ভাস্কর্য

Send
নভেরা হোসেন
প্রকাশিত : ১১:২৭, জুলাই ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৯, জুলাই ২৩, ২০২০

মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। নন্দিতাকে এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই বেরোতে হবে, উপায় নেই, আর্ট কলেজে যৌথ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, সেখানে নন্দিতার তিনটি ওয়াটার কালার আর দুটো পেস্টাল পেইন্টিং রয়েছে। এই প্রদর্শনীটা কিছুটা ভিন্ন ধরণের, এখানে একাডেমিক শিল্পীরা নয় বরং যারা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে আঁকা-আঁকি করে তাদের নিয়ে এক্সিবিশন। নন্দিতার বাবা একজন কবি ছিলেন, ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে নানা ধরণের বইয়ের সমাবেশ, বাবার ঘরে শুধু বই আর বই। সেখানে কী নেই? বাংলা প্রাচীন সাহিত্য থেকে শুরু করে হিন্দু মিথোলজি, লুইস হেনরি মর্গানের ‘এনসিয়েন্ট সোসাইটি’, ফরাসি চিত্রকলার ইতিহাস, স্টিফেন হকিন্স। তবে নন্দিতা বাবার সংগ্রহে থাকা বিচিত্রা পত্রিকার একটি সংখ্যা দেখে চমকে উঠেছিল, সেখানে একজন ভাস্কর গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন, হাতে ছেনী জাতীয় কিছু। শিল্পী নভেরা আহমেদ। নন্দিতা নভেরার চোখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেছিল, কি ধারালো দৃষ্টি!, যেন অসংখ্য চোখ দেখছে চারপাশের জগৎটাকে। এরপর হাসনাত আব্দুল হাইয়ের নভেরা উপন্যাসটা পড়ার সুযোগ হলো, নন্দিতা তন্ময় হয়ে সেই শিল্পীর জীবন নিয়ে ভাবতে থাকতো ।

এতদিনে নন্দিতা যেন নিজের একটা জগৎ খুঁজে পেলো। ছোট থেকেই নানা জিনিস জোড়া দিয়ে একটা অবয়ব তৈরী করার একটা স্বভাব ছিল নন্দিতার। ঘোড়া, মানুষ, ময়ূর, পাখি কত কি! সারাদিন কাঠ নিয়ে একটু একটু করে কোনো অবয়ব, ভাবনাকে তৈরী করা। পড়াশোনার মাঝেই ওর হাতে বাটাল, হাতুড়ি, নানা সূক্ষ্ম যন্ত্র। প্রকৃতিকে খুঁড়ে বের করতে লাগলো এক টুকরো শুষ্ক কাঠের মধ্যে অথবা মাটি, ব্রোঞ্জ নানা উপকরণ দিয়ে বানাতো  ভাস্কর্য। এর মধ্যে মানুষের ফরমটি ওকে বেশি টানে।

বৃষ্টির দাপটটা একটু কমেছে মনে হয়। বাসার সামনে রাস্তায় প্রায় হাঁটু সমান পানি, কিন্তু নন্দিতাকে আর্ট কলেজে যেতে হবে। গায়ে একটা রেইন কোট চাপিয়ে ভরা বৃষ্টির মধ্যে নন্দিতা বাসা থেকে বের হলো, গলির ভেতরের হাঁটুপানি কোনো মতে পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠলো নন্দিতা, রাস্তায় লোকজন নেই বলতে গেলে। একটা মুদি দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে রিক্সা বা সিএনজির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো নন্দিতা। প্রায় বিশ মিনিট হয়ে গেলো কোনো যানবাহনের দেখা নেই,  নন্দিতা অগত্যা হাঁটতে শুরু করলো। শংকর বাস স্ট্যান্ড ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেলো, হঠাৎ পিছন থেকে কেউ একজন নন্দিতা বলে ডাকলো কিন্তু চেনা কাউকে দেখা গেলো না। পাশে এসে একটা সিএনজি দাঁড়ালো, সিএনজির ভেতর থেকেই ডাকটা আসছে, আরে কলেজের সহপাঠী মুনির, কত দিন পর ! নন্দিতা মুনিরকে দেখে খুব উচ্ছসিত হয়ে উঠলো, মুনির সিএনজির ভেতর থেকে বেরিয়ে নন্দিতার কাছে জানতে চাইলো কেমন আছো? এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাচ্ছ?

