সাহিত্যে ২০২০’র নোবেল কে পাচ্ছেন?

Send
তরুণ রায়হান
প্রকাশিত : ০২:৪৪, অক্টোবর ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৫২, অক্টোবর ০৬, ২০২০

গত ৫ অক্টোবর চিকিৎসায় নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন শাখায় এ বছরের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নোবেল কমিটি ঘোষণা করবে সাহিত্যে ২০২০ সালের নোবেল বিজয়ীর নাম। কিন্তু তর যেন সইছে না সাহিত্যপ্রেমীদের। তাই সাহিত্য বিভাগে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণার পূর্বেই প্রতিবছরের মতো অনেকেই অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে সুইডিশ একাডেমি কারো অনুমান সত্য হতে দিচ্ছে না বা কারো ঔচিত্যের ধারও ধারছে না। সুইডিশ একাডেমি যখন লিও তলস্তয়কে নোবেল না দিয়ে সমালোচনার কাঁটা গিলে ফেলতে পেরেছে, কিংবা পেটার হান্ডকেকে নোবেল দিতে পেরেছে, তখন আর কী বলা!

কয়েক বছর ধরে হয়তো স্নায়ুর চাপ সবচেয়ে বেশি সহ্য করছেন জাপানি ভাষার লেখক হারুকি মুরাকামি, এবং তার ভক্তরা।

২০১৮ সালে যৌন কেলেঙ্কারির কারণে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার স্তগিত করে নোবেল কমিটি ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ীর নামের সঙ্গে একসঙ্গে ঘোষণা করে। কিন্তু সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এক বছরের জন্য থেমে থাকলেও সুইডিশ সোসাইটির ১০০ সদস্য মিলে সাহিত্যে নোবেলের পরিবর্তে শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জন্য ‘নিউ একাডেমি প্রাইজ’ প্রবর্তন করেন। সেই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মুরাকামির নাম ছিলো। কিন্তু মুরাকামি নিজের নাম প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সাহিত্যে নোবেলের বিকল্প হিসেবে নিউ একাডেমি প্রাইজকে আমি সমর্থন করছি না।’ অনুমান করা যায় অন্য কোনো বিকল্প গ্রহণ করে তিনি নোবেলের সম্ভবনা পায়ে ঠেলতে চান না।

সাহিত্যিকের ভৌগলিক অবস্থান, ভাষা, লিঙ্গ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিবেচনা করে সাধারণত অনুমান করা হয়, যে বছর চীনের মো ইয়ান পুরস্কার পেলেন, তখন সবাই ধরে নিলেন মুরাকামি তো বহু দূর, কোনো এশিয়ান এই পুরস্কার আপাতত পাবেন কিনা সন্দেহ।

এবার দুইবার বুকারজয়ী কানাডার বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউডের নামও রয়েছে অনেকের মুখে। দেখা যাক এ বছর তিনি নোবেল পান কিনা।

ওদিকে অনেকে ধারণা করছেন নোবেলের পরিবর্তে ‘নিউ অ্যাকাডেমি প্রাইজ’-প্রাপ্ত ৮৩ বছর বয়সী ম্যারিস কুন্দে পেতে পারেন এবারের নোবেল। আর সেসবের পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। অনেকে বলছেন, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ফ্রান্স শাসিত গুয়াদলুপে জন্মগ্রহণ করেও মূলত উপন্যাস এবং নাটকের মাধ্যমে সমসাময়িক ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক যিনি হতে পেরেছেন তিনি অবশ্যই নোবেলের মতো পুরস্কারের যোগ্য। একজন বিশ্ব-নাগরিকের জীবনের বিভিন্ন অংশে ক্যারিবীয়দের দাসত্ব ও ঔপনিবেশিকতা কেমন প্রভাব ফেলে সেসবই কুন্দের অধিকাংশ উপন্যাস এবং নাটকে প্রতিফলিত হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে বেশ পঠিত সমসাময়িক রাশিয়ান লেখক লিউডমিলা উলিৎস্কায়াকেও অনেকেই নোবেল পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে পছন্দের তালিকায় রাখছেন। ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার উলিৎস্কায়া ২০০৬ সালে তার উপন্যাস ‘দোভাষী দানিয়েল স্তাইন’-এ দেখিয়েছেন কেন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের এক হওয়া প্রয়োজন। এই উপন্যাসই তাকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি। এছাড়া সাহিত্য অ্যাস্থেটিসিজম (নান্দনিকতা) সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম রূপকার হিসেবেও ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটিতে উলিৎস্কায়াকে এ সময়ের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র-শাসিত ক্যারাবিয়ান সমুদ্রের দ্বীপ অ্যান্টিগুয়ার ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক জ্যামাইকা কিনকেডও পাঠকদের প্রত্যাশার সাগরে ভাসছেন নোবেলজয়ী হিসেবে। ইতোমধ্যে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার পুরস্কার পেয়ে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। জ্যামাইকা কিনকেডের উপন্যাসিকা ‘লুসি’ বিশ্বব্যাপী বহুল পঠিত।

