প্রসঙ্গ ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’

Send
লিপি নাসরিন
প্রকাশিত : ১১:১৮, জুন ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৭, জুন ১৬, ২০২০

আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন প্রিয় মানুষ ড. আবেদীন কাদেরের `বড় বেদনার মতো বেজেছ' প্রবন্ধের বইটা সময় পেলেই টান দিয়ে কোলের উপর নিয়ে বসি। কয়েকটা প্রবন্ধ পড়া হয়েছে। আমি আসলে স্লো রিডার। পড়তে গিয়ে বারবার থামি, ভাবি কিংবা বুঝতে চেষ্টা করি লেখকের হৃদয়ের ক্ষরিত অনুভূতিগুলো বা কখনো কল্পনায় আঁকি লেখকের প্রমগ্ন অবয়ব—সেখান থেকে ধ্বনি আর শব্দের সমন্বয় সুতোয় গেঁথে তুলে আনি দীপ্যমান এক উজ্জ্বল সম্ভার আর মণিমাণিক্য খচিত সে রত্বসম্ভারের আভায় চমৎকৃত হই ক্ষণে ক্ষণে । তাঁর “কবিতার সংগীত কবিতার চিত্রকলা” প্রবন্ধটি পড়ছিলাম একরাতে, পড়তে পড়তে আমার নিদমাখা নয়নে ভেসে উঠছিল “প্রমগ্ন কবিতাবলি”-র অসাধারণ মুগ্ধময়তায় ভরা কিছু পঙক্তিমালা।

কবি, অনুবাদক গৌরাঙ্গ মোহান্তের নির্বাচিত কিছু কবিতা এবং অগ্রন্থিত কয়েকটি কবিতা নিয়ে কাব্য সংকলন এটি। শ্রেষ্ঠ শব্দটিতে কবির প্রবল আপত্তি বিধায় তিনি নির্বাচিত কবিতাবলির ‘প্রমগ্ন’ শব্দটিকেই বেছে নিয়েছেন শিরোনামে। অধিকাংশ কবিতা গদ্যের ফর্মে নির্মিত। অসাধারণ শব্দ আর বাক্যের গাঁথুনিতে কবি নির্মাণ করেছেন এক স্থাপত্যশিল্প যার প্রতিটি খাঁজে অলঙ্করণের সুদৃশ্য ঝালরবাতি থেকে ঠিকরে পড়ে সুবর্ণ রেখা।

নেরুদা যেমন বলেছিলেন, “সবাই একভাবে লিখবেন না, এক ধরনের কবি আছেন যাঁরা দরজা খুলে, জানলা খুলে কবিতা লেখেন, তাঁরা দেখেন একটা ডালে একটা পাখি বসে আছে, তাঁরা দেখেন আকাশে মেঘ কিন্তু আরেক ধরনের কবি আছেন যাঁরা দরজা জানলা বন্ধ করে একটি ল্যাম্প জ্বেলে টেবিলে বসে কবিতা লেখেন।” কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা পড়ে আমার নির্ণয় তিনি প্রথমোক্ত দলের। মধুরিমা বর্ষিত সুডৌল তরঙ্গের এক অভিঘাত “প্রমগ্ন কবিতাবলি”। কবির জন্য শব্দ শুধু সাধারণ শব্দ নয়, word object যেমন বলেছিলেন পল ভ্যালেরি। শব্দ একটা বস্তু—তার বহু রপ আছে। চিত্র, ধ্বনি সব মিলিয়ে কবির শব্দ; সেই শব্দের গাঁথুনি দিয়ে কবি চিত্রিত করেছেন একটি টানা আলোর রেখা যা সুদূরে মিলিয়ে যেতে যেতে চারপাশ স্বচ্ছ করে তোলে আভায়; শীতার্ত অন্ধকারকে নিয়ে যায় তাপিত দিনে।

