সেল্ফ হোম কোয়ারেন্টাইন

Send
শরীফ সাইদুল আলম
প্রকাশিত : ১৭:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যআবিদ হাসান তার রুমের পাশের ব্যালকনিতে বসে চা খেতে খেতে রেডিও শুনছেন। প্রশস্থ ব্যালকনির কার্নিশে লাগানো আছে বেলি, জুঁই, গন্ধরাজ আর হাস্নাহেনা। মাথার উপরে শিকায় ঝুলছে বেশ কিছু অর্কিড। নিচতলা থেকে উঠে আসা একটি মাধবীলতা ব্যালকনি ঘেঁষে চলে গেছে উপরতলা পর্যন্ত।

সন্ধ্যার দিকে হাস্নাহেনার গন্ধ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। আবিদের স্ত্রী মহুয়া সকাল বিকাল গাছগুলোর যত্ন নেন। কদিন হলো মাধবীলতা গাছে বাঁধা বাসাটিতে টোনা আর টুনি এক জোড়া ডিম পেড়েছে। ছেলে অয়ন আর মেয়ে লুব্ধক রোজ দেখতে আসে কখন ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। ওরা চাইলে হাত বাড়িয়ে বাসাটি ধরতে পারে কিন্তু মা একবার বারণ করায় তা কখনোই করে না। জায়গাটিতে বসলে যে কারওই ভালো লাগবে। এক টুকরো সুখের স্পর্শ যেন এখানে। অবসর সময় সকলে মিলে জায়গাটিতে বসে গল্প করে।

৬ বছরের ছেলে অয়ন। আবিদের পাশে পাটিতে বসে খেলছে আর বাবাকে নানান প্রশ্নে জর্জরিত করছে। এটা কেন, ওটা কীভাবে, কেন হলো, কোকিল কেন বাসা বাঁধতে পারে না সব তার জানতে চাই-ই চাই। বাবাও কোনো বিরক্ত না হয়ে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন আর ফাঁকে ফাঁকে মেয়ে লুব্ধকের ড্রইং করা দেখছেন। লুব্ধক গাছের ফাঁকে লুকানো বাসা আর পাখিটিকে দেখে দেখে আঁকছে। ও এবার ক্লাস সিক্স পড়ে। ভীষণ লক্ষ্মী আর মিষ্টি এক মেয়ে। পড়াশুনায় যেমন ভালো পাশাপাশি ড্রইং আর আবৃত্তিতে সেরাদের একজন। মেয়েটি কখনো বাবা, মায়ের অবাধ্য হয় না। সংসারের টুকিটাকি কাজে মাকে বেশ সাহায্য করে। ঘর গুছিয়ে রাখা, ভাইটিকে গোসল করানো, খাওয়ানো, আর সময়মতো ওকে নিয়ে পড়তে বসা সব সে হাসিমুখে করে। দুই ভাইবোনের মধ্যে যেমনি মিল তেমনি খুনশুটিও লেগে থাকে খেলার মধ্যে।

বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে দ্রুত সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। এখন দুপুর ১টা বেজে ১৫ মিনিট। স্ত্রী রান্নাঘর থেকে রুমে এসে বসে। রেডিওটি ৬৩০ কিলোহার্টজে টিউন করে আবিদকে একবার ডাকল। বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বাংলাদেশ বেতারে তনিমা করিম আর ইমতিয়াজ মাশরাফির উপস্থাপনায় চলছে ‘বাজাও বিশ্ববীণা’। Jeniffer Lopez-এর First love গানটি বাজছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গান শোনানো হয় এই অনুষ্ঠানে। গানটি কেবলই শেষ হলো। ঘোষণা এলো বিরতির পর Elton john-এর গান শোনানো হবে। এই শিল্পীর গান আবিদ আর মহুয়ার খুব পছন্দ। মহুয়া প্রায়ই এখানে চিঠি লিখে পছন্দের গান শুনতে চায়। আবিদের কোনো সাড়া না পেয়েআবারও রুম থেকে স্ত্রী গলা বাড়িয়ে বলল ‘কইগো,ওদের সঙ্গে আর কত গল্প করবে। কিছু মুখে দিয়ে সপ্তাহের বাজারটা একবার করে এসো। এখন দুপুরবেলায় বাজারে লোকজনও কম আছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো না। তুমি বাজারের লিস্টটা নিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ো।

