সংক্রমণকাল এবং চিত্ত-প্রণয়

Send
দীপক চৌধুরী
প্রকাশিত : ০৬:০০, জুলাই ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, জুলাই ২২, ২০২০

হিরুর বউ এত সুন্দর হবে এটা বস্তিবাসীর কাছে অকল্পনীয়।   ঊনিশ ছুঁইছুঁই বয়স, অগ্নিময় সুন্দর সেই রূপ। টানাটানা চোখ দেখেই ভীষণ আগ্রহ দেখিয়েছিল হিরু। দারুণ ফিগার। অবশেষে বিয়েটা হয়ে গেল নাটকীয়ভাবেই। ঈদের ছুটিতে বন্ধু কামালের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েই মেয়েটিকে নজরে পড়ে। নানা কৌশলে হিরু নামটিও জেনে গেল, রোকসানা। লোকমুখে রুকু। বিয়ের প্রস্তাব দেবার আগমুহূর্তে হিরু সংগ্রহ করে নিয়েছিল তরুণীর বৃত্তান্ত। মা-হারা মেয়ে খালার বাড়িতেই বড় হয়েছে। দূরে স্কুল হওয়ায় পথে বখাটেদের উৎপাত। একপর্যায়ে যন্ত্রণা থেকে রেহাই  পেতে লেখাপড়ার পর্ব অষ্টম শ্রেণিতেই ইস্তফা।

এই ক’দিনেই রুকুর সঙ্গে কয়েকবার চোখ বিনিময় হয়েছিল হিরুর। এরপর কাছাকাছি এসেও থেমে গেল মন দেওয়া-নেওয়া। এক আধ-দিন সুযোগ পেয়ে হাত ধরে ফেললেও রুকুর কাছ থেকে পাল্টা শব্দ এলো, ‘উঁহু।’

কাহিনির বিস্তারিত শুনে কামাল চুপ করে রইল একটু-ক্ষণ। এরপর উসকে দিয়ে বলল, ‘হাঁটু কাঁপলে অইবে না। বোতল জোগাড় কর, নয় মাল ছাড়।’

কীসের বোতল বুঝতে কষ্ট হলো না হিরুর।

ওষ্টে চাপাহাসি। ঈষৎ বিব্রতভাব, দোটানা মন। টিনের চালার ছোটঘরে বেঞ্চিতে বসে চিঁড়ার নাড়—টোস্ট বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়নের পর এক বসাতেই বিয়ের আলাপ। শুরুতে এক মুহূর্তের দেখাতে হিরুর বুক কেঁপে উঠেছিল। এবার ঘরে, ভয় তো নেইই একেবারে সামনা-সামনি, কাছাকাছি, মুখোমুখি।

পাটকাঠির পার্টিশানের আড়ালে রোকসানাকে ডেকে নিয়েছেন ওর  প্রৌঢ়া খালা। পরিষ্কার দেখা যায়—কোমর ছাপিয়ে এক মাথা কালোচুল। পিঠটা চওড়া, লম্বা মতন। মুখের গড়ন দেখে বয়সটা বোঝার উপায় নেই। ত্রিশ হতে পারে আবার পঁতাল্লিশও। আড়চোখে হিরুর ওপর চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘রুকু এ্যাইবার ভুল করিস না। ট্যাকাঅলা পোলার ঘরে ভাত থাকলেই কি সুখ অয়! ভাতের সুখ নাকি শইলের সুখ চাস? এমুন ছেলে পাওন যায় না। কী ফিগার! চেহারা দ্যাখচস, রাজপুত্তুর।’

ধীর অথচ তেজী কণ্ঠে রুকু বলল, ‘মুনে অয় তুমার লোভ অইতাছে! বিয়া তো আমি করুম। ঠিক না?’

‘রাজি অইয়া যা, মাইয়া অইচস। তর পছন্দয় অইব না, ব্যাডাদের পছন্দ লাগব। ব্যাডারা তর রঙ দ্যাখব, তর শইল দ্যাখব, ফিগার দ্যাখব।’

‘কেডা বিয়া করব?’