তাঁর “মাঠবাড়ির ধুলো নারকেলপাতায় চুমু খেয়ে আমার বুকের ভেতর শুয়ে থাকে”(নৈঃশব্দ্যের শূন্যতা), “দীপ্ত সুতো থেকে ঝরে পড়ছে তরল গান্ধার” (মেঘের মেটামরফসিস)” বায়ুচঞ্চল মসলিন ঢেকে রাখো বাসমতী সৌরভ” (তীরধ্বস তাড়িত জল, নির্মলতা) কিংবা “নিঃসঙ্গ বৃক্ষের শিকড়ে নেই পুনর্ভবি শিহরণ”(বৃক্ষ বিভাস ও প্রলয়স্বপ্ন) লাইনগুলি পড়তে পড়তে যে কোন পাঠকই শ্রান্ত শরীর জিরিয়ে নেবার মতো থেমে যাবে।. প্রকৃতির নির্মল ব্যঞ্জনা থেকে চলতে চলতে কবি ছুটে যান অর্ফিয়াসের বাঁশির সুরমূর্ছনায়, বাতাসে শুশ্রূষা বুলিয়ে নেন তাঁর অবিন্যস্ত চুলে। কখনো শ্রাবণমেঘের ধূপছায়া ফটোগ্রাফ আঁকেন প্রস্রবণ রেখায় অসাধারণ এক kaleidoscopic বিমূর্ত বিভাসে। অভিজাত বৈচিত্রময় শব্দাধিক্য কখনো কখনো পাঠকের মনে জাগিয়ে তুলতে পারে দুর্বোধ্যতার ক্লান্তি; কিন্তু কবির সৃষ্টি সাধনার সার্থকতা হয়তো সেখানেই। সুধীন্দ্রনাথের মত, “যে দুরূহতার জন্ম পাঠকের আলস্যে তার জন্য কবিকে দোষারোপ করা অন্যায়।কাব্য যদি জীবনের মুকুর হয় তবে এই জটিল যুগে প্রতিবিম্ব তাকে আরও জটিল করে তুলবে এতে আশ্চর্য কী?”

শঙ্খ ঘোষের কথায় সত্য বলা ছাড়া আর কোন কাজ নেই কবিতার, তাহলে কবিতা হচ্ছে সত্য আর কল্পনার মিশেলে এক জলরঙে ছড়িয়ে দেওয়া বিরাণভূমের আল্পনা তাই কবি আশ্রয় খোঁজে উপমা, অলঙ্করণ বা সমাসোক্তিতে ভরা এক বিশাল রূপকল্পের পটভূমিতে – যা কবিকে আকর্ষণ করে অনুভূতির ব্যাপ্তি প্রকাশে। তেমনি কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত তাঁর কবিতাকে সত্যাশ্রয়ী বোধ থেকে টেনে বের করে এঁকে দিয়ছেন যৌবন ঘামে ভেজা এক নিমগ্ন পঙক্তিমালায়।

“ছায়া শরীর বিমূঢ় চেতনাকে কখনো করে না বিনির্মুক্ত”(আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়া শরীর) ,”আমি বৃক্ষের নিচে মুদ্রিত চোখের গভীরে ধারণ করি শুদ্ধতম সাগরস্বপ্ন “(বৃক্ষ ও সাগর স্বপ্ন), “শারদ বৃষ্টির শব্দের মধ্যে ডুবে থাকি”(অভিবাসী জল) কিংবা ” যে দৃশ্য আমি দেখি, কেউ চাক্ষুষ করে না, তা নিয়ে মুখর হওয়া যায় না”( জলকথা) এরকম অসংখ্য লাইন তাঁর কবিতায় প্রসারিত হয়ে আছে কখনো বিমূর্ত ব্যঞ্জনায় কখনো বা আশা-নিরাশার দোলায়। তাঁর কবিতায় নৈঃশেব্দ্যের বাদামি ফুল থেকে শব্দের খোয়াব শিশির মূর্ত হয়ে ওঠে সুতীক্ষ্ণ ছেনির নিপুণ কারুকাজে। দূর অরণ্যে মাদল হাওয়ায় তাঁর কবিতার শব্দরা খোলস ছেড়ে এক অলৌকিক আনন্দে হারিয়ে যায় সবুজ ঘুঘুর নরম পালকে।

