ইমার্জেন্সি, কবিতার তর্জমা | অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

Send
.
প্রকাশিত : ১২:৪৫, নভেম্বর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৩, নভেম্বর ১৮, ২০২০

ইন্দিরা-ইমার্জেন্সি (১৯৭৫-৭৯) আরোপিত হওয়ার আগে থেকেই এক-এক সময় আবহাওয়াটা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকতো। বাইরের দিক থেকে অবশ্যই অনেক সময় রাষ্ট্রভাষায় যাকে ‘বাতাবরণ’ বলা হয় তার ধরনধারণটা ছিল প্রতিশ্রুতিব্যঞ্জক, কখনো-বা ফৌজি পাহারায় সুরক্ষিত শান্তিক্ষেত্রের নিরাপত্তার মতোই। যারা ভাবনাচিন্তা করে থাকেন, প্রাতিষ্ঠানিকতায় সংশয় পোষণ করা যাদের বিবেকধর্ম, তাদের মানসে স্বভাবতই প্রচ্ছন্ন একটি সংকটের আশঙ্কা উদ্যত হয়ে ছিল। বিশেষত যারা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ধ্যানধারণার সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচিত তাদের কাছে অবিদিত ছিল না প্রতারিত মানুষজনের ইতিহাস আমাদের এটাই শেখায় যে আপৎকালীন অবস্থা কোনো বিশেষ পর্বের সংঘটন নয়, বরঞ্চ সেটা প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে! অর্থাৎ প্রাত্যহিকের খাঁজে-খাঁজেই চলতে থাকে কণ্ঠরোধের সন্ত্রাস।

সম্ভবত ভারত-চীনের দ্বৈরথ (১৯৬২) সূচিত হবার সঙ্গে-সঙ্গেই সংবেদী মহলে রাষ্ট্রশক্তির দোর্দন্ডপ্রতাপ নিয়ে সঙ্গত জল্পনার সূত্রপাত। এই প্রথম বোধহয় প্রসঙ্গক্রমে ব্রেশটের কবিতা প্রযুক্ত হয় : ‘সাধারণ লোকে ঠিকই বুঝতে পারে/ যুদ্ধ কখন আসছে।/ নেতারা যখন রেগে যুদ্ধের শাপ-শাপান্ত করে/ যুদ্ধ তার ঢের আগে বেধে গেছে, সৈন্য-সাঁজোয়ায়, নৌবহরে।’ বিভিন্ন সাময়িকীতে এই সূত্রে শিল্পীর স্বাধিকার বিষয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছি তাদের জের অন্তত দুয়েক দশক জুড়ে থেকে গিয়েছে। সবুজ বিপ্লব (১৯৬৮- ) থেকে শুরু করে আদমসুমারির (১৯৭১) তোড়জোড় জমে ওঠার সন্ধিক্ষণে তথাকথিত সাধারণ লোকের চোখে আপাতসাফল্যের আড়ালে ধনী-নির্ধনের নির্মম ভেদরেখার বীভৎস চেহারাটা গোপন ছিল না। সে দিক থেকে দেখলে উৎকেন্দ্রিক রোমান্টিক মতিগতিসত্ত্বেও নকশাল আন্দোলনের বাস্তব একটি ভিত্তি ছিল।

মনে রাখতে হবে অন্তরিম এই পর্বে সমাজতাত্ত্বিক সন্দর্ভের পাশাপাশি আরেকটি ধারা প্রবল হয়ে উঠেছিল : অনুবাদ কবিতার। সারা জগতের কাব্যপ্রবাহ থেকে দেশজ সন্ধিৎসার উপযোগী চয়ন ও ভাষান্তরণের গরজ, শঙ্খ ঘোষ ও আমার সম্পাদনায় ‘সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত’ (১৯৬৪) প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই, বিস্ময়কর প্রাচুর্যের পরিমাত্রা পেয়েছিল। কবিতার অনুবাদের একটা মস্ত সুবিধে এই যে, অনুবাদক নিজে যেকথা সরাসরি বলতে পারছেন না, আড়াআড়ি বুননে, অনুবাদ্য কবির মুখ দিয়ে সেটা অকাতরে বলিয়ে নিতে পারছেন। ওইরকম সংক্রান্তির ঘোরেই এক রাত্তিরে আমি ডব্ল্যু. বি. ইয়েটসের ‘দুর্গ’ (The Tower) কবিতাটি অনুবাদ করে বসেছিলাম। হটাৎ কেন আমার বলার প্রবণতা দাখিল করতে গিয়ে মূলত অ-রাজনৈতিক কবি ইয়েটসের শরণাপন্ন হয়েছিলাম তার স্বপক্ষে বিরোধাভাসে দৃপ্ত যুক্তিটা জুগিয়ে দিয়েছিলেন সেই আইরিশ কবিই স্বয়ং : ‘আমাকে রাজনীতিওয়ালা বানাতে চেয়ো না… আমি কখনও মুখ বুজে থাকিনি। আমি চিরদিনই আমার একমাত্র অস্ত্র—কবিতা—কাজে লাগিয়েছি… একটা ইস্যুকে প্রভাবিত করতে গিয়ে কবির আয়ুধের অভিঘাত প্রতিপন্ন হতে পঞ্চাশ বছর লেগে যায়।’

