কবির সংশয় ও সংরাগ

Send
কামরুল হাসান
প্রকাশিত : ১১:১৯, জুলাই ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৬, জুলাই ২০, ২০২০

মিনার মনসুরের লেখালেখির শুরু সত্তর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০ সালে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বরলিয়া গ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ (সম্মান) এবং এমএ। কবিতার বই ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’; ‘অনন্তের দিনরাত্রি’; ‘অবিনশ্বর মানুষ’; ‘আমার আকাশ’; ‘জলের অতিথি’; ‘কবিতাসংগ্রহ’ এবং ‘মা এখন থেমে যাওয়া নদী’; ‘মিনার মনসুরের দ্রোহের কবিতা’। কবির ৬০ তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।প্রেম—চিরন্তন এই মানবিক আবেগ চর্যাপদের কাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বৈষ্ণবকাব্য ও পুঁথিসাহিত্য ঘুরে, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ প্রমুখ মহারথীদের হাত গড়িয়ে তরুণতম কবিকেও আলোড়িত করছে। তবে কালের পরিক্রমায় কবিতার গতিপথ পাল্টে গেছে, রোমান্টিক কবিদের কাল অবসিত হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছিল আধুনিক কালের ঊষা, এখন সে কালও উত্তরাধুনিক যুগের কাছে অপসৃয়মান। উত্তরাধুনিকতার এই যুগপর্বে প্রেম প্রকাশের ধরনও পাল্টে গেছে। রোমান্টিক যুগের কামহীন শুদ্ধাচারী প্রেম আধুনিক কবিদের হাতে দেহময় যৌনগন্ধী হয়ে উঠেছে, কেবল সৌন্দর্য নয়, তারা প্রত্যক্ষ করেছেন ক্ষয় ও বিনষ্টি। উত্তরাধুনিক যুগে প্রেম ব্যক্তিক আবেগের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী ছাড়িয়ে সমাগ্রিকতার দিকে যাত্রা শুরু করেছে, হয়েছে শেকড় অভিমুখী। মিনার মনসুরের প্রেমের কবিতার মূলসূত্রটি আধুনিকতার সঙ্গে গাঁথা।

প্রেম ও দ্রোহ—বাংলা কবিতার দুই প্রধান আবেগ মিনার মনসুরের কবিতায় বারংবার বিভিন্ন কাব্যিক প্রকাশে অনুরণিত হতে দেখি। প্রেম ও দ্রোহ তার কবিতার প্রধান দুটি সুর ও আবেগ। এ কবি বেড়ে উঠেছেন ষাটের উত্তাল দিনগুলোয়, কবিতা রচনায় ব্রতী হয়েছেন সত্তরের গনগনে আগুনলাগা সময়ে—যখন একটি সদ্যস্বাধীন দেশ অস্থির সময় পার করছে; যার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছে আশির স্বৈরশাসক শাসিত সময়ে তিনি যে দ্রোহী হবেন—সেটাই সঙ্গত ও স্বাভাবিক। প্রেমের ভেতর যেমন দ্রোহ রয়েছে, তেমনি দ্রোহের ভেতর রয়েছে প্রেমের অধিষ্ঠান। এ দু’টি প্রধান আবেগের মাঝে কবির পক্ষপাত প্রেমের প্রতি। যদিও এ পর্যন্ত প্রকাশিত তাঁর সাতটি কাব্যগ্রন্থ ও কিছু অগ্রন্থিত কবিতা থেকে পাখির দুটি ডানার মতো উড়াল দিয়ে একপক্ষে প্রেমের কবিতা আর অন্যপক্ষে দ্রোহের জড়ো করে একই বছরে ‘প্রেমের কবিতা’ ও ‘দ্রোহের কবিতা’ প্রকাশিত  হয়েছে, তবু তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন; বিশুদ্ধ রাজনৈতিক কবিতা বা বিশুদ্ধ প্রেমের কবিতাকে কবির কাছে সোনার পাথরবাটির মতোই মনে হয়েছে। তার এই সংশয় যৌক্তিক, কেননা একটি কবিতায় বিভিন্ন আবেগ ও চিন্তা ছায়া ফেলে যায় আর বিশুদ্ধ প্রেম বা বিশুদ্ধ দ্রোহ বলে কিছু নেই।

