ফ্রক

Send
আহমেদ ফারুক মীর
প্রকাশিত : ১৬:২৩, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৫, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যপ্রতি বছর আমার অনেক বন্ধুরাই ঈদের পূর্বমুহূর্তে স্ট্রিট চিলড্রেনদের একটা-দুটো জামা দিয়ে থাকে। আমি কখনো এসব দানকার্যে পার্টিসিপেট করিনি। কিন্তু মনে মনে ইচ্ছে ছিল, তবে ঘটা করে এরকম আয়োজন আমার ভালো লাগেনি কখনো। একটা শিশুকে একটা একশ টাকার টিশার্ট বা শার্ট দিতে গিয়ে যারা তার সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক মিডিয়া বা গণমাধ্যমে বাহ্বা নিতে চায় তাদেরকে হিওপোক্রেট মনে হয়। গরিব শিশুটির মগজে গরিবানা আরও টেকশইভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। একটা জামা দেয়ার পরিবর্তে তার ব্যক্তিগত আত্মসম্মানটুকু কেড়ে নেয়া হয়।

যাই হোক, আমি অনেকদিন ধরে আমার এলাকার বিভিন্ন স্তরের শিশুদের সঙ্গে মিশি। ওদের মধ্যে নানান কোয়ালিটির শিশু আছে। নিতান্ত গরিব আছে তুলনামূলক কম। অনেককেই ঈদের দিনে পরার মতো একটা জামা তাদের বাবা কিনে দিতে পারতেন। কিন্তু জ্যোয়া আর আনহাকে এবার তার বাবা-মা কিছু দিতে পারছেন না। ওদের দুজনের সঙ্গেই আমার বেশ খাতির। ঈদের আগের দিন বিকেলে আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের কাল্পনিক ঈদ ঈদ খেলা দেখছিলাম। কল্পনায় ওদের ঈদ আয়োজন মেলা কিছু। কয়েক সেট জামাকাপড়, সেমাই, পায়েস, বাঁশি, ঝুমঝুমি আরও অনেক কিছু। বাস্তবের সাধটা হয়তো ওরা এভাবেই নিতে চায়।

আনহা বড়, তাই আনহা জ্যোয়াকে গিফট দিয়েছে একটা নোয়াহ গাড়ি। আমি আনহার কাছ থেকে গাড়িটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখলাম। মাটি দিয়ে বানিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়েছে গাড়িটা। দেখতে সুন্দর হয়েছে মাটির নোয়াহ গাড়ি। নোয়াহ মানে নূহের (ইসলামে যিনি নূহ নবি) নামে বানানো গাড়ি। কিন্তু গাড়ি আগুনে পোড়াতে গিয়ে আনহার হাত পুড়ে গিয়েছে। দগদগে একটা ঘা ওর আছে। তবু যেন ওদের কীসের আনন্দ। আগামীকাল ঈদ। ঈদের আনন্দই ওদেরকে উচ্ছল করে রেখেছে।

আমি আনহাকে ডাকলাম।
—কী রে হাত পুড়েছে গাড়ি বানাতে গিয়ে?
—হু।
—ওষুধ লাগিয়েছিস?
—না।
—ব্যথা করে না?
—করে, কিন্তু মায় কইছে ঈদের পরে ওষুধ আনব।
—ওষুধ কোথায় পাওয়া যায় জানিস?
—জানি, ওষুধ দোকানে পাওয়া যায়।
—আমার সঙ্গে যাবি?
—কই?
—ওষুধের দোকানে।
—হ।
—আয়, জামা গায় দিয়ে আয়।

আনহা জামা গায় দিয়ে আসতে গিয়েছে। জোয়্যাও আসতে লাগল আনহার পেছনে পেছনে (আমি এটাই চেয়েছিলাম, দুজনেই আসুক, তবে ওদের ইচ্ছায়) জোয়্যার গায়ে জামা নেই। ছোট মানুষ। জামা না গায় দিয়েই ওরা রাজ্য ঘুরে বেড়ায়। আমি জোয়্যাকে বললাম,

—কী রে, জামা নিবি না ঈদে?
—না।
—ক্যান?
—জামা সাবান দিয়া ধুইয়া দিছে মায়, কাইলকা ঈদ আইলে গায় দিমু।

কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে দোকানে পৌঁছালাম। ওষুধ পাওয়া গেল। ওষুধ লাগিয়ে দিয়ে আনহাকে জিজ্ঞেস করলাম,