কানাডিয়ান কবি অ্যান কার্সনকে এ বছর নোবেলের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে ধরা হচ্ছে। সর্বশেষ টিএস ইলিয়ট পুরস্কার পাওয়া এই কবি’র বহুল পঠিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘ইরোস দ্য বিটারস্যুইট’, ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ এবং ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ উল্লেখযোগ্য।

‘ওয়াইট নয়েজ্‌’, ‘লিব্রা’ ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ ইত্যাদি উপন্যাসের জন্য যিনি বিশেষভাবে পরিচিত সেই মার্কিন কথাসাহিত্যিক ডন ডিলিলোকেও ধরা হচ্ছে এবারের নোবেলের সম্ভাব্য জয়ী হিসেবে। সমসাময়িক মানুষের জটিল জীবনের বয়ান খুব নিচু স্বরে তুলে ধরেন তিনি।

আরেক মার্কিন কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটসকেও অনেকে নোবেল পুরস্কারজয়ী হিসেবে দেখতে চান। আমেরিকার সমসাময়িক ভূবনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা তার লেখার প্রধান বিষয়। টনি মরিসন ১৯৯৩ সালে নোবেল পাবার পর দু’যুগেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এবার ওটস নোবেল পেতেই পারেন।

কিন্তু মার্কিন মুলুক থেকে সরে এসে আরবের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় অ্যাদোনিসের নাম ল্যাডব্রক্সের বাজির তালিকায় অবস্থান করছে অনেক বছর ধরে। এছাড়াও বেশ কয়েক বছর ধরে অ্যাদোনিসের নোবেল জেতার সম্ভাবনা প্রবল, কারণ আরব বিশ্বে তারচেয়ে প্রভাবশালী কবি আর কেউ নেই।

চিনুয়া আচেবের চেয়ে বয়সে প্রায় এক দশকের ছোট নগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো। নোবেল কমিটি আচেবেকে সম্মানীত করতে পারেনি, কিন্তু নগুগির মতো একজন শক্তিশালী ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ যিনি আফ্রিকার সাহিত্যের আন্তর্জাতিক লেখকদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন, বিশেষ করে উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের লেখকদের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন, তাকে নিশ্চয়ই আমরা নোবেল কমিটির বিস্মৃতির জলে ডুবে থাকতে দেখতে চাই না। ১৯৮৬ সালে নাইজেরিয়ার নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক ওলে সোয়েঙ্কা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, এবং ২০০৩ সালে জে এম কোয়েটজি, এরমধ্যে আর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান এই পুরস্কার পাননি। সুতরাং নগুগি এবার পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

বয়সের বিচারে নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচির নাম কিন্তু উচ্চারিত হয়েছে কারো কারো মুখে। তার বয়স কম হলেও এই বয়সে তার লেখার ওজন কোনো দিক থেকেই কম নয়। আচেবের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি।