‘তুইই করবি, আমি করমু?’ খালা বিরক্তমাখা মুখে তাকালেন রুকুর দিকে। এরপর কয়েক মিনিট নীরব থেকে বললেন, ‘আমি নিঃসন্তান। এ্যাইডা কার দোষ? সমস্যা তর খালুর। হেও আমার ফিগার দেইখা বিয়া করছিল। তার ফিগার আমার লগে যায়? হের শইলে আমারে খায় না, চউক্ষে খায়। বড় অইচস ঠিকই, কিন্তু কথাডা বুজবি বিয়ার পর! বুজলি?’

শিকেয় দুধের পাতিল তুলে রাখতে রাখতে কমলা রঙের শাড়িপরা খালা রুকুর মুখ পড়লেন। কয়েক মিনিট পর আবার শোধালেন, ‘ঢাকার পাত্র।’

জীবনের ঢেউ নানা দিকে ঠেলে দিলেও হিরুর চোখ দু’টি ওকে বেশ কাবু করেছে। হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল মুখে। শব্দ করে  কোনোকিছু উচ্চারণ না করলেও মাথা ঝাঁকিয়ে বিনা শর্তে রাজি হয়ে গেল রুকু।

তবে রাজি হওয়ার কথাটি শোনার পর হিরুর খানিকটা সন্দেহ জাগে। সত্যিই না কি মিথ্যে? অবশেষে ঠোঁটে হাসি মিশিয়ে রুকুর খালা বললেন, ‘অয় রাজি।’

মোবাইল ফোনে একমাত্র বেঁচে থাকা মাকেও খবরটি জানাল হিরু। এরপর এক সপ্তাহের ভিতরই বিয়ের কথা পাকাপাকি হলো। কামাল, সামসু আর হাশেম—এই তিনজন মিলেই বন্ধু হিরুর বাজার-সওদা, বিয়ের দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করল ঢাকার তালতলা মার্কেট থেকে। ছুটি মিলেনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রি হিরুর।

একদিক ছাড়া সবদিক দিয়েই হিরুর যোগ্যতা বেশি। লেখাপড়া থ্রি-ফেল, শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হলেও নগদ টাকা-পয়সা, ঘরে রঙিন টেলিভিশন, ময়ুরপঙ্খী ছবি আঁকা পালঙ্ক। হেডমিস্ত্রীর সঙ্গে সহকারি  সে। কামাল ট্রেনে মওসুমি ফল বিক্রি করে, সামসু টিএসসির মোড়ে   বাদাম ফেরি করে আর হাশেমের চাকরি কসাইখানায়।

হিরুর সংসারে রুকু ঢোকার পরের সপ্তাহেই একত্রে খাওয়ার আয়োজন করা হল। বিয়ের পর পারিবারিক ভোজন অনুষ্ঠানে একদিন চারবন্ধুর স্ত্রীদের মধ্যে গল্পগুজব হবে, এমন দাবি তিনবন্ধুর কাছ থেকে উঠেছিল। আর এখানেই বোঝা গেল কামালের বউ মৌসুমী মোটামুটি সুন্দরী হলেও ভীষণ খাটো, গাট্টগোট্টা ধরনের নাকবোচা শ্যামল রঙের বউ সামসুর, হাশেমের বউ লম্বা হলেও গায়ের রঙ কাল, লক্ষ্মী-টেরা চোখ।

খাওয়া-দাওয়ার পর তিন বন্ধু সন্ধ্যায় একত্রে সিনেমা হলে ঢুকল। সিনেমার গল্প বাদ দিয়ে ওরা হিরুর সুন্দর বউ নিয়ে সাংঘাতিক চিন্তিত, অন্তরে জমা হওয়া হিংসাও। বন্ধুদের উদ্দেশে কামাল বলল, ‘মেট্রিক পাস দিয়াছি। বাজান বিয়া করাইল পাঠশালা পাস গেরস্তের মাইয়া। আর কী কই কও।’ হাশেম মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘যৌতুক হিসেবে কডা ট্যাকা পাইছিলাম। এইগুলান কবেই শ্যাষ।’ সামসু ঈষৎ বিরক্তির কণ্ঠে বলল, ‘কামাইল্যা, তুই কামডা ভালা করচ নাই।’

