রশীদ হায়দার। যোদ্ধা জলেস্থলে। ছিলেন। আছেন। থাকবেন।

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১১:২২, অক্টোবর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৪, অক্টোবর ২১, ২০২০

সব চিঠি সংগ্রহে নেই, বহুবার আস্তানা বদলে হারিয়ে গিয়েছে কিছু। কলকাতায় ছিলুম যখন, ঢাকা থেকে বই/পত্র-পত্রিকা পাঠাচ্ছেন, সঙ্গে চিরকুট, খবরাখবর কম, কাজের কথা বেশি, সংক্ষিপ্ত যদিও। এবং কোন বই, পত্রিকা দিতে হবে কাকে, নির্দেশ। প্রাপকের তালিকায় পয়লা অন্নদাশঙ্কর রায়। স্বাভাবিক। তাঁর গৃহেই প্রতিপালিত হচ্ছি।

চিঠি লিখছেন অন্নদাশঙ্কর রায়কেও।

আমরা, অনুজ-অনুজাকুল রশীদ হায়দারকে ‘দাদুভাই’ সম্বোধন করি। এই সম্বোধন কোত্থেকে, কী ভাবে শুরু, কে প্রচারক, কার ঘিলু থেকে, বলতে অপারগ। ডাকনাম ‘দুলাল’। হতে পারে ‘দু’ থেকে অপভ্রংশ ‘দা’, ‘দুলাল ভাইয়ে’র বদলে সংক্ষিপ্তকরণ ‘দাদু’, সঙ্গে ‘ভাই’, সন্ধিসংযোগে দাদুভাই। কিংবা এও হতে পারে, ভাবচক্করে দাদু (দাদা), দাদুর স্বভাবে গম্ভীর, মাঝে মাঝে হালকা রসিকতা, মন-মেজাজ পাল্টে। পারিবারিক চৌহদ্দিতেই নিজেকে প্রকাশ, প্রকাশিত করেন আমোদিত আড্ডায়। ভাগ্নি লোপা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মেজমামার সামনে ইংরেজি শব্দ বললেই বানান জিজ্ঞেস করতেন।’

লক্ষণীয়, লোপা বলছেন, ‘মেজমামা’। ‘দাদু’র বালাই নেই। বড়োমামা জিয়া হায়দার মেজ দুলাল তথা রশীদ। তিনিই আমাদের ভ্রাতৃকুলে দ্বিতীয়। সেই অর্থে ‘মেজভাই’ বলাই যুক্তিপূর্ণ।

যৌথ পরিবারের মতোই শেখ-পরিবার, পাবনার দোহারপাড়ার বাড়িতে। চাচাত ভাইবোন মিলিয়ে ত্রিশ। সারাক্ষণ নরক গুলজার। জিয়া হায়দার অগ্রজ, মোহাম্মদ শেখ হাকিমউদ্দীন-রহিমা খাতুনের প্রথম পুত্র। ডাকনাম রোউফ। তিনিও ‘বড়োভাই’ বা ‘রোউফভাই’ নন, ‘সোনাভাই’ সম্বোধিত। এই রহস্য আবিষ্কার শিবেরও অসাধ্য।

ঘরে ছিলুম না, ঢাকা থেকে টেলিফোন। বাড়ির পরিচারক ধরলে, ঢাকা থেকে কণ্ঠ, ‘দাদুভাই বলছি।’ পরিচারক অর্ধেন্দু মাইতির জবাব, “দাদা ঘরে নেই।” দাদু (অন্নদাশঙ্কর রায়) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে ফোন করেছিল?’ অর্ধেন্দু : “দাউদদার দাদুভাই।”

ঘরে ফিরলে দাদুর প্রশ্ন : ‘তোমার দাদু বেঁচে আছেন এখনও? তোমার দাদুভাই ফোন করেছিলেন।’

বলি, ‘মেজদা রশীদ হায়দারকে দাদুভাই সম্বোধন করি।’

হেসে জিজ্ঞাসা, ‘বড়দাকে কী সম্বোধন?’

