তালমাজ ব্রিজ ও হাটিচিনসন আইল্যান্ড

Send
মঈনুস সুলতান
প্রকাশিত : ১৫:১৭, অক্টোবর ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৭, অক্টোবর ০১, ২০২০

আইকোনিক স্থাপনা তালমাজ মেমোরিয়েল ব্রিজকরোনা ক্রাইসিসে কাকতালীয়ভাবে জুটে গেছে ফ্যামিলি ভেকেশনের সুযোগ। তাই খানিকটা এক্সাইটমেন্ট নিয়ে আমি ও হলেণ আমাদের কন্যা কাজরির সঙ্গে লিফট চড়ে রওনা হই ছাব্বিশতলা ভবনটির ছাদে। গতকাল কাজরির ভাইরাস টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছে, তাই আমাদের একসঙ্গে বেড়াতে যেতে তেমন কোন ঝুঁকি নেই। আমাদের বন্ধুস্থানীয় বয়োবৃদ্ধ জনশন দম্পতির সাভানা শহর থেকে বেশ দূরে গ্রামের দিকে আছে একটি হর্স ফার্ম। তাঁরা তাঁদের ঘোড়ার খামারে তিন রাত্রি কাটানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। হাতে একটু সময় আছে, তাই কাজরি আমাদের নিয়ে এসেছে, এ মেঘছোঁয়া ইমারতের চূড়ায়। আমি অনেক দিন ধরে শহর সংলগ্ন বেজায় লম্বা-চওড়া তালমাজ ব্রিজটি কোনো উঁচু জায়গা থেকে সামগ্রিকভাবে দেখতে চাচ্ছিলাম। তাই কাজরি এ আয়োজন করেছে। ছাব্বিশতলা দালানটি একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা বিশেষ। সাভানাতে লকডাউন উঠে গেছে বটে, কিন্তু এ ইমারতে কর্মব্যস্থতা এখনো শুরু হয়নি। এত উঁচুতে উঠার ব্যাপারটা আমাদের মেয়ে কীভাবে ম্যানেজ করেছে, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। তবে ছাদে এসে-দূরের তালমাজ মেমোরিয়েল ব্রিজটির দিকে তাকিয়ে, এর দিগন্ত-প্রসারি বিস্তার ও ব্যাপ্তি দেখে দারুণ লাগে।

কিন্তু আমার এ ভালোলাগা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, আমাদের মেজবান—ঘোড়ার খামারের মালিকিন মিসেস সিভিল জনশনের কাছ থেকে টেক্সট আসে। খামারে আসার আগে সতর্কতার প্রয়োজনে তাঁরা ভাইরাস টেস্ট করিয়েছিলেন, একটু আগে জানা গেছে যে, তাঁর স্বামী মি. ডাডলি জনশনের করোনা পজিটিভ। তাই তাঁরা খামারে না এসে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছেন। মিসেস জনশন অবশ্য জোর দিয়ে লিখেছেন, আমরা যেন আমাদের ভেকেশন ক্যানসেল না করি। খামারের গেট খোলার কোড নম্বর পাঠিয়ে তিনি আমাদের ওয়েলকাম জানিয়ে ফের লিখেছেন, ‘এনজয় ইয়োর ফ্যামিলি ভেকেশন।’ এ দুঃসংবাদে আমার উৎসাহের বেলনুটি কেমন যেন চুপসে যায়।

আলো পড়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠা চকমিলান গির্জা

দালানের ছাদ থেকে নেমে, ভেকেশন ক্যানসেল করবো কিনা—এ দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে আমরা পার্কিংলটে আসি। কাজরি তার রঙচটা গড়ির দরোজা, ছাদ ও বনেটের কিয়দংশে নানা সাইজের শত—দেড়েক স্টিকার সেঁটেছে। এগুলোর কোনটায় চিত্রের পাশে মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তা, কোনটাতে সামাজিক দূরত্ব বিষয়ক কাটুর্ন, আবার কোন কোন পোস্টার সাইজের স্টিকারে ব্ল্যাক লাইভস্ ম্যাটার আন্দোলনের প্রতি সমর্থকসূচক ম্যাসেজ লেখা। হঠাৎ করে গাড়ির দিকে তাকালে মনে হয়, একখানা কুঁচকানো নকশীকাঁথা কেউ যেন ওখানে শুকাতে দিয়েছে। আমি হলেণের দিকে তাকাই, সম্ভাব্য ভেকেশন-সংক্রান্ত দোলাচল নিয়ে তাকে তেমন চিন্তিত দেখায় না। হর্স ফার্মে আমাদের প্রধান মেজবান ডাডলি সাহেবের কাছ থেকে এবার কল আসে। তিনি আমাদের দোনামোনা ভাব দূর করতে সহায়তা করেন। তাঁর টেস্ট রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে বটে, গলায়ও একটু খুচখুচানি শুরু হয়েছে, কিন্তু ওয়ান—ডে টেস্টগুলোর রেজাল্ট অনেক সময় ইনকারেক্ট হয়, ডাক্তার তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন, ফের টেস্ট করানোর। তিনি ও তাঁর স্ত্রী মিসেস সিভিল জনশন ফার্মে আসতে পারছেন না, তাই বলে আমাদের ভেকেশন মাটি করার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বরং আমাকে ও কাজরিকে আমাদের অ্যাসাইনমেন্টগুলো স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘গাইজ, ডু মি আ ফেভার, কাজরি—প্লিজ টেক সাম কুল পিকচারস্ অব দি হর্সেস, আর সুলতান—তুমি ঘোড়াগুলো নিয়ে তিন—চার হাজার শব্দের মধ্যে একটি রচনা তৈরী করে দিতে পারলে, আমি হর্স ফার্ম নিয়ে ওয়েবসাইটটা দাঁড় করাতে পারবো।’ মিসেস সিভিল হলেণকে আলাদাভাবে ফের টেক্সট্ করে জানিয়েছেন, ডাডলি যদি সত্যি সত্যি কোভিডে কোয়ারিন্টিন হন, তাহলে ওয়েবসাইট তৈরী নিয়ে মেতে থাকলে তাঁর সময়টা ভালো কাটবে, করার কিছু না থাকলে তাঁর মেজাজ খাট্টা হয়ে ওঠতে পারে।

