শোভা

Send
আদিত্য অনীক
প্রকাশিত : ১৬:১৪, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৮, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য

মেয়ে বিয়াতে বিয়াতে মা যখন ক্লান্ত—তখন আমার জন্ম। আমি বাবা-মার চতুর্থ অপকর্ম।

ঈশ্বর সবই দিয়েছেন—হাত, পা, নাক, মুখ, চোখ, উরু, জঙ্ঘা, বুক—শুধু শোভা ছাড়া।

তাই ক্যাদরানি একজন ডেকে উঠল ‘শোভা’ বলে। ওই হয়ে গেল আমার নাম নামপত্র।

ছেলের জন্য তর সইছিল না। বছর বছর বিইয়ে যাচ্ছিল মা। পিঠাপিঠি দুই ছেলে হলো।

চার বোন সেবাদাসীর মতো কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। দুই ছেলের সেবাযত্নের জন্যই যেন মা কষ্ট করে আগে চার মেয়ে বিইয়েছে।

এতদিন বাবা ছিল ‘বিউটির বাপ’। ছেলে পয়দা করে রাতারাতি ‘বাবলুর বাপ’ বনে গেল।

ভাইদের উচ্ছিষ্ট ছিল আমাদের খাদ্য। নিরাশ্রিতা বিড়াল ভাগ্য। কোনো ছেলে যদি বলত তরকারিতে লবণ হয়নি তবে বাবা চোখ উলটে বলত, এখন উচিত চার শয়তানিকে একসের করে কাঁচা লবণ খাইয়ে জন্মের মতো রান্না শিখিয়ে দেয়া। কথার ঝাঁঝে চার মেয়ের মৃত্যুর আকুলতা হলফল করত। আমার বুকে এক দুরাশা কলবল করে উঠত—ইস্ ফের যদি শুরু করা যেত পুরুষ জন্ম থেকে।

পিঠাপিঠি ভাইটি কোনো কারণে কেঁদে উঠলেই বাজের মতো ছুটে আসত মা। ছেলে কাঁদছে এটাই আমার অপরাধের চূড়ান্ত। নাকেমুখে এমনভাবে কিল আর লাথি মারত যেন মরে যাই। অন্তত বড় বিপদটা বিদায় হয়। চার মেয়ের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কালো আর বেপরোয়া। বড় হয়ে নাকি শুভ্র বংশবদনে কালি মাখিয়ে ছাড়ব।

জামার তালি ফেটে বেদনা ঝরে। মেয়ে হয়ে জন্মানোর যন্ত্রণার লাভা বুকের ভেতর গড়গড় করে। উদ্গীরণ কই? চোখের লোনাজলে কালশিটে ভিজে ওঠে—করুণাঘন ঈশ্বর তুমি কোথায়? তুমি কি পুরুষ? নইলে কেন তোমার কানা বিচার?

ভাই দুটোর প্রতি প্রচণ্ড হিংসা হতো। মা যদি ছেলে বিয়াতে না পারত তবে আমাদের ওপর এত লানত নেমে আসত না। ওরা যদি হঠাৎ মারা যেত তবে মায়ের ছেলে বিয়ানোর দম্ভ কোথায় যায় দেখতাম।

ছাত্রী হিসেবে মেধাবি ছিলাম। কিন্তু স্কুল পাস করার পর কলেজে ভর্তি হওয়া হলো না।

বাবার চোখে মেয়েরা দোজখের লাকড়ি। এদের লেখাপড়ায় টাকা খরচ করার চেয়ে মাদ্রাসায় দান করা নেকির কাজ।

ছেলে দুটোর লেখাপড়ায় বিস্তর খরচ। বিষয়ে বিষয়ে টিচার, কোচিং, নানা পদের গাইড। আর আমাদের লেখাপড়া বন্ধ। জিদ্দে বুক ফেটে যেত। ইচ্ছে করত ছেলে দুটোর খাবারে বিষ মিশিয়ে দেই। বাবার বাহাদুরি কই যায় দেখি। ছেলেমানুষ মারার বিষ কোথায় পাওয়া যায়?

