সাহিত্যে নোবেলজয়ী লুইসের সঙ্গে

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৬:৪৯, অক্টোবর ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫০, অক্টোবর ১১, ২০২০

লম্বায় পাঁচ ফুটের বেশি নয়, ছোটো-খাটো, নরম চেহারা। কণ্ঠস্বরও অনুচ্চ। কী করে ছাত্রছাত্রী পড়ান, সব ছাত্রছাত্রীর কর্ণকুহরে প্রবেশ অবাধ কিনা, ইচ্ছে জেগেছিল জিজ্ঞেস করি। সম্পর্ক আঁটোসাঁটো নয় তত, চেপে গেলুম। অবশ্য আমাদের দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নয় যে, লাস্ট বেঞ্চের পড়ুয়ারা ফিসফাস-কানাকানি-কানাঘুষা করবে। এদেশেও যে ধোয়া তুলসীপাতা, আদৌ তা নয়, করে। অন্যকে বিরক্ত না করে।

সদ্য নোবেলজয়ী কবি লুইস গ্লুকের বিষয়ে বলছি। বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে (দশ দিনব্যাপী) কবিতাপাঠের সেশন মাত্র তিনটি। একটু রাত গড়ালে। বাকি সাতদিন গল্প, উপন্যাস পাঠ, আলোচনা। প্রশ্নোত্তর। অনুষ্ঠানও জমজমাট। পৃথিবীর নানা দেশের, কম করেও পঞ্চাশজনের বেশি, লেখক-লেখিকার উপস্থিতি। অংশগ্রহণ। অনেকেই বহুখ্যাত। জনপ্রিয়। পাঠকের আকর্ষণ। দর্শনীয়। স্বাভাবিক খুবই, শ্রোতার সংখ্যা উপচে পড়া, টিকিটের উচ্চমূল্য হলেও।

বছর চারেক আগে ইশিগুরো এসেছিলেন, অবাক মানেন, শ্রোতার ভিড় দেখে। এক ঘণ্টার বেশি, পাঠকদের (যারা বই কিনেছেন ওঁর) বইয়ে স্বাক্ষর দিতে-দিতে হাস্যমুখে বলেন, ‘বার্লিনে আমার এত পাঠক? একমাত্র জাপানে দেখেছি আমার পাঠে হলভর্তি শ্রোতা।’

কাজুও ইশিগুরো কথা বলতে ভালোবাসেন, আড্ডাবাজও। অনুষ্ঠান শেষে আড্ডায় বললুম, ‘দুই-তিন বছরের মধ্যেই নোবেল পুরস্কার পাবে।’

ইশিগুরো : তুমি বলছো?

—মুসলমানের এক কথা।

গলা ফাটিয়ে নয়, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে, ‘নোবেল পুরস্কার চাই না। পুরস্কার পেলে ভালো লেখা লিখতে পারবো না। যা লিখতে চাই, হবে না। ফরমায়েশি লেখা এবং প্রকাশকের তাগাদায়, বেশি অর্থের জন্যে তখন, লেখার মেজাজ পাল্টে যাবে। দায়িত্বের গুরুভার কঠিন থেকে কঠিনতর হয়। লেখককে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিৎ লেখকের শেষ বয়সে।’

১৯৮৮ সাল থেকে দুই ডজনের বেশি নোবেলজয়ীকে (সাহিত্যে) দেখেছি কাছ থেকে। পরিচয়, ঘনিষ্ঠতাও হয়েছে। স্বীকার করি, মূলে গ্যুয়েন্টার গ্রাস। এও স্মরণ করছি, গাব্রিয়েল মার্কেজের সঙ্গে, গ্যুয়েন্টারের বাড়িতেই, এই ভাষায় পরিচয় করিয়ে দেন, ‘পারহাপস, হি ইজ, অ্যাজ আ পোয়েট, টুআইস ইন এক্সাইল আফটার দ্য ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার (সম্ভবত, এই লেখকই দুইবার নির্বাসিত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে।)।

মার্কেজ বলেন, ‘বিশ্বযুদ্ধের দুইশ/পাঁচ’শ বছর আগেও উল্লেখযোগ্য লেখকের তেমন হদিস নেই খুব।’