পাল্টা ক্ষেপে কামাল জানতে চাইল, ‘তরা ক, আমি জানতাম? গণক? হিরু বিয়া করতে কইল। আর, সুন্দরবিবি রুকু রাজি অইয়া গেল।’

 

হিরু বরাবরের মতো সকালে গিয়েছিল হেডমিস্ত্রির সঙ্গে। এক বাড়িতেই দু’মাসের ইলেকট্রিক কাজ পড়েছে। এজন্য বেড়েছে প্রচুর খাটুনি। কিন্তু বেশি অর্থের আশায় রাত পযন্ত কাজেই ডুবে থাকে।

সেজেগুজে ঘরের সামনেই এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলেও পালঙ্কে লম্বা হয়ে শুইতেই  ঘুম এসে গেল রুকুর। হিরুর নৈশকালীন চিত্ত-প্রণয়ে এমন অসময়ে গভীর ঘুম।

খিলগাঁও বস্তির এই তিন বন্ধু একত্রে হল সাতদিন পর। ওরা তিনজনের বসবাস উত্তরের দিকে, হিরু দক্ষিণে, সদর রাস্তার পাশে। দোকান, গাড়ির হর্ণ, রিকশার টুংটাং সারাক্ষণ।

চায়ের দোকান ফেলে এসে বসল ওরা হিরুর ঘরে। দু’জন ঘরের সামনে দাঁড়াল। কামাল ভিতরে ঢুকেছে। সবাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহৃত মুখের মাস্ক পকেটে ঢুকিয়ে দিল।

সামসু বলল, ‘দেড়মাস দ্যাখচি, পরচিও। করোনা গরিবের ব্যারাম না।’ 

‘রুকু আছ?’ কামালের মিষ্টিকণ্ঠ।

জবাব নেই। তবু ওরা ঘরে ঢুকে গেল। শাশুড়ি রূপচান বিবি কয়েকবার ধাক্কা দিলে উঠে বসল রুকু। এখনও ঘোর কাটেনি। ব্লাউজের গলার দিক আর বগলের নিচটা অনেকটা ভেজা। কাপড়ও ডান হাটুর ওপরে ওঠে গেছে।

রুকু পালঙ্ক থেকে নামতেই ওরা যেন দখল করার মত দ্রুত পা উঠিয়ে বিছানায় বসল।

শাশুড়ি রূপচাঁন বিবি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কামাইল্যারা আইচে। চা-চানাচুর খাওয়াইবা না?’ রুকু নিরুত্তর।

ফার্মেসীতে ঔষধ আনার জন্য যেতে যেতে রূপচান বিবি বললেন, ‘বউ, পেসারের অষুধ আনতে যাই।’

‘আইচ্ছা।’

গল্প শুরু হয় মহল্লার রাস্তা খোঁড়াখুড়ি নিয়ে, নির্মাণ কাজের ত্রুটি, ঠিকাদারের গুণ্ডামি, গার্মেন্ট শ্রমিকদের ঠকানো নিয়েও। কামাল শুরু করেছিল আলাপ। কিন্তু সকল আলোচনা যেন জট বেঁধেছে রুকুর মুখে। বড় জলচৌকিতে বসেছিল রুকু। ওর মুখখানি যেন ওদের চুম্বকের মতো টানে। রুকুর গলা-ঠোঁট-বুক চেটেপুটে খেয়ে ফেলতেই তিনজনের চোখ ঘুরে বেড়ায়। ওয়াশার নোংরাপানি, উপচেপড়া ড্রেনের ময়লা, চুলার নিবু নিবু গ্যাসের আগুন। সবাই শ্রোতা। বক্তা শুধু রুকু। স্বামী হিরুর সিনেমাপ্রীতি, কাহিনিতে নায়কের ব্যর্থ প্রেমের রোমান্টিক ভালবাসা, এসব নানান কথা। বিকেলের চা-পান করা নয়, যেন রুকুর গল্প শোনার জন্যই তিনবন্ধুর আসা। দু’হাত উঁচিয়ে চুল গোছানো শুরু করতেই ওর টানটান শরীর স্পষ্ট হয়ে উঠল। একপর্যায়ে খোঁপাটা খুলে গেল। দাঁড়াল না রুকু, বসা থেকেই গোছা গোছা চুলে খোঁপা বাঁধার চেষ্টা চালাল। কিন্তু চুলগুলো অবাধ্যের মতন পিঠ ছাপিয়ে যাওয়ায়, রুকু ঠোঁটে হাসি এনে বলল, ‘আমার কী দোষ, কন?’