আবিদ একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। ছেলে অয়ন আর মেয়ে লুব্ধককে নিয়ে ছোট্ট সংসার।মোটামুটি একটা বেতনে কোনোরকম সংসারটা চলে যায়। বেতনের বাইরে উপরি রোজগার কিছু নেই। ৮ বছরের চাকরি জীবনে সঞ্চয়ও প্রায় শূন্যের কোঠায়।

কোভিড-১৯ মহামারির জন্য সরকারি আদেশে অফিস-আদালত, দোকানঘর সব বন্ধ হয়ে আছে। কবে নাগাদ তার অফিস খুলবে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। দেশের অনেক জায়গায় লকডাউন চলছে। তার পরিবারও এখন বাসায় বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। আবিদের অবশ্য প্রতি সপ্তাহে বাজার করতে বের হতে হয়। আজ স্ত্রী বাজারে যাওয়াতে বলায় মনটা খারাপ হয়ে ওঠে। স্ত্রীর কাছে সামান্য কিছু টাকা রাখা আছে। ওটুকু শেষ হয়ে গেলে কীভাবে চলবে, তা ভাবতে গেলে চোখে সর্ষেফুল দেখে। তবুও স্ত্রীর কথায় উঠে এল।

খেয়ালি আবিদ কাউকে কিছু বুঝতে দিল না। ড্রয়ার টেনে একটা প্যান্ট, ফুলস্লিভ শার্ট আর হ্যান্ডগ্লাভস বের করে পরে নিল। এবার দরজার পেছনে টানানো মুখের মাস্কটা বের করে পকেটে রাখে। এদিক ওদিক খুঁজে একটা শপিং ব্যাগ বের করে নিয়ে অদ্ভুত এক কাণ্ড করল আবিদ হাসান। ব্যাগটিকে তিনি মাথা থেকে গলা অব্দি ঢেকে নিয়ে কাঁচি দিয়ে চোখ বরাবর দুটো গোল ছিদ্র করলেন। তারপর গলায় আস্ত করে গিট্টু দিয়ে রান্নাঘর থেকে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। লুব্ধক মুখ চেপে হেসে তার মাকে ডেকে আনল। মা পেছন থেকে দেখে বলল,‘এ তুমি কী পরেছ আবিদ? এ কী অবস্থা তোমার! খোলো ওগুলো, খুলে ফেলো।’ আবিদ গম্ভীর গলায় বলল,‘পিপিই। আমার হাতে বানানো পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট।’ স্ত্রী তার মাথা থেকে ওটা টান মেরে খুলতে গেলেন কিন্তু পারলেন না। আবিদ মাথাটা ঘুরিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল। ছোট ছেলেটা তাদের চেঁচামেচি শুনে কী হয়েছে দেখতে এল।

আবিদকে এখন এলিয়েনের মতো লাগছে। দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকলেন তিনি। নামার পথে দ্বিতীয়তলায় দরজার কাছে ময়ূখ সাহেবের ৩ বছরের মেয়ে আর্দ্রার সঙ্গে দেখা হয়। বাচ্চাটি ওখানে বসে একাকী খেলছিল। আবিদকে ওই অবস্থায় দেখে ভূত ভূত বলে চিৎকার দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। মা-বাবা আর ফুপু দৌড়ে এল। ততক্ষণে আবিদ তার মাথা থেকে পিপিইটি এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলল। মা তাকে কোলে নিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? কোথায় ভূত দেখেছ?’আবিদ এরই মধ্যে তাদের দরজার কাছে এসে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘এই যে মামনি, আমি তোমার আঙ্কেল।’ আর্দ্রার বাবাকে বলল, ‘আপনার বাবুটি আমাকে দ্রুত নামতে দেখে ভয় পেয়েছে।’ মেয়েটির বাবা ওকে কোলে তুলে বলল, ‘ভয় পাবার কী আছে? সে তো তোমার লুব্ধক আপুর বাবা। কিছু ভাববেন না আবিদ সাহেব আমার মেয়েটি এমনিতে একটু ভীতু।’ আবিদ হাফ ছেঁড়ে বাঁচলেন। দ্রুত নামতে নামতে পকেটের মাস্কটি বের করে নাক আর মুখটা আটকে দিলেন।