নন্দিতা বললো আজ আমার এক্সিবিশন আছে, আর্ট কলেজে যেতে হবে, কিছুতেই যেতে পারছি না। মুনির বললো আমিতো মতিঝিল যাবো, চলো তোমাকে নামিয়ে দেই, নন্দিতা কিছু না ভেবেই সিএনজিতে উঠে বসলো, দুজনে কলেজ জীবনের অনেক স্মৃতিচারণ করতে লাগলো, ওই সময় মুনির নন্দিতাকে খুব পছন্দ করতো কিন্তু নন্দিতা মুনিরকে তেমন একটা পাত্তা দিতো না, ইন ফ্যাক্ট নন্দিতা প্রেমের বিষয়ে সব সময় একটু নির্লিপ্ত। ও যেন কী চায় নিজেও জানে না। বড় রাস্তায় পানি জমে গেছে, সিএনজিওয়ালা বললো ইঞ্জিনে পানি ঢুকলে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে, মুনির বললো যেভাবেই হোক আমাদের আর্ট কলেজে নামিয়ে দিন। অনেক কষ্টে নন্দিতা-মুনির এক্সিবিশন হলে পৌছালো, মুনিরও ওর সাথে নামলো । মুনিরকে নিয়ে এক্সিবিশন হলে ঢুকতে নন্দিতার একটু অস্বস্তি লাগছিলো তবু তাকে আজ এড়ানো যায় না, মুনির একদম রাত পর্যন্ত এক্সিবিশন হলে থাকলো। নন্দিতা সাংবাদিকদের  ইন্টারভিউ দিয়ে বাসায় যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো, মুনির বললো চলো একসাথে ফেরা যাক, নন্দিতা বললো তোমার মতিঝিলের কাজে গেলে না?

মুনির হেসে বললো তার চেয়েও বড় একটা কাজ হয়ে গেলো।

মানে? বুঝি নাই।

না আজ আর ওই কাজে যাবো না ভাবলাম, তোমার কাজ দেখলাম। আর্ট কলেজের সামনে বসে চা খাবার সময় মুনির নন্দিতার হাতের উপর হাত রাখলো, নন্দিতা খুব অপ্রস্তুত হয়ে হাতটা সরিয়ে নিলো, হঠাৎ করে কেমন যেন একটা অস্বস্তি এসে ভর করলো মনে। এত বছর পর মুনিরের সাথে দেখা, এখন ওর জীবন সম্পর্কে নন্দিতা কিছুই জানে না, আর এতো অল্প সময়ের মধ্যে মুনিরের ভাব-ভঙ্গির পরিবর্তন নন্দিতাকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিলো, কিন্তু এমন একটা অবস্থা মুনিরকে এড়ানো ও যাচ্ছে না। এতক্ষণে বৃষ্টি কমে এসেছে, একটা খালি সিএনজি দেখে মুনির শংকর পর্যন্ত ভাড়া ঠিক করলো, চায়ের দোকানের ঘটনার পর থেকে নন্দিতা কিছুটা অস্বস্তিতে ভুগছিল, মুনিরের সব কথায় হা-হু উত্তর করছিলো ।

দু’জনে সিএনজিতে চড়ার পর নন্দিতা একদম চুপ হয়ে গেলো, সিএনজির এক পাশে ঘেঁষে বসার চেষ্টা করলো, মুনির পেছন থেকে নন্দিতার কাঁধে হাত রাখতে চেষ্টা করলো, নন্দিতা সামনের দিকে ঝুঁকে বসলো। মুনির হঠাৎ বললো নন্দিতা মনে হচ্ছে আমাকে নিয়ে টেনশন করছো?

না তা কেন হবে?

না তখন থেকেই দেখছি কেমন গুটিসুটি মেরে আছ।

নন্দিতা এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে একমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো । নন্দিতার বাসার সামনে সিএনজি এসে থামলে নন্দিতা ভদ্রতা করে বললো মুনির বাসায় আসো, মার সাথে আলাপ হবে ।

