জাহিদ নেওয়াজ খানের গল্পএই সময়ের শ্রাদ্ধ

Send
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
প্রকাশিত : ১৯:৪৭, অক্টোবর ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৯, অক্টোবর ১২, ২০২০

বাংলাদেশের এই সময়ের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলো কী? পুঁজিবাদী বিশ্বের ক্ষমতাকেন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গীজাত প্রভাব ও অনুপ্রেরণা থেকে সরকার, বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ, প্রচলিত গণমাধ্যম এবং বেসরকারি নানা সংস্থা বলবে—মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন—এসবের কথা। সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক জাহিদ নেওয়ার খানের গল্পগ্রন্থ ‘শ্রাদ্ধবাসর’ এর সাতটি গল্পও উপস্থাপন করছে এসব পরিস্থিতিকেই।

এই সময়ের যেসব ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রায়ই আমাদের দৃষ্টি কাড়ে সেসব ঘটনার মতো কিংবা সেসব ঘটনারই গল্প আছে জাহিদ নেওয়াজ খানের ‘শ্রাদ্ধবাসর’ গ্রন্থে। সংবাদ হয়ে উঠা ঘটনার নানা দিক থাকে, অনেক ব্যাপার থাকে যেগুলো সংবাদের বিষয় নয়, যেগুলো তথ্যের আবেদনে সমাপ্ত নয়, যেগুলোর অভিঘাত থাকে সাংবাদিকের মনে, যেগুলোর অভিঘাত ক্রিয়া করে সাহিত্যিকের কল্পনায়, যেগুলোর রূপকীয় ও প্রতীকী মূল্য আছে। সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান যেন সেসব ঘটনার সাহিত্যিক-অভিঘাত নিয়েই হাজির হন এসব গল্পে।

বইটির প্রথম গল্প ‘শ্রাদ্ধবাসরে’র প্রধান চরিত্র প্রগতিশীল ও বামপন্থি তরুণ ইশতিয়াককে অনিশ্চয়তা ও হুমকিতে ফেলে দেয় মৌলবাদ ও অর্থতাড়িত রাজনীতি। খুন হয় ইশতিয়াক। খুনের কারণ কী? মৌলবাদী জঙ্গিরাই কি ইশতিয়াককে মেরে ফেলল? নাকি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য স্বপক্ষ বা প্রতিপক্ষ জঙ্গিদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ইশতিয়াককে শিকার করল? নাকি প্রেমিকা মনিকা ও ঝুমার সম্পর্কের ঈর্ষার ছুরির নিচে প্রাণ হারাল ইশতিয়াক? পুলিশ এই রহস্যের মধ্যে খাবি খেতে থাকে। ইশতিয়াকের মনোজটিলতার চেয়ে এই গল্পে বড় হয়ে ওঠে জঙ্গিবাদীদের হুমকি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, জঙ্গিবাদের নামে হত্যা, কিংবা জঙ্গিবাদের হুমকির অজুহাতে বিদেশে পাড়ি জমানোর সমাজ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

‘পিতা প্রয়াত’ গল্পে মশিউর রহমান ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে খুন হন। ব্যবসার অংশীদার জয়নুল খুন করান সুজনকে দিয়ে। সুজন ও তার দল একদিন গোয়েন্দা পুলিশের পোশাক ও গাড়ি ব্যবহার করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল মশিউর রহমানকে। সেই সুজনের ছেলের সাথে বিয়ে নিহত ব্যবসায়ী মশিউরের মেয়ে তনুর। এই গল্পও আসলে এই সময়ের পুঁজি সঞ্চয়ের প্রবণতা এবং গুম-খুনের পরিস্থিতির ওপরই স্থাপিত।

‘একটি রাজনৈতিক সংলাপ’ গল্পে সারা জীবন দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা রাজনীতিক শহীদুজ্জামান শেষবারও হেরে যান। সংসদ নির্বাচনে তার আসনে দল মনোনয়ন দেয় এক শিল্পপতিকে। দলের চেয়ারম্যান তাকে ডেকে নিয়ে ওই প্রার্থীর হয়ে কাজ করতে বলেন। এই সময়ে অর্থের কাছে রাজনীতি, দল ও রাজনীতিবিদদের জিম্মি হয়ে পড়ার উদাহরণই এই গল্প।

