আলম তালুকদারশিশুসাহিত্যের অসামান্য জাদুকর

Send
সুহিতা সুলতানা
প্রকাশিত : ০৮:৫২, জুলাই ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪২, জুলাই ১১, ২০২০

মনুষ্য জীবনের পথটা খুব পিচ্ছিল। আর তা যদি করোনাকালে হয় তাহলে তো জগৎ সংসার অন্ধকারময়। মৃত্যুর মধ্যে বসে বাঁচার স্বপ্ন দেখা। কারণ সামান্য নয়। মনের আবেগ এখন কাজ করে না। আমরা এখন আমির ভেতরে ডুবতে ডুবতে তলিয়ে যাচ্ছি। অতলে! গৃহবন্দি থাকতে থাকতে ঘরও হয়ে উঠছে বৈরি। কোথায় গেলে বাঁচার মন্ত্র পাওয়া যাবে? মার্চ ২০২০ থেকে শুরু হয়েছে বিষাদ ও কষ্টের কাল! ক্ষয়ে যাচ্ছে হৃদয় ক্ষয়ে যাচ্ছে চোখ আর আমাদের সময়।

যাঁকে নিয়ে লিখতে বসেছি তিনি আমাদের গুরুজন। তাঁকে আমি গুরু বলে সম্বোধন করতাম। আমাদের অগ্রজ শিশুসাহিত্যিক আলম তালুকদার সবাইকে কষ্টের সাগরে ফেলে দিয়ে স্বভাবজাতভাবে পান চিবুতে চিবুতে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

অলস দুপুরে বিষণ্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি এই বুঝি বর্ষা নামবে, তারপর একসময় চোখ নেমে এলো ফেসবুকের পাতায়...সঞ্জীব পুরোহিতের পাতায় এসে চোখ স্থির হয়ে রইল, আর পলক পড়ে না! অবিশ্বাস্য মনে হলো… ‘বিদায় খোলামন, বিদায় ছড়াকার বন্ধু আলম তালুকদার’—প্রথমে ভেবেছি সঞ্জীব মজা করছে, ও যা করে থাকে! তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাসেঞ্জারে ফোন করলাম ওকে...সঞ্জীব হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে উঠলো, ‘হ্যাঁ সুহিতা আপা, আলম ভাই সত্যিই নেই!’ চোখ ভিজে উঠলো আমার। আমি তখন গুণদা’র (কবি নির্মলেন্দু গুণ) ইনবক্সে তাঁর

‘হুলিয়া’ কবিতা নিয়ে কথা বলছিলাম। কবিতাটি ২০১৮ সালে ‘বই’ পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলাম নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর। ভাবলাম ফেসবুকে পোস্ট করার আগে গুণদা আর চিত্রশিল্পী প্রদোষ পালকে পাঠাই, কারণ প্রদোষদা মনে করতে পারছিলেন না তাঁর কোন চিত্রকর্মটি ‘হুলিয়া’ কবিতার ব্যাক গ্রাউন্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল! আলম তালুকদারের মৃত্যুর খবরটা দিতেই আঁতকে উঠলেন গুণদা...‘ও মা!

কী বলো? কখন? করোনায়?’

বলি, হ্যাঁ দাদা, করোনা পজেটিভ ধরা পড়েছে!

ফোন করি বড় ভাই রেজাউদ্দিন স্টালিনকে। ভাইয়ের কণ্ঠ ভেজা অনুভব করলাম, ওঁ আগেই জেনেছে সংবাদটি। আমি ডাইনিং টেবিলের সামনে বিমর্ষ হয়ে বসে রইলাম।একে একে আমাদের মাথার ওপর থেকে আর্শীবাদের হাত সরে যাচ্ছে!

২.

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি আমরা। ঢাকা বইমেলা চলাকালীন সময়ে প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যায় চলে আসতেন আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। চির সবুজ এই মানুষটিকে আমরা আর পাবো না। এটাই কষ্ট। তারুণ্যকে জয় করেছিলেন যেন। কবি নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী থেকে শুরু করে কামাল চৌধুরী, ফরিদা মজিদ, ইকবাল হাসান, নাসির আলি মামুন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আমিরুল ইসলাম, লুৎফর রহমান রিটন, আসলাম সানী, আনজির লিটন, রতন মাহমুদ, খালেদ হোসাইন, তারিক সুজাত, শামীম রেজা, অনিকেত শামীম, সঞ্জীব পুরোহিত, মাসুদ পথিক, আহমেদ শিপলু, জাহিদ সোহাগ, সজল আহমেদ, চন্দন চৌধুরী, চাণক্য বাড়ৈ, গিরীশ গৈরিক,অরবিন্দ চক্রবর্তী ও অহ নওরোজসহ অনেকের হৃদয়ের কাছাকাছি ছিলেন এই মানুষটি! ম্যাজিক লণ্ঠনের সাহিত্য আড্ডা থেকে শুরু করে হাতিরপুলে গুণদাদের আড্ডায়ও নিয়মিত উপস্হিতি ছিল তাঁর। পাঠক সমাবেশের কর্ণধার শহিদুল ইসলাম বিজু যিনি মনে প্রাণে সহ্য করেন সকল লেখকের সকল কিছু—তাঁর পাঠক সমাবেশে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই চলে আসতেন ছড়াকার আলম তালুকদার। পায়ের আওয়াজ থেকেই বোঝা যেত তিনি আসছেন। এরকম এক সন্ধ্যায় একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে অনেক দিন পর গুরু আলম তালুকদারের সঙ্গে দেখা হয়, দেখা হতেই তুমুল বকা—‘বই’ পত্রিকায় আর লেখা নিচ্ছেন না কেন? বড় সম্পাদক হয়ে গিয়েছেন?’ আমি নীরবতা কাঁধে নিয়ে ঠায় দাড়িয়ে রইলাম, ঘরভর্তি মানুষের সামনে সত্যি কথাটি কীভাবে বলি? গুরু আমার ক্ষমতা নেই, আমি পারবো না আপনার লেখা আগের মতো করে প্রকাশ করতে।কথাটি শেষ অবধি তাঁকে বলা হয়নি।