স্মিত হেসে কামাল বলল, ‘চুলের দোষ দিচ্ছ? আমার বউয়ের মাথায় তো চুলই নাই।’ হাশেম ও সামসু এতে সায় দিল হাঁ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে।

কামাল আর হাশেমের হাতের দুই আঙুলে জ্বলতে থাকা সিগারেট ধোঁয়াচ্ছন্ন করে ফেরেছিল ঘর। রুকু বলল, ‘অতো সিগারেট-বিড়ি খান ক্যান?’

সামসু বলল, ‘হ, ধোঁয়ার লাইগা বইতে পারতাছি না। আমি খাই না। সিগরেট-বিড়ি আসলেই বিষ।’

এবার নিজের চোখে দেখা কিশোর কালের এক গল্প শুরু করল রুকু। প্রতিবেশির চল্লিশোর্ধ্ব নারীর নিকার বন্দোবস্ত করা নিয়ে গ্রামে পঞ্চায়েত-বৈঠক। সেখানকার এক মুরুব্বির নানান ফতুয়ার বিবরণ শুনে শ্রোতাদের উৎসাহে রুকুর আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। ততটা হাসি উদ্রেকের গল্প না হলেও হাসির চোটে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা তিনবন্ধুর। অনেকক্ষণ পরে রুকু লক্ষ করল—আসলে তাদের চোখগুলো ওর শরীরের ভরা নদীর মতন যৌবনটাতেই গিয়ে টেকে। আড্ডার চেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয় ওদিকে। যতক্ষণ আড্ডা চলতে থাকে ততক্ষণই কামাল, সামসু আর হাশেমের চোখ পুরো শরীর  ঘোরাঘুরি শেষে রুকুর বুকে এসে স্থির হয়।

রূপচান বিবি পাশেই বিছানায় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ ছেলে হিরুর গন্ধ পেলেন যেন নাকে। চোখ কচলাতে লাগলেন। এরপর বাইরে বেরোতে বেরোতে বললেন, ‘বউ, তুমরা একলগে চা খাইতে পারবা। হিরুও আইসা গ্যাছে।’

দরজায় এল হিরু।

কামাল বলল, ‘কী রে দোস্ত, আর কত কামাবি?’

হাত-মুখ ধুয়ে  এসে হিরু বলল,‘ করোনাভাইরাসে তো ম্যালা ঝামেলা পোহাইতে অইব?’

উদ্বিগ্ন কণ্ঠ হাশেমের। কোমড় থেকে গুলের কৌটা খুলতে খুলতে বলল, ‘করোনাকালে খারাপ একটা কাম করছে আমার মালিকে। কয়দিন ধইরা হেরে খালি পুলিশে খুঁজতাছে। হুনছি, চোরাই মহিষ আইন্যা জবাই করছে। আমরা কাইট্যা টুকরা টুকরা কইরা বেইচ্যা দিছি। আমগো ট্যাকাও পাই নাই।’

হিরুর বউ সবার জন্য পরিবেশন করেছে চা-চানাচুর। এরমধ্যে একথা—সেকথার পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেল করোনাভাইরাস প্রসঙ্গ।

রুকুকে উদ্দেশ করে হাশেম বলল, ‘টিভি ছাইড়া দ্যাও। খবরটা হুইনা লই কী কয়, দেহি।’

খবরের মাঝখানে বিজ্ঞাপন। রিমোট হাতে নিয়ে মিউট করল হিরু। কামাল উচ্চারণ করল, ‘দুনিয়াডায় শয়তান ভইরা গ্যাছে তো, গজব পড়ছে।’

ফের খবর শুরু হতেই টিভিতে প্রচারিত তিন চিকিৎসকের অভিমত শুনে সামসু মন্তব্য করল, ‘মাথাওয়ালা লোকেরা কি আর ভুল কথা বলব?’

