সিঙ্গাপুর সায়েরি | শেষ পর্ব

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১২:৩২, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৫, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০

পূর্ব প্রকাশের পর

পথে ট্যাক্সি ক্যাবের ড্রাইভার প্রসঙ্গক্রমে বললো যে, মুস্তফা সেন্টার হলো সিঙ্গাপুরের গরিবদের মার্কেট, অর্থাৎ বাজেট মার্কেট। তার দেয়া তথ্যমতে যার নামে এই সেন্টার, ইন্ডিয়া থেকে আগত সেই মোহাম্মদ মুস্তফা গত শতকের ষাট-সত্তুরের দশকে সিঙ্গাপুরে সস্তা জিনিসপত্র ফেরি করতো। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এতবড় ব্যবসায়ী। তবে জাতিতে চাইনিজ সেই সিঙ্গাপুরিয়ান ড্রাইভার একটু তাচ্ছিল্যের সাথে একথা বলতে ভুললো না যে, সিঙ্গাপুরিয়ানরা এই গরিবি দোকানে এখনো খুব একটা যায় না, এ দোকানের বেশিরভাগ ক্রেতা এখনো ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি আর বাংলাদেশি। ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান পাশে থাকার সুবাদে বাংলাদেশি হিসেবে এ তাচ্ছিল্য আমি সহজেই গায় মেখে নিলাম। তবে আমি নেট-ফেট থেকে যে তথ্য পেয়েছি তার সাথে ঐ ড্রাইভারের কথার অনেক অমিল রয়েছে। নেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে মুস্তফা সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ মুস্তফা একা নন, বরং এর প্রতিষ্ঠাতা হলো জনাব মোহাম্মদ মুস্তফা (১৯১৬-২০০১), তার ছেলে মুশতাক আহমেদ ও মোহাম্মদ মুস্তফার ভাই শামসুদ্দিন।

এই তিনজন মিলে ১৯৭১ সালে ‘মোহাম্মদ মুস্তফা অ্যান্ড শামসুদ্দিন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’ নামে একটি তৈরি পোশাকের দোকান খোলেন সিঙ্গাপুরের ক্যাম্পবেল লেনে। পরে এর সাথে ইলেক্ট্রনিক পণ্যও যোগ করা হয়। ১৯৭৩ সালে মুশতাক আহমেদ সেরাঙ্গুন প্লাজায় আরও একটি দোকান খোলেন একই নামে। ১৯৮৫ সালে মুশতাক আহমেদ সম্পূর্ণ দোকানটি সেরাঙ্গুন প্লাজায় স্থানান্তর করেন। সেরাঙ্গুন প্লাজায় দোকানের ঘরের ভাড়া ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হলে তিনি লিটল ইন্ডিয়ার সৈয়দ আলভি রোডে মুস্তফা সেন্টারের বর্তমান লোকেশনে প্রথমে একটি ঘর কিনে সেখানে দোকানটি স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করেন। ধীরে ধীরে তিনি পাশের আরও ২০টি ঘর কিনে ফেলেন। একের পর এক ঘর কিনতে থাকেন আর শেষ পর্যন্ত দোকানটি ৭৫০০০ বর্গফুটের একটি শপিং মলের আকার পরিগ্রহ করে। ২০০৩ সাল থেকে এটি পুরো মাত্রায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চলমান একটি সুপারমার্কেট। এখানে এখন ৩ লক্ষ আইটেমের দ্রব্যাদি ক্রয়বিক্রয় হয়। এর সাথে আরও আছে একটি ফরেন এক্সচেঞ্জ সেন্টার ও একটি ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি। সবশেষে ২০১১ সালে এর ছাদের উপরে একটি কাবাব রেস্টুরেন্টও খোলা হয়েছে।