ঘোড়ার খামার নিয়ে গ্লসি পেপারে একটি সচিত্র পুস্তক ছাপানোর আইডিয়া ডাডলির মাথায় ঢুকে এ বছরের প্রথম দিকে। এতে ঘোড়াগুলোর ছবির সাথে তাদের বংশ-তালিকা এবং বিবিধ রেসে তাদের বিজয়ী হওয়ার তথ্যাদি থাকবে। হর্স ফার্মের পেছন দিককার প্রাইভেট বনানীতে গাছপালার আড়ালে আছে দুটি গেস্ট কটেজ। ওখানে যে সব বন্ধুবান্ধব জনশনদের অতিথি হয়ে সময় কটিয়েছেন, তাদের মন্তব্য থাকবে পুস্তকটির একটি চাপ্টার জুড়ে। আমি খামারের সবুজাভ পরিসরে ঘোড়াদের দিনযাপন নিয়ে একটি রচনা তৈরী করে দেওয়ার ওয়াদা করেছি। কিন্তু করোনা সংক্রমণের তুলতবিলে এখনও কিছু লিখে উঠতে পারিনি। মাস তিনেক ঘরবন্দি থেকে ডাডলি ইন্টারন্যাটের কৃৎকৌশল সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেছেন। তরুণ গোছের একজন ওয়েবসাইট বিল্ডারের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয়েছে অন্তর্জালে। বই প্রকাশের প্রসঙ্গ ছাড়ান দিয়ে তিনি এবার ওয়েবসাইট নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে মেতেছেন।

নদীতে ফেরিবোট ও পাড়ে সাভানা নগরী

কাজরি গাড়ি স্টার্ট দিতেই তার দুটি কুকুর কাঁইকুই করে কী যেন বলে। সে এক হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে তাদের দিকে বাড়িয়ে দেয় ডগি—বিস্কিটের কৌটা। সবুজাভ চোখে কৌতূক ফুটিয়ে হলেণ জানতে চায়,‘ আর ইউ গেটিং রেডি টু রাইট আবাউট হর্সেস?’ কনফিডেন্টলি জবাব দেই, ‘ইয়েস ডিয়ার।’ কৈশরে আমি এক প্যাকেট ক্যাপস্টেন সিগ্রেট কিংবা এক বাটি রসমালাই এর বিনিময়ে জানাশোনা মানুষজনদের প্রেমপত্র লিখে দিয়েছি, কোন কোন চিঠির ইতিবাচক ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠেছে যুগল সম্পর্ক, ক্ষেত্র বিশেষে বিয়ে—শাদীর মতো ঘটনাও ঘটেছে, বছর না ফিরতে পাত্রপাত্রির সংসারে খোকাখুকুও পয়দা হয়েছে। তাই ঘোড়াবিষয়ক রচনা লেখার প্রস্তাবে ঘাবড়ে যাওয়ার বান্দা আমি নই। আস্তিন গুটিয়ে জানালার কাচটি নামিয়ে আমি সাভানা শহরের চলমান দৃশ্যপটে নজর দেই।

