মাছ ও মুখোশ

Send
প্রদীপ আচার্য
প্রকাশিত : ১৯:৩৩, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৩, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যদরজার ফাঁক দিয়ে সাগরের নোনা জল শবযাত্রার ভঙ্গি আর শব্দের হাহাকারে ভেতরে ঢুকে হাঁটু, কোমড়, ঘাড় ছাড়িয়ে সুমনের পুরো শরীর ডুবিয়ে দিতে থাকে। একোরিয়ামের চারপাশে মাছগুলো কী এক নিদারুণ অস্থিরতায় ভিজতে ভিজতে আঁশ, পাখনা, চামড়া, পুরো শরীর একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে সুমনের মুখের ওপর লেপটে থেকে তৈরি করে এক অচেনা মুখোশ। আর মাছের কঙ্কালগুলো ওড়ে জলের ওপর, হাওয়ায়। স্বপ্নে এতটুকু দেখে ঘুম ভাঙে সুমনের। মোবাইলে দেখে নেয় সময়টা। ভোর হতে চলল। স্বপ্নের ঘোর তখনো চোখে। আবছা অন্ধকারে দেখে অয়ন আর শিউলির নিশ্চিন্ত, ঘুমন্ত মুখ। একটু এপাশ ওপাশ করে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে সে। ঘোরটা কেটে স্বপ্নে দেখা গোল্ডফিস, টাইগার শার্ক, এনজেল ফিস আর অন্য মাছগুলো পষ্ট হয় ক্রমশ। মুখে ধীরে হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সুমন, একি তারই মুখ নাকি মাছের শরীরে আবৃত্ত কোনো মুখোশ পরা সে নিজে! ডানপাশে ফিরে ঘুমন্ত শিউলির বাহুতে হাত রেখে তাকে আলতো করে নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করে সুমন। শিউলি চোখ মেলে পলকেই। অয়নের দুই বছর চলছে। অয়ন আসার পর থেকে শিউলির গভির ঘুমটা হারিয়ে গেছে। সুমনের আহ্বানে সাড়া দেয় সেও। এসময় অয়ন সচরাচর জাগে না। আলতো স্পর্শ থেকে গভিরে গিয়েও সুমনকে অন্য রকম লাগে তার। কিছু হয়েছে তোমার? –উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শিউলির, নিচুস্বর। কিছু না, কথা বলো না, অয়ন জেগে যাবে। ফিসফিস কথাগুলো নিজেদের কানেই ঘোরের মতো শোনায়। মুহূর্তটাকে অচেনা লাগে। ভোরের দিকে আসলাম ভাইয়ের ফোনে ঘুম ভাঙে সুমনের। লক ডাউন শুরু হবার আগেই সুমন সপরিবারে চলে এসেছে গ্রামে। শহরের স্টেশন রোডে তার একটি দোকান আছে। একোরিয়াম পার্ক। একোরিয়াম বক্স, মাছ, মাছের খাবার, আ‌র্টি‌ফি‌সিয়াল পেন, এসব বিক্রি করে সে। আসলাম ভাই জানায়, তার কাছে মাছের খাবার যা আছে তা দিয়ে পুরো এপ্রিল মাস চলবে। এর মধ্যে কোনো দোকান না খুললে কী হবে বুঝতে পারছে না। আসলাম ভাইয়ের কথায় কেমন হতাশা আর অ‌নিশ্চয়তার সুর। সুরটা সুমনকে আনমনা করে দেয়। সকালের স্বপ্নটা মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে চক্রাকারে। অয়ন দাদির পাশে বসে সবজি কাটা দেখে, হাতে একটি আলু। শিউলি চা দেয়, সাথে টোস্ট বিস্কুট আর কয়েক মুঠো মুড়ি। অভ্যাসবশত চায়ে চুমুক দেয় সুমন, টোস্ট কামড়ায়, কেমন অস্থির লাগে। মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করে অকারণে। হঠাৎ মেসেজে চোখ যায়। রনির পাঠানো। মেসেজটা পড়ে অস্বস্তি ভর করে মনে। ফোন দেয়। রনি গত রাতে ফোনে তাকে চেষ্টা করে না পেয়ে মেসেজটা পাঠিয়েছে। সুমনের দোকানের কাছেই বাসা তার। সুমনের সাথে ভালো সম্পর্ক, বন্ধুত্বই প্রায়। রনি বলে, গতকাল সন্ধ্যায় এলাকার বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারটা নষ্ট হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের লোক এসে নতুন ট্রান্সমিটার এখনো লাগাতে পারেনি। সারারাত এলাকা অন্ধকার। রনি জিজ্ঞেস করে, সুমন ভাই, আপনি দোকান বন্ধ করে যাবার সময় তো অনেকগুলো মাছ আপনার একোরিয়ামে ছিল! ওগুলো বেঁচে থাকবে তো? উত্তর দেয়ার আগেই রনির ফোনটা বন্ধ হওয়ার শব্দ পায় সুমন। সম্ভবত রনির মোবাইলের চার্জ শেষ। অস্থিরভাবে রনির প্রশ্নের উত্তর খোঁজে সে। অস্বস্তি বাড়তে থাকে আরো। দুপুরে কোনোরকমে খেয়ে ওঠে। মাছের বাটির দিকে না তাকানোর চেষ্টা করে দ্রুত খাওয়া শেষ করে। মোবাইলে নিউজ দেখে নেয় এক পলকে। বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা গতকাল সর্বোচ্চ। কী এক বিভ্রান্তিময় শূন্যতা পেয়ে বসে তাকে। হাঁসফাঁস লাগে খুব। গ্রামে বন্ধুরা থাকলেও সুমন তাদের জানিয়ে দিয়েছে একদম নক না করতে। কেউ নক করে না এখন আর। অয়নকে নিয়ে বিছানায় যায় সে। বালিশে মাথা রেখে জানালার বাইরে চেয়ে আনমনা কী একটা ভাবে। অয়নের হাতে দাদুর পুরোনো লাঠি। বিছানা আর সুমনের শরীরের উপর লাঠিটা বুলাতে থাকে সে, এখন এটাই তার খেলা। বাইরে গাছের পাতায় পড়া সূর্য কিরণ আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে আসে। তন্দ্রাঘোরে গতরাতের স্বপ্নটা সুমন আধো আধো দেখতে পায় আবার। শিউলি আর অয়ন নিশ্চিতে ঘুমোয় পাশে, একই বিছানায়, মুখোশটা ক্রমশ রূপ নেয় অনুতাপে আর একোরিয়ামের মাছগুলোর কঙ্কাল উড়তে থাকে জলের ওপর, হাওয়ায়। সুমন স্বপ্নের ঘোরে বিড়বিড় করে, বিলীন হতে হতে হৃদয়কে শেষ প্রশ্ন করার সুযোগ পাব তো?

/জেড-এস/

লাইভ

টপ