আবিদ হনহনিয়ে ছুটে চলছে। বাইরে চলছে লকডাউন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কারও ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। আবিদ বের হলো তার প্রয়োজনে। ঘরের বাজার করতে হবে। অন্তত এক সপ্তাহের বাজার তো করতে হবে। গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। মাঝে আবার ছুটি বর্ধিত করা হলো।

আজ এপ্রিলের ১৪ তারিখ। অফিস বন্ধের কারণে মার্চের বেতন এখনও পাননি। এ কদিন ধরে বাজার করছেন খুব হিসাব করে। তারপরও হিসাব মেলাতে পারছেন না আয়-ব্যয়ের। এমাসের বেতনেরব কী হবে? পথ চলতে চলতে অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। কারওসঙ্গেই কথা বলল না। বাজারের কাছাকাছি এসে পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটি বের করল। গুনে দেখল, এক হাজার আটশত চল্লিশ টাকা। গতমাসে স্ত্রীর কাছে যে বাসা ভাড়ার টাকা রেখেছিল সেই ভাড়া না দিয়ে এখন খরচ করতে হচ্ছে। বাড়িওয়ালাকে বুঝিয়ে হয়তো আগামি মাসে ভাড়া দেয়া যাবে। অনেক বছর যাবত একই বাসায় থাকছেন। কখনো ভাড়া দিতে দেরি করেননি। তাই আবিদ বাড়িওয়ালার ওপর ভরসা পাচ্ছেন। মানিব্যাগের অল্প টাকা দেখে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কী হবে সামনের দিনগুলোতে। অনর্থকই টাকাটা আরেকবার দেখে মানিব্যাগে ভরে রেখে দেন।

রাস্তায় প্রচুর লোকজনের চলাফেরা। নিজেকে বাঁচিয়ে চলার কারও কোনো তোয়াক্কা নেই। আবিদ ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু পারছেন কোথায়? সকলেই যেন গায়ের ওপর এসে পড়ছে। পাশের ফ্ল্যাটের ব্যবসায়ী রমিজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে আচমকা দেখা হওয়ায় তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে আবিদ সাহেব How are you?’ আবিদ ইতস্তত করে বলল, ‘No handshake, please avoid 6 feet destance always.’ভদ্রলোকটি ‘of course, of course’বলতে বলতে চলে গেল।

আবিদ গুটিগুটি পায়ে ভয় নিয়ে মাছের বাজারে ঢুকলেন। লোকজন যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে একে অন্যের ওপর। কীসের লকডাউন চলছে আবিদ তা বুঝতে পারছে না। তরকারির বাজার, মুদির দোকানে, ফুটপাথ সর্বত্র লোকে গিজগিজ করছে। চ্যানেলগুলো দেখাচ্ছে প্রতিদিন বিশ্বে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে একলাখ পনেরো হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবুও কি মানুষ মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছে না, তাদের পরিবারকে আক্রান্ত করার ভয় কি নেই!