চকমিলান গির্জার বিশাল ইমারতে তেরছা হয়ে আলো পড়ে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেছে স্থাপত্যটি। তার সিঁড়িতে অলসে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে জনা কয়েক পর্যটক, একজন পুরুষ সেলফোনে ছবি তুলছেন। পাম বীথিকায় ছায়াচ্ছন্ন একটি স্কোয়ার পাশে স্লো হতে হতে ট্যাফিক জ্যামে আটকে যায় গাড়ি। নগরীতে জ্যাম লাগার ঘটনাটি নতুন। কাজরি আইফোন ঢুড়ে কারণ বের করে। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের পরিস্থিতিতে ঘণ্টাখানেক আগে চালু হয়েছে একটি কমার্শিয়াল টেস্টিং সাইট। তার সামনে শতাধিক গাড়ি সড়কের উপর দাঁড়িয়েছে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে। স্কোয়ারের ঠিক মধ্যিখানে বিরাট একটি ঔক গাছ থেকে ঝুলছে সাদাটে—ধূসর পরচুলার মতো স্প্যানিশ মস। তার তলায় দাঁড়িয়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ বাদক সেক্সোফোন বাজাচ্ছেন। বেঞ্চে আধশোয়া হয়ে একজন গৃহহীন পুরুষ পামপাতার সুঁতলিতে বুনছেন ক্রুশকাঠ। সামনের গাড়িগুলো আগ বাড়তেই কাজরি একসেলেটারে মৃদু চাপ দেয়। বেশী দূর যেতে পারি না আমরা। দেখি—পাশের প্রশস্ত সরণীতে সাদা ঘোড়ায় টানা একটি এক্কা গাড়ি খুরের খটাখট শব্দে আস্তে—ধীরে আগাচ্ছে।

সেক্সোফোন বাজাচ্ছেন কৃষ্ণাঙ্গ বাদক

কাজরি স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে বাউলি কেটে ঢুকে পড়ে জ্যামহীন সরণীতে। ব্লক দুই পাড়ি দিতেই পাওয়া যায় সাভানা কলেজ অব আর্টসের কফি আউটলেট। গাড়ি থামিয়ে আমরা ছুটি ওখান থেকে স্যান্ডুইচ কিনতে। বিরাট আকারের একটি হলঘরে সারাই করে রাখা হয়েছে লাল রঙের একটি অকেজো বাস। যানবাহনটি ব্যবহৃত হচ্ছে ক্যাফে হিসাবে। এখানে তরুণ খদ্দেরদের কেউ মাস্ক ব্যবহার করছেন না, তবে ভিড়ভাট্টাও তেমন নেই দেখে খুশি হই।

স্যান্ডুইচ চিবাতে চিবাতে আমরা চলে আসি একটি নেইভারহুড বারে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তিন ধরনের ক্রাফ্ট বিয়ারের জন্য বিখ্যাত এ পানশালায় মাস কয়েক আগেও সন্ধ্যাবেলা বসতো ব্লুগ্রাস মিউজিকের জমজমাট আসর। বিয়ার ব্রু করার তিনজন কারিগর সম্প্রতি শয্যাশায়ী হয়েছেন কোভিডে। তাই সপ্তাদিন আগে ম্যানেজমেন্ট স্বেচ্ছায় বারের কপাটে তালা ঝুলিয়েছেন। তবে ব্যবসা পুরো বন্ধ করেননি। চাইলে জানালায় ক্রেডিটকার্ড বাড়িয়ে দিয়ে ক্রয় করা যাচ্ছে শীতল পানীয়। আরেকটি কাজ করে এরা নাগরিকদের প্রশংসাভাজন হয়েছেন, তা হচ্ছে—সত্তর শতাংশ অ্যালকোহল পূর্ণ তরলের বোতল প্রস্তুত করা। ডিসইনফেকশনের উপায়— সন্ধানী নাগরিকরা তা কিনে নিচ্ছেন, বলা চলে পাইকারী হারে। আমাদের গাড়ি থেকে নেমে জানালায় যেতে হয় না। সড়কের পাশে টেবিল পেতে তাতে সারি দিয়ে রাখা হয়েছে ডিসইনফেকশন লিক্যুইডের বোতল। কাজরি গাড়ির জানালা দিয়ে বাক্সে বিশ ডলারের নোট রেখে তুলে নেয় দুটি বোতল।

শহর থেকে বেরিয়ে আসার মুখে কাজরি ফের একটি গলিতে থেমে টেক্সট্ করে। জানতে পারি, এখানে বাস করছেন হাসপাতাল থেকে চাকুরিচ্যুত মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান ব্রেনডন সাবদিয়ে। তিনি সাভানা থেকে সামান্য দূরে ছোট্ট একটি শহরের হাসপাতালে কাজ করতেন। এপ্রিল মাসে ওই হাসপাতালে কোভিডান্ত রোগির সংখ্যা ছিলো প্রচুর। এদের মধ্যে বেশ কতজন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান—আমেরিকান। সেবা, দানে হাসপাতাল নাকি শ্বেতাঙ্গ রোগিদের দিকে পক্ষপাত দেখিয়েছে। ব্রেনডন নিজের পরিচয় গোপন করে স্যোশাল মিডিয়ায় বিষয়টি শেয়ার করেছিলেন। আমরা জেনেছিলাম যে, আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটারের বেলা শ্বেতাঙ্গ রোগিরা যথাযথ সেবা পেয়েছিলেন, অন্যদিকে কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ রোগিদের হাসপাতালের করিডরে শুইয়ে রাখা হয়েছিলো, অবহেলার ভেতর এদের কারো কারো মৃত্যু হলে হাসপাতাল সময়মতো অত্মীয়স্বজনদেরও জানায়নি। কীভাবে যেন ব্রেনডন সাবদিয়ের পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে। প্রতিক্রিয়ায় হাসপাতাল কতৃপক্ষ তাঁকে কনফিডেনশিয়েল ইনফরমেশন ফাঁস করার অভিযোগ তৎক্ষণাত ফায়ার করে। বর্তমানে বেকার ব্রেনডন তিনপ্রস্ত ফিল্টার দেওয়া মাস্ক তৈরী করছেন। হর্স ফার্মের কর্মচারীরা মাস্ক ব্যবহার করেন না। আমরা তাদের কয়েকটি মাস্ক উপহার দিতে চাই। ফেসশিল্ড ও পিপিই পরা ব্রেনডন বেরিয়ে আসেন। তিনি বেশ দূরে দাঁড়িয়ে সাপ ধরার চিমটার মতো দেখতে একটি দীর্ঘ লাঠির ডগায় এক ডজন মাস্ক আটকে তা পাঠিয়ে দেন আমাদের গাড়ির জানালায়। সুরক্ষা মুখোশগুলোর মূল্যও আমরা একই পদ্ধতিতে ক্যাশ ডলারে পরিশোধ করি।

