে আসলে আরেকজন দিচ্ছে। দু’জন করে লোক তাকে ধরছে। আর মাঝখানের একজন তার জিবটাকে ধরছে টেনে। জিবটাকে ধরে বাঁকা করে খচ করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ফলা।

এই ফলাটার পেছনটাতে আবার একটা প্যাঁচ আছে। সেই প্যাঁচটাতে আবার লাগানো আছে লম্বা রড। সেই ফুটো দিয়ে রডটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে নাচতে নাচতে ওই জায়গা থেকে শিব মন্দিরের দিকে যেতো। আর ব্রাহ্মণ গোসল সেরে মাটি ছুঁয়ে, দু’হাত বাড়িয়ে উঠে প্রণাম করতো মাটিকে। এমন করতে করতে শিবতলার দিকে যেতো। এরপর গাজন শেষ হলে, গাজনের মাথা কাটা হবে। সেই মাথাটা কাটলে হবে শক্তি পরীক্ষা। কে মাথাটা পাবে? এই নিয়ে তৈরি হতো জটলা। চারিপাশে মানুষ গিজগিজ। মাথাটা কাটার পর যেই না ফেলে দেওয়া হতো। ব্যাস। গ্রামের সমস্ত যুবক ঝাঁপিয়ে পড়তো। কে নেবে সেই মাথা? ওরে বাপরে বাপ! সুবল নামে একটা ছেলে ছিলো, সে এমন করে মাথাটা ধরতো, কারও সাধ্য ছিল না তার কাছ থেকে মাথাটা ছিনিয়ে নেওয়ার।

এভাবেই বৈশাখের সবকিছুই আমরা উপভোগ করেছি। এখন তো ফাঁপা সমাজ। খালি মনে হয়; দুর্নীতি সর্বস্ব, আন্তরিকতাহীন, মানবতাহীন, এ কী জীবন আমরা এখন কাটাচ্ছি! পুনর্মুদ্রণ

 

শ্রুতিলিখন : মিলন আশরাফ

//জেডএস//

লাইভ

টপ