পেশার যাতনা

Send
মাহবুব নাহিদ
প্রকাশিত : ১৯:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যবাবা আর মা দুজনই ডাক্তার বলে কারও ভালোবাসাই ঠিকভাবে পায় না ছোট্ট ছেলে রাতুল। বাবামায়ের অনেক কষ্ট, বাচ্চাটার বয়স মাত্র দুই বছর। এই সময়ে ওকে কত ভালোবাসা দেয়া প্রয়োজন, কত জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, কত কিছু শেখানো প্রয়োজন। কিছুই করতে পারে না বাবা নাসিম আর মা ইভা। দুজনের মনেও আসলে সবসময়ই একটা অপ্রাপ্তির দীর্ঘনিঃশ্বাস লেগে থাকে। কিন্তু কিছু তো আর করার নেই। এমন কাজ তাদের বাইরে তো থাকতে হবেই। তার ওপর আবার মফস্বল শহরে বসবাস। তারা দুজন যে হাসপাতালে ডিউটি করেন সেই হাসপাতালে ডাক্তারের সংকট সবসময়ই লেগে থাকে। অনেক বলেও সেসব সমাধান হয় না। ওই কোনোরকম চালানোর জন্য চলে আরকি। অনেক সুযোগ-সুবিধাই নেই হাসপাতালে, ওসব নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন সবাই। এখন আর কেউ কথা বলে না। তবে নাসিম আর ইভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এভাবে আর চলে না। একটা বড়সড় ছুটি নিতেই হবে। ছেলেটা এভাবে ওর নানির সঙ্গে একা একা থাকে। ওকে দারুণ একটা সময় উপহার দিতে হবে। সময় উপহার দেয়ার জন্য দুজন একই সময় মিলিয়ে ছুটি নিতে হবে। তবে সেই ছুটির জন্য একরকমের যুদ্ধ করতে হয়েছে তাদের। যুদ্ধে অবশ্য বিজয় হয়েছে তাদের। নতুন করে একজন ডাক্তার জয়েন করায় কিছুটা শান্তি পেল তারা। নাহলে এই ছুটি পাওয়া একদম অসম্ভব হয়ে যেত। ছুটিও কম সময়ের না, একদম টানা বিশ দিনের। এই সময়ে তারা চাইলেই দেশের বাইরে বা দেশেই কোনো ট্যুরিস্ট এলাকায় যেতে পারতেন। কিন্তু সেই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেন তারা। ছেলেকে নিয়ে নানাবাড়ি আর দাদাবাড়ি বেড়াতে যাবেন। গ্রামগঞ্জ দেখার অনেক দরকার আছে, গ্রামীণ স্নিগ্ধ বাতাসে ঘুরতে হবে, ঘাসের মাঝে হাঁটতে হবে। যে জীবনটা রাতুল যাপন করছে তা থেকে বের করতে হলে তাঁকে এমন একটা আবহাওয়ায় কিছুদিন নিতেই হবে। একসঙ্গে বাবা-মায়ের সঙ্গেও থাকতে পারল, গ্রামের পরিবেশ দেখা হলো আর আত্মীয়দের চেনাও হলো।

তারা পরেরদিন বের হবার সিদ্ধান্ত নিল, রাতুলের নানাবাড়ি আর দাদাবাড়ি একই জায়গায় তাই তেমন ভ্রমণ নিয়েও ঝামেলা হবে না। একবার শুধু যাবে, আরেকবার আসবে। কিন্তু এই সুখ আর সইল না তাদের। দেশে করোনাভাইরাস আক্রমণ নেয়ার খবরে সকল ডাক্তারদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আর সকল পরিবহন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে, তাই তাদের আর যাওয়া হচ্ছে না। দুঃখের বিষয় হলো তাদের শহরেই করোনা রোগী ধরা পড়েছে। পরেরদিন থেকে করোনা ইউনিটে ডিউটি শুরু করল নাসিম আর ইভা। ছেলেটাকে আগে রাতের বেলা বুকে জড়িয়ে ঘুমাতে পারত তারা। এখন আর তাও পারে না। তাদের শরীরেও চলে আসতে পারে করোনাভাইরাস, সেই ভয়ে তারা ছেলের কাছেও আসে না। বাসায় না এসে তারা বাইরেই কোথাও একটা থাকা শুরু করল। ছেলেকে মাঝেমধ্যে দেখতে আসে তারা। ছেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে আর বাবা-মা বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অঝরে কাঁদে। রাতুল ছেলেটা হয়তো কাঁদে না, ও বুঝেই নিয়েছে যে কেঁদে আর কোনো লাভ নেই। এইটুকু বয়সেই জীবনের নির্মম পরিণতি বুঝে নিয়েছে সে। এখন না কাঁদলেও বাবা-মায়ের আসার সময়ের অপেক্ষা করে রাতুল। কিন্তু ইদানিং তার মা একাই আসে, বাবা সঙ্গে আসে না। সে মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে, বাবা কেন আসে না?

মা উত্তরে বলে, বাবা অনেক ব্যস্ত। আসার সুযোগ পাচ্ছে না।

আচমকা একদিন বাবাও আসে কিন্তু হেঁটে নয়, অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে। বাবাকে একটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো। নাসিম বিদায় নিয়েছে করোনাভাইরাসে। ছেলেকে তার আর আদর করা হলো না। ছেলে হয়তো বুঝতেই পারছে না যে বাবা আর আসবে না!

/জেড-এস/

লাইভ

টপ