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করলাম। বিয়ে হচ্ছে না বলে বাবা-মায়ের কষ্টের সীমা নেই। মনে হতো এবার নিজেই বিষ গিলি। চেষ্টা করে একটা ছেলে জুটিয়ে বাবা-মাকে উদ্ধার করলাম। ছেলে বীমার দালাল। মোষের মতো কালো। গরিলার মতো লোম। সজারুর পাছার মতো খাড়া চুল। মাধবদির কলুদের মতো থ্যাবড়া নাকের ফুন্দা দিয়ে ভেতরের প্যাটা পাকানো চুলের ওপর চোখ পড়লে গা ঘিনঘিন করে ওঠে। ইচ্ছে করেই মোষটাকে বেছে নিলাম যেন রাস্তার কুত্তিও ওর দিকে ফিরে না তাকায়।

মনে মনে খুশি হলেও বাবা মধ্যবিত্তের আকামা তেজে গর্জাল। ‘আমার মেয়ে হয়ে এত বড় কলঙ্ক করলি? যা আজ থেকে তোর জন্য আমার দুয়ার চিরতরে বন্ধ।’বাবা এক ঢিলে দুই পাখি মারল।

রামপুরার ঘুপচিতে একরুমের বাসা ভাড়া নিলাম। তিন মাসের মধ্যে মোষটা পেটে বাচ্চা ঢুকিয়ে দিল।

বাচ্চা হবার পর সংসারে অনটন বেড়ে গেল। আগে টিউশনি করতাম। সেটাও বন্ধ। কিছুতেই আর চলছে না। কাতর গলায় বললাম, প্লিজ একটা উপায় করো।

সে বলদা চোখ কপালে তুলে বলল, উপায়? উপায় থাকলে কী আর তোমার মতো পেঁচিরে কেউ বিয়া করে? ইচ্ছা করল আয়নাটা মুখের সামনে ধরে বলি নিজের চেহারাটা দেখ প্যাঁচার বাচ্চা।

আগে আমার প্রতি তার একটা আকর্ষণ ছিল। কার্তিক মাসের কুত্তার মতো ঘেঁষাঘেঁষি করত, জড়িয়ে ধরত, রাত হলে কাছে আসত। এখন আর ভালো লাগে না। অন্য মেয়ে দেখলেই ছুক ছুক করে। প্রায়ই শূন্য পকেটে ঘরে ফেরে। শার্টে লম্বা চুল বা লিপস্টিকের দাগ ছাড়াই ওর চোর টাইপ চেহারা দেখেই বুঝতে পারি যেদিন সে বাইরের মেয়েদের কাছ থেকে আসে। মা-মেয়ে তার কাছে আপদ। বিদায় হলে বাঁচে। কিন্তু এই মেয়েকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

চাকরির জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করলাম। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট ঘরে বসে যত সহজে মিলে চাকরি তত সহজ না। একটি হোয়াইট কলার জবের জন্য আমার কল্পনার কোমল কৃষ্ণচূড়া দলিত হলো অনেক পুরুষের বিষের বুলেটে। দু-তিন জায়গায় চাকরি হলোও। কোনোটাই টিকল না বেশি দিন। তাদের নতুন মুখ চাই। পেট ঝোলা ষাঁড়গুলোর এক মাঠের ঘাসে বেশিদিন রুচি থাকে না।

পাড়ায় কেজি স্কুল খুলেছে। যিনি মালিক তিনিই হেডমাস্টার। বেতন কম দিতে হয় বলে মেয়ে টিচার নিচ্ছে। হোক কম বেতন। তবু নানা গুয়ে ছুক ছুক করা অফিসের কুকুরগুলোর পেছনে ঘুরতে আর ভালো লাগে না। টিচারের মর্যাদা আছে। ইজ্জত নিয়ে চাকরি করা যাবে।

চাকরিটা হয়ে গেল। সদ্য পাস করা একঝাঁক টাইট-ফিট তরুণী টিচার। তবে টিচারগুলো বেশিদিন টিকছে না। হেডমাস্টার বলেন, ঘাড় মোটা হয়ে গেলে তো আর রাখা যায় না।

টিচার হবার সুবাদে টিউশনি গতি পেল। ছাত্রদের জন্য আলাদা রুমের দরকার। দুই রুমের বাসা ভাড়া করলাম। স্থায়ী কাজের বুয়া। ঘাত-প্রতিঘাতে জীবন চলে যাচ্ছে।