‘প্রেমের কবিতা’র ভূমিকায় তিনি বলেছেন তার হৃদয়ের সুস্পষ্ট পক্ষপাত সহজ প্রকাশের দিকে। সামগ্রিকভাবে সে চেষ্টাই তিনি করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি যেন বাংলার মরমী কবিদের উত্তরসূরী। কতটা সহজবোধ্যভাবে কবির হৃদয়াবেগ পাঠকের কাছে তুলে ধরা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত কাব্যিক অলঙ্কারসমূহ তিনি অনেকটাই এড়িয়ে গেছেন। কবিতার দেহকে প্রসাধন ও অলঙ্কারসর্বস্ব না করে মেদমুক্ত রাখতে চেয়েছেন। আজকের আধুনিক নারীর প্রসাধন ও অঙ্গসজ্জার মতোই তার কবিতার রূপ—নিরাভরণ নির্মেদ সৌন্দর্যে আলোকিত। মধ্যযুগের প্রেমের কবিতায় যেমনটা দেখা যায়, প্রেমিকার রূপবর্ণনা, তেমনটা কিছু নেই মিনার মনসুরের কবিতায়। রূপবর্ণনার চেয়ে তিনি জোর দিয়েছেন নায়িকার মানবিক সত্তার উপর; বিচ্ছিন্ন নয়, সমগ্রতার উপর। নারীকে তিনি প্রসাধিত পুতুল হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন মানবিক গুণাবলীতে ভাস্বর এক সামগ্রিক সত্তা হিসেবে।

মিনার মনসুরের প্রথম দিককার কবিতায় প্রেমের প্রকাশটি সরল আবেগে ঠাঁসা, কিন্তু সময়ের অগ্রগমনে সেখানে ক্রমশ ফুটে উঠেছে না-পাবার ক্ষোভ, প্রেমিকার প্রতারণার প্রতি ঘৃণা। নরম প্রেমিকসত্তাটি নম্র উচ্চারণ ছেড়ে দ্রোহী উচ্চারণে উচ্চকিত হয়েছে। যে কাব্যদশকে কবি মিনার মনসুরের আর্বিভাব সেই সত্তর দশক পরিচিত দ্রোহীকাল হিসেবে, যেখানে উচ্চকিত বিদ্রোহীর পোশাকের নিচেই রয়েছে অতৃপ্ত প্রেমিক সত্তা। কবি মিনার মনসুরের কবিতায় একটি হাহাকারবোধ ছড়িয়ে আছে পঙক্তিসমূহে, না-পাবার বেদনায় নীল এ কবি, সেই নীলে ছোপানো নীলরঙা তার কবিতা। দ্রোহের লালের পাশে তা এক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে বৈকি! প্রাপ্তি নয়, অপ্রাপ্তি থেকেই তার কবিতার জন্ম। মনার মনসুরের কবিতায় না-পাওয়াই পরম পাওয়া, প্রেরণার উৎসস্থল। তবে অবাক হই যে ‘প্রেমের কবিতা’-র প্রথম কবিতাটিই একটি রাগী কবিতা যেখানে হতাশ, ব্যর্থ কবি পরিচিত সবকিছু ছেড়ে দ্রোহী মেজাজে চলে যাচ্ছেন। অপ্রাপ্তি থেকে কেবল হাহাকার ও বেদনা নয়, সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ, কখনো ক্রোধে তিনি ফেটে পড়ছেন। ‘যে যায়’, ‘তবু তুমি থাকো’, ‘এখনো ফিরতে পারো’ কবিতাসমূহে এ ক্ষোভ বেশ প্রকাশিত।

‘এখনো ফিরতে পারো’ কবিতাটি পতিত সময়ের একটি চালচিত্র; ভালোবাসার কোমলতার ভেতরেও সময় তার শ্বাপদ নখর, হিংস্র চোয়াল ঢুকিয়ে দিয়েছে।

