শহীদ কাদরী প্রসঙ্গে জফির সেতু

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : তানভীর রহিম
প্রকাশিত : ০৯:০০, আগস্ট ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, আগস্ট ২৮, ২০২০

শহীদ কাদরী বাঙালি কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করেছেন। দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ববোধ এবং প্রকৃতি ও নগর জীবনের অভিব্যক্তি তার কবিতার ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যেকে বৈশিষ্ট্যায়িত করেছে। তার কবিতায় অনুভূতির গভীরতা, চিন্তার সূক্ষ্মতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ চারটি। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক।

আজ ২৮ আগস্ট শহীদ কাদরীর মৃত্যুবার্ষিকী। তার কবিতা সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন নব্বই দশকের কবি জফির সেতু।

আলাপকারী : শহীদ কাদরীকে এখনও কেন পড়তে হবে—এরকম একটি ফেসবুকীয় প্রশ্নের উত্তরে আপনি কী বলবেন?

জফির সেতু : বলা যায়, চল্লিশের দশকের পরে যখন বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা ভেঙে পূর্ববঙ্গে তথা ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্য বা বাংলাদেশের সাহিত্যের যে বিকাশ হতে যাচ্ছিল—বিশেষ করে বাংলা কবিতা বাংলাদেশের কবিতা হয়ে উঠছিল—সেই কবিতা হয়ে ওঠার পেছনে যে কয়জন কবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে শহীদ কাদরী একজন।

কবিতাকে যে কবিতা হয়ে ওঠতে হবে—মানে শিল্প হয়ে ওঠার প্রকরণগত দিকে ওই সময় যারা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন, বা উত্তরকালে যারা এই ধারা অনুসরণ করেছেন তাদের মধ্যে শহীদ কাদরীর অতুলনীয় অবদান রয়েছে।

বিশেষ করে তিনি বাংলা কবিতার মেদ-বহুল শরীরটাকে নির্মেদ করতে করেছেন, এটা একটা দিক। আবার অন্য দিক হচ্ছে, বাঙালির যে স্বাভাবিক ভাবালুতা—ঔপনিবেশিক কাল থেকে মানুষের যে সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামকে শুদ্ধ শিল্পচর্চার সাথে সংযুক্ত করা। এসব ব্যাপারে শামসুর রাহমান যেমন আবেগী ছিলেন, শহীদ কাদরী ঠিক তার বিপরীতে; আবেগকে সুসংহত-পরিশীলিত ও পরিমিত করেছেন।

আমি আবারও বলছি, বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে কবিতার আঙ্গিক বা অন্যান্য আনুষাঙ্গিক বিবেচনার ক্ষেত্রে তিনি খুবই সচেতন ছিলেন। যে কারণে বাংলা কবিতায় তার একটা বড় ভূমিকা আছে।

 

আলাপকারী : এই কারণে আপনি বলতে চান তাকে পাঠ করা জরুরি আমাদের সূচনা-বিন্দুকে বোঝার জন্য?

জফির সেতু : হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটাই। যদিও শহীদ কাদরীর কবিতায় আমরা যে নগর বা নাগরিক অনুসঙ্গ, যে আধুনিকতা বা নগরকেন্দ্রিক যে সংবেদনশীলতা পাই তা কতখানি সহজাত তা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে।

 

আলাপকারী : তার নাগরিকতা আরোপিত না খণ্ডিত?

জফির সেতু : আমি মনে করি খণ্ডিত। তার আধুনিকতা ত্রিশের আধুনিকতাবাদেরই প্রতিফলন। ত্রিশের আধুনিকতাবাদকে আমি গোটা ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের পরিবর্তে দু-একটা ঔপনিবেশিকদের তৈরি আধুনিকতা বলে মনে করি। বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স।

আমি মনে করি, শহীদ কাদরী বোদলেয়ারের প্রভাব আত্মস্থ করতে পারলেও কিছু জায়গায় মেকিত্ব বা বানানো ব্যাপারও আছে। তারপরও তার কবিতাগুলো উতরে গেছে।

 

আলাপকারী : শহীদ কাদরীকে কবীর সুমনের গান বা দু-একটা জনপ্রিয় কবিতা দিয়ে বিচার করলে তার প্রকৃত কবিত্বের কাছে পৌঁছানো যায় কি না? শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। জনপ্রিয় এবং তরল কবিতাগুলো বেশি আলোচিত।