আমাদের চলার পথে এবার : খানিকটা দূরে দালান—দুমেলার ওপর দিয়ে, সাদাটে—নীল মেঘের ঠিক নিচে ভেসে ওঠে, সাভানা শহরের আইকোনিক স্থাপনা—তালমাজ মেমোরিয়েল ব্রিজ। অনেক উঁচুতে ত্রিশংকু হালতে ঝুলে থাকা ব্রিজটির ভিজ্যুয়েল ইমপ্যাক্ট এত প্রখর যে—আমি মনে মনে সেতুটির একটি জুতসই বর্ণনা ভাবি। মনে হয়, কোন পুরাণ-গ্রন্থের চিত্রিত পৃষ্টা থেকে উড়ে এসে সাভানার নিলীমায় স্রেফ ফ্রিজ হয়ে গেছে অতিকায় এক ধাতব গাঙচিল। বছর কয়েক আগে সাউথ আফ্রিকা থেকে ফ্লাই করে এসে আমরা যে দিন এ নগরীতে ল্যান্ড করেছিলাম, নগরীর তাবৎ স্থাপত্যরাজিড় মধ্যে ব্রিজটি আমার মধ্যে ছড়িয়েছিলো বিপুল বিমুগ্ধতা। সে থেকে ভাবছি, নদীজল থেকে ১৮৫ ফিট উঁচু লোহার পুলটি নিয়ে কিছু লিখবো, কিন্তু এর দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা উড্ডীন শোভার তেমন কোনো উপমা খুঁজে পাই না।

লাল রঙের বাসে কলেজ অব আর্টসের কফি আউটলেট

হলেণ পাশ থেকে আমার কব্জি স্পর্শ করে মৃদু স্বরে বলে, ‘উই উইল নেভার সি দ্য বিউটি অব দিস ব্রিজ থ্রু দ্য স্ক্যাচের অব মি. বারনন।’ মন্তব্যটির সঙ্গে সহমত পোষণ করে জবাব দেই, ‘ইয়েস, দ্যাট ইজ ট্রু।’ ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাবেক সৈনিক রূপালি—চুলো বৃদ্ধ এরিক বারননের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় ভারী ইন্টারেস্টিং একটি পরিবেশে। সাউথ আফ্রিকা থেকে ঘণ্টাবিশেক ফ্লাই করার কারণে—আমরা দুজনে শিকার হয়েছিলাম প্রচণ্ড জেটলেগের। গেস্টহাউসের কামরায় কিংসাইজ বেডে শুয়ে ক্রমাগত এপাশ—ওপাশ করছিলাম, কিছুতেই ঘুম আসছিলো না। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে রাত পৌনে বারোটার দিকে আমরা সরণীতে হাঁটতে বেরোই। একটি পানশালার নিয়নে ঝলমল বিজ্ঞাপন ‘ড্রিংকিং অ্যান্ড ড্রয়িং’ আমাদের আকর্ষণ করেছিলো দারুণভাবে। হলেণ উদ্যোগ নিয়ে বলে, ‘লেটস্ গো অ্যান্ড হ্যাভ আ নাইট ক্যাপ ড্রিংক।’ নিদ্রাকর্ষক পানীয়ের সম্ভাবনা আমাকেও উদ্দীপ্ত করে। ভেতরে ঢুকে দেখি, হল—কামরায় পাতা বেশ কতগুলো লম্বা—চওড়া টেবিল। তাতে বসে আর্ট কলেজের ছেলেমেয়ো ড্রাফ্ট বিয়ার পান করতে করতে স্ক্যাচ করছে। লাইভ মিউজিকের ডায়াসে কোন গায়ক কিংবা বাদক নেই, তার পরিবর্তে খাটানো আছে গোটা চারেক ইলেজ। তাতে ক্যানভাস আটকিয়ে ছেলেমেয়েরা দিব্যি রঙতুলি দিয়ে আঁকছে চিত্রাদি। আমরা যে টেবিলে বসি, ওখানে চুপচাপ বসে তালমাজ মেমোরিয়েল ব্রিজের স্ক্যাচ করছিলেন মি. এরিক বারনন। তাঁর সম্পূর্ণ শুভ্র চুল—দাড়ি ও গোঁফ থেকে ছড়াচ্ছিল বিরল প্রজাতির সিলভার ফক্সের রূপালি আভা। আমরা নাইট ক্যাপ হিসেবে আমারুলা লিক্যুরের অর্ডার করেছিলাম।