এই প্রতিষ্ঠানকে মূলত এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ মুস্তফার যোগ্য সন্তান মুশতাক আহমেদ। তাঁর জন্ম ১৯৫১ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে। মোহাম্মদ মুস্তফা তখন একা সিঙ্গাপুরে বাস করতেন আর তাঁর পরিবার বাস করতো ভারতে। ১৯৫৬ সালে মোহাম্মদ মুস্তফার স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি ছেলে মুশতাক আহমেদকে সিঙ্গাপুর নিয়ে আসেন। মুশতাককে ক্রাইস্ট চার্চ সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি স্কুল সার্টিফিকেট শেষ না করেই বাবার সাথে ব্যবসায় নেমে পড়েন। ১৯৭১ সালে ‘মোহাম্মদ মুস্তফা এন্ড শামসুদ্দিন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠার পূর্বে তিনি তাঁর বাবার খাবার দোকানের পাশে একটি ছোট দোকান খুলেছিলেন। সেখানে তিনি শুধু রুমাল বিক্রি করতেন। তাঁর রুমাল বিক্রির সাফল্য দেখে বাবা ও চাচা দুজনই খাবারের দোকান গুটিয়ে ‘মোহাম্মদ মুস্তফা অ্যান্ড শামসুদ্দিন প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’ নামে তৈরি পোশাকের দোকান খোলেন ১৯৭১ সালে। সেই ছেলেবেলায় তিনিই প্রথম সিঙ্গাপুরে ‘একদরের’ ব্যবসা প্রবর্তন করেন। এই ‘একদর’ পদ্ধতি তার ব্যবসাকে অল্প সময়ে সারা সিঙ্গাপুরে জনপ্রিয় করে তোলে। এর পরের সাফল্যের কাহিনি তো উপরেই বলা হয়েছে। বর্তমানে মুস্তফা সেন্টারের বার্ষিক বিক্রয়ের পরিমাণ কমবেশি ৩০২ মিলিয়ন ইউএস ডলার, বাংলায় ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। আমেরিকান বিজনেস ম্যাগাজিন ফোরবেস-এর হিসাব মতে ২০০৮ সালে সিঙ্গাপুরের ৪০ জন ধনী মানুষের তালিকায় মুশতাক আহমেদের অবস্থান ছিল ৩৭তম।

মুশতাক আহমেদের এই সুপার মার্কেটে আমার ছেলেমেয়েরা ঘুরলো অনেক, কিনলো খুবই কম। সম্ভবত তারা তাদের বাবার পকেট সম্পর্কে খুব সচেতন। ঘণ্টা-দেড়েক ঘুরে কিছু চকোলেট আর মেমেন্টো সামগ্রি কিনে আমরা বিদায় হলাম মুস্তফা সেন্টার থেকে। আবার গ্রাবের ট্যাক্সি, আবার ঠিকানা ৬১০১৭৭। সেখানে আজকে আমাদের বিদায়ী ডিনার। ডিনারে ইউনুসরা আছে, বন্ধু মোফাজ্জল আছে, মেলবোর্নের পুলিশ বিভাগে চাকুরিরত আবদুল্লাহ আল আমিন মাসুমের সেই ছোট পরিবার আছে, সাথে আরও আছে এক জন—আমাদের রাজাপুরের মাহবুবুল ইসলাম দুলাল ভাই। ডিনারে খাবার আর গল্প সমান তালে চললো। এর আগেই আমাদের যাওয়ার গোছগাছ শুরু হয়ে গেছে। ডিনার শেষে বিদায়ী পর্বে আমার ছেলেমেয়েদের হাত আশীর্বাদের ডলারে ভরে উঠলো। এগুলো মুস্তফা সেন্টারে যাওয়ার আগে হাতে পেলে তারা পুরো মুস্তফা সেন্টারই কেনার পরিকল্পনা করে ফেলতো কিনা আল্লাহ মালুম। পরদিন সকাল আটটার দিকে আমরা রওয়ানা হলাম চাঙ্গি এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টে বোর্ডিং পাস নিয়ে আমরা চললাম চাঙ্গি জুয়েল নামে খ্যাত অত্যাধুনিক শপিংমল-কাম-পার্কটি দেখতে।