মুনির বললো আজ নয়, অন্য কোনো দিন, আজ অনেক  রাত হয়ে গেছে, তোমার মোবাইল নম্বরটা বলো সেভ করে নেই। নন্দিতা নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে মুনিরের বিজনেস ফার্মের কার্ড নিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো। এক্সিবিশন নিয়ে নন্দিতার মনে যত উচ্ছ্বাস তৈরী হয়েছিল মুনিরের উপস্থিতির কারণে তা কিছুটা দমে গেছে, বিশেষ করে শেষের দিকে মুনিরের আচরণ নন্দিতার ভালো লাগছিলো না। রাতে ফিরে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করে একটা ভালো ঘুম দিলো, সকালে উঠে পুরো বিষয়টাকে খুব অগুরুত্বপূর্ণ মনে হলো ।

এর মধ্যে বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো, নন্দিতা নিজের স্কুল আর আঁকাআঁকি নিয়ে মগ্ন হয়ে ছিল, প্রায় দেড় মাস চলে গেলো, মুনিরের কথা একরকম ভুলেই গিয়েছিলো। হঠাৎ মোবাইল ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কল আসলো, প্রথমে কয়েকবার লাইনটা কেটে দিলো নন্দিতা, তারপর মনে হলো কোনো জরুরি ফোনওতো হতে পারে। ঐপাশ থেকে বেশ ভারী পুরুষকণ্ঠ।

নন্দিতা কেমন আছো?

নন্দিতা প্রথমে চিনতে পারলো না, তখন মুনির বললো, এতো দ্রুত আমাকে ভুলে গেলে? এই সেদিনইতো দেখা হলো । তখন নন্দিতা চিনতে পারলো, একটু অস্বস্তি হতে লাগলো, মুনির হাসিখুশি ভঙ্গিতে বললো সেদিনতো তোমার পেইন্টিং দেখে আমি মুগ্ধ, আর আজ তোমাকে আমার একটা কাজ দেখাতে ইচ্ছে হলো । নন্দিতা জানতে চাইলো কী কাজ?

মুনির বললো আমিও একটু-আধটু আঁকাআঁকি করি, তবে তোমার মতো অতো ভালো নয়। কাঠ আর মেটাল দিয়ে ভাস্কর্য তৈরী করি। মুনিরের কথা শুনে নন্দিতা চমকে উঠলো, ছেনি-বাটালি হাতে নভেরা আহমেদের বিচিত্রার ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। 

এতদিন তোমাকে ফোন করিনি, কারণ একটা বিশেষ কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।

আজ তোমাকে দেখাবো বলে মনে মনে স্থির করলাম।

এ তো খুব ভালো কথা, অবশ্যই দেখবো কিন্তু আজ না। আজ বাসায় কিছু গেস্ট আসবে। মুনির একটু অসহিষ্ণু হয় পড়লো। বললো ওনারা চলে যাওয়ার পর এসো।

না না ওদের যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে।

রাতেই আসো।

নন্দিতা মুনিরের আকুতি দেখে অবাক হয়ে গেলো, বললো না মুনির আজ সম্ভব না, তুমি আরেকদিন ফোন করো, আজ রাখি।

মুনিরের ফোনের কণ্ঠে কেমন যেন একটা অসহিষ্ণুতা ঝরে পড়ছিলো। নন্দিতা ভাবছিলো বিষয়টা নিয়ে, মুনির কি আবার তার পুরানো প্রেমকে নিয়ে নষ্টালজিয়াতে ভুগছে?

এর পর প্রায় এক সপ্তাহ চলে গেলো ।

মুনির একদিন রাতের বেলায় ফোন করলো—

নন্দিতা কী খবর ?

এই তো ভালো।

তুমি? 

আছি একরকম… তুমিতো কখনো ফোন করলে না?

আসলে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, করা হয়নি। 

নন্দিতা তোমার কি কাল সন্ধ্যায় সময় হবে?

কেন বলো তো?

না আমার কাজটা তোমাকে দেখতে চেয়েছিলাম...

হুম, আচ্ছা দেখি...

না না দেখি না কাল অবশ্যই এসো। আমার কার্ডের পেছনে বাসার ঠিকানা দেওয়া আছে, বিকালে এসো আমি অপেক্ষা করবো।

নন্দিতাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মুনির লাইন কেটে দিলো।

নন্দিতা সারারাত এপাশ-ওপাশ করলো, ঘুম হলো না, কেমন একটা অচেনা ফিলিং হচ্ছে। মুনিরের ওখানে যেতে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে, ওর ব্যবহার কেমন যেন ব্যাখ্যাতীত। আবার মুনিরকে সরাসরি এড়ানো যাচ্ছে না। স্কুল থেকে ফিরে ঘরে শুয়ে থাকলো চুপচাপ, মা বললো কীরে শুয়ে আছিস কেন? শরীর খারাপ?