ভুরু কুঁচকে মি. বারনন মার্টিনির গ্লাস থেকে তুলে নেন একটি অলিভ। তা মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে বলেন, ‘ইউ গাইজ মাস্ট বি ফ্রম সাউথ আফ্রিকা, লিসেন…দিস ইজ আমেরিকান সাউথ, এখানে কেউ রাত রারোটায় আমারুলা অর্ডার করে না।’ করমর্দন করে পরিচিত হতে হতে বলেছিলাম,‘দিস আ ক্রিম বেসড্ ড্রিংক ফ্রম আ ট্রি।’ আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তিনি উৎসাহের সাথে আওয়াজ দেন, ‘ইয়েস, আই নো, এটা আফ্রিকার মেরুলা বৃক্ষের জারিত নির্যাস, দাঁতাল হাতীরা এটা পান করতে খুবই পছন্দ করে।’ তাঁর আচরণের মধ্যে আন্তরিকতার সাথে মিশেছিলো হাল্কা কৌতুক, যা দ্রুত অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতে সহায়তা করে। রাত একটু বাড়তেই তিনি পোর্টফোলিও ব্যাগ গেঁটে বের করেছিলেন আরেকটি স্ক্যাচখাতা। তাতে প্রিটোরিয়া ও জোহানসবার্গের দুটি দৃষ্টিনন্দন ব্রীজের ইলাবরেট নকশা দেখতে পেয়ে আমরা আশ্চর্য হয়েছিলাম, এবং জেনেছিলাম, এক সময় বারনন সাহেব মিলিটারীতে মেকশিফ্ট ব্রিজ নির্মাণের ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করতেন। তালমাজ ব্রীজ নির্মাণেও তাঁর অবদান আছে। হবি হিসাবে বারনন নানা দেশের বিবিধ ডিজাইনের ব্রিজগুলোর ছবি আঁকা পছন্দ করেন।

পরদিন জনশন দম্পতির মেহমান হিসাবে আমি যাই হাটচিনসন আইল্যান্ডে, কোস্টাল জ্যাজের মাসওয়ারী সংগীতের জলসায়। ওখানে ফের দেখা হয়েছিলো বারননের সঙ্গে, তিনি হুইল চেয়ারে বসা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘উই অ্যাটেন্ড অল জ্যাজ মিউজিক ইভেন্টস্ টুগেদার।’ মিসেস বারনন হেসে যোগ করেছিলেন, ‘ইয়েস, উই এনজয় ড্রিংকিং আ কাপোল অব বার্বন হোয়াইল লিসেনিং কুল সাদার্ন জ্যাজ।’ তার বছর কয়েক পর আমরা সাভানা শহরে এসে থিতু হতে চেষ্টা করি, কোস্টাল জ্যাজ মিউজিক প্রোগ্রামেরও সদস্য হই, এবং প্রায় প্রতি মাসে মিউজিকের কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে তাঁদের সঙ্গে আমাদের মিথস্ক্রিয়ার স্মৃতি তৈরী হতে থাকে।

সরণীতে সাদা ঘোড়ায় টানা গাড়ি

কাজরি গোলকধাঁধার মতো গুরুন্টি দেয়া একটি বেজায় সর্পিল সড়ক বেয়ে ব্রিজের দিকে উঠতে শুরু করে। হলেণ ও আমি কোভিডে আক্রান্ত হয়ে বারনন সাহেবের মৃত্যুর প্রেক্ষাপট নিয়ে তর্পণ করি। লকডাউনের সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিজেদের স্ট্রিক্টলি গৃহবন্দি করেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তাদের পালক—কন্যা তিয়েন কলেজ ডরমিটরি ছেড়ে মা—বাবাকে দেখতে আসে। সামান্য জ্বর—কাশির ব্যাপারটা তিয়েন তাঁদের জানায়নি। দ্বিতীয় সপ্তাহে সে অসুস্থ হয়ে পড়লে বারনন দম্পতি সতর্ক হন। কিন্তু ততদিনে ভাইরাস দানা বেঁধে বসেছে মি. বারননের শরীরে। হাসপাতালে সপ্তাহ দিন ছিলেন তিনি, ভেন্টিলেটার কিংবা লাইফ সাপোর্টে যেতে চাননি।

মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর পোস্টিং থেকে জেনেছিলাম, তারুণ্যে ভিয়েতনাম—ফেরত মি. বারনন অই দেশে মার্কিনি যুদ্ধাগ্রাসনের প্রতিবাদ করে জেল খেটেছিলেন। প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তিকে পৌঁছে পর্যটক হিসাবে বারনন ফিরে যান ভিয়েতনাম। ওখানকার এতিমখানা থেকে তিনি দত্তক নিয়েছিলেন অনাথ শিশু তিয়েনকে।