ইয়েটসীয় দ্বিতীয় যুক্তিটিও আমার কাছে মনঃপুত ঠেকেছিল খুব। ডরোথি ওয়েলেসলির একটি কবিতায় তিনি লক্ষ করেছিলেন ‘সংরাগের কালো ছায়া কীভাবে চিরন্তনের মধ্যে গিয়ে ফেটে পড়ে।’ এই মিশ্রণ ‘দুর্গ’ কবিতাটিরও পারমিতা। এখানে তিনি তাঁর সমূহ স্মৃতিপুঞ্জ, অকৃতার্থতা, ক্ষোভ আর আর্তিকে সমন্বিত করে শেষ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার (testament) রেখে গিয়েছিলেন যার আসল কথাটা হল ইমার্জেন্সির মুখে শিরদাঁড়াটা উঁচু রাখা : ‘আমার ঘোষণা শোনো/ আমারই মতন হবে তারা অভিমানী,/ দর্পিত সেই জনসংহতি কোনো/ স্বার্থ কিংবা রাষ্ট্রে তো নয় বাঁধা/ নয় নিষ্ঠ্যূত ক্রীতদাস নয় তারা/ বা শোষক-ভজা থুতু দিত যারা যা-তা…’। সুতরাং গজদন্তমিনারের কবি বলে অপশনাক্ত কবির ওই কবিতাকে উচাটন আমার সময়ের প্রেক্ষিতে রেখে, অনেক সময় ইচ্ছাক্রমে মূল থেকে সরে এসে শিল্পীর স্বাধীনতার কাজে ব্যবহার করাই ছিল সেদিন আমার চূড়ান্ত অভিপ্রায়।

পরিশেষে এল ইন্দিরার জারি-করা ইমার্জেন্সি। রাজভবনে আমাদের কয়েকজনকে নেমন্তন্ন করে এনে প্রধানমন্ত্রী যখন আমাদের অরাজনৈতিক এক দেশাত্মবধে দীক্ষিত করতে চাইছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমার বিপুল তর্ক বেধে যায়। বিশেষত সেই একরোখা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে তিনি কবিতায় আশাবাদের পোষকতা করতে আরম্ভ করতেই তাঁকে আমি ঈষৎ বেঁকিয়ে-চুরিয়ে নিবেদন করি লেসলি স্টিফেন-এর একটি অজেয় বীজমন্ত্র : ‘আশাবাদের মতো এমন অ-নান্দনিক আর কিছুই নেই।’ কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তো কবিতার পরতে পরতেই তখন অবক্ষয়ের বীজ দেখতে পাচ্ছেন। এমন-কি লতাপাতাফুলপাখির এষণাও তাঁর কাছে স্বজাতির পরিপন্থী নৈরাশ্যবাদের শামিল। সেই অপবাদেই আমার বন্ধু শঙ্খ ঘোষের একটি নিসর্গকবিতা সেন্সরগ্রস্ত হয়েছিল বলে তাঁর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দিয়ে আমি সেই সন্ধ্যায় অনাবিল আনন্দের আস্বাদ পেয়েছিলাম।

জীবনানন্দের মুদ্রায় বলতে হয় : ‘সে সব অনেক আগের কথা অনেক চিহ্ন চিন্তা রীতির ক্ষয়/ হয়ে গেছে তারপরেতে…।’ কিন্তু সত্যিই কি আগের কথা? যে-পত্রিকার সম্পাদকের হাতে তাড়াহুড়ো করে ‘দুর্গ’ কবিতাটির অমসৃণ তর্জমা তুলে দিয়েছিলাম, তিনি, ভাস্কর মুখোপাধ্যায়, আমাকে একটা চিঠিতে জানিয়েছিলেন : “The tower কবিতাটির অনুবাদটি তখন ছাপা হয়নি। জরুরি অবস্থার অনুশাসনে ‘লেখা ও রেখা’ অপ্রকাশের অন্তরালে চলে যেতে বাধ্য হয়। ওই ঘটনার প্রায় তিরিশ বছর বাদে পুরনো কাগজপত্রের মধ্যে আবিষ্কার করলাম আপনার পাণ্ডুলিপিটি। সম্ভবত আপনারও মনে নেই এই চিঠির সঙ্গী ১০ পৃষ্ঠার ‘দুর্গ’। এত বছর আমার কাছে আপনার অনুবাদ ধরে রাখার অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।”

ভাস্কর মুখোপাধ্যায়ের উষ্ণ কৃতজ্ঞতা, অনুবাদকবিতাটি অনেকদিন ধরে রেখেছিলেন বলেই তাঁর আবহবিভাবসমেত সেই খসড়া বিবেকী পাঠকের কাছে পৌঁছানো গিয়েছিল।

আর কোনোদিন যেন ইমার্জন্সি না ঘটে, সেই আকাঙ্ক্ষাই—কিংবা ইয়েটসের ভাষায় ‘সংরক্ত চিন্তন’—আমার এই পার্বণের অন্যতম সম্বল। আর যাই হোক কারো কবিতা যেন কোনো দিনই বাজেয়াপ্ত না করা হয়, এটুকুই, অভিজ্ঞতার পাবক বিয়োগফলের মতো, আমাদের অন্যতম ভরসা।

[ডব্ল্যু. বি. ইয়েটসের ‘The Tower’ কবিতার অনুবাদ প্রসঙ্গে লেখা]

//জেডএস//

লাইভ

টপ