নন্দিতা কোনো জবাব দিলো না, বিকাল হতেই অস্থির লাগতে শুরু করলো। বাসা পেতে তেমন সমস্যা হলো না, কলাবাগান ডলফিনের গলিতে তিরিশ নম্বর বাসা। একটা পাঁচতলা বাড়ির চিলে কোঠায় মুনির থাকে। ফোন দিতেই মুনির চাবি হাতে নিচে নেমে এলো, একটা লাল রঙের ফতুয়া পড়েছে, চোখে-মুখে চাপা উত্তেজনা ।

মুনির বললো আমি ভেবেছিলাম তুমি আসবেই না ।

কেন? না এমনি মনে হয়েছিল ।

তুমি কি একাই থাকো?

হুম, অনেকদিন ধরে।

আব্বা-আম্মা কুমিল্লাতে।

ও তোমার ভাই বোন?

ওরা সব আমেরিকাতে ।

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই একটা বেলি ফুলের সুগন্ধ ভেসে আসলো, এয়ার ফ্রেশনার। বসবার ঘরে মাটিতে বসবার ব্যবস্থা, সেলফে অনেক বই, নানারকম ভাস্কর্য চারপাশে ছড়ানো। একটা বাজ পাখি, ডানা ছেঁড়া, রক্তাক্ত। দুটি নারী মূর্তি পরস্পরকে জড়িয়ে আছে। নন্দিতা মুনিরের কাজ দেখে অবাক হলো । মুনির দু-কাপ চা বানিয়ে আনলো, সাথে পনিরের সমুচা, নন্দিতা চেয়ে চুমুক দিয়ে জানতে চাইলো তোমার সেই বিশেষ বস্তুটি কী? ওহ আছে, অপেক্ষা করো, চা-টা শেষ করো, দেখলেইতো জানা হয়ে যাবে।

নন্দিতা একটা সমুচায় কামড় দিয়ে চা-টা শেষ করলো, একটু অস্থির লাগছে। এখান থেকে দ্রুত চলে যেতে ইচ্ছে করছে। নন্দিতা বললো একটু তাড়াতাড়ি করো, একটা কাজ আছে সেখানে যেতে হবে।

দাঁড়াও যাবেতো, এখানেতো থাকার জন্য আসোনি, আর তোমার চেহারার যা অবস্থা হয়েছে। নন্দিতা হাসার চেষ্টা করলো, না না কী হবে, একটু ক্লান্ত লাগছে...

কফি খাবে?

না না আর কিছু খাবো না…

মুনির নন্দিতাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলো, এটাকে বেডরুম কাম ষ্টুডিও বলা যাবে, মাটিতে মেট্রেস পেতে বিছানা, বিছানায় কয়েকটা বীয়ারের কৌটা, অ্যাশট্রে, কয়েকটা কলম, প্যাড, আর সারা ঘরে কাঠের, মেটালের নানা ভাস্কর্য। একটা চৌবাচ্চার মধ্যে নারী-পুরুষ সঙ্গমরত, একটা অচেনা প্রাণীর শুধু অবয়ব। নন্দিতা বুঝলো মুনির সাধারণ ছেলে না, তার চিন্তা ভাবনায় প্রকৃত শিল্পীর ছাপ। পাশেই একটা পাঁচ ফুটের মতো ভাস্কর্য কাপড় দিয়ে ঢাকা, মুনির তার সামনে নিয়ে নন্দিতাকে দাঁড় করলো, বললো কাপড়টা সরাও। নন্দিতা কাঁপা কাঁপা হাতে কাপড়টা সরিয়ে চমকে উঠলো। নন্দিতার নগ্ন মূর্তি, স্তনগুলো যেন নন্দিতাকে দেখছে।

মুনির বললো কিছুতেই কাজটা শেষ করতে পারছিলাম না, মনে হলো তোমাকে সামনে দাঁড় করিয়ে কাজটা করলে শেষ করতে পারবো ।