হিরু মাথা নিচু করে বলল, ‘বুজতাছি না, কিচ্চু। দ্যাশে কী যে অইব।’

চায়ে চুমুক দিয়ে সামসু বলল, ‘মুখে মাস্ক বসাইয়া বাদাম বেচন যায়? মহল্লায় মুডেই সুবিদা করতে পারি নাই। একমাস বইসা  থেইক্যা পরে মাস্ক লাগাইয়া নামছিলাম। পোলাপানে ধাওয়া করে,  পিডাইতে আহে।’

কামাল বলল, ‘ট্রেন বন্ধ। কী করুম, ক।’

আড্ডা ভেঙে যায় রাত ন’টায়। এর কিছুক্ষণ পরই হেডমিস্ত্রি এসে দরজার সামনে পুরান মটরসাইকেল থামায়। মাঝবয়সী মানুষ। নীল হাফহাতার শার্টের সঙ্গে কালো ফুলপ্যান্ট। চুল পরিপাটি।

ইশারা করতেই হিরু বাইরে বেরোয়। এরপর আড়ালে যায় ওরা দুজন।

‘হিরু মিয়া, মালিকেরে তো এ্যারেস্ট কইরা ফেলছে ডিবি।’

‘তাইলে কী উপায়?’

হেড মিস্ত্রী বলল, ‘আমার মটরসাইকেলে উঠ।’

বিনা মন্তব্যে হাঁ ভঙ্গিতে হিরু মাথা নাড়াল।

হিরু ঘরে ঢোকার পর রুকুকে আস্তে আস্তে বলল, ‘মায়েরে খাওয়াইয়া শুইয়া পইড়। ওষুধ টাইমলি খাইতে ভুইলা যায়। তুমি মনে কইরা দিও। ফিরতে রাত অইতে পারে আমার।’

রাত বাড়তেই থাকে। হিরু ফেরেনি। ওকে শিশু অবস্থা থেকে বড় করা, বিয়ের বয়েস থাকার পরও হিরুর কথা ভেবে নিজেকে সৃষ্টিকর্তার কাছে সঁপে দেওয়া, নিজের অস্তিত্বকে আপন খেয়ালেই বিপন্ন করার কারণ ছিল হিরু। এই পেটের সন্তানকে বড় করা যে কত কষ্ট ছিল? না, এটা কাউকে বোঝানো যায় না। কোনো কোনো মুহূর্তে ছেলের বউ রুকুকেও না।

‘লাত্থি-ঝাঁটা খাইতে অয় না তো?’ মধ্যরাতে হঠাৎ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব রূপচান বিবি। কখনো এমন রাগ দেখেনি রুকু। পাশে এসে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, তুমার মাইয়া অইলে লাত্থি-ঝাঁটার কথা কইতা?’

‘হিরু আমার নাড়ি-ছেঁড়া ধন।’

রুকু আস্তে বলল, ‘মা, আমি বুজতে পারি।’

নিঃশব্দে থাকলেন কয়েক মিনিট। এরপর পানিতে টলটল চোখ দুটি মোছা শেষ হল রূপচান বিবির। কয়েক মিনিট পর বললেন, ‘বউ- বউয়ের মতন থাকবা! আমি হিরুর মা। কামাইল্যারা তুমারে ফুসলাইয়া সব্বনাশ করবা। বোজো?’

‘না, মা আফনে আছেন না?’

‘আচি, আমি তুমারে আহ্লাদ দিয়া মাথায় তুলচি।’

‘মা আমারে কই ফালাইবেন, কন?’