জুয়েল চাঙ্গি বাহির থেকে

চাঙ্গি জুয়েলের পরিচয় হলো nature-themed entertainment and retail complex হিসেবে। এটি এককথায় থাকে থাকে সাজানো পাঁচ-তলা একটি বৃত্তাকার বন, যার চতুষ্পার্শ্বে রয়েছে অত্যাধিুনক বিপণি, এভিয়েশন ফ্যাসিলিটিজ, রেস্টুরেন্ট ও একটি হোটেল। এটি চাঙ্গি এয়ারপোর্টের তিনটি টার্মিনালের সাথে সরাসরি সংযুক্ত। আমরা তিন নম্বর টার্মিনাল থেকে একেবারে পায়ে হেঁটে গিয়েছি, যদিও টার্মিনালের স্কাই ট্রেনেও যাওয়া যায়। এই কমপ্লেক্সের একেবারে মধ্যখানে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ কৃত্রিম জলপ্রপাত। প্রপাতটির নাম ‘দি রেইন ভরটেক্স’ (The Rain Vortex)। একটি কাচের বৃত্তাকার অবতল ছাদের মাঝখান দিয়ে ১৭০ ফুট উঁচু থেকে প্রতি মিনিটে ৩৭,৮৫০ লিটার পানির এক অবিরাম প্রপাত এখানে চলমান। ৩০০০ বর্গমিটার কাচের ছাদটি ৯০০০ টুকরা কাচ দিয়ে নির্মিত। প্রপাতের চতুষ্পার্শ্বে পাঁচ তলা ফ্লোরের প্রতি ফ্লোরে ঘোরানো বন এবং দর্শকদের জন্য দৃষ্টিনন্দন বসার স্থান। রাতে দর্শকদের জন্য প্রপাতটি হয়ে ওঠে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর ৩৬০ ডিগ্রি এক স্টেজ।

চাঙ্গি জুয়েলের একেবারে উপরের ফ্লোরে রয়েছে আরও একটি পার্ক, যার নাম ক্যানোপি পার্ক, বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘চাঁদোয়া বন’। পঞ্চম ফ্লোরের অর্ধেকটা জুড়ে এই পার্ক বিস্তৃত। এই পার্কের উপর দিয়ে একটি ঝুলন্ত সেতুও আছে। উঠতে হলে আলাদা টিকেট কাটতে হয়। এখানে দুটি গোলক ধাঁধাঁ ও দুটি মেঘের গামলা আছে। মেঘের গামলা বলছি কারণ গামলা-আকৃতির ঐ বিশাল এনক্লোজোরে লাফ দিলে ঘন কুয়াশা ছেড়ে দেয়া হয় এবং লাফ দেয়া লোকটির অনুভব হয় যে সে মেঘের মধ্যে খেলছে। চাঙ্গি জুয়েলের অভ্যন্তরস্থিত ১৩০ রুমের হোটেলটির নাম ইয়োটেল (YOTEL)।

সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুঙ ২০১৩ সালে তাঁর জাতীয় দিবসের বক্তৃতায় প্রথম এই রকম একটি স্থাপনার ভাবনা ব্যক্ত করেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। খুলে দেয়ার পর থেকে গড়ে প্রতিদিন ৩ লক্ষ ভিজিটর এই স্থাপনা পরিদর্শন করে। এ স্থাপনা নির্মাণে ১.৭ বিলিয়ন সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার ব্যয় হয়েছে। এটির স্থাপত্যশিল্পীও সেই বিখ্যাত ব্যক্তি মোশে সাফদি, যিনি ম্যারিনা বে স্যান্ডস হোটেলেরও ডিজাইনার। এত বিখ্যাত স্থাপনায় আমাদের অবিখ্যাত পদচিহ্নটুকু ঘণ্টাখানেকের জন্য এঁকে রেখে এবং স্মৃতিস্বরূপ আমার মেয়ের জন্য একটি পার্স কিনে এনে আমরা ত্যাগ করলাম জুয়েল চাঙ্গি। তার ঘণ্টাখানেক পরে লায়ন এয়ারের একখানা গরিবি বিমানে আমরা বাপছেলেমেয়ে সবাই ত্যাগ করলাম সিঙ্গাপুরের দামি মাটি। শেষ হলো অনেকদিনের পরিকল্পনার সিঙ্গাপুর সায়েরি।

আরও পড়ুন : সিঙ্গাপুর সায়েরি | পর্ব-০৯

//জেডএস//

লাইভ

টপ