 

‘সহসাই অন্ধকার গিলে খাবে পৃথিবীর শেষ

আলোটুকু; হলিউডি চৌকশ অভিনেত্রীর মতো

এই মায়াবী নিসর্গ চকিতেই পরে নেবে আরণ্যক বেশ।

মানব খোলসটুকু ছুঁড়ে ফেলে মুহূর্তেই পড়বে বেরিয়ে

নেকড়ের অগণিত জান্তব নখর; তরী নয়,

ঘাটে ঘাটে দন্ত প্রদর্শন করে স্বাগত জানাবে

এ-কালের ভয়াল কুমির!’                      

(এখনো ফিরতে পারো/আমার আকাশ)

 

‘হলিউডি চৌকশ অভিনেত্রীর মতো/এই মায়াবী নিসর্গ চকিতেই পরে নেবে আরণ্যক বেশ’ লাইনটি চমৎকার। তবে প্রতীকায়িত হলেও কবিতাটি বেশ খোলামেলা, আড়ালহীন। ‘তবু তুমি থাকো’-তে তিনি লিখেন, ‘জানি অনন্যা অন্যের পণ্য হবে তুমি;’। পণ্যশাসিত মুনাফালোভী সময়ে কবি তার প্রেমাস্পদকে রক্ষা করতে অসমর্থ। এই অসামর্থতা রূপ নেয় চূড়ান্ত বিবমিষায়—‘প্রেমও পচনশীল/নারীও পচনশীল/শিল্পও পচনশীল/ঈশ্বর মূলত এক পচনতাড়িত/সম্মিলিত উৎকণ্ঠার নাম।’ শেষ দু’টি পঙক্তি সাহসী ও দারুণ। ‘যে যায়’ কবিতায় প্রতারিত হবার ক্ষোভ থেকে উগড়ে দিয়েছেন ঘৃণা, অভিশাপে জর্জরিত করেছেন প্রেমাস্পদকে, সে অভিশাপ কখনো শালীনতার সীমাও ছাড়িয়েছে। ফুটে উঠেছে কবির সীমাবদ্ধতা, কেননা তিনি বেপথু প্রেমিকাকে ফেরাতে অক্ষম।

 

‘যে নধর মাংসপিণ্ড যায় দুলিয়ে বর্ণাঢ্য পাছা—

সেও যাক। যে নির্লজ্জ স্তন যায়, নগ্ন

কামার্ত ঊরুরা যায়, উদ্র যোনি যায়,

অবিশ্বানী ঠোঁট যায়, প্রতারক চক্ষু যায়, ভ্রষ্টা

চুল যায়, হন্তারক দুই হাত যায়—’                  

(যে যায়/আমার আকাশ)

 

আমরা যদি কবিতাকে মোটা দাগে হৃদয়জাত এবং মস্তিষ্কজাত—এই দুইভাগে ভাগ করি, তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কবি মিনার মনসুরের বেশিরভাগ কবিতা হৃদয় বা আবেগসঞ্জাত। তার কবিতা যতখানি আবেগতাড়িত করে, ততখানি চেতনাতাড়িত করে না। খুব আবেগাপ্লুতও করে কি? আধুনিক সময়ের কবি হিসেবে তিনি নিরাবেগে প্রকাশ করেন হৃদয়ের তীব্রতম আবেগ। এখানেই বর্তমান সময়ের প্রেমের কবিতা চিরকালীন প্রেমের কবিতা থেকে আলাদা হয়ে যায়। পুরোদস্তুর নাগরিক এ কবির হৃদয়জাত কবিতার মাঝে অবশ্য চেতনা ও বোধের সমাগম আকছারই ঘটে।