এ কথার তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন না রুকুর শাশুড়ি।

চার সপ্তাহ ধরে হিরুর ব্যস্ত সময় কাটছে। সকাল আটটায় ঘরের বের হয়—ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা-বারোটা। ভার্চ্যুয়াল অর্ডার বেরিয়েছে একদিন। বাড়ির নির্মাণকাজে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেছেন হাই কোর্ট। বাড়িওয়ালার সঙ্গে হেডমিস্ত্রি আর হিরুর মাথা নাকি এরপর থেকে ঠিক নেই। ছেলের কষ্টে রূপচান বিবিরও দুশ্চিন্তা।

এরমধ্যে একদিন বিকাল। কামাল, সামসু আর হাশেম এসে বসল হিরুর ঘরে। তিনজনই আজ পান চিবোতে চিবোতে ঢুকল। কামাল বলল, ‘চা খাইতে আইচি।’

শোয়া থেকে উঠলেন রূপচান বিবি।

কথাটা লুফে নিয়ে রুকু বলল, ‘চা খাইতে চান, খাইবেন। কেউ তো চা বানাইয়া বইয়া থাকে নাই। বহেন।’

অসময়ে দাঁত মাজতে মাজতে গলা ওঠালেন রূপচান বিবি।

‘চিনি নাই, চা খাইবা কী দিয়া?’

‘মা, বেবস্তা অইবো।’ জোর দিয়ে বলল রুকু।

চিরতার পানি গলাধঃকরণের মতো মুখ করে রেগে গেলেন রূপচান বিবি। ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, ‘অত খ্যাচোর-ম্যাচোর কইর না।’

এমধ্যেই হুলস্থ’ল চারদিকে। পুলিশ এসেছে। কেউ কেউ চেঁচামেচি করে বলাবলি করল—ডাকাত ধরতে এসেছে। সিগারেট নিভিয়ে টিভিটা অফ করল হাশেম।

ঘর থেকে বেরুতেই পুলিশ হাশেমকে ধরে ফেলল। এরপর দু’হাতে হাতকড়া পরিয়ে মাঝবয়সী এক পুলিশ সদস্য বললেন, ‘তুই, হাইস্যা কসাই না? এখন তোর মালিকরে ধরব।’

মুহূর্তের মধ্যেই কামাল আর সামসু ভোঁ-দৌড়ে পালাল। ঈষৎ কৌতূহলে হিরুর মা মুখ বের করে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে ঘরেই ফিরে পালঙ্কে পা উঠিয়ে বসলেন।

‘বৌ, তুমি ওগোরে চিনতে পারতাচো না। কামাইল্যাগোরে আমি চিনি।’

কণ্ঠে বিনয় ঝরে রুকুর। ‘মা, কী করুম। পুরাডা দিন একা একা থাকি তো।’

গভীর রাত। তুফানে বস্তির ঝুম নিরবতা নেই। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘনঘন। আকাশ ফাটা বৃষ্টি  নেমেছে। দূরে কোথাও  বজ্রপাত। বউকে জড়িয়ে ধরে হিরু। কেটে গেছে ওর দুশ্চিন্তা। হেডমিস্ত্রির সঙ্গে  সেও সহকারি ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজটা ছেড়ে দিয়েছে। এককোণে ছোটখাটের ওপর বিছানায় শুয়ে রয়েছেন শাশুড়ি। ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে রুকু বলল, ‘মায়ে গভীর ঘুমে। ফজরের নমাজের আগে ঘুম ভাঙবেই না।’

‘জানি, তুমি আমায় আদর করলে মায় খুশি অয়। ত্যয়, এ্যাইডা তুমি বোজো?’ হিরুর এমন প্রশ্নে চোখোচোখি তাকায় রুকু। ওর পিঠে চিমটি কাটে।

ব্রায়ের হুকটা খোলার জন্য হিরুর ডানহাতটা নিজের পিঠের দিকে টেনে নিল। এরপর  ফিসফিস করে বলল, ‘এ্যাইডা একটু খোলো তো। নতুন তো, টাইট।’

//জেডএস//

লাইভ

টপ