জফির সেতু : এটা সত্য যে, শহীদ কাদরীকে কয়েকটি কবিতা দিয়ে বিচার করা হচ্ছে, যেমন 'তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা' বা 'রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট' এই ধরনের কিছু কবিতাই সামনে আসছে। কিন্তু 'উত্তরাধিকার' কিংবা 'বৃষ্টি, বৃষ্টি' বা এ ধরনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিতার যে শিল্পমান তা এক কথায় অনবদ্য। যা পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য কবিতার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করি। ওই সমস্ত কবিতা সাধারণের কাছে পৌঁছেনি বা তেমন আলোচনায় আসেনি।

 

আলাপকারী : জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ বা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন ইত্যাদি পার করে যখন আমরা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম—ধরুন যাদের বয়স চল্লিশের নিচে বা আপনাদের কাছাকাছি, তাদের কাছে এসব প্রসঙ্গ শিল্পের বিষয় হিসেবে কি গ্রাহ্যতা পাচ্ছে? বা এই সমস্ত কবিতা?

জফির সেতু : শিল্পের যদি বেসিক লক্ষ্য থাকে, যেমন আমি জাতীয়তাবাদ নির্মাণ করবো বা দাবী আদায় করবো—এটা একান্তই আমার মত, আমি মনে করেছি যে, শিল্পের মধ্যে যদি এই ধরনের চেতনা কাজ করে সেটা মহৎ হয়ে উঠতে পারে না।

 

আলাপকারী : আমরা যখন শহীদ কাদরী বা শামসুর রাহমান বা অন্যান্যদের চর্চার কথা বলি, এই চর্চাটা কীভাবে করা যায়? এটা কি শুধু পিএইচডি থিসিসের মধ্যেই থাকবে? মানে, এই চর্চা বলতে আমরা কী বুঝি?

জফির সেতু : আসলে পিএইচডি থিসিস বা প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা—এসব কোনো কাজেই লাগে না। এসব মাস্টারদের কী কাজে লাগে? বরং কবিতাকে নষ্ট করার জন্য তো একজন মাস্টারই যথেষ্ট। এখন হচ্ছে, শহীদ কাদরীর কবিতা-চর্চার মধ্য দিয়ে উত্তরকালের কবিরা কীভাবে লাভবান হতে পারে, এটাই বোধহয় প্রশ্ন তাই না?

 

আলাপকারী : হ্যাঁ।

জফির সেতু : মানে তারা কী নিতে পারে, তাইতো?

 

আলাপকারী : হ্যাঁ।

জফির সেতু : আমি মনে করিকবি হিসেবে শিল্পের প্রতি তার যে কমিটমেন্ট ছিল এবং আমরা দেখতে পাই তার কবিতায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অভিঘাত এসছে, মুক্তিযুদ্ধ এসেছে কিন্তু সেসব তার কবিতার মানকে কখনো ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং ব্যক্তিক এবং জাতীয় চিন্তাকে সংশ্লিষ্ট করে কীভাবে যথার্থ শিল্পচর্চা করা যায় তার একটা বড় উদাহরণ শহীদ কাদরী দেখিয়েছেন। এই জায়গাটি নিশ্চয়ই উত্তরকালের কবিরা ভাববেন, কারণ শিল্প কখনোই সমাজ-রাষ্ট্র নিরপেক্ষ বিষয় নয়।

 

আলাপকারী : শহীদ কাদরী কি তার সমকালে বা উত্তরকালে কম মূল্যায়িত? আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান বা সৈয়দ শামসুল হকের তুলনায়?

জফির সেতু : শামসুর রাহমান বাংলাদেশে যেমন চর্চিত বা আল মাহমুদকে মানুষ যেভাবে জানেন শহীদ কাদরীকে সেভাবে জানেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যারা কবিতা লিখতে আসেন এবং যারা আবৃত্তি করেন এর বাইরে শহীদ কাদরীর তেমন পরিচয় নেই।

আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, শামসুর রাহমানের পপুলারিটির একটা কারণ আছে এবং আল মাহমুদেরও। যদিও তারা দু'জনেই বড় কবি। কিন্তু সেই কারণগুলো শহীদ কাদরীর ক্ষেত্রে ঘটেনি, বা তিনি ঘটতে দেননি। তাই শহীদ কাদরী বহুল পঠিত নয়। তবে আমি মনে করি, শহীদ কাদরীকে পুনঃপাঠের যথেষ্ট দরকার আছে।

 

আলাপকারী : আমাকে সময় দেবার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। শুভ কামনা।

জফির সেতু : আপনাকেও ধন্যবাদ জানাই।


বৃষ্টি, বৃষ্টি | শহীদ কাদরী

সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর–ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভীড়ে

যারা তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটলো, চৌদিকে

ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মত যেন বা মড়কে

শহর উজাড় হবে,—বলে গেল কেউ—শহরের

পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে খুব ঠাণ্ডা এক ভয়াল গলায়

 

এবং হঠাৎ

          সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে

          বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম!