বাজারে ঢুকে শুনতে পেল আজ মাছ খুব সস্তা। আবিদ একটু দূরে ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে বড় রুই মাছটির দিকে আড়চোখে তাকাল; পরক্ষণেই ইলিশের দিকে তাকিয়ে মাছওয়ালাকে বলল, ‘ভাইজান ইলিশ কত?’লোকজনের হট্টগোলে তার সে শব্দ চাপা পড়ে থাকে। বার কয়েক বলার পরও যখন শুনল না তখন নিজেকে খুব সাবধানে কয়েকজনের পেছন থেকে মাথা উঁচু করে বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইজান ইলিশ...’ অমনি তার ওপর এক ভদ্রলোক সজোরে ধাক্কা খেল। আবিদ মাটিতে পড়ে যায়। তার ওপর পিছলে পড়ে একজন, পড়বিতো পড় আরও দুজন সঙ্গে নিয়ে এবার।

আবিদ হাসানের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। শেষে কোনোরকমে ঠেলে বের হয়ে এল। ভাগ্যিস কোনো কাদা-পানি ছিল না। আলগা বেশ কিছু ময়লা হাত দিয়ে ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল।

চিৎকার দিয়ে বলল, ‘চারদিকে ভাইরাসের মহামারি। দেশে প্রতিদিন লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে আর আপনারা কেন এরকম করছেন, কেন দূরত্ব বজায় রাখছেন না?’পাশ থেকে কয়েকজন তার কথায় হেসে উঠল। দূর থেকে আরেকজন বলল, ‘হালায় আইছে কোত্তোন, জ্ঞান দ্যায়, আমগো দ্যাশে কিচ্ছু অইব না। এত্তো ভয় যহোন বাসাত্তোন বাইরাও ক্যা।’ আবিদ সব শুনে দুহাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে বেরিয়ে আসে বাজার থেকে।

পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন মানিব্যাগ ঠিক আছে কিনা। হ্যাঁ, একদম ঠিক। তবুও টাকাটা গুনে আবার রেখে দিলেন যথাস্থানে। ভাবতে থাকলেন এত অল্প টাকা দিয়ে সামনের দিনগুলোকে কীভাবে পার করবেন। আবিদ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকলেন। ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় নিয়ে হেঁটে চলছেন। চলতি মাসে বেতন না হলে সে কীভাবে চলবে এই শহরে। ছোট্ট সুখী এক সংসার তার। বোনেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। মা আর বাবা ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রামে বেশ ভালো আছেন। কিন্তু একমাত্র তিনি নিজে বেশি ভালো নেই। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে খেয়েপড়ে কোনোরকমে চলে যায়। সঞ্চয় বলতে আর থাকে না। তবুও তৃপ্ত তিনি পরিবারটির জন্য।

আবিদ ভয় পাচ্ছেন এখন। অফিসটা না খুললে কী অবস্থা হবে। দেশের যে অবস্থা তাতে পুরো মাস জুড়েই লকডাউন চলতে পারে। ধনীদের টাকার অভাব নেই। গরিবেরাও হাত পাততে পারবে। কিন্তু তিনি তো মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তার কী হবে? পথে বসেই সিদ্ধান্ত নিলেন আগামি মাসে তিনি বাসা ছেড়ে ছোট পরিসরের এক টিনশেডের বাসায় উঠবেন। আবিদ আরও দ্রুত হাঁটতে থাকেন। নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে এসেছেন তিনি। হঠাৎ শুনতে পেলেন হট্টগোল। বুঝে উঠতে পারেন না আওয়াজটা কোন দিক থেকে আসছে। আরেকটু এগিয়ে মোড় পর্যন্ত গিয়ে দেখতে পেল বেশ কজন ত্রাণের চাল নিয়ে এদিকে আসছে। আবিদ দাঁড়িয়ে পড়ল।