—এইবার ঈদে নতুন জামা কিনবি না?
—না, আব্বায় কইছে পরে কিন্না দিব, এইবার ট্যাহা নাই।
—আমার সঙ্গে বাজারে যাবি?
—ক্যান?
—বাজারে জামা থাকলে জোয়্যাকে একটা কিনে দেব। খালি গায়ে ওরে ভালো লাগে না। সহসা জোয়্যার মুখ উজ্জ্বল। আনহা বলল,—তাইলে যাই।
—চল।

জ্যোয়া এবার আগে আগে। বাজার যেন বহুদূরে ঠেকছে ওর কাছে। পথ যেন ফুরায় না আর। তিড়িং বিড়িং করে দৌড়াচ্ছে আগে আগে। গাড়ি দেখলে ভয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তারপর আবার দৌড়। আমার ঠিক তাই মনে হলো। আনহার মুখ তেমন উজ্জ্বল নয়। ও চুপচাপ আছে। তবে জোয়্যার জামা কেনা হবে বলে ও আমার দিকে শিশুসুলভ কৃতজ্ঞতা ভরে তাকাচ্ছে। অবশেষে বাজারে পৌঁছেছি। জোয়্যার জন্য জামা কেনা হলো, জোয়্যা জামা পরে আছে এখন। ও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। আনহাও খুশি ছোট বোনের উচ্ছলতা দেখে।

আনহাকে বললাম,
—তুই কিছু কিনবি?
—কিনা দিবেন? (বলে আনহা একটা নীল ফ্রকের দিকে তাকাল)
—দেখি, পারি কিনা?
—কোনটা কিনবি বল? (উজ্জ্বল মুখে ও তখন নীল ফ্রকাটার দিকেই আবার তাকাল)
—ওইটা। (আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল)
—আচ্ছা।

ঈদের দিন। জোয়্যা আর আনহা আজ রাস্তায় খেলছে না। জোয়্যা নতুন জামা গায় দিয়ে আছে। যেন ফড়িংয়ের মতো লাফাচ্ছে মেয়েটা। আমাকে দেখেই আঙুল ধরে টেনে সেমাই খেতে নিয়ে গেল। আমি ঘরে গিয়ে দেখি আনহার নতুন জামা গায়ে নেই। আমি বললাম,

—কী রে, তোর জামা কই? গায় নেই যে?
আনহা লজ্জায় লাল হয়ে বলল,—সকালে গায় দিছিলাম। ছাতা লাগব দেইখা খুইলা ভাঁজ কইরা প্যাকেট কইরা ট্রাঙে রাখছি। আবার সামনের বছর ঈদের দিন গায় দিমু।
—দেখি, কোন ট্রাঙে রাখছস?

আনহা ওর মায়ের কাঠের বক্সটা খুলল, সব কাপড়চোপরের নিচে দুইটা পলিথিনের মধ্যে সুন্দর করে ফ্রকটা ভাঁজ করে রাখা। ছোটবেলায় মা তার বাবার বাড়ির গয়নাগুলো বক্সের এতটা নিচে রাখতেন। আমি ঘর থেকে বের হবার আগে আনহার মায়ের হাতে আরও পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে এলাম। আনহার এখন স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স। আনহা আর জোয়্যাকে আমার সন্তান বলেই মনে হচ্ছে।

আমি আরও ত্রিশ বছর পরের ভাবনায় চলে গিয়েছি ততক্ষণে। নিজের বৃদ্ধ হতে দেখি তখন। হার্টে অসুখের জন্য ভালো ডক্টর খুঁজছিলাম। অবশেষে যে ডক্টরের কাছে আমার ছেলে নিহার আমাকে নিয়ে গেল ওর নাম আনহা। গ্রাম কুতুবা। ভোলা দ্বীপের একা মুখোর গ্রাম। যার কাদাময় রাস্তাগুলো দিয়ে আনহা, জোয়্যা, আমি হেঁটে যেতাম। সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্তে আমরা সবাই আলাদা আলাদা সময়ে ঘরে ফিরতে দেখতাম সাদা সাদা বকদের। আমি নিজের পরিচয় গোপন করে রেখে হার্টের চিকিৎসা সেরে এসেছি। সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবছি, আনহার কৃতজ্ঞ মুখটা, ওর বক্সের নিচে রাখা আগামী ঈদের জন্য যত্নে রাখা জামাটা...।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