বজ্র–শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি : শ্রুতিকে বধির ক’রে

গর্জে ওঠে যেন অবিরল করাত–কলের চাকা,

লক্ষ লেদ–মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন!

 

নামলো সন্ধ্যার সঙ্গে অপ্রসন্ন বিপন্ন বিদ্যুৎ

মেঘ, জল, হাওয়া,—

               হাওয়া, ময়ূরের মতো তার বর্ণালী চিৎকার,

কী বিপদগ্রস্ত ঘর–দোর,

ডানা মেলে দিতে চায় জানালা–কপাট

নড়ে ওঠে টিরোনসিরসের মতন যেন প্রাচীন এ–বাড়ি!

জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় জনারণ্য, শহরের জানু

আর চকচকে ঝলমলে বেসামাল এভিনিউ

 

এই সাঁঝে, প্রলয় হাওয়ার এই সাঁঝে

         (হাওয়া যেন ইস্রাফিলের ওঁ)

বৃষ্টি পড়ে মোটরের বনেটে টেরচা,

ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নীচু

ত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে

দ্যাখে,—জল

অবিরল

জল, জল, জল

তীব্র, হিংস্র

খল,

          আর ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় শোনে

ক্রন্দন, ক্রন্দন

নিজস্ব হৃৎপিণ্ডে আর অদ্ভুত উড়োনচণ্ডী এই

বর্ষার ঊষর বন্দনায়

 

রাজত্ব, রাজত্ব শুধু আজ রাতে, রাজপথে–পথে

বাউণ্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদের, উন্মূল, উদ্বাস্তু

বালকের, আজীবন ভিক্ষুকের, চোর আর অর্ধ–উন্মাদের

বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ। রাজস্ব আদায় করে যারা,

চিরকাল গুণে নিয়ে যায়, তারা সব অসহায়

পালিয়েছে ভয়ে।

 

বন্দনা ধরেছে,—গান গাইছে সহর্ষে

উৎফুল্ল আঁধার প্রেক্ষাগৃহ আর দেয়ালের মাতাল প্ল্যাকার্ড,

বাৎকা–চোরা টেলিফোন–পোল, দোল খাচ্ছে ওই উঁচু

শিখরে আসীন, উড়ে–আসা বুড়োসুড়ো পুরোন সাইনবোর্ড

তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি

কেননা সিপাই, সান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,

পালিয়েছে ভয়ে।

 

পালিয়েছে, মহাজ্ঞানী, মহাজন, মোসাহেবসহ

অন্তর্হিত,

বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ–পথের চিহ্ন

ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে

কেবল করুণ ক’টা

বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে

বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো

নর্দমার ফোয়ারার দিকে,–

 

ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট–টিন

ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন

মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি

লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপশন, শাদা বাক্সে ওষুধের

সৌখীন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার

ভবিতব্যহীন নানাস্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি

 

এইক্ষণে আঁধার শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে

নগ্নপায়ে ছেৎড়া পাৎলুনে একাকী

হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে

ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকার মতো একমাত্র আমি,

আমার নিঃসঙ্গে তথা বিপর্যস্ত রক্তেমাংসে

নূহের উদ্দাম রাগী গরগরে গলা আত্মা জ্বলে

কিন্তু সাড়া নেই জনপ্রাণীর অথচ

জলোচ্ছ্বাসে নিঃশ্বাসের স্বর, বাতাসে চিৎকার,

কোন আগ্রহে সম্পন্ন হয়ে, কোন শহরের দিকে

জলের আহ্লাদে আমি একা ভেসে যাবো?

[সূত্র : শহীদ কাদরীর কবিতা, প্রকাশক : সাহিত্য প্রকাশ, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ১৯৯৩]

//জেডএস//

লাইভ

টপ