আলোচনায় আছেন আরেক আফ্রিকান লেখক সিসি ডাঙ্গারেম্পা। এ বছরে বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার পর নিজের দেশ জিম্বাবুয়ের সরকার-বিরোধী দল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন তাদের দেশের তথাকথিত সরকারী দুর্নীতি এবং শতকরা ৭০০ ভাগেরও বেশি মুদ্রাস্ফীতিসহ ক্রমাগত অর্থনৈতিক সংকটের বিরোধীতা করে আন্দোলনের ডাক দিলে সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে গ্রেফতার হয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছেন সিসি ডাঙ্গারেম্পা। সেকারণে তার সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার প্রথম উপন্যাস ‘নার্ভাস কন্ডিশন’ ১৯৮৯ সালে আফ্রিকান বিভাগে কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ অর্জন করে। ডাঙ্গারেম্পা পরিচালিত সিনেমা ‘নেরিয়া’ ১৯৯৩ সালে জিম্বাবুয়ের সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্রের আসন দখল করে। তার সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দিস মউর্নঅ্যাবল বডি’ এ বছরের বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। উপন্যাসটি একজন তরুণ মেয়ে এবং একটি নবজাতক জাতির আশা এবং সম্ভাবনা নিয়ে লেখা—যে কাহিনিটি, আশার আলো আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমাদের জীবন আদতে আমাদের কোথায় নিয়ে যায় সেসব আবিষ্কার করার যাত্রায় আমাদের সহযোগী হয়।

আলবেনিয়ার লেখক, কবি ও কথাসাহিত্যিক ইসমাইল কাদারে এবার নোবেল পাচ্ছেন কিনা? হ্যাঁ, এটাও চিন্তার বিষয়। ষাটের দশক থেকেই তিনি আলবেনিয়ার প্রভাবশালী এবং নেতৃস্থানীয় লেখক। ১৯৬৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি’ প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাদারে কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার এই উপন্যাসটিই তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। এছাড়া কয়েক দশক জুড়ে তার নামটি পাঠকদের মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে।

মিলান কুন্ডেরা নোবেল পাননি? এও সম্ভব?! হ্যাঁ, তিনিও ‘জীবিত’ লেখকদের একজন, যাকে পুরস্কার দিয়ে সুইডিশ একাডেমি মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে। ফ্রান্স-প্রবাসী চেক কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা জনপ্রিয়তার মাপকাঠি পার হয়ে গেছেন বহু আগেই। তবু এক অজানা কারণে পিছিয়ে আছেন কয়েক দশক ধরে। তার নাম আর কেউ বলছেন না। তিনি এই বয়সে এসে নোবেল পেলে পাঠকের আনন্দের সীমা থাকবে না।

মো ইয়ান পেলেও দক্ষিণ কোরিয়ার বর্ষীয়ান কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে কমে গেছে তা নয়। বরং কথাসাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের বিশাল কাতারের মাঝে কবিতার রং লাগতে পারে কো উনকে নিয়ে। সুতরাং এশিয়াবাসী সংগত কারণেই আশা করতে পারেন, কো উনকে নিয়ে।

এছাড়াও মিশরের নারী লেখক নাওয়াল আল সাদাউই, হাঙ্গেরির ঔপন্যিাসিক-নাট্যকার পিটার নাদাস, সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, স্পেনের ঔপন্যাসিক হুয়ান মারসে, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদী, রুশ কথাসাহিত্যিক মিখাইল শিসকিন, স্প্যানিস ঔপন্যাসিক হাভিয়ার মারিয়াস, নরওয়ের নাট্যকার জন ফসে, আইরিশ ঔপন্যাসিক জন বানভিল, বেলজিয়ামের কবি লিওনার্দ নোলেনস প্রমুখের যে কারো নাম নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসেবে উচ্চারিত হতেই পারে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

আগামী ৮ অক্টোবর সাহিত্যে আমরা নতুন নোবেল লরিয়েটকে পাচ্ছি। তার আগ পর্যন্ত স্নায়ুর চাপ সহ্য করতেই হবে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ
X