হঠাৎ বিকেলে হেডমাস্টার ডেকে পাঠালেন। শোভা, তোমাকে আর রাখা যাচ্ছে না। কাল থেকে আর আসার দরকার নেই।

বুকের মধ্যে বুবুজেলা বেজে উঠল। চাকরিটা না থাকলে টিউশনিও থাকবে না। মেয়েকে নিয়ে বাঁচব কী খেয়ে? ধরা গলায় বললাম, স্যার।

হেডমাস্টার আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে জ্যামিতিক জরিপের এক্সরে মেশিন বসানো। কামুক দৃষ্টি গায়ের নরম জায়গাগুলোতে তীরের মতো বিঁধতে লাগল। একটা চিরকুট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, সন্ধ্যায় এখানে এসো।

চিরকুট হাতে আসার আগেই বললাম, জি স্যার।

আবছায়া অন্ধকারে আরামবাগের মেস কোয়ার্টার। স্যার রুমের তালা খুললেন। এককোণে হাড়িপাতিল আর কেরোসিনের স্টোভ। সিঙ্গেল খাটের ওপর তেলচিটে বিছানা। এক্সপার্ট হেডমাস্টার আমার মলাট খোলা গায়ে অভিজ্ঞতার ছাপ্পর মেরে দিলেন।

কাজ শেষে বললাম, মেয়েটার জ্বর, স্যার আমি যাই প্লিজ।

বসো বসো। এমন নিরিবিলি পরিবেশ তো আর সহজে মিলে না। ওহ্‌ তোমার তো বাচ্চা আছে।

বাচ্চাটা মনে হয় নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল। সিজারিয়ান করাতে পারলে না? নরমাল ডেলিভারি হলে ঢিলা হয়ে যায়। মজা থাকে না।

হঠাৎ দরজায় টোকা। একজন এমনভাবে ঢুকে পড়ল যেন সে ঢোকার জন্য তক্কে তক্কে ছিল। তেলাপোকা কালারের ক্রিমিটাইপ নেড়িকুত্তা। গায়ে ঢলে পড়ে কথা বলতে লাগল।

আমি জড়সড় হয়ে যেতেই স্যার বললেন, ভয়ের কিছু নেই। উনি রহিম সাহেব, এই রুমটা তারই।

খুব আপন মানুষ। ধরো আমরা এক মায়ের পেটের ভাই।

হেডমাস্টার ভুরভুরা সাপ পচা গন্ধের মুখটা কানের কাছে এনে বলল, আমি যাই। তুমি আর একটু থাকো। বুঝো তো সব। তার মুখটা বন্ধ করে এসো, নইলে প্রেস্টিজ পাংচার।

হেডমাস্টার চলে গেলেন। তেলাপোকাটা দরজা বন্ধ করে ফিরে তাকাল। ওই পিশাচ চাহনি চিনি।

ধর্মঘটী শরীরের নিরেট পাথর বিষের ছোবলে নীল।

রাতে জ্বরে অচেতন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছি। ঘুম নেই। শিউরে উঠছে শরীরটা থেকে থেকে।

যারা নিকটাত্মীয় ছিল তারা মুখ ফিরিয়েছে। ছিল এক দূর সম্পর্কের ঈশ্বর—সেও পুরুষের দলে। অন্ধকারে পুরুষ মানুষগুলোর মুখ একে একে ভেসে উঠছে মনের ক্যানভাসে। বুকের ভেতরে সাপক্রিমিশকুনের দংশন। মনের মধ্যে জিঘাংসার আগুন। তাবত ঘৃণা আর থু এই পুরুষজাতটার জন্য বুকের মধ্যে দলা বেঁধে আছে।

ইচ্ছে করছে ফুসলিয়ে একে একে বাসায় নিয়ে আসি।

তারপর ম্যাগাজিনসহ অস্ত্রটা বটি দিয়ে কেটে কুত্তার মুখে পুরে দেই।

সেটা সম্ভব নয়। কারণ মেয়েটার ওপাশে একটা পুরুষ জানোয়ার শুয়ে আছে।

একটু বাদে জানোয়ারটা ভাববে আমি ঘুমিয়ে গেছি।

তখন চুপচাপ উঠে চোরের মতো রান্না ঘরে যাবে।

ওখানে কাজের বুয়া শুয়ে আছে।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