গাড়ি এতাক্ষণে উঠে পড়েছে ব্রিজে। নদীজলের বার্জভাসা ওয়াটারস্ক্যাপ আমাদের দৃষ্টিকে করে তুলে প্রসারিত। একটি বিষয় নিয়ে আমরা নিচুস্বরে টুকটাক কথা বলি। তিয়েন একটু সাবধান হলে, জ্বরের লক্ষণ অনুভব করা মাত্র কোয়ারিন্টিনে গেলে, বারনন সাহেব কী বেঁচে থাকতেন আজ অব্দি? নাকি মানুষের পরমায়ু পূর্বনির্ধারিত, পৃথিবীতে পরিস্থিতি যাই হোক, নির্দিষ্ট মেয়াদের পর প্রস্তান করতে হয় নীরবে?

অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী দাহ করা হয়েছিলো বারননের শরীর। অনুমতি নিয়ে তাঁর স্ত্রী ব্রিজের মাঝ বরাবর এসে তাঁর প্রিয় স্পটে দাঁডিয়ে—রেলিং ঘেষে ঝুঁকে নদীজলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেহভস্ম। লকডাউনের কারণে তাঁর আত্মীয়স্বজন ও অনুরাগীদের মধ্যে হাতে গোনা সামান্য কয়েকজন শরীক হয়েছিলেন অন্তেষ্ঠিক্রিয়ায়। আমাদের প্রাণের ভয় ছিলো প্রচণ্ড, তাই যোগ দেইনি তাঁর শেষকৃত্যে। চার লেনের বিশাল ব্রিজটিতে গাড়ি—ঘোড়া কিছু নেই। কাজরি আমাদের উঁচু থেকে রিভার—ভিউ দেখার সুয়োগ করে দিতে অতি ধীরে ড্রাইভ করছে। মি. বারননের শেষযাত্রায় সামিল না হওয়ার অপরাধ আমার মধ্যে চূর্ণিত হয়। না ভেবে পারি না, আমার সমাপ্তিতেও গোর হতে পারে বান্ধবহীন পরিবেশে।

ব্রিজের মাঝামাঝি আসতেই হলেণ মিনিট তিনেকের জন্য গাড়ি থামাতে বলে। কাজরি সাইড করে ওয়ানিং লাইট ফ্লাশে দেয়। তারপর নেমে এসে বনেট তুলে সে ভাণ করে যে গাড়িতে সমস্যা কিছু হয়েছে। জনশন দম্পতির জন্য আমাদের বাগান থেকে চয়ন করে আনা ফুলের তোড়া থেকে একমাত্র সবুজাভ গোলাপটি তুলে নিয়ে হলেণ হেঁটে যায় রেলিং এর কাছে। তামলাজ ব্রিজ সম্পর্কে আমার অস্বাভাবিক অনুরাগ জানতে পেরে—বারনন অনুমতি নিয়ে এখানে হেঁটে আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। রিভার—ভিউ পর্যবেক্ষণে আমার আগ্রহ ছিলো প্রচুর, তবে রেলিং এর কাছে যেতেই হাঁটু ঠকঠকিয়ে কাঁপছিলো, এ আচরণ নিয়ে কোন রকমের বিদ্রুপ না করে তিনি হিপপকেট থেকে ছোট্ট ফ্লাক্স বের, ছিপি খুলে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘হ্যাভ আ বার্বন শট, ইট উইল গিভ ইউ দ্য কারেজ টু ডিল ইউথ দ্য হাইট।’ মি. বারননের স্মৃতিতে নদীজলে গোলাপটি ছুড়ে দিয়ে হলেণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে মুহূর্ত কয়েক। আমিও বহতা জলের দিকে তাকাই। একখানা ফেরিবোট ওপাড়ের হাটচিনসন আইল্যান্ড থেকে ফিরে আসছে সাভানা নগরীতে। নদীর ঘাটে নোঙর করে ভাসছে পর্যটকদের নিয়ে হামেশা ট্যুর করা দুটি স্টিমার। বারননদের ষাটতম বিবাহবার্ষিকীতে জনশন দম্পতি তাঁদের সম্মানে আয়োজন করেছিলেন স্টিমার রাইডের। নিমন্ত্রিত হয়ে বয়োবৃদ্ধ দুই দম্পতির সান্নিধ্যে স্টিমবোটের ডেকে বসে উলুলঝুলুল হাওয়ায় সিগ্ধ হওয়ার স্মৃতি কিন্তু এখনো ম্লান হয়নি এক বিন্দু।