—সোনাভাই।

অন্নদাশঙ্কর : ‘একজন ভাই, একজন দাদু।’ রসিকতায় রহস্য।

রশীদ হায়দারকে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় জিজ্ঞেস করেছিলেন একবার, “বাংলাদেশে তোমরা পঞ্চপাণ্ডব (সাহিত্যে), কিন্তু তুমি দলছুট। সব ভাই পদ্য লেখেন, তুমি কেন গদ্য?’

উত্তর : বাঁধাধরার বাইরে।

শ্যামল : নাচগানও করো না নাকি?

রশীদ : গানের গলা মন্দ নয়। নাটকও করি। গানে-নাটকে নাচুনিপনা আছে।

শ্যামল : বউ কয়টি?

রশীদ : দাদা, আর বলবেন না।

শ্যামল মুখ খোলার আগেই ইতি বৌদি (শ্যামলের স্ত্রী) ঝাঁঝালো কণ্ঠে : “বাজে কথা ছাড়ো। ওঁদের (সঙ্গে রশীদের স্ত্রী ঝরা, আনিসা হায়দার। হৈমন্তী হায়দার, ওরফে হেমা। শাওন্তী হায়দার, ওরফে ক্ষমা) খেতে দেবে না?”

—সব সংলাপই যে হুবহু, বোধ হয় নয়। এলোমেলো হতে পারে। স্মৃতি থেকে লেখা। চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি। রশীদের দুই কন্যা হেমা, ক্ষমা শুধরে দিতে পারেন। রশীদের পরিবারকে নিয়ে গিয়েছিলুম শ্যামলের বাসায় (ভাড়া বাসা)।

রশীদের ‘অন্ধ কথামালা’ উপন্যাস পড়ে (প্রথম প্রকাশ ঢাকায়। দ্বিতীয় প্রকাশ কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি থেকে) উচ্ছ্বসিত প্রশংসামাখা চিঠি লেখেন শ্যামল। চিঠির সুবাদেই সম্পর্কিত।

আড্ডায় শ্যামল এও বলছিলেন, “তোমার উপন্যাস শ্রীমতীকে পড়তে দিয়েছি। শ্রীমতীকে ফোন করি।”

রশীদের প্রশ্ন : “ কে শ্রীমতী?”

শ্যামল : আমরা ভায়রা। ইতির ছোটবোনকে বিয়ে করেছেন।

রশীদ : ইতিবৌদির বোনকে বিয়ে করেছেন একজন শ্রীমতী?

শ্যামল : জানো বোধ হয়, হিন্দু ভদ্রলোকের নামের আগে ‘শ্রী’ বলতে হয়।

মতির নামের আগে ‘শ্রী’ যোগ করি। ওঁর নাম মতি নন্দী। খুব ভালো লেখক। আমার চেয়ে ভালো লেখে।

আড্ডার নানা মোড়। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে।

রশীদের কন্যা ক্ষমা (শাওন্তী হায়দার) তখন ‘যুগান্তর’ পত্রিকায়। গিয়েছেন কলকাতায়। শ্যামলের স্মৃতিকথা প্রকাশিত প্রতিসপ্তাহে, সাহিত্য সাময়িকীতে। কয়েকটি সংখ্যা নিয়ে শ্যামলকে দিয়ে বলেন, “সম্পাদক বলেছেন, স্মৃতিকাহিনী ছাড়াও আরও লেখা চাই।”

শ্যামলের প্রশ্ন শাওন্তীকে, “মামনি, কী খাবে? বিয়ার, জিন, রাম না হুইস্কি?” শাওন্তী হেসেই কুটিপাটি। উত্তর : ‘পানি’।