নন্দিতা কোনো জবাব দিলো না, এক দৃষ্টিতে নিজের নগ্ন মূর্তির দিকে তাকিয়ে রইলো । মুনির পেছন থেকে এসে নন্দিতার কোমর আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করলো, নন্দিতা গায়ের সব শক্তি দিয়ে ছোটার চেষ্টা করলো। কিন্তু মুনিরের হাত দুটো যেন পাথরের মতো স্হির, এক চুল সরানো যাচ্ছে না। নন্দিতা জোরে চিৎকার করলো, কিন্তু মুনির সামনের ঘরে ফুল ভলিউমে গান ছেড়ে এসেছে। দ্রুত হাতে একটা দড়ি দিয়ে নন্দিতার হাত আর পা দুটো বেঁধে ফেললো, চললো নানারকম শারীরিক অত্যাচার। নন্দিতা নিজেকে মুক্ত করার অনেক চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতেই পারলো না, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে এলো। মুনির নন্দিতাকে আটকে রাখলো, এভাবে প্রায় পাঁচ দিন চলার পর নন্দিতা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো, রক্তপাত বন্ধ হচ্ছিলো না। মুনির  নন্দিতাকে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিচে গেটের কাছে নিয়ে একটা সিএনজিতে করে ধানমন্ডির একটা নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গেলো। ড্রাইভারকে বললো, সামনের ব্যাংক হতে কিছু টাকা তুলতে হবে, এক্ষুণি আসছি। সাথে রুগী, আপনি অপেক্ষা করেন ।

ড্রাইভার বললো রোগীর অবস্থাতো ভালো না মনে হয় ।

হুম ভাই হাসপাতালে নেবো তাই টাকা আনতে যাচ্ছি ।

ড্রাইভার গাড়ি সাইড করে দাঁড় করালো। মুনির দ্রুত হেঁটে অন্য রাস্তা দিয়ে গিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে চলে গেলো। সিএনজিওয়ালা অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বুঝলো ওই লোক কেটে পড়েছে, রোগী সংজ্ঞাহীনের মতো, ব্লিডিং হচ্ছে, দ্রুত সে সামনের একটা ক্লিনিকে নিয়ে গেলো ।

ক্লিনিকের লোকজন বললো রোগীর সাথে কে আছে?

সিএনজি ড্রাইভার বললো আমি নিয়ে এসেছি, আগে রোগীর চিকিৎসা করান। ক্লিনিকের লোকজন বললো আগে বাড়ির লোক আসুক তার আগে রোগীর এডমিশন হবে না। নন্দিতাকে অনেকক্ষণ একটা স্ট্রেচারে বারান্দায় শুইয়ে রাখা হলো। ড্রাইভার বললো আমি বাড়িতে খবর দিচ্ছি। নন্দিতার সাথে থাকা ব্যাগ থেকে মোবাইল পাওয়া গেলো, সেখান থেকে কয়েকজনকে ফোন করার পর নন্দিতার স্কুলের কলিগ আফরোজা আসলো তারপর নন্দিতাকে ভর্তি করা হলো ।

নন্দিতা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছু সময় পর জ্ঞান হারিয়ে ফেললো পুরোপুরি। তারপর তার আর কিছু মনে ছিল না। নন্দিতার জ্ঞান ফিরলো যখন হাসপাতালের বিছানায় মা মুখের উপর তাকিয়ে আছে। নন্দিতার বুক চেপে কান্না আসছিলো কিন্তু ও যেন কান্নার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকলো, ডাক্তাররা নন্দিতার মাকে জানালো নন্দিতার উপর কয়েকদিন ধরে শারীরিক নির্যাতন হয়েছে। এখন সে শকের মধ্যে আছে, কথাও বলছে না তেমন, ওকে পরিচর্যা করে সুস্থ করে তুলতে হবে। পুলিশ কেস হলো, নন্দিতার কাছ থেকে তেমন কিছু জানা গেলো না, সে শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কোনো কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। নন্দিতাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো। নন্দিতার মা মেয়ের সুস্থতার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো আর নন্দিতা যেন কিছুই চাই না, তার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, জীবনের সব অনুভূতি যেন সে হারিয়ে ফেলেছে, একটা অস্ফুট আর্তনাদ ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছে। একটা চাপা ক্রোধ, সবকিছু শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে আবার ন্যাতিয়ে পড়ে। নন্দিতা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দেয়ালের দিকে, কখনো কখনো বিচিত্রায় দেখা সেই ভাস্করের মুখচ্ছবি মনে ভেসে ওঠে, হাতে ছেনি, বাটালি, মাথার মধ্যে ঘুন পোকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