আমার চোখ নগরীর দৃষ্টিনন্দন একটি ইমারতের ঘড়ি লাগনো গম্বুজ পেরিয়ে চলে যায় হাসপাতালের বহুতল ভবনের দিকে। স্থানীয় নিউজ ফিড থেকে আমি জানি যে, এ সপ্তাহে হসপিটালাইজেশনের হার বেড়েছে গেল সপ্তাহের তুলনায় চার গুণ। করোনাআক্রান্তদের অনেকেই তরুণ, বয়সে আমাদের কন্যার সমবয়সি। নগরীর ডেমোক্রেটিক মেয়র মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে চেয়েছিলেন, রাজ্যের রিপাবলিকান গভর্ণর তাঁর উদ্যোগকে আইনিভাবে ব্লক করে দিয়ে মিডিয়ায় বলেছেন, পরিস্থিতি তেমন একটা বিপদজ্জনক নয়, নগর কর্তৃপক্ষের উচিত স্কুলগুলো খুলে দিয়ে নর্মালসি বহাল রাখতে সহায়তা করা। ঠিক বুঝতে পারি না, আর কতজন মানুষের মৃত্যু হলে রাজ্য প্রশাসনের ঠনক নড়বে?

তালমাজ ব্রিজটি দৈর্ঘ্যে কাটায় কাটায় ১,০২৩ ফিট, প্রায় দুই মাইলের মতো। মৃদুগতিতে তা পাড়ি দিতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ওপাড়ের আরেকটি নোনাজলবাহি নদীবেষ্টিত ছোট্টমোট্ট দ্বীপ হাটচিনসন। প্রায় সাত মাইল লম্বা অপ্রশস্ত দ্বীপটি ব্যবহৃত হচ্ছে সমুদ্রগামী জাহাজের কনটেইনার নির্মাণের ঠেক হিসাবে। ব্রিজের ওপর থেকে পরিষ্কার দেখা যায়, বালুচর জুড়ে থরে থরে সাজিয়ে রাখা ইস্পাতের অজস্র পেল্লায় সাইজের বাক্স। সাভানা নদী অতিক্রম করে আমরা সেতুর এক্সটেনশন ধরে চলে আসি অন্য একটি নদীর উপর। ওখান থেকে ঘুরানো ফ্লাইওভার নেমে গেছে হাটচিনসন দ্বীপের বিখ্যাত বহুতল বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টারের দিকে। গুজব ছড়াচ্ছে যে, এখানে হাজার পাঁচেক ডেলিগেট জড়ো করে ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির ইলেকশন বিষয়ক সন্মেলন করবেন। কনভেনশনওয়ালারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ডেলিগেটদের মাস্ক পরা কিংবা সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখার কথা বলে কেউ বিরক্ত করবেন না। গণসমাবেশের বিরাট এ স্থাপনাটি ফেরিবোট দিয়ে ওপারের সাভানা শহরের সঙ্গে যুক্ত। ফ্লাইওভার থেকে নেমে আমাদের গাড়িটি একটি অডিটরিয়াম কাম আপস্কেল রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে ছুটে। এখানকার পার্মানেন্ট রানওয়েতে হামেশা অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাশন শো। একটি—দুটি শো—তে হলেণ জাজ হিসেবে কাজ করেছে। সে সুবাদে আমিও সন্ধ্যা কাটাতে এসেছি একাধিকবার এ অডিটরিয়ামে। এখানকার রিল্যাক্স পরিবেশে বাতাবিলেবুর সৌরভ ছড়ানো মার্গারিটার গ্লোব—গ্লাসটি হাতে নিয়ে, রানওয়েতে ক্যাটওয়াক করা তরুণ—তরুণীদের অবলোকন করতে বেশ ভালোই লেগেছে। জানতে পারি, ফ্যাশন শো-গুলো ফের চালু হয়েছে, ছেলেমেয়েরা সামাজিক দূরত্ব নিয়ে বিশেষ একটা মাথা ঘামাচ্ছে না, মনে হয়, সব কিছুই এ দ্বীপে চলছে আগের মতো, ঢিমে তালে, স্বাভাবিক গতিতে। কিন্তু প্যানডেমিকের প্রভাবে আমাদের শুধু এখানে আসা হচ্ছে না।

গলফকোর্স ছাড়িয়ে আমরা চলে আসি খানিকটা জংলা মতো জায়গায়। সম্পূর্ণ কাচে তৈরী দালানটিতে ঝলমল করছে মধ্য দিনের সুরুজ। এ গ্লাসহাউসে ফি মাসে বসতো কোস্টাল জ্যাজের গায়ক—বাদকে জমজমাট জলসা। দেখা হতো জনশন ও বারননদের সঙ্গে। মিউজিকের পর পর রেস্তোরাঁর টেরাসে জড়ো হতাম আমরা, জ্যাজের বিষয়—আশয় শেষ হয়েও হতো না। ককটেল অব্দি গড়াতো। কোন কোন গায়ক অনুরোধে ফের ব্যান্ডস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে গাইতেন। দম্পতিদের কেউ কেউ মেতে উঠতো যুগল ড্যান্সে। লকডাউনের শুরুয়াতে কোস্টাল জ্যাজের লাইভ প্রোগ্রাম বাতিল হয়ে যায়। মাস তিনেক পর অনলাইনে স্ট্রিমিং করার বন্দোবস্থ হয়। তবে স্ক্রীনে জ্যাজ শুনে লাইভ জলসার আমেজটি ঠিক পাওয়া যায়নি।