শ্যামলের দুই কন্যা। কন্যাদ্বয়ের সঙ্গে এরকম রঙ্গালি আমাদের জানা।

সম্ভবত, শাওন্তীই বাংলাদেশের একমাত্র, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের স্নেহস্পর্শে ধন্য। সত্যজিৎ ওঁকে বই উপহার দিয়েছেন, স্বাক্ষরিত। মৃণালের কাঁধে হাত রেখে ছবি। মৃণালের মৃত্যুর পর শাওন্তী ওঁর ফেসবুকে ওই ছবি পোস্ট করেন।

মৃণালকে উপহার দিয়েছিলুম রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ উপন্যাস। পড়ে কৌতূহলী। বলেন একদিন, “ছবির উপাদান আছে। মুশকিল, ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধসময়কালীন কোনো চিত্র, ডকুমেন্টেশন পাওয়া যাবে না। এক্সজাটলি যা চাই।”

আমরা জানি, বাংলাদেশের চিত্রপরিচালকরা বাংলাদেশের গল্প, উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহী নয়, পারঙ্গমও নয়। আল মাহমুদের ‘জলবেশ্যা’ গল্প নিয়ে কলকাতায় ছবি হয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ নিয়ে নাটকও।

রশীদ গল্প, উপন্যাস লিখেছেন বিস্তর, কিন্তু নাট্যকারও। ‘নাগরিক’-এর ‘তেলসংকট’ মঞ্চসফল। প্রথমে লিখেছিলেন ছোটগল্প, দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত। গল্প পড়ে শফিক রেহমান উচ্ছ্বসিত। পরামর্শ দেন নাট্যরূপ দেবার। রশীদ খুশি। এক সপ্তাহের মধ্যেই, রশীদের কথা, ‘নাটক বিরচিত’। অনেকেরই অজানা হয়তো, গল্প থেকে নাট্যায়ন।

রশীদের ‘শেকস্পীয়র দ্য সেকেন্ড’ নাটক কেন নাট্যমঞ্চকারীদের নজর এড়িয়েছে, হেতু কী, বলতে অপারগ। কবি হাসান হাফিজুর রহমানের বিশ্বাস ছিল, শেকস্পীয়র দ্য সেকেন্ড যথাযথ অনুবাদ হলে বিশ্বের বহু রঙ্গালয় লুফে নেবে। অনূদিত হয়নি। নিজেও চেষ্টা করেননি। নাটকরে প্রতি প্রেম ঘন ছিল কিন্তু সঘন হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ‘ভ্রান্তিবিলাস’-এ ‘কিংকর’-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন (পরিচালনা মুনীর চৌধুরী)। দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় স্কুলারশিপ নিয়ে পড়তে গেছেন, তিনমাস পরে ছেড়ে ছুড়ে ঘরে ফেরা, ঘরে বউ, দুই কন্যা। ভয়, এক বছর (স্কলারশিপ) থাকলে বাংলা একাডেমির চাকরি গোল্লায় যাবে। মন থেকে নাটক বিদেয় করেননি, অনুবাদ করেছেন ফ্রানৎস্ কাফকার ‘কাঠগড়া’। মূল উপন্যাস ‘দাস্ প্রোৎসেস’। ফরাসি নাট্যরূপ দিয়েছেন আঁদ্রে জীদ এবং জ্য লুই বাঁর। ফরাসি নাট্যরূপের ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য ট্রায়াল’। অনুবাদক যোসেফ কাৎয্ ও লিয়্ কাৎয্। ইংরেজি থেকে রশীদের অনুবাদ ‘কাঠগড়া’। বাংলা একাডেমির প্রকাশনা। ‘কাকফকার মৃত্যুদিনে (৩ জুন)।’ ১৯৮৪ সালে। কাফকার জন্ম : ৩ জুলাই ১৮৮৩, মৃত্যু : জুন ৩, ১৯২৪।

লক্ষণীয়, চতুর্থ ভাষায় অনুবাদ (যদিও মূল উপন্যাস জার্মান ভাষায়)। ‘দাস প্রোৎসেস’ হয়ে যাচ্ছে, ইংরেজিতে দ্য ট্রায়াল। ‘বিচার’ নয়। রশীদের অনুবাদে নামকরণ ‘কাঠগড়া’। চতুর্থ ভাষায় অনুবাদিত, মূল থেকে কি?