দুর্বৃত্তায়নের অর্থনীতির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে লেখা গল্প ‘ম্যানেজার’। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি, ক্ষমতায়ন ও দুর্বৃত্তায়নের চক্করে কীভাবে এই ‘ম্যানেজার’ শ্রেণির উত্থান হলো আর তাদের চাপে কীভাবে দেশ ছাড়লেন সুবীর ও লাহিড়ী বাবুরা, কীভাবে আলাউদ্দিন ও মইনুদ্দিনরা হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে এই শ্রেণির? এসবই উঠে আসে এই গল্পে।

সাম্পদ্রায়িক পরিচয় এবং ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বের ওপর স্থাপিত গল্প ‘যেখানে সীমান্ত’। গল্পটিতে ভারতীয় নাগরিক হিন্দু সুদেষ্ণা চক্রবর্তী খ্রিস্টান লিংকন গোমেজকে ছেড়ে আসে যে কারণে ঠিক এই কারণে দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর তাকে ছেড়ে যেতে হয় বাংলাদেশী নাগরিক মুসলিম শোভন বাবর মাহমুদকে।

সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়েই আরেকটি গল্প ‘পাশের বাড়ির দীর্ঘশ্বাসেরা ছায়া ফেলে যায়’। ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার ধাক্কা এসে লাগে বাংলাদেশের ভোলায়। সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ধর্ষিতা হয় হিন্দু যৌনকর্মী লক্ষ্মী। লক্ষ্মীর বেদনাকে সাংবাদিক সানজিদার সহানুভূতি ও উপলব্ধি দিয়ে সামনে আনা হয়েছে এই গল্পে।

ক্ষমতা ও বাসনার মনস্তত্ত্ব নিয়ে গল্প ‘ধূপছায়া’য় কোপেনহেগেন থেকে অস্কার ইয়ুর্গেনসেন ওরফে রামিজ বাংলাদেশে এসেছে বাবা-মায়ের খোঁজে, এসেছে তার আত্মপরিচয়ের খোঁজে। সরকারের এক মন্ত্রণালয়ের বড়কর্তা মাকসুদা বেগমের স্বামী মোকাদ্দেসের মাধ্যমে গর্ভবতী গৃহকর্মী কিশোরীর সন্তান রমিজ। বাংলাদেশের শক্তিশালী আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার পরিশীলিত দাপটের নিচে হারিয়ে যায় রমিজের আত্মপরিচয়।

এই সময়ের জীবনের ছায়াচিত্র জাহিদ নেওয়ার খানের ‘শ্রাদ্ধবাসরে’র গল্পগুলো। আমাদের এই সমাজ, এই বাস্তবতার জনপ্রিয় কাহিনী ও ঘটনার রূপও মেলোড্রামাটিকই হয়ে থাকে সচরাচর। ঘটনার প্রাধান্য, চরিত্রের ধরণ, চরিত্রের নৈতিক অবস্থান—এসবের বিচারে এই বইয়ের গল্পগুলো মেলোড্রামার মতো। সামাজিক বাস্তবতায় একটি নৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে এ বইয়ের গল্পের চরিত্ররাও সাড়া দেয়। সে অনুযায়ী তারা তাদের সংকট তৈরি করে এবং সংকট মোচনের চেষ্টাও করে। সাহিত্যে এই ঘটনা ও চরিত্ররা খুব বেশি প্রচলিত ও চর্চিত এবং শুরু থেকে এখনও জনপ্রিয়ও। মেলোড্রামাটিক হওয়ার একটা সুবিধাও আছে। সমাজের গড়পড়তা জনগোষ্ঠীর শিল্পরুচি মেলোড্রামার সুরে বাধা থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আধুনিক যুগ নির্মাণের সময়টায়, মানুষের রুচি ও নৈতিকতার ভাঙাগড়ার সময়টায়, মেলোড্রামার একটা বড় ভূমিকা ছিল। এই স্বাদের সাহিত্য তাই জনপ্রিয়ও হয়েছিল তখনকার কালে দেশে দেশে। বাংলাদেশের সমাজও রুচি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দিক থেকে ভাঙাগড়ার ভিতর দিয়েই তো যাচ্ছে। যে কারণে এখানেও জাহিদ নেওয়ার খানের সম্ভাবনা আছে জনপ্রিয়তার মুখ দেখার। খেয়াল করবার বিষয় হচ্ছে, অনেক বেশি মেলোড্রামাটিক হয়েও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু বাংলা কথাসাহিত্যে উজ্জ্বল। 

শ্রাদ্ধবাসর (গল্পগ্রন্থ), জাহিদ নেওয়াজ খান, প্রকাশক : আবিষ্কার, মুদ্রিত মূল্য ১৬০ টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ
X