যদিও তার আরাধ্য আবেগের, সত্যের সরল প্রকাশ, যেসব কবিতায় তিনি সরল আবেগ ছেড়ে তীর্যক হয়েছেন, শ্লেষ ও হাস্যরস, এমনকি আত্মকরুণা জুড়ে দিয়েছেন সেসব কবিতা অধিকতর আড়ালসম্পন্ন ও আকর্ষণীয় হয়েছে। প্রথমদিককার কাব্যসমূহের সারল্য ছেড়ে শেষের দিককার কাব্যসমূহে আমরা এই বাঁকবদলটি লক্ষ্য করি। বস্তুত তার প্রথম দিককার কবিতা অতিকথনে ভরপুর, যা ছিল তার দশকের একটি প্রধান দুর্বলতা। পুনরাবৃত্তিতে ঠাঁসা এসব কবিতা আবৃত্তির মঞ্চে যতটা আলোড়ন তোলে, পাঠে ততখানিই নিস্প্রপ্রভ করে রাখে। সময়ের প্রভাব তিনি এড়াতে পারেননি; যদিও তার ব্যক্তিমানস ও কবিসত্তার ভিতর একটি লাজুক, সংগোপী ও নম্র সত্তা রয়েছে। আচরণ ও ব্যক্তিত্বে এই নম্রপ্রকাশটি দ্রোহী মানুষটিকে প্রেমিক বানিয়েছে, তার কবিতাও অবশেষে দারস্থ হয়েছে প্রেমের।

কবি অবশ্যই তার কবিতার কথক, কিন্তু নিজেকে যতটা আড়াল করা যায়, কবিতা ততই নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে, একের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে বহুর অভিজ্ঞতার অংশ। সময়ের হাত ধরে মিনার মনসুরের কবিতা যত এগিয়েছে, এই নৈর্ব্যক্তিকতা তত প্রকাশিত হয়েছে। প্রথাগত প্রেমের প্রকাশ তার প্রথম দিককার কবিতাকে ভারী করে তুললেও তিনি ক্রমশই সামষ্টিক বোধের দিকে এগিয়েছেন। কথোপথনের একটি ভঙ্গি মিনার মনসুরের কাব্যদেহে অন্তঃসলিলা নদীর তো প্রবাহিত। তিনি যে কেবল তার প্রেমিকার সাথেই অবিরত কথা বলেছেন তা নয়, তিনি কথা বলেছেন প্রকৃতির সঙ্গে, তার প্রবহমান সময়ের সাথে, তার পাঠকের সাথে—যাদের হৃদয়সংবেদ তার কবিতার গন্তব্য। হৃদয়ের সরল আবেগ তিনি আড়াল করতে চাননি, সহজবোধ্য এক ভাষায়, উপমা-প্রতীক-রূপক-চিত্রকল্পের কাব্যিক ভার যতটা সম্ভব এড়িয়ে তিনি নিজ হৃদয়ের মর্মবাণী প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রেমের কবিতা বলেই এসব কবিতায় প্রথাগত ‘আমি’-‘তুমি’ সর্বনামের আধিক্য রয়েছে, রয়েছে অতিকথন। আমার কাছে বরঞ্চ অধিকতর প্রিয় তার ছোট কবিতাসমূহ। ‘ও আকাশ’, ‘ও তন্বী বিদ্যুৎ’, ‘শ্মশানের কাদাজল’, ‘হরিপদ’, ‘নবকৃষ্ণলীলা’ প্রভৃতি কবিতা কেবল আয়তনে ছোট নয়, ভাবপ্রকাশে সংহত ও ব্যঞ্জনাধর্মী। ‘নবকৃষ্ণলীলা’ কবিতায়ও সেই অভিনবত্ব ধরা পড়ে:

 

কালো মেঘ—সে যতোই কালো হোক—বুনো

মোষ রক্তচোখ আস্ফালনে

ভাঙুক আকাশ; রামপুরানিবাসিনী রাধিকার

পাকা চোখ জানে—অই ঘনকৃষ্ণ মেঘেদের বনে

চলিতেছে নবকৃষ্ণলীলা;—                           

(নবকৃষ্ণলীলা/জলের অতিথি)

 