অসাধারণ বাঙ্ময়তায় কবি এঁকেছেন মায়াবী পোট্রেট যা একজন বোদ্ধা পাঠককে করে আনন্দিত। এই কবির কবিতায় চোখ রাখলেই পড়া হয়ে যায় না, চোখকে পাততে হয় পরতে পরতে না হলে সে শব্দের মায়াজাল অনুরণন তুলবে না নিউরনে। এজন্য সাধারণ পাঠক হয়তো কিছুটা ভ্রু কুঁচকে বন্ধ করে দিতে চাইবে কপাট, কারণ কবিতার সীমিত পাঠক এবং বোঝার আলস্য যেমন দায়ী তেমন “কবিতার শব্দ সাধারণ হয়েও অসাধারণ আবার অসাধারণ হয়েও সাধারণ”- মালার্মের এই বিশুদ্ধ উচ্চারণও সেটিকে করেছে রহস্যময়।

একটি কবিতার মহত্ত্ব সেখানে যখন তা জীবনের গভীর তলকে ছুঁয়ে যেতে পারে, কবির ‘ ঢিবি’, ‘আগুনের পলাশমুদ্রা ও স্বদেশ’ ও ‘নৃশংস অন্ধকার’ জীবনের সেই তলকে ছোঁয়ার অবিনাশী প্রচেষ্টায় এক অনিশ্চিত যাত্রার কারণ খোঁজার গভীরতায় ধাবমান যেন।’আগুনের পলাশমুদ্রা ও স্বদেশ’ কবিতা যেমন উন্মোচন করে আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই অনিশ্চিত দিনগুলোতে বাস্তুচ্যুত মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার এক করুণ চিত্র তেমনি ‘নৃশংস অন্ধকার’-এ সম্ভ্রম হারানো এক গৃহবধূর করুণ পরিণতির মাঝে বিধ্বস্ত বাংলার প্রতীকায়ন।

বাবা ফিরে এলে তাঁর পায়ের কাছে পাকড়ার হাউ-হাউ করে কান্না যেন কোটি শরণার্থীর বুকের আর্তনাদের মুগুর পেটানো শব্দে বিদীর্ণ। কবি যখন বলেন “স্বদেশে পোষা কুকুরের হৃদয়ের মহত্ত্ব দিয়ে আমাদের আর কেউ স্বাগত জানায়নি ” তখন এক অনিরুদ্ধ বেদনায় লীন হতে হয় পাঠককে।