ধন্য মনে করি নিজেকে, দুই ডজনের বেশি নোবেলজয়ীর (সাহিত্যে) সঙ্গে দেখা, পরিচয়। সাক্ষাৎকার ডয়েচে ভেলের (বাংলা) জন্যে। ২০০১ সাল থেকে বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। বহু মহারথীর যোগদান। মারিও ভার্গোস ইয়োসার ইন্টারভিউ করলুম। ভবিষ্যতে নোবেল পাবেন কিনা অনিশ্চিত। ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের দেখভালে আবদুল্লাহ আল ফারুখ, জানতে চাইলেন, ‘কীভাবে শ্রোতার কাছে পরিচয় করিয়ে দেবে?’

—ভাববেন না। দায়িত্ব দিয়েছেন।

সম্ভবত, ডয়েচে ভেলের ইতিহাসে, তাও আবার বাংলা বিভাগে ইয়োসার প্রথম সাক্ষাৎকার। ইয়োসা নোবেল পেয়েছেন।

ইচ্ছে করছে গোপন কথা বলার। ইয়োসা, নোবেল পাওয়ার চার বছর আগে ‘ডি ডি এ আর’ লেখক হিসেবে এক বছর স্কলার, থাকতেন এই লেখকেরই মহল্লায়, প্রায়—নিত্যদিনই দেখা। মাঝে মাঝে আস্তানায়। এসেই বলতেন (সস্ত্রীক), ‘তন্দুরি চিকেন খাবো।’ এই আবদার রুশ কবি ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কোর। ছিলেন এক বছর বার্লিনে, ডিএএআর ডি’র স্কলার। ইয়েভতুশেঙ্কো নোবেল পাননি, কিন্তু, মৃত্যুর পরে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সম্পাদকীয় ‘লস্ট গ্রেট পোয়েট।’

লুইস গ্লুক (উচ্চারণ ‘গ্লাক’ নয়) দুইবার বার্লিনে (বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল লিটেরেচার ফেস্টিভালে)। প্রথম (২০০৪) সাক্ষাতের স্মৃতি, ওঁর কবিতাপাঠের আসরে (আরো চারজনের সঙ্গে) সাকুল্যে কুড়ি শ্রোতাও নয়। পাঠশেষে আড্ডায় উচ্ছ্বাস, ‘এতজন আমার কবিতা পড়েছেন?’

লুইসের দুটি বই পড়েছিলুম (‘ফার্স্ট বর্ন’। প্রকাশ ১৯৬৮)। ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস।’ পড়ে মুগ্ধ। মুগ্ধতায় আলাপচারিতা। তিনি বিস্মিত। ‘এই প্রথম, আমেরিকার বাইরে কেউ একজন বললেন।’

ওঁর কবিতায় দেশঘর, শৈশব-কৈশোর-যৌবন, ফেলে আসা অতীত, সাংঘাতিক দোলায়িত  হই, একাত্মতা বোধ করি। বলি। কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘দ্যাটস কান্ট্রি।’

লুইসের সঙ্গে আবার দেখা সাত বছর পরে, বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবেই। চিনলেন। প্রশ্ন করেন, ‘সুইট হোম (নিজের দেশ) ছাড়া একজন দেশপ্রেমিক কী করে বাঁচে? দেশকে কীভাবে কাছে পাও?’

উত্তর দিই না। চোখে জল আসে।

বলেন, ‘চলো বার্লিনের বিখ্যাত টিয়ারগাহে টিয়ারগার্টেনে (পাঁচ বাগান ও পার্ক)।

আমরা হাঁটি। মাঝেমাঝেই উধাও। বাগানে। ভুলে গিয়েছিলুম লুইস গ্লুক নিসর্গ প্রেমিকা। ওঁর কবিতায় প্রকৃতিপ্রেম নানাচিত্রে, নানা অভিধায় উদ্ভাসিত। আত্মগত। কবিতায় বৈশ্বিক। আজকের বিশ্বচিত্রে।

লুইস গ্লুকের কবিতা এই কথকতাই নানা পর্বে। শুনিয়েছিলেন বার্লিনের সাহিত্য উৎসবে, দুইবার, কবিতা। কবিতাপাঠে। অনুচ্চকণ্ঠে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