আবার ফিরে আসি সঞ্জীব পুরোহিতের কাছে, ক’দিন আগে ওর বাবা মারা গেছেন।আলম তালুকদার ছিল ওর শেষ আশ্রয় স্থল! সেও চলে গেল! ওর কান্নার ভেতরে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল এ-কথাগুলোই। সঞ্জীবের লেখাটিই পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে দিচ্ছি,‘গার্ড অব অনারের বিউগলটা ছিল ভীষণ সুরেলা! করুণ ছিল না। আলম ভাই শুয়েছিলেন জাতীয় পতাকা মুড়ে। কেউ না থাকলে নিশ্চিত কোণা সরিয়ে উঁকি দিতেন। হেসে আমাকে বলতেন, সানাই বাজাই কে? কার বিয়া হা হা হা।’

যেদিন আমার মা চলে গিয়েছিল আমাদের ছেড়ে। সারারাত্রি আমি আর বড় ভাই স্টালিন মৃত মাকে নিয়ে যশোর যাচ্ছিলাম এ্যামবুলেন্সের এসির ঠান্ডা হাওয়া মনে করিয়ে দিচ্ছিল তোমাদের মা আর ফিরে আসবে না! মার খুব কাছে পাথর হয়ে বসেছিলাম আমরা দু’ভাইবোন। স্বজন হারানোর বেদনা কত কঠিন তা যার যায় সে-ই বোঝে।

সব লেখক-আড্ডায় ছিল তার সরব উপস্হিতি। রসে টইটম্বুর একটা মানুষ। বড় বড় পদে চাকরি করেও কোন অহংকার ছিল না। যখন পাবলিক লাইব্রেরীর মহাপরিচালক ছিলেন, একদিন ফোন করে জানতে চাইলেন, কন তো সুহিতা, আপনি ফটাফট সেমিনার আয়োজন করেন ক্যামনে, সিস্টেমটা আমারে কন তো?’ আমি জোরে হেসে উঠলে বলেন, আরে মসকরা নয়, সত্যিই।’

এরকম অসংখ্য স্মৃতি আলম ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের। কনকর্ড টাওয়ারে তখন কবি প্রকাশনী থেকে ‘বই’ পত্রিকা প্রকাশের কাজ করতাম আমরা। আলম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা, আমার লেখা নিয়েছেন? বললাম, এখনই দেন ।

পান চিবুতে চিবুতে বললেন, মামা বাড়ির আবদার?’

কাল দেবো, ঠিকমত ছাপবেন, খারাপ হলে খবর আছে।’

তাৎক্ষণিক ছড়া কাটতে পারতেন, খুব সহজেই মানুষের বন্ধু হয়ে যেতেন। এ-বছর বড় ভাই স্টালিনের জন্মদিনে উপহার হিসেবে নিয়ে এলেন দু’কেজি পিয়াজ, কারণ তখন পিয়াজের মূল্য প্রায় দেশ স্বাধীন হবার পর সর্বোচ্চ মূল্য। এবার বুঝুন তিনি কেমন রসিক ছিলেন। সাহিত্যে ও সাহিত্যিকের মধ্যে যদি রসবোধ না থাকে তাহলে তা সাহিত্য ও সাহিত্যিকই নন। এ কথাগুলো অকপটে বলতেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো : চাঁদের কাছে জোনাকি, ডিম ডিম ভূতের ডিম, বাচ্চা ছড়া কাচ্চা ছড়া, যাদুঘরের ছড়া, ছড়ায় ছড়ায় আলোর নাচন, অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা প্রভৃতি।

সম্পাদিত গ্রন্থ : শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, নাজমুল আহসান স্মারক গ্রন্থ, জাদুঘর বিচিত্রা, টাঙ্গাইল জেলার স্থান নাম বিচিত্রা।

যখন জাতীয় জাদুঘরের সচিব ছিলেন তখনও আমরা গেলে নথিপত্র সরিয়ে রেখে আড্ডা দিতে শুরু করে দিতেন। খুব দিল খোলা মানুষ ছিলেন আলম তালুকদার।

তাঁর বই বিষয়ক শ্লোগানটি বই পড়ুয়া পাঠকের কাছে চিরকাল অমর বাণী হয়ে থাকবে—

‘পড়িলে বই আলোকিত হই

না পড়িলে বই অন্ধকারে রই’

ঐ যে শাহবাগ, আজিজ মার্কেটের পথ ধরে কনকর্ড টাওয়ারের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন আমাদের চোখের ওপর দিয়ে, হৃদয়ের পাশ ঘেষে শিশুসাহিত্যের অসামান্য জাদুকর।

//জেডএস//

লাইভ

টপ