অসংখ্য প্রতিশব্দের অনায়াস ব্যবহার করেছেন কবি তাঁর কবিতার বাক্যবন্ধে যা কবিতাকে দিয়েছে এক অত্যুজ্জ্বল দীপ্তি; তখন শব্দ আর শুধু শব্দ থাকে না তা থেকে ঝরে পড়ে এক অনির্বচনীয় সংগীত। প্রতিশব্দের দক্ষ ব্যবহার ভাবের ধারণাকে জটিল তো করেই নি বরং মনে হয়েছে এটা ব্যবহার না করলে হয়তো ভাবনাটাই হয়ে যেতো ভোঁতা। দৈনন্দিন মামুলি ব্যবহারের অনেক শব্দ তিনি যেমন সযত্নে পরিহার করেছেন তেমনি মায়ের কাছে কথা বলার মতো কিছু সাদামাটা শব্দের ব্যবহারও দেখা যায় কিছু বাক্যে। “মার নামাঙ্কিত সুবর্ণ-লকেট সেকরার হাতে তুলে দিয়ে নির্জনতাকে করেছি লোনাক্ত” (ঢিবি)—এই অসামান্য অভিঘাত সৃষ্টিকারি সত্যাশ্রয়ী বাক্যটিতে মিশে আছে কতো ঘটনাবহুল জীবনের আখ্যান; কবিতা তাই জীবন্ত। উপমা, অলঙ্করণ আর বিশেষণে একটা শুধুমাত্র বস্তুরূপ নয়। এই বইয়ের অনেক কবিতা পড়লে যে কারোর তাই মনে হবে। ভাষার প্রতি নিবিড় মনোনিবেশ আর যত্নের ফলশ্রুতিতে প্রতিটা কবিতা হয়ে উঠেছে এক সংবেদনশীল মনের ঝরে পড়া গল্প। বেদনাতাড়িত কবির হৃদয় শরণ খোঁজে আরেক মহাকবির গানে কিন্তু সে আশ্রয় তাকে স্থিতি দেয় না বরং খোয়াইজলে তার ঘর, পৃথিবী পদ্মপাপড়ির মতো ভেসে যেতে থাকে। “ব্লেড ও নির্মোক” কবিতাটিতে ‘মাতরিশ্বা’ও ‘নির্মোক’ শব্দ দু’টির কথা বলতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসুর উদহারণ টেনে বলতে হয়- “মেঘের বদলে জলধ বা অম্বুবাহ লিখলে, তাঁর মতে কবিতার বেগটাকে শ্লথ করে দেওয়া হয়, কেননা, মেঘের যে সজলতা তার রচনার মধ্যেই মূর্ত হবার কথা, ঐ শব্দ সেটাকে আগেই ফাঁস করে দিচ্ছে।” এখানেও যদি ‘মাতরিশ্বা’ ও ‘নির্মোক’ শব্দের পরিবর্তে বাতাস ও খোলস/চামড়া ব্যবহার করা হতো তাহলে সেই একইভাবে ফাঁসকরা অর্থ পাঠককে টানতো না অর্থাৎ শব্দ নিজেই নিজের বিষয় জানিয়ে দেবে কবি তা চাননি বরং শব্দকে উপায় ধরেছেন। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘সংস্কৃত কবিতা ও আধুনিক যুগ’ প্রবন্ধে শব্দ ও তার প্রতিরূপ নিয়ে বিস্তর আলোচনা সেরেছেন। তাঁর মতে “আধুনিক কবিতায় সব শব্দের মূল্য সমান নয়, মাঝে মাঝে কোন কোনটি চাবির মতো কাজ করে, রহস্যের দরজা তাতে খুলে যায় , হঠাৎ তার আঘাতে চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠে, চঞ্চলতা ছড়িয়ে পড়ে সারা কবিতায়।” – ঠিক তেমনি এ কবির “এবার শূন্যতা কুন্ডলিত হলে তুমি আমার ক্ষয়িষ্ণু ত্বক আর পেশির ভেতর দেখবে যতিহীন শব্দের প্রসারতা” কিংবা ”আমার চোখে পাতার ত্রিমাত্রিক নৃত্য দেখে বলেছিলে কিছু কম্পন শাশ্বত হয়ে ওঠে” (কম্পন)- এখানে যতিহীন শব্দ, কুন্ডলিত শূন্যতা, পাতার ত্রিমাত্রিক নৃত্য বাক্যের চরিত্রলক্ষণ যা নিবিড়তায় আমাদের চোখেও সেই ত্রিমাত্রিক নৃত্যের মাতম তোলে। কবি যখন বলেন -” হিমচাঁপাকোমল উজ্জ্বলতায় জেগে থাকবে আমার জল-মৃত্তিকা- বাতাসহীন ব্যক্তিগত পথ।”( জলঘুড়ি ) – তখন আমরা প্রদক্ষিণ করি তাঁর অন্তরের বেদনার্ত ফ্যাকাশে উপবৃত্ত যা প্রাণসত্তাবিহীন হয়েই চিরোজ্জ্বল কবির মানসপটে।