গাছপালায় ছায়াচ্ছন্ন ডাঙ্গা থেকে আওয়ারা হেঁটে এসে গল্ফকোর্সে ঢুকে পড়ে কয়েকটি হরিণ। গায়ে সাদাটে ফুটকি তোলা দুটি শিশুসহ একটি মা হরিণ হেঁটে যাচ্ছে গালফকোর্সের কৃত্রিম জলাশয়ের দিকে। নলখাগড়ার আড়াল থেকে আকাশে উড়াল পাড়ে ধবল ডানার একটি সারস। শিংগাল হরিণের তত্ত্বাবধানে আরও কয়েকটি হরিণ ঢুকে পড়ে আদিগন্ত সবুজাভ প্রান্তরে। মৃদুগতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে আমাদের গাড়িটি আগ বাড়ছে। ছাটা ঘাসের সবুজাভ শ্যামলিমায় চরে বেড়ানো হরিণের দৃশ্যপটটি আমাদের চেনা, গ্লাসহাউসে তন্দ্রামদির হয়ে বসে—সাদার্ন জ্যাজ শুনতে শুনতে, মাঝে-সাজে চোখ খুলে আমরা তাকিয়ে থাকতাম মায়ামৃগে নন্দিত সবুজ প্রান্তরের দিকে। চক্রাকারে টার্ন নিতেই লাল—নীল বাতি ফ্লাশ করে ট্রাফিক পুলিশের একটি মোটরসাইকেল আমাদের সড়ক ছেড়ে গাড়ি সাইড করতে ইশারা দেয়।

চাকায় রোডসাইডের ঘাস ধামসে দিয়ে খানিক সামনে বেড়ে কাজরি ঢুকে পড়ে পার্কিংলটে। ওখানে জড়ো হয়েছে প্রচুর গলফকার্ট ও কয়েকটি হুডখোলা ভিনটেজ মোটরকার। কোন কোন কার্ট থেকে উড়ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেসবল ক্যাপ পরা ছবির নিচে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন,’ লেখা পতাকা। আমি আড় চোখে কাছের গলফকার্টে সাঁটা স্টিকারগুলোর দিকে তাকাই, তাতে মাস্ক পরার কুফল ও অভিবাসিদের সাথে ক্রমবর্ধমান ক্রাইমের সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের অসত্য উক্তিগুলোর নিচে লেখা—আমেরিকানদের খোলাবাজারে বন্দুক কেনার অধিকারকে বহাল রাখার জোরালো শ্লোগান। আমি ওয়াকিবহাল যে, কয়েকদিন আগে ট্রাম্প সার্পোটাররা হাটসিনসন দ্বীপের জেটিতে বোট—পার্টির আয়োজন করেছিলো। ভাসমান বোটগুলো থেকে উড়ছিলো বর্ণবাদী হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের শ্লোগান লেখা ঝাণ্ডা। আমার স্নায়ু কেন জানি সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে যায়।

গলফকার্ট ও ভিনটেজ মোটরকারগুলোতে জড়ো হওয়া সাহেব—সুবোদের মধ্যে রই রই আওয়াজ ওঠে। বৃত্তাকৃতির সড়কে দারুণ গতিতে ছুটে আসে পর পর কয়েকটি রেস-কার। আমরা জানি যে, বছরে একবার হাটচিনসন দ্বীপে জমে রেসকারের কার্নিভাল। মনে হয়, সে পর্বকে সামনে রেখে আজ রেস করনেওয়ালারা ট্রায়াল রানে মিলিত হয়েছে।

একটি মোটরবাইক স্টার্ট নেয়। হার্লি ডেভিডসন ব্র্যান্ডের এ বাইকটি বেজায় ভারি, সাইলেন্সার খুলে রাখাতে শব্দ হচ্ছে প্রচুর। সোনালি চুলদাড়িওয়ালা বাইকারের বাইসেপগুলোতে উল্কি করে আঁকা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নাৎসী—প্রভাবিত লগো। কোমরে পিস্তল ঝোলানো বাইকার পা ঠেকিয়ে ব্যালেন্স রাখতে রাখতে গালফকার্টগুলোর মাঝ দিয়ে এগিয়ে আসছে আমাদের গাড়িটির দিকে। ট্র্যাফিক পুলিশের বাইক থেকে বাজে রোড ক্লিয়ারের হুইসেল। কাজরি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে আসতে যায় পার্কিংলট থেকে। সড়কে ইন করার মুখে স্কিড করে নুড়িপাথর ছিটকিয়ে বাইকটি থামে জানালার পাশে। বাইকার ইশারায় আমাদের মুখঢাকা মাস্ক দেখিয়ে নেতিবাচক কিছু বলে বৃদ্ধাঙ্গুলি নিম্নমুখী করে। কুকুর দুটি তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। লেইন ফ্রি পেয়ে তাতে গাড়ি ঢুকিয়ে কাজরি এক্সেলেটারে চাপ দেয়। দেখতে দেখতে আমাদের গাড়িটি উঠে আসে দ্বীপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফ্লাইওভারে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ
X