মধ্যবিত্ত ঘরের আবিদ সিদ্ধান্ত নিল আজ সে ত্রাণ নেবে। তিনি দ্রুত চলে এলেন ত্রাণ কাজে ব্যবহৃত গাড়িটির কাছে। গাড়িটির পেছনে দীর্ঘ লাইন। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন পরিচিত কাউকে দেখা যায় কিনা। তাহলে যে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যাবে। আরও একটু অপেক্ষা করলেন। না, পরিচিত কাউকেই দেখলেন না। আবিদ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। কিছু একটা চিন্তা করে লাইনের শেষ ব্যক্তিটি থেকেও অনেকটা দূরত্ব নিয়ে ভয়ে ভয়ে দাঁড়াল। বাজারের ব্যাগটি লুকানোর চেষ্টা করলেন।

স্ত্রী আর ছেলেমেয়ের মুখচ্ছবি ভেষে উঠল চোখের সামনে। তারা যেন আবিদকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল, ‘ছিঃ আবিদ ছিঃ, তুমি এত নীচ! তুমি ত্রাণ নিতে এসেছ! তোমার কি কোনো যোগ্যতা নেই! অন্য কিছুই কী করতে পারো না তুমি! তোমারতো একটা সুন্দর দেশ আছে, একটা সুন্দর গ্রাম আছে। তুমি সেখানে গিয়ে কৃষিকাজ করতে পারো। নিজেকে সাজাতে পারো। তোমার কীসের ভয়?’

আবিদ স্পষ্ট দেখতে পেল সে জমিতে ফসল ফলাচ্ছে, হাঁস-মুরগি আর মাছের চাষ করছে। ছেলেমেয়েরা তাকে সাহায্য করছে, স্ত্রী থালায় করে জমিতে খাবার নিয়ে আসছে। আবিদের চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। হঠাৎ তার কাঁধে মৃদু স্পর্শ। মুখটি তার দিকে ফেরাতেই দেখল পরিচিত আক্কেল চাচাকে। তিনি বেআক্কেলের মতো বলল, ‘কী আবিদ ত্রাণ নিবা? আসো, আমার পেছনে দাঁড়াও।’ তার কথায় আবিদের শরীর রি-রি করে উঠল। শেষে ওখান থেকে বের হয়ে অন্য পথ ধরে এগিয়ে গেল। সে নিজের কাছে পরাজিত হতে রাজি নয়। চলে এল স্বপ্ন ডিপার্টমেন্টাল শপটিতে যেখান থেকে সে মাঝেমধ্যে বাজার করেন। শেষ অবধি মধ্যবিত্তের বাজার স্বপ্নতে ঢুকে বেশ পরিচ্ছন্ন পরিবেশে প্রায় পনেরো দিনের বাজার সেরে বাসায় ফিরলেন।

দরজায় নক করতেই স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘এত দেরি হলো কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?’আবিদ স্ত্রীকে শুধু জানালেন তার public transmition হয়ে গেছে। তার জন্য কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হোক অর্থাৎ তাকে যেন অন্তত চৌদ্দ দিনের জন্য এক রুম ছেড়ে দেয়া হয়। আবিদ নিজেকে বাঁচানোর জন্য, তার পরিবারকে বাঁচানোর জন্য এখন থেকে এই কটি দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবে। আবিদ জানেন তার পরিবারের সবাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে এবং সব ব্যাপারে সচেতন। ছেলেমেয়েদেরও ছোটবেলা থেকেই এভাবে দুজনে মিলে গড়ে তুলেছেন।

আবিদ খুব সতর্কতার সঙ্গে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে থাকলেন। এদিকে স্ত্রী বাচ্চাদের সব বুঝিয়ে বলে তাকে সাহায্য করার কথা বলে আবিদের থাকার সব ব্যবস্থা করলেন।

এভাবে যার যার অবস্থান থেকে সতর্ক থাকলে পুরো সমাজ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে।

আবিদ আর চাকরি নিয়ে ভাবছেন না। জানেন চাকরি না থাকলে গ্রামে তার বাবার যে জমি আছে তাই দিয়ে বাবা-মা, ভাইসহ সবাই খুব ভালো থাকতে পারবেন। ওখানের সুখের ছোঁয়াটা হবে আরও সুন্দর।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