ইংরেজি অনুবাদেই বিশ্বস্ত থেকেছেন রশীদ। ইংরেজির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি ঝরঝরে অনুবাদ। স্বাধীনতা যেটুকু, সংলাপে। বাংলা সংলাপের মেজাজমর্জি অনুযায়ী।

“রশীদের চালচলনে যত গাম্ভীর্যই থাক, চেহারায়, চোখের চাহনি খাঁটি অভিনেতার। সুদর্শন চেহারা। সিনেমায় এলে বহু নায়কের ভাত জুটবে না।” চাঁদভাই (অভিনেতা গোলাম মুস্তফা) আরও বলেন, “রশীদকে নিয়ে নায়িকাদের লটরপটর বেড়ে যাবে।” কেন? প্রশ্নের উত্তরে, “আমাদের সিনেমায় কেউ শিক্ষিত নেই, নায়কনায়িকা কেউ শুদ্ধ বাংলাও বলতে পারে না। নায়িকাদের ঘরঘরানা জানো। রশীদ সুশিক্ষিত, গহল্পকার-ঔপন্যাসিক। ওঁর কদর চাঁদকে হাতে পাওয়া।” চাঁদভাইয়ের কথা হুবহু উদ্ধৃত, হলফ করে বলা দোষনীয়। তবে অনেকটাই স্মৃতি থেকে লেখা।

রশীদ হায়দার পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রামণিক। যেখানেই যাচ্ছেন, চিঠি লিখছেন। বর্ণনা দিচ্ছেন শহরের। জানাচ্ছেন অভিজ্ঞতা। নিউইয়র্কে গিয়ে, এক বাঙালির রেস্তরাঁয় খেয়ে, “রুই মাছের ঝোল ইছামতির পানি।” নিউইয়র্ক দেখে, ‘বড়ো-বড়ো বিল্ডিংয়ের চেহারাসুরতে অসভ্যতা।” বার্লিনে স্কলারশিপ নিয়ে এসে, পশ্চিম বার্লিন “মিউজিয়াম। তিন ভাগে বিভক্ত। অ্যালায়েড ফোর্সের। আমেরিকার দখলে বেশি। ব্রিটেন-ফ্রান্সের দখলে কম। তিন ভাগে তিন রকম কুলটুর (কালচার)।” প্যারিসে গিয়ে লিখছেন : “আমাদের পাকাশিড় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সটান দাঁড় করিয়ে দিলে আইফেল টাওয়ারের চেয়ে সুন্দর।”

কলকাতায় যখন ছিলুন, ঢাকা থেকে যেসব চিঠি লিখেছেন, দেশের হালহকিকত, পারিবারিক বিষয়ই বেশি। একটি চিঠিতে, “সরকারের প্রশ্রয়ে মোল্লাদের দাপট ক্রমাগত। ভবিষ্যৎ ভালো নয়।”

রশীদ হায়দার নেই, দেহাবসান। দেহ না থাকলেও উপস্থিতি দেশময়। প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের, একাত্তরের দলিল, স্মৃতিকথার সংকলক। ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। রূপকারও। সম্পাদনায় নিজস্বতা। উপস্থিতি।

আমাদের দাদুভাই, রশীদ হায়দার, আমাদের পারিবারিক নয় শুধু, গোটার দেশের। তাঁকে দেখি জলেস্থলে। গোটা বাংলাদেশে। আছেন। থাকবেন। মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর মতো এত কেউ কি লিখেছেন? না। নিজেই যোদ্ধা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