কবিতা এবং দর্শনের সম্পর্ক কিছুটা বিতর্কিত, কেউ কেউ কবিতা থেকে দর্শন একেবারে বিদায় করে দিতে চান ; এ দলে সেই প্রাচীন গ্রিক সময় থেকে আধুনিক কালের সমালোচক পর্যন্ত। তবে কবিরা নীরব থেকেছেন বোধহয় সবসময়; কোনটা ভুল কোনটা সঠিক কিংবা ন্যায়-অন্যায়ের ধারণাই বা কীভাবে আসলো সেটি কি আসলে সমাজ বা সংস্কৃতি দিয়ে নির্ধারিত -সেসব উত্তর যেমন কোন কোন দার্শনিক দিয়ে গেছেন তেমনি তা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি- তারপরও দার্শনিকরা কংক্রিট কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। আসলে মানব অস্তিত্বের জন্য কোনটা বেশি জরুরি জ্ঞানতত্ত্ব (জানা) নাকি বস্তুগত অধিবিদ্যা (অবস্থান)? আমরা কীভাবে জানবো দৃশ্যমান জগতের বাইরেও আরেকটি জগত আছে(যদি আমরা জানি)- ইত্যাদি নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলে দার্শনিক মন, দর্শন তাই আপেক্ষিক। Philosophy সংজ্ঞার মধ্যে আছে প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসা তাই মানুষ তার প্রজ্ঞা দিয়ে সেসবের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে। প্লেটোর কথায় “Poetry is a kind of rhetoric” এ কথাও Republic এ এসেছে “There is an old quarrel between philosophy and poetry.” গ্রিক সমাজে কবিতার প্রতি ছিল অন্ধ ভক্তি, তারা কবিতাকে ঈশ্বরের বাণী মনে করতো, কবিতা তাই হয়ে উঠেছিল ঐশ্বরিক। সক্রেটিসের কথায় “তখন আমি বুঝতে পারলাম কবিগণ জ্ঞান দ্বারা কবিতা লেখেন না, বরং এক ধরনের সৃজনী ক্ষমতা ও অনুপ্রেরণা দ্বারাই কবিতা লেখেন।” কবিরা চালিত হন আবেগ দিয়ে আর দার্শনিকরা যুক্তি দিয়ে তাহলে কি একজন কবি কবি-ই আর দার্শনিক দার্শনিক-ই? হয়তো তাই কিন্তু কবি যখন জগত আর জীবনের নিগূঢ় সত্যকে তার কবিতার উপজীব্য হিসাবে গ্রহণ করেন, তখন তা আর নিছক কবিতা থাকে না হয়ে ওঠে এক আলঙ্কারিক দর্শন। ড.হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন,”রবীন্দ্রনাথের ভালো কবিতাগুলো এতো ভালো যে সেখানে দর্শনের প্রয়োজন পড়ে না, তাঁর খারাপ কবিতাগুলোতে পাই তথাকথিত দর্শন।” তবে একথা ঠিক কবিতায় দর্শনের চেয়ে সৌন্দর্যই বেশি। কবিকে সব থেকে নাড়া দেয় প্রেম আর দার্শনিককে জীব ও জগতের মৌলিক চরিত্র; তাই যদি হবে তবে প্রেম তো জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ- মানব প্রেম থেকে প্রকৃতি প্রেম, সে হিসাবে কবিতা এক দর্শনই। প্রেম জীবনের এক মৌলিক চরিত্র যা মানুষকে ধাবিত করে বৃহত্তর কোন মহত্ত্বের দিকে সেদিক থেকে বিচার করলে আধুনিক কবিতা হয়তো আরো বেশি দর্শনপ্রিয় পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা আর মনোদ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে। এত কথার অবতারণা এজন্য যে “প্রমগ্ন কবিতাবলি” কাব্যসংকলনের অধিকাংশ কবিতায় কবি ধরেছেন সেই জানা পৃথিবীর বাইরের এক অজানা পৃথিবীকে—দার্শনিকগণ যা খুঁজে ফেরে প্রজ্ঞা দিয়ে, কবিরা তা জয় করেন কল্পনা দিয়ে (আছে কী নেই কবি বা দার্শনিক কেউ তা জানে না)। কবি যখন উচ্চারণ করেন, ফিরে যাও বাতাস, ফিরে যাও প্রশ্বাস/ নিষ্ফল বৃক্ষ যদি ছুঁড়ে ফেলে নিশ্বাস / কী ক্ষতি বাতাসের, বাতাস স্রষ্টার (ফিরে যাও) কিংবা ” শব্দের ভিতর দিয়ে নৈঃশেব্দ্যের শূন্যতায় হাঁটি … আমি হেঁটে ভ্রমণের সূত্র শিখে ফেলি; হেঁটে বাড়ির দূর-বাসনায় ফিরে আসি।” (নৈঃশব্দ্যের শূন্যতা) – তখন ফুটে ওঠে এক অবধারিত দর্শন যা কবিকে নিরন্তর মগ্ন রাখে চেতন থেকে অবচেতনে। ফরাসি চিন্তা-চেতনায় সার্ত্রে থেকে বোদলেয়ার কবিতায় নিমগ্ন হওয়া দার্শনিকের একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল সেটি যে মাত্রায় হোক না কেন, যেন প্রেমকেই দর্শনায়িত (Philosophicalized) করা হতো। দর্শন এবং কবিতা তাই প্রতিপক্ষ নয় বরং নিজ নিজ সৌকর্যে ভাস্বর। ‘হাওয়া পথ’ কবিতায় কবি লিখেছেন ,”হাওয়া পথে নদীর ঢেউ বসানো থাকে।…/আমি কেবল উন্মাদ হয়ে উঠছি/…মাধব ঝরনায় ভিজে হেঁটে হেঁটে অপেরা গৃহে ঢুকছি/…আমার কোন সুখ নেই-আমি মৃতের অভিনয় জানিনা।” মৃত তারাই জীবনের প্রতিবেশ যাদের নিয়ামক হয়ে ওঠে না। দর্শন যদি শুষ্ক তত্ত্ব হয় তবে কবিতা তার বুকে এক মহাবৃক্ষের অবিরাম প্রস্বেদন; তাই মৃতের অভিনয় না জেনেও কবি সুখী হতে পারেন না হয়তো অনন্ত এক জিজ্ঞাসায় তাড়িত হয়ে। “অন্ধকার আছে বলে কিছু দার্শনিক দারুচিনি পাতায় জীবাণুমানবের গতিচক্র আঁকে/আমিও এক খণ্ড অন্ধকারের পাশে লেকসজল অরণ্যভূমি গড়ে তুলি…” -এরকম অসংখ্য পঙক্তিমালায় ফুটে উঠেছে তাঁর প্রাতিস্বিক নিমগ্নতা। ‘রাত ও সবুজ দৃষ্টির উড়াল’ কবিতায় কোথা হতে যেন উড়ে আসে এক দর্শন বাণী -“সূর্য অস্তমিত হলে অন্ধকারের প্রতীক্ষা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়/রাতের অর্থ কি শুধুই অন্ধকার?/…কোন এক সন্ধ্যা হবে আমার শেষ আশ্রয়!/…তমসা-নিমগ্ন বৃক্ষের দিকে চেয়ে গভীর অন্ধকারের স্বরূপ উপলব্ধি করি; এ অন্ধকারে আলোর অধিকার নেই।” কবির হৃদয় বিষণ্ণ হয়ে ওঠে অন্ধকারে আলোর উৎসারণে, তাই তো বৃক্ষের মাঝে সে অন্ধকারের স্বরূপ খুঁজতে গিয়ে কবি পৌঁছে যায় জীবনের শেষ সিদ্ধান্তে। কোন এক জলঝরা সন্ধ্যায় হয়তো কোন অ-কবি সন্ধ্যার কাছে মিনতি করেও তার মনপোড়ার কোন ভাষারূপ পাবে না তখন আশ্রয় হবে কবির এই চিত্রকল্পের যা উচ্চারণে পাঠকের ভেজাসন্ধ্যার স্বরূপ ঝরে পড়বে একটা শুধু দীর্ঘশ্বাস বা ঝাপসা চোখের অস্পষ্ট চাহনিতে। এরকম অসংখ্য জীবনঘেঁষা লাইন আছে তাঁর কবিতায় যা Intensive পাঠককে থামিয়ে দেবে। “অদৃশ্য সময় নিয়ে আমার শুধু মৃত্যুময় বেঁচে থাকা” (পারমিতার প্রত্যুক্তি)—এক মর্মর মুখরিত কল্লোলধ্বনি থেমে গিয়ে বিরানশ্বাসে কেঁপে ওঠে বুকের অতলভূমি।