ত্রিশের দোলা পাই তার কবিতায়। সে তুলনায় তার সিরিজ কবিতাসমূহ যেমন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ গ্রন্থের ওই একই শিরোনামের ৮টি সংখ্যা সম্বলিত কবিতা; কিংবা ‘আমার আকাশ’ গ্রন্থের ‘অন্তর্যাত্রা : ২২ ফ্রেব্রুয়ারি, ১৯৯০’ এর ১৪টি কবিতার সমাহারে রচিত দীর্ঘ কবিতা তেমন টানেনি। আমাকে টেনেছে তার আড়ালসম্পন্ন কবিতাসমূহ। ‘কবিতাসংগ্রহ’ গ্রন্থের ‘মহান দীনতা’, ‘কুয়াশার কার্ডিগান পরা সেই নারী’, ‘দুই রমণীর গল্প’, ‘মীন রাশির জাতিকা’, ‘যদি একাকী তবু’ আমার ভালো লেগেছে। এসব কবিতায় কবি যে সংশয় প্রকাশ করেছেন ‘শতভাগ প্রেমের কবিতা বলে কিছু নেই’, তা ফুটে উঠেছে, তবে প্রেমই এসব কবিতার মূল প্রেরণা। মাঝে মাঝে তিনি অত্যন্ত মনোহরণ, চিত্তাকর্ষক সব পঙক্তি রচনা করেন—

                                                      

‘…প্রশান্ত দিঘীর মতো গূঢ়

শরীরের জলে যখন উঠতো বেজে

মাছেদের রূপালী ঝিলিক—তখনও মাছ নয়,

জলের রহস্য তার মনে জাগাতো বিস্ময়।’                  

(দুই রমণীর গল্প/কবিতাসংগ্রহ)

 

পতঙ্গ আলোর দিকে অনিবার্য আকর্ষণে ধাবিত হয়, যে আকর্ষণ বিনাশী; কিন্তু উড়ে উড়ে আলোর পৌরুষ দেখা অভাবিত। ‘মীন রাশির জাতিকা’ কবিতায় মিনার মনসুর লিখেন, ‘এ কথা যে বলেছিলো তার প্রাণ ছিলো/মাছেদের মতো খুব সমুদ্র-কাতর।’ ‘মাছেদের মতো খুব সমুদ্র-কাতর’—এক কথায় চমৎকার। প্রকৃতির অবারিত প্রান্তর ছেড়ে কেবলই গুটিয়ে যাওয়া খাঁচাবন্দী আধুনিক মানুষকে দেখে তার করুণা ‘কেউ বাঁচে অ্যাকুরিয়ামের জলে। ‘যদিও একাকী তবু’ কবিতার শুরুটা এরূপ:

 

‘যদিও একাকী তবু দুইজন থাকে

এক ঘরে; অনিবার্য এই সহবাস।’                             

(যদিও একাকী তবু/কবিতাসংগ্রহ)

 

নশ্বর প্রেয়সী অবিনশ্বর হয় কেবল কবির রচনায়, শব্দেই সে বাঁচে। স্মরণে আসে মিনার মনসুরের প্রথম কাব্যের নাম ‘অবিনশ্বর মানুষ’। তবে সে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। পুরোপুরি কামহীন নয় তার কবিতা, হওয়া উচিৎও নয় এই আশরীরকামজ আধুনিক যুগে। ‘পিংকি’ কবিতায় গোলাপী মেয়েটির দেহ নিয়ে রীতিমতো বেহিসেবী হয়ে উঠেছে কবির কলম।

 

‘জামার ভেতরে তার ঘৃতবর্ণ দেহটাও হয়ে ওঠে পিংক।

সহসা আছড়ে পড়ে সমুদ্রের যৌনগন্ধী ঢেউ;

ঘুরপাক খায় তার সুডৌল জঙ্ঘাকে ঘিরে; আমি শুধু তার

অপরূপ পায়ের গোড়ালি দেখি—সেখানেও পিংকের ঝিলিক!’   

(পিংকি/মা এখন থেমে যাওয়া নদী)

 

কামজ হতে গিয়েও তিনি আত্মবিস্মৃত হন না, হন সংবৃত; পায়ের গোড়ালির রূপ দেখে ফিরে আসেন। মিনার মনসুরের কবিতায় বিরামচিহ্নের প্রচুর এবং ব্যাকরণসম্মত ব্যবহার দেখে মনে হয় তিনি খুব প্রথাসম্মত কবি। কবিতাপাঠকে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি বলেই বিশ্বাস করেন। ‘তোমার কোনো ত্রাণকর্তা নেই’ শিরোনামের টানাগদ্যে লেখা তিনটি কবিতাই দেহজ প্রেমের ইঙ্গিতবহুল; কেবল ইঙ্গিত নয়, প্রকাশ্য বর্ণনায় বাঙ্ময়। কাব্যিক পরিভ্রমণের এ দীর্ঘপথ পর্যন্ত দৈহিক লীলা বর্ণনায় মোটামুটি বিরত কবি শারিরীক মিলনের অনিবার্যতাকে কখনো প্রতীকে, কখনো প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপন করেছেন।

মিনার মনসুরের প্রেমের কবিতার ভুবনটি জাগতিক হলেও শেষের দিককার কবিতায় দেখতে পাই মহাজাগতিক উড়াল। জগতের সীমা ছেড়ে মহাজগতের অসীমের পানে পাড়ি দিতে তৈরি যেন। ‘বহুদিন পর কণ্ঠ তোমার’ কবিতায় তিনি লিপিবদ্ধ করেন:

 

‘বহুদিন পর কণ্ঠ তোমার ভেসে আসে যেন মহাজাগতিক গান—

সুদূরের কোনো অজ্ঞাত গ্রহ থেকে।

কৃষ্ণবিবর আলো করে ফোটে গুচ্ছ গুচ্ছ তারাদের মতো

অপরূপ কিছু স্বপ্নের ফুল;…’  

(বহুদিন পর কণ্ঠ তোমার/মা এখন থেমে যাওয়া নদী)

 

প্রথাগত ভাষা ও আঙ্গিকে লিখলেও মাঝে মাঝে বিশেষ করে শেষের দিকে তিনি বেশ কিছু কবিতা টানাগদ্যে লিখেছেন। তার টানাগদ্যে লেখা কবিতার মাঝে কথোপথনের ভঙ্গিটিই বেশি ফুটে ওঠে। একটি পঙক্তি রয়েছে, ‘যাকে ছুঁই সেই-ই তো নেই হয়ে যায়!’ অসামান্য! শৈশবের খেলাটির রূপকে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতাকে দারুণ লিপিবদ্ধ করেছেন, এ যেন ‘যেখানেই হাত রাখি সেখানেই তোমার শরীর’—এর বিপ্রতীপ উচ্চারণ। কাব্যিক পরিভ্রমণে ক্লান্তিহীন মিনার মনসুর প্রেমের দিকে তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। তবে ইদানিং, হয়তো বয়সের প্রভাব, হতে পারে করোনাকালের প্রভাব, তার কবিতায় বিদায়ের, জীবনের নশ্বরতার একটি করুণ সুর বেজে ওঠে। তিনি লিখেন,

 

একদিন সত্যি সত্যি উড়ে যাবো—খাঁচা

টেরও পাবে না। পায়ে তীব্র ব্যথা নিয়ে

নিরাশ্রয় চেয়ারটি নিশ্চিত থাকবে বসে একা।

...

এই গোধূলি বেলায়

গলায় গরল রক্ত তুলে বলি : ‘তোরা ফিরে আয়’।

তুমিও বলবে। স্কুল-বালিকার মতো দুরন্ত মেঘেরা আকাশ মাতাবে।

 

চেয়ারটি তখনো থাকবে বসে একা।

 

দ্রোহী ও প্রেমী এই কবি তার কব্যিক অভিযাত্রায় ষাটের ঘাটে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুর বিবেচনায় তিনি এখনো সাত নম্বর বিপদ সংকেত সত্তর দশক থেকে দশ ক্রোশ দূরে। তার কাব্যতরী তরতর করে বালাই ষাট পেরিয়ে শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে সত্তুর পেরিয়ে এগিয়ে চলুক আরো দূর আর পাড়ি দিক আশির সমুদ্র- সেই কামনা করি। তাকে অভিনন্দন!    

//জেডএস//

লাইভ

টপ