“কোথাও আমার লেগেছে আগুন কিছু যায় পুড়ে।/গহন-গামী জল খুঁজি সজল ধরণি জুড়ে।” (জলময়ূরের পালক)- এক অবিস্মরণীয় কল্পচিত্র এঁকেছেন কবি যা মানব মনের চিরন্তন ঘুমিয়ে থাকা অনুভূতিকে জাগিয়ে দিয়ে যেন ফিরে যায় দিগন্তের মিলনমেলায় কিন্তু তার আবেদন বুকের মাঝে মুহ্যমান এক বিরলপ্রজতায়। উদ্বেল, বিহ্বল হৃদয় বলে ওঠে এতো আমারই বেদনার জলতরঙ্গ।

“আমার নিস্তরঙ্গ ঘরে দিগন্তের অবভাস/ধূসরিত সবুজ বনে বসন্তের উপহাস।” -আধুনিক কবিতাকে অবসরের সুখপাঠ্য বলে ধারণা করা এখন অনেকটাই অসঙ্গত কারণ জীবনের বাস্তব করাঘাতে তা এখন আলস্যে অনাব্যশক সৃজন নয়, হয়ে উঠেছে জীবন ও বাস্তবতার এক গতিশীল চালচিত্র। তা সত্ত্বেও কোন কোন কবিতা সাত্ত্বিক প্রেমের নির্মলতাকে ধারণ করে ক্ষয়িষ্ণু সময়ে জীবনের অনেক নৈরাশ্যের মাঝেও অনুপম সুখের ক্ষণিক আশ্রয়ণ।

“কার্ল প্লেস পার্ক” কবিতায় তাই কবি প্রেমকে টেনে নিয়ে এক অলৌকিক গন্ধে কর্তিত ঘাসের শরীরে শুনতে পায় প্রার্থিত ফলের দীপ্তি মাখা নবজেন্মর উপাখ্যান। এই বইয়ের “জলময়ূরের পালক ” কবিতাটি চল্লিশটি দ্বি-পদের সমাহারে রস আর অন্ত্যমিলে ছড়িয়ে রেখেছে এক অনিন্দ্য সৌন্দর্য। ভালো লাগা ছড়িয়ে যাবে পাঠকের নিভৃত কোণে। এই কবিতাটি পড়লে ওয়ার্ডসওয়ার্থের সেই কথাটি হৃদয়পটে চমকিত হয় : “Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings.” এই কবিতাটি রক্তকে যেন কালিতে পরিণত করে লিখিত হয়েছে। আনন্দ-যন্ত্রণা, সত্যাশ্রয়িতা, অন্তঃক্ষরণ,আশা-নিরাশা, আর ব্যাকুল প্রতীক্ষার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে যে উপমা ও রূপকে ধরেছেন তা যেন সত্যি Mirror of life এ পরিণত হয়েছে। কবির নিষ্ঠ উচ্চারণ, ” যে আমার নিশ্বাস- সত্য ও আপাতঅদৃশ্য,/যে মুহূর্তে মৃত আমি,তার কাছে অস্পৃশ্য।”প্রমগ্ন কবিতাবলির কয়েকটি কবিতার পরিসর দীর্ঘ , পড়তে গেলে মনে হয় কোন জীবনোপম গল্পে ঢুকে পড়েছি। কবিতায় শব্দের সার্থক প্রয়োগে কালো অক্ষরের প্রতিভাস থেকে সপ্তবর্ণের রশ্মি প্রক্ষেপিত, শব্দালঙ্কর ও অর্থালঙ্কর দুইই যেখানে প্রতিভাত। কবিতা পড়তে পড়তে পাঠক হাঁটতে থাকবে শিউলি ঝরা এক উঠোনতলায় কলাপাতার সবুজ স্নেহে। আর লুটেরার থাবায় একখণ্ড ন্যাকড়াও যখন হয়ে যায় দৃশ্যাতীত তখন সে কবিতা হয়ে ওঠে জন্মভিটেয় এক দুঃসহ সময়ের পরিপ্রেক্ষিত।কবি তাই আকাশচারিতা ও উচ্ছ্বল প্রেমের মদিরতায় না ভেসে থিতু হয় ধূলির পৃথিবীতে । “জীবন তাহলে অর্থহীন দীর্ঘবাক্য?কখনো ভাবি মুছে ফেলি দু-একটি শব্দ কিংবা সম্পূর্ণ পঙক্তি। কখনো ভাবি অর্থহীনতারও বুঝি রয়েছে অর্থ যা আমি জানিনা । মানুষ সবকিছু জেনে যেতে পারে না।”(জীবন-প্লাবিতার কথকতা)—কবিতা আর দর্শনের সীমানা রেখা মুছে গেলো এইখানে।

কবিতা তাই যখন অশ্রান্ত ঝরনার নিরুদ্বিগ্ন গতি পাথরের ঠোকরে বাধা পেয়ে পথ পাল্টে নেয়, হাতুড়ি পেটানো করতলে ফুঁসে ওঠা ফোস্কায় যখন স্বেদগ্রন্থির লোনা ঘাম লুটোপুটি খায় কিংবা ভয়ার্ত চিতল হরিণী ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের নিশানা থেকে পালিয়ে যখন জলপানে নিমগ্ন হয় তখন তার বুকের কলধ্বনিতে জেগে ওঠে কবিতা। তাই তো কবিতা বোঝা যায় না, বোঝানোও যাবে না।

জয় হোক কবিতার।

//জেড এস